• ই-পেপার

উদ্ভাবনের আনন্দ : শ্রেণিকক্ষ থেকে জাতীয় মঞ্চে

মনের ভিতর বনের কুহু

আবু তাহের

অনলাইন ডেস্ক
মনের ভিতর বনের কুহু

গৃহকর্তা জমিসংক্রান্ত মামলার বাদী। হাজিরা দেওয়ার জন্য শহরে রওনা হয়েছিলেন সকাল ৭টায়। যাত্রার সময় তিনি গৃহকর্ত্রীর হাতে দশ টাকার নোটের একটি তাড়ায় পাঁচ শ টাকা দিয়ে বলেছেন, পাশের গ্রাম থেকে পাওনাদার আসবে একজন। টাকাগুলো যেন ওই ব্যক্তিকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। কারো নজরে যাতে না পড়ে, সেভাবে রান্নাঘরে হাঁড়িপাতিল রাখার তাকের এক কোণায় টাকাগুলো রাখা হয়। পাওনাদার এলো দুপুরে। গৃহকর্ত্রী তাক হাতড়ান টাকার তাড়ার জন্য। ওরে আল্লাহ! টাকা তো পাওয়া যাচ্ছে না। চুরি হয়ে গেছে।

বাড়িতে কাজের জন্য আছে দুই নারী, দুই পুরুষ। এরা রান্নাঘরে বারবার আসা-যাওয়া করে। চারজনকেই সন্দেহ করা হয়। চারজনই বলে, ‘চুরি করিনি আম্মা।’ গৃহকর্তার স্ত্রীর ভাই মনসাদ তার বোনজামাইর টাকায় পরে আর খায়। মওকা পেলেই খুব লাফায়। সে বলে, ‘চাইরডারেই ছ্যাঁচা দিমু। মাইর খাইয়া ফরফর কইরা চোট্টামির কথা স্বীকার যাবেই।’ বহিরাগতের এমন চোটপাট বাড়ির স্থায়ী পুরুষ সদস্যরা বরদাশত করল না। তারা বলে, পিটুনির দরকার নাই। স্বনামখ্যাত গুনিন জাকু পাটোয়ারিকে আনা হচ্ছে। উনি এসে ‘চাল পড়া খাইয়ে অপরাধী চিহ্নিত করবেন।

গৃহকর্তার ছোট ভাই নাসিমুল হক জানান, গুনিনের মন্ত্রপূত চাল চারজনকে নয়, খাওয়ানো হবে পাঁচজনকে। মানে কাজের চার লোক আর মনসাদকে। স্তম্ভিত মনসাদ জানতে চায়, কী কারণে তাকে চোর মনে করা হচ্ছে। নাসিমুল বলে, রান্নাঘরে তুমিও বারবার আসা-যাওয়া কর। কখনো চা বানাতে বলো। কখনো চুলার আগুনে সিগারেট ধরাও। কখনো ডাব কেটে পানি খাওয়ার জন্য দা সন্ধান কর। এসবের ফাঁকে দুলাভাইর টাকাকে নিজের টাকা মনে করে যে সরাওনি, তার নিশ্চয়তা মোরা পাব কোথা?

‘অপমানের একটা সীমা থাকা চাই। এ বাড়িতে আমি আর এক সেকেন্ডও থাকব না।’ মনসাদ ঘোষণা করে এবং তার মালসামানা গোছগাছ করতে কাজের এক লোককে নির্দেশ দেয়। লোকটা নির্দেশ পালনে উদ্যত হতেই নাসিমুল হাত ইশারায় তাকে থামিয়ে মনসাদকে বলে, তোমার মহান সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। তবে সিদ্ধান্তটি কার্যকর করতে হবে ঘণ্টা খানেক পরে। আশা করি, ওই সময়ের মধ্যে জাকু পাটোয়ারি এসে পড়বেন।

জাকু এসে বিড়বিড় করে রহস্যময় আওয়াজ দিয়ে এক বাটি আতপ চালে ফুঁ দেন। সেই চাল মুঠো মুঠো করে পাঁচজনকে দিলেন। বললেন, চিবাও। চিবিয়ে মুখ থেকে বের করে ঘরের মেঝেতে ফেলবে। নির্দেশমতো ওরা চিবোয় এবং মেঝেতে ফেলে। দেখা যায়, চারজনের মুখ থেকে বেরিয়েছে ফিরনির মতো তরল। কাজের এক লোকেরটা ছিল শক্ত আটার দলার মতো। তার ডান হাতের কবজি পাকড়িয়ে গুনিন জাকু পাটোয়ারি বলেন, এ-ই-ই টাকা চুরি করেছে। সঙ্গে সঙ্গে লোকটা নাসিমুল হকের পায়ে পড়ে বলে, মাফ কইরা দেন গো কাগা। জীবনে আর এরকম করুম না। যদি করি ফাঁস দিয়া আমারে আল্লাহর কাছে সোপর্দ কইরা দিয়েন।

