সংগ্রাম, বঞ্চনা আর ঘুরে দাঁড়ানোর অদম্য ইচ্ছার গল্পে সাজানো হরিজন সম্প্রদায়ের তরুণী আলোরাধার জীবন। গাইবান্ধা সদর উপজেলার কাচারিবাজার এলাকার এই তরুণী বর্তমানে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন। দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্যের সঙ্গে লড়াই করেও তিনি হার মানেননি। এবার বসুন্ধরা শুভসংঘের দেওয়া একটি সেলাই মেশিন তার স্বপ্নপূরণের পথে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে।
পরিচ্ছন্নতাকর্মী বাবার সীমিত আয়ে তিন বোনের পড়াশোনা চালানো ছিল কঠিন এক সংগ্রাম। সেই সংগ্রামের মধ্য দিয়েই বড় হয়েছেন আলোরাধা। বিয়ের পর স্বামীর সংসারে এলেও আর্থিক সংকট পিছু ছাড়েনি। স্বামীর একটি ছোট দোকান থাকলেও নানা সামাজিক বৈষম্য ও অবহেলার কারণে ব্যবসা ভালো চলে না। ফলে সংসারের চাকা সচল রাখতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হয় পরিবারটিকে।
আলোরাধা বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই দেখেছি বাবা কত কষ্ট করে আমাদের মানুষ করেছেন। সমাজে আমরা অনেক সময় অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হয়েছি। তবুও পড়াশোনা ছাড়িনি। এখন অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছি। স্বপ্ন দেখি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। বসুন্ধরা শুভসংঘের দেওয়া এই সেলাই মেশিন আমার কাছে শুধু একটি মেশিন নয়, এটি নতুন জীবনের আশা।’
তিনি বলেন, ‘আমি বিভিন্ন ধরনের পোশাক, ব্লাউজ, ফ্রক, পায়জামা ও শিশুদের পোশাক সেলাই করতে পারি। এখন ঘরে বসেই কাজ করে সংসারে আয় করতে পারব, পড়াশোনার খরচও চালাতে পারব। আমি চাই সমাজের বোঝা হয়ে নয়, নিজের যোগ্যতায় মাথা উঁচু করে বাঁচতে।’
রবিবার (২৬ জুলাই) গাইবান্ধা চেম্বার অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাকক্ষে আলোরাধার মত দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করা ৩৬ নারীর হাতে বসুন্ধরা গ্রুপের উপহার হিসেবে সেলাই মেশিন তুলে দেওয়া হয়।
কালের কণ্ঠের জেলা প্রতিনিধি ও জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি অমিতাভ দাস হিমুনের সভাপতিত্বে ও সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি ছিলেন বসুন্ধরা গ্রুপের উপদেষ্টা ও শুভসংঘ প্রধান প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন।
এ সময় তিনি গাইবান্ধা সদর, ফুলছড়ি ও সাদুল্লাপুর উপজেলার ৩৬ নারীর হাতে সেলাই মেশিন তুলে দেন। তিন মাস বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ শেষে দক্ষ হয়ে ওঠা নারীরা সেলাই মেশিন পেয়ে আবেগাপ্লুত হন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইমদাদুল হক মিলন বলেন, ‘বসুন্ধরা শুভসংঘের দেওয়া এই সেলাই মেশিন আপনাদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার একটি মাধ্যম। এটি কাজে লাগিয়ে নিজের পরিবারের পোশাক তৈরির পাশাপাশি আয়ও করা সম্ভব। আমরা চাই আপনারা এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে স্বাবলম্বী হোন, সন্তানদের শিক্ষিত করুন এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটান।’
অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন গাইবান্ধার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) যাদব সরকার, গাইবান্ধা জেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুন্নবী টিটুল, গাইবান্ধা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবদুল্লাহ আল মামুন, গাইবান্ধা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইদ্রিসুজ্জামান মোনা, নাট্যকর্মী মানিক বাহার।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) যাদর সরকার বলেন, ‘সেলাই মেশিন শুধু একটি যন্ত্র নয়, এটি নারীদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার একটি মাধ্যম। এই উদ্যোগের মাধ্যমে অনেক নারী ঘরে বসেই আয় করার সুযোগ পাবেন এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবেন। আপনারা নিজেরা স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি আশপাশের অন্য নারীদেরও এই কাজ শেখাবেন। আমরা বিশ্বাস করি, নারীর ক্ষমতায়ন পুরো পরিবার ও সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।’
গাইবান্ধা জেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুন্নবী টিটুল বলেন, ‘বসুন্ধরা শুভসংঘের এই সেলাই মেশিন বিতরণ কর্মসূচি নারীদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলার একটি উদ্যোগ। আমরা আশা করি, এই মেশিন ব্যবহার করে উপকারভোগীরা আয়মুখী কাজে যুক্ত হবেন এবং এলাকায় অন্য নারীদের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবেন। বসুন্ধরা গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে নারীরা স্বাবলম্বী হয়ে নিজেদের পরিবারের পাশাপাশি সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবেন।’
অনুষ্ঠানের সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন বসুন্ধরা শুভসংঘের সদস্য হুমায়ুন আহম্মেদ বিপ্লব, আহসানিয়া তাসনিম, সুমাইয়া আক্তার, ছামিউল বাসির, আশিদুল ইসলাম, সোহানুর রহমান, আহসান আজিম প্রধান, তৌহিদুল ইসলাম, আফিয়া ইভা, দীবাকর মোদক, সজীব সরকার, সুমাইয়া খাতুন, আবিদা আক্তার, আফরিন আক্তার ও সিনথিয়া আক্তার।