প্রত্যক্ষদর্শীর মুখে এ ঘটনা শুনে জাকু পাটোয়ারির গুণমুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। তাকে দেখার আগ্রহও হয় খুব। কিন্তু দেখার সুযোগ হয় না। বহু বছর পর, ১৯৭৮ সালের এক বাদলা দিনে ট্রেনে ঢাকা থেকে আমরা তিন বন্ধু বাড়ি ফিরছি। পথিমধ্যে এক স্টেশন থেকে পাঁচ ছয়জন যাত্রী উঠল আমাদের কম্পার্টমেন্টে। তাদের মধ্যে সাদা বাবরি চুল, সাদা লম্বা দাড়ি ঘন গোঁফধারী বিলকুল রবিঠাকুরের চেহারার ব্যক্তিকে দেখিয়ে বন্ধু রহমত বলে, ইনিই জাকু পাটোয়ারি।

আমরা আলাপ জমাই। একপর্যায়ে জানতে চাই, আতপ চালে কোন মন্ত্র পড়ে ফুঁ দেন। ৮২ বছর বয়সি গুনিন বলেন, মন্ত্রফন্ত্র কিছু না বাবা। মনের ভিতর বনের কুহু ঢুকিয়ে দিই। তাতেই কাম সারা। চোরার গলা শুকিয়ে যায়। তার চিবানো চাল হয়ে যায় আটার দলা।

২. মানসিকভাবে দুর্বল করে অপরাধীকে ধরা দেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা সোজা কাজ নয়। তবু কেউ কেউ মনে করেন, ওটা তেমন কঠিন নয়। চোপাবাজিতে লক্ষ্যার্জন সম্ভব। আমার স্কুলজীবনের সহপাঠী আজিজ আহমেদদের বাড়িতে অনেক নারকেল গাছ। ওই গাছের ডাব একটু পোক্ত হতেই চুরি হয়ে যেত। আরেক সহপাঠী মুন্সি ফারুক ঘোষণা করে যে রাতের আঁধারে একটি গাছের ডাব সমগ্র আত্মসাতের অধিকার তারও রয়েছে। আজিজ জানায়, ফারুক লেট করে ফেলেছে। কেননা আজিজের দাদি পানি পড়া ঢেলেছেন গাছের গোড়ায়। চোর ডগায় উঠলেই অন্ধ হয়ে যাবে। ডাব চুরি করা দূরের কথা, গাছ থেকে নামতেই পারবে না। এ অবস্থায় বিষ পিঁপড়ার কামড়ের পর কামড়। যন্ত্রণায় চোর হাউমাউ কাঁদতে থাকবে আর বাড়ির লোকজন এসে তাকে দিবে প্যাদানি।

গৃহকর্তা ‘হ্যাঁ, লেট হয়তো কিছুটা হয়েছে’ বলে মুন্সি ফারুক, ‘কিন্তু সময় তো ফুরিয়ে যায়নি। উপরের বস্তু করায়ত্ত করতে সংকল্প পোষণই যথেষ্ট—এরকম ভাবলে তো ভবিষ্যৎ হাওয়া। নিচ থেকে উপরে পৌঁছার যথোপযুক্ত সময় তৈরি করে নিতে হয়। কেন না ওটা কেউ কাউকে উপহার দেয় না।’ আমরা ভয় পেয়ে গেলাম। ফারুককে পরামর্শ দিই, অন্ধ হওয়ার ঝুঁকি নিস না বন্ধু। কিন্তু তার সাফ কথা : নো রিস্ক নো গেইন।

এক দুপুরে সাইকেল হাঁকিয়ে বন্ধুদের বাড়ি গিয়ে ফারুক বিকাল ৪টার মধ্যে তাদের বাড়িতে যেতে বলে। সে ম্যাজিক প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছে। জাদুকরের নাম কী, তার বাড়ি কোথায়? ফারুকের উত্তর : নাম নয়-কর্মই মানুষকে মহান বানায়। জাদুকরের বাড়ি দিয়ে কী হবে? তার দক্ষতায় খাদ আছে কি নেই সেটাই বিচার্য। বন্ধুরা সবাই জাদু দেখতে জড়ো হলো। আজিজও ছিল সেখানে। ফারুক সবাইকে বাড়ির বৈঠকখানার একটি কামরায় নেওয়ার পর সুর করে গায়—‘ডাবের আমি/ডাবের তুমি/ডাব দিয়ে যায় চেনা।’ আমরা দেখি, কামরায় রয়েছে দুই ডজনেরও বেশি ডাব, যেগুলো আজিজদের গাছে ছিল। ডাবগুলো যেন বলছে, ফারুকের মনের ভিতর বনের কুহু ঢুকিয়ে দেওয়ার আজিজি চেষ্টা ব্যর্থ।

৩. নীলফামারীর ডোমার থানা (বর্তমানে উপজেলা) সদরেও বিজন সর্বজ্ঞ নামের এক গুনিন ছিলেন, যিনি মনের ভিতর বনের কুহু না ঢুকিয়েই হারানো দ্রব্য বা মানুষ কোন অবস্থায় কোথায় বিদ্যমান সেই সন্ধান দানে ছিলেন পারঙ্গম। ভুক্তভোগী বহু লোক কানাকড়িও খরচ না করে গুনিনের হাতে উদ্ধার পেয়েছেন। বিজন সর্বজ্ঞর এক নাতি (ভ্রাতুষ্পুত্রের পুত্র) উৎপল সর্বজ্ঞ প্রতিবেদক পদে কাজ করতেন ঢাকায় এক দৈনিক পত্রিকায়। উৎপলের মুখেই শুনেছি পরোপকারের বিনিময়ে তার ওই দাদু উপনীত হয়েছিল ‘যার মাথায় ধরলাম ছাতি/সে মারল মাথায় কষিয়ে এক লাথি’ অবস্থায়।

পাকিস্তানি জমানায় শেষ প্রান্তে ডোমারে বদলি হয়ে এলেন এক সরকারি অফিসার নজর আলী শাহ (এটা কল্পিত নাম)। উৎপল তার বাবার কাছ থেকে শুনেছেন, অবাঙালি ওই অফিসার উঠতে-বসতে সর্বদা ক্ষমতার আস্ফালন করতেন। ছিলেন থানা পর্যায়ের হুজুর। ভাবভঙ্গি ছিল গোটা প্রদেশের হুজুরে আলার মতো। নতুন কর্মস্থলে যোগদানের তিন মাসের মাথায় নজর আলী হুজুরের স্ত্রীর গলার সোনার হার খোয়া যায়। বাসস্থানের আঙিনায় পাতকুয়ার পাড়ে গোসল করার আগে একটা পিঁড়ির ওপর সোনার হারটি রেখেছিলেন বেগম হুজুর। গোসল সারার পর তিনি আর হারটি খুঁজে পান না। রহস্যময় ঘটনা!

খোলা আকাশের নিচে বেগম হুজুরের গোসলের সময় নারী বা পুরুষ, সবারই উঠোনে আসা নিষিদ্ধ। তার মানে কেউই হারটা দেখেনি। দেখেনি অথচ চুরি হয়ে গেল, এ কীভাবে সম্ভব? প্রশ্নের জবাব মিলছিল না। ফলত বিরামহীন চলছে নজর আলী শাহের তর্জনগর্জন। থানা-পুলিশ আশ্বাস দেয়, ঘাবড়ানোর কিছু নেই স্যার। তদন্ত জারি আছে। নজর বলেন, পাঁচ দিন ধরেই শোনাচ্ছ জারি আছে জারি আছে। জারি দিয়ে আমার কী কাজ! আমি চাই নেকলেস। ওটা উদ্ধার করবে কখন? আমার ইন্তেকালের পরে?

নজর আলীর অস্থিরতা প্রশমনের উদ্দেশ্যে তার অফিসের সিনিয়র কেরানি চুরি-উত্তর বিভিন্ন ঘটনার ইতিবাচক উত্তরণের বর্ণনা দিয়ে জানালেন, তার মনে হচ্ছে গুনিন বিজন সর্বজ্ঞর সাহায্য নিলে সংকট মোচন সম্ভব। গুনিনের সাহায্য প্রার্থনার অনুমতি পান কেরানি। তার মুখে সব শোনার পর বিজন সর্বজ্ঞ চোখ বুজে ধ্যান করলেন মিনিট তিনেক। এরপর বললেন : চুরি যায়নি। হারখানা আছে কুয়ার ভিতরে। খুব সম্ভব কাক ঠোঁটে করে নিয়ে গিয়ে ওখানে ফেলেছে। কুয়া থেকে তোলা হয়েছিল সেই সোনার হার। গুনিনের গুণপনায় অতিশয় মুগ্ধ নজর শাহ নগদ দুই শ টাকা দেন বিজন সর্বজ্ঞকে। কিন্তু গুনিন দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, গুরুর হুকুম আছে উপকারের বিনিময়ে পুরস্কার নিও না। নিলে ঈশ্বর কুপিত হবেন।

ঘটনার পরদিন ভোরে পুলিশ এসে বিজন সর্বজ্ঞকে থানায় নিয়ে গেল। থানার ওসি বলেন, নজর আলী হুজুরের ধারণা, যে ব্যক্তি সোনার অলংকার কোথায় আছে ঠিকঠাক বলে দিতে পারে। সে ব্যক্তি তো চোর-ডাকাতের দলকেও বলে দিতে পারে গৃহস্থের অলংকার কোন কোন জায়গায় আছে। ওসি বলেন, এই যুক্তিতে, আপনাকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করার নির্দেশ দিয়েছেন নজর আলী শাহ। আপনি বসে চা-বিস্কুট খান। সেকেন্ড অফিসার কিছুক্ষণের মধ্যে আপনাকে জেরা শুরু করবেন।

মিনিট পাঁচেক পরেই থানার সেকেন্ড অফিসার এসে বলেন : সর্বজ্ঞ মশাই। আপনাকে তিন ঘণ্টা ধরে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেছে (আসলে কোনো প্রশ্নই তাকে করা হয়নি)। কাজ শেষ। আপনি বাড়ি যেতে পারেন।

৪. উপকার গ্রহণের পর কিছু কিছু লোক কী করে তার সরস কেচ্ছা শুনিয়েছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুর রব সাদী।

অর্থকষ্টে জর্জরিত এক ব্যক্তি রোজার ঈদের আগে খামের উপরে লিখেছে—‘প্রাপক, আল্লাহ।’ ডাকঘরের লোকরা বিস্মিত। তারা খাম খুলে দেখেন চিঠিতে লেখা—‘ছেলেমেয়ে নিয়ে সম্মানের সঙ্গে ঈদ করার জন্য কিছু টাকা দেবেন দয়াময়।’

পোস্ট মাস্টারের উদ্যোগে ডাকঘরের কর্মীরা দয়াপরবশ হয়ে চাঁদা তুলে লোকটার ঠিকানায় দুই হাজার টাকা পৌঁছে দিয়ে জানায়—‘আল্লাহ পাঠিয়েছেন।’ ঈদুল আজহার আগে লোকটা আবার আল্লাহর ঠিকানায় চিঠি দেয়—‘রাব্বুল আলামিন, গত ঈদে আপনার টাকায় ঈদটা ভালোভাবেই করেছি। এবারও টাকা দরকার দয়াময়। তবে এবার ফেরেশতার হাতে পাঠানোর আবেদন করছি। কারণ আমার বিশ্বাস, গতবার আপনি চার হাজার টাকা দিয়েছিলেন। বেজন্মার বাচ্চা বেজন্মা পোস্ট মাস্টারটা দুই হাজার টাকা মেরে দিয়েছে।

লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

তারেক রহমান সরকারের জনকল্যাণমুখী বাজেট

সিরাজুল ইসলাম
তারেক রহমান সরকারের জনকল্যাণমুখী বাজেট
সংগৃহীত ছবি

একটি বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়। একটি বাজেট আসলে একটি সরকারের রাজনৈতিক দর্শন, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিফলন। সে কারণেই নতুন সরকারের প্রথম বাজেট সব সময়ই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ জনগণ তখন শুধু বরাদ্দের অঙ্ক দেখে না; তারা খুঁজে দেখে সরকার কোন দিকে দেশকে নিয়ে যেতে চায়।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটও সেই অর্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরতির পর ক্ষমতায় আসা সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট হিসেবে এটি দেশের অর্থনীতি, সমাজ এবং রাষ্ট্র পরিচালনা সম্পর্কে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার কেবল প্রবৃদ্ধির কথা বলেনি বরং মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তার মতো মৌলিক বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়েছে। অনেক সময় আমরা উন্নয়ন বলতে শুধু বড় বড় সেতু, মহাসড়ক কিংবা অবকাঠামো প্রকল্পকে বুঝি। কিন্তু বাস্তবতা হলো উন্নয়নের প্রকৃত ভিত্তি মানুষ। দক্ষ, শিক্ষিত, সুস্থ এবং উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী ছাড়া কোনো দেশ দীর্ঘ মেয়াদে এগিয়ে যেতে পারে না। এবারের বাজেটে সেই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেই এটি অনেকের কাছে জনবান্ধব বাজেট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

শিক্ষা খাতের দিকে তাকালে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়। বিশ্বের যে দেশগুলো দ্রুত উন্নতি করেছে, তাদের প্রায় সবকটিই শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করেছিল। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা দেখলে বোঝা যায়, মানবসম্পদে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু এই জনসংখ্যাকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে না পারলে সেটিই আবার বোঝায় পরিণত হতে পারে। সেই কারণে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে কেবল সনদ নয়, প্রয়োজন দক্ষতা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্য-প্রযুক্তি, কারিগরি শিক্ষা এবং গবেষণার ওপর জোর না দিলে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকবে। তাই শিক্ষা খাতে বাড়তি মনোযোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ।

একইভাবে স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্বও নতুন করে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। করোনা মহামারির পর পুরো বিশ্ব বুঝেছে, স্বাস্থ্য খাতকে অবহেলা করলে তার মূল্য অর্থনীতি, সমাজ এবং রাষ্ট্র—সবাইকে দিতে হয়। একজন অসুস্থ নাগরিক যেমন উৎপাদনশীল হতে পারেন না, তেমনি একটি দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা জাতীয় উন্নয়নের গতি কমিয়ে দেয়।
বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলে এখনো অনেক মানুষ মানসম্মত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, চিকিৎসক সংকট দূর করা, আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের নাগালের মধ্যে আনা সময়ের দাবি। বাজেটে এই খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেই সাধারণ মানুষ আশাবাদী হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

তবে আমার দৃষ্টিতে এবারের বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশ্ন। একটি রাষ্ট্র কেবল অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেই চলে না; তাকে নিরাপদও হতে হয়। বর্তমান বিশ্বে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। সাইবার হামলা, প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ, আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।

এ অবস্থায় প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগকে শুধু ব্যয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার একটি অপরিহার্য উপাদান। একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং দক্ষ সশস্ত্র বাহিনী শুধু যুদ্ধের জন্য নয়; দুর্যোগ মোকাবেলা, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন এবং জাতীয় সংকট মোকাবেলাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই সামরিক খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধিকে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।

এবারের বাজেটের আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে গুরুত্বারোপ। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া। সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সঙ্গে না নিয়ে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। দরিদ্র, প্রবীণ, বিধবা, প্রতিবন্ধী এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি তাই রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্বের অংশ।

এ ছাড়া কৃষি খাতের বিষয়টিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের অর্থনীতি যতই শিল্প ও সেবাখাতনির্ভর হোক, কৃষির গুরুত্ব কখনো কমবে না। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে কৃষির বিকল্প নেই। কৃষক যদি ন্যায্য মূল্য না পান, তাহলে পুরো অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই কৃষি উৎপাদন, সংরক্ষণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়নও বাজেট বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের প্রশ্নটিও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। তাদের জন্য যথেষ্ট কর্মসংস্থান তৈরি না হলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিবেশ সৃষ্টি, ব্যবসা সহজীকরণ এবং উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক নীতি গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া, যথেষ্ট পরিমাণে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না হলে এই শিক্ষিত তরুণ সমাজ সমাজের বোঝা হয়ে উঠবে। তাতে সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে, নানা রকম অপরাধমুলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধিরও আশঙ্কা থাকে।

বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। গত কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল তখনই অর্থবহ হবে, যখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকবে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হয়, সেটিই হবে এই বাজেটের অন্যতম বড় পরীক্ষার ক্ষেত্র।

তবে বাজেট যত ভালোই হোক, বাস্তবায়নই শেষ কথা। বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক সময় দেখা গেছে, উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা কাগজে থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন ঘটেনি। এখানেই সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রথমত, রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। উন্নয়ন ব্যয় পরিচালনার জন্য সরকারের আয় বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি ও অপচয় কমাতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং সময়ক্ষেপণ দীর্ঘদিনের সমস্যা। তৃতীয়ত, প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে হবে। বরাদ্দ ঘোষণা করলেই হবে না; তা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, জনগণ এখন শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা ফলাফল দেখতে চায়। তারা জানতে চায়- শিক্ষা খাতে বরাদ্দের ফলে বিদ্যালয়ের মান কতটা বাড়ল, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের ফলে চিকিৎসাসেবা কতটা উন্নত হলো, আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল তাদের জীবনে কতটা পৌঁছালো।

সুতরাং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে শুধু একটি অর্থনৈতিক দলিল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার, একটি উন্নয়ন দর্শন এবং একটি ভবিষ্যৎ রূপরেখা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার ওপর জোর দিয়ে সরকার যে বার্তা দিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।

এখন অপেক্ষা একটাই—ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান কতটা কমানো যায়। কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত বাজেটের অঙ্ককে নয় বরং তার ফলাফলকেই মনে রাখে। যদি এই বাজেটের লক্ষ্যসমূহ সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এটি শুধু একটি অর্থবছরের পরিকল্পনা হয়ে থাকবে না; বরং বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

জামায়াতের পরিকল্পিত রাজনৈতিক আন্দোলনের নেপথ্যের আসল কারণ কী

রাজনৈতিক বিশ্লেষক
জামায়াতের পরিকল্পিত রাজনৈতিক আন্দোলনের নেপথ্যের আসল কারণ কী
সংগৃহীত ছবি

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ বারবার রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখোমুখি হয়েছে। দেশের প্রতিটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়ই বিভিন্ন ধরনের বয়ান সামনে এসেছে। কখনো গণতন্ত্র ও সংস্কারের দাবি হিসেবে তা এসেছে। আবার কখনো তা এসেছে রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিও আবার একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে। জামায়াতে ইসলামীর পরিকল্পিত এক মাসব্যাপী আন্দোলন কি সত্যিই রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের উদ্দেশ্যে? নাকি তা নির্বাচনী হতাশার পর হারানো রাজনৈতিক প্রভাব পুনরুদ্ধারের একটি কৌশল? জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের দাবি, তাদের আন্দোলনের লক্ষ্য হলো সংবিধান ও রাষ্ট্র পরিচালনা ব্যবস্থায় অর্থবহ সংস্কার আনা, যাতে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরো শক্তিশালী হয়। 

তবে সমালোচকেরা এটাকে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেন। তাদের মতে, সংস্কারের ভাষা এখন এমন একটি রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে, যার মাধ্যমে দলটি নিজেদের প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়া নির্বাচনী ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করছে। 

এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের রাজনৈতিক মিত্ররা ব্যাপক আশাবাদ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। অনেকের ধারণা ছিল তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাদের জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের সুযোগ করে দেবে। কিন্তু যদি ধরে নেওয়া হয় যে ভোটাররা শেষ পর্যন্ত তাদের রাজনৈতিক অবস্থান প্রত্যাখ্যান করেছেন, তাহলে নির্বাচনের ফলাফল জামায়াত এবং তাদের মিত্রদের জন্য একটি বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। বেশ কয়েকজন পর্যবেক্ষকের মতে এই প্রত্যাখ্যান সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়েছিল। যার মধ্যে তরুণ ভোটার, নারী, পেশাজীবী এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীও ছিল। তাদের দৃষ্টিতে আধুনিক রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন এবং একই সঙ্গে ইসলামী মূল্যবোধের প্রধান রক্ষক হিসেবে পরিচিতি গড়ে তোলার জন্য জামায়াতের প্রচেষ্টা অনেক ভোটারের কাছেই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। 

সমালোচকদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে দলটির ঐতিহাসিক ভূমিকার যে স্মৃতি বিদ্যমান মানুষের কাছে, সেখানে এটি তাদের ভাবমূর্তি পরিবর্তনের নানা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও জনমনে তাদের সম্পর্কে ধারণাকে এখনো প্রভাবিত করে চলেছে। 

জামায়াতের রাজনৈতিক মিত্রদের ভবিষ্যৎ নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে বৃহত্তর রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ জোটটির জনসমর্থন দুর্বল করে দিয়েছে। তাদের দাবি সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং নৈতিক নেতৃত্বের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, জোটের একটি অংশ রাজনৈতিক সুবিধাবাদের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় সেই প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়েছে। এসব অভিযোগ শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হোক বা না হোক, সমালোচকদের মতে, এর রাজনৈতিক প্রভাব জনগণের আস্থা কমিয়ে দিতে ভূমিকা রাখতে পারে। 

যদি ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ফলাফল সত্যিই ভোটারদের রায়ের প্রতিফলন হয়ে থাকে তবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সেই রায় সব রাজনৈতিক পক্ষের মেনে নেওয়া উচিত। একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনের ফলাফলে হতাশ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে প্রত্যাশা থাকে যে তারা নিজেদের পুনর্গঠন করবে এবং ভবিষ্যতের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেবে। রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তনের জন্য নির্বাচনের বাইরের কোনো পথ অনুসরণ না করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাওয়াই তাদের দায়িত্ব। এই প্রেক্ষাপটেই জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। বিশেষ করে, গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনার প্রসঙ্গ টেনে এনে তাঁদের দেওয়া মন্তব্য দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। 

সমালোচকদের মতে, এ ধরনের বক্তব্য গণতান্ত্রিক নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হয় না, বিশেষত যখন নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আপত্তি জানানো বা রাজনৈতিক প্রতিকার চাওয়ার জন্য আইনসম্মত ও সাংবিধানিক পথ খোলা রয়েছে। 

এটি স্বাভাবিকভাবেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দেয়। যদি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যেই মতপার্থক্য প্রকাশ ও সমাধানের সুযোগ বিদ্যমান থাকে, তবে গণতান্ত্রিক সম্পৃক্ততার পরিবর্তে কেন সংঘাতমুখী ভাষা বেছে নেওয়া হচ্ছে? রাজনৈতিক মতভেদ গণতন্ত্রের একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। তবে দায়িত্বশীল নেতৃত্ব এটাই দাবি করে যে, বিরোধ ও মতপার্থক্যের সমাধান সাংবিধানিক পথেই খোঁজা উচিত। আর, এমন বক্তব্য বা ভাষা ব্যবহার না করা উচিত, যা সামাজিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তোলার ঝুঁকি সৃষ্টি করে।

কিছু বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে গণ-আন্দোলন বা ব্যাপক জনসমাবেশ গড়ে তোলার সম্ভাবনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের প্রশ্ন, অত্যন্ত আবেগঘন ও উত্তেজনাপূর্ণ জনমুখী প্রচারণা কি অনিচ্ছাকৃতভাবে—অথবা ইচ্ছাকৃতভাবেই দেশকে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে পারে? অতীতে বাংলাদেশ রাজপথের সংঘাতের ক্ষতিকর পরিণতি প্রত্যক্ষ করেছে। তাই, যেসব রাজনৈতিক কৌশল দেশকে আবারও অস্থিরতা ও সংঘাতের পুনরাবৃত্ত চক্রে ফিরিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে, সেই বিষয়ে অনেক নাগরিকই সতর্ক ও শঙ্কিত।

জামায়াতকে ঘিরে চলমান বিতর্ককে তাদের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে দলটির ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগের কারণে তারা এখনো জনপরিসরে নিবিড় পর্যালোচনা ও সমালোচনার মুখোমুখি হয়। বাংলাদেশের অনেকের কাছেই এই ইতিহাস জাতীয় পরিচয় এবং রাজনৈতিক চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার কিংবা এর তাৎপর্যকে খাটো করে দেখানোর, তা বাস্তব হোক বা কেবল এমন ধারণা সৃষ্টির প্রচেষ্টা হোক, এমন যে কোনো প্রচেষ্টাই অনিবার্যভাবে জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।

সমালোচকদের মতে, অন্তর্বর্তী রাজনৈতিক সময়ে দেশের ইতিহাসের বয়ান নতুনভাবে নির্মাণের যে প্রচেষ্টা হাতে নেওয়া হয়েছিল, তা নাগরিক সমাজ, শিক্ষাবিদ, গণমাধ্যম এবং তাদের পাশাপাশি, দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অটুট রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সাধারণ মানুষের দৃঢ় প্রতিরোধের মুখে পড়ে। তাঁদের মূল্যায়ন হচ্ছে, বৃহত্তর বাঙালি জাতীয় পরিচয় এখনো স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে উৎসারিত আদর্শের ওপরই দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। তাই সেই ঐকমত্য থেকে সরে আসার যে কোনো প্রচেষ্টাই নিঃসন্দেহে রাজনৈতিকভাবে বেশ কঠিন।

এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক আন্দোলনের ঘোষণাটি আরো গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে। শান্তিপূর্ণভাবে এবং আইনের সীমার মধ্যে থেকে জনসমাবেশ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পরিচালনা করা সবারই গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে দেশব্যাপী দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনের সময়কাল এবং উদ্দেশ্য স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্নের জন্ম দেয় যে এর প্রকৃত লক্ষ্য কী?

একটি ব্যাখ্যা হলো, এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত প্রতিশ্রুত সংস্কার ও অঙ্গীকার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। অন্যদিকে, খানিকটা সন্দেহ মনে ধরে রেখে আরেকটি ব্যাখ্যায় বলা যেতে পারে, সংস্কারের এজেন্ডাকে আসলে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সরকারের ওপর দীর্ঘস্থায়ী চাপ সৃষ্টি করা এবং দেশে এক ধরনের অনিশ্চয়তার পরিবেশ বজায় রাখাই এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য।

সমালোচকদের মতে, এ ধরনের কৌশলের পেছনে আরো বিস্তৃত একটি রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ কাজ করছে। যদি একটি নির্বাচিত সরকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল করতে পারে, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অগ্রগতি অর্জন করে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো সুসংহত করতে সক্ষম হয়, তাহলে আগামী বহু বছর ধরে জামায়াতের শাসনক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে অনেকটাই। এই দৃষ্টিকোণ থেকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে কেবল একটি দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি হিসেবে নয়, বরং এমন এক পরিস্থিতি হিসেবে দেখা হতে পারে, যা এককভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় পৌঁছাতে অক্ষম রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নতুন বা বিকল্প সুযোগ এনে দেয়।

অবশ্য এই ব্যাখ্যাটি কতটা সঠিক, তা এখনো রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়। তবে শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভিত্তি হলো নির্বাচনের ফলাফলকে সম্মান করা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং মতপার্থক্যের সমাধান শান্তিপূর্ণ উপায়ে খুঁজে নেওয়া। সংস্কারের দাবি তোলা, সরকারের সমালোচনা করা এবং জনমত সংগঠিত করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর। একই সঙ্গে তাদের ওপর এই দায়িত্বও বর্তায় যে, এমন কোনো বক্তব্য বা কর্মকাণ্ড থেকে তারা বিরত থাকবে যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থা দুর্বল করতে পারে অথবা সংঘাতকে উৎসাহিত করতে পারে।

বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে শুধু ক্ষমতাসীনদের কর্মকাণ্ডের ওপর নয়, সমানভাবে নির্ভর করে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর আচরণ ও ভূমিকার ওপরও। স্থায়ী রাজনৈতিক সংকটের আবহে প্রকৃত সংস্কার কখনো বিকশিত হতে পারে না। একইভাবে, নির্বাচনের ফলাফল কেবল নিজের পক্ষে এলে তা মেনে নেওয়ার প্রবণতা থাকলে গণতন্ত্রও কখনো শক্তিশালী হতে পারে না।

তাই, মূল প্রশ্নটি এখনো একই রয়ে গেছে-বর্তমান আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য কি সত্যিই আরো শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, নাকি নির্বাচনী হতাশার পর নিজেদের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখাই এর মূল উদ্দেশ্য? তবে শেষ পর্যন্ত এই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করবেন বাংলাদেশের জনগণই, তাঁদের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ এবং সাংবিধানিক রাজনীতির প্রতি অব্যাহত অঙ্গীকারের মাধ্যমে।

রাষ্ট্রেরও চরিত্র থাকে

জিল্লুর রহমান
রাষ্ট্রেরও চরিত্র থাকে

রাষ্ট্রেরও চরিত্র থাকে

কোনো কোনো সপ্তাহে চারটি আলাদা ঘটনা যেন একটি বড় গল্পের চারটি অধ্যায় হয়ে ওঠে। প্রথমে মনে হয়, এদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। একটি কূটনীতি, একটি বাণিজ্য, একটি যুদ্ধ, আরেকটি নিছক জীবনদর্শন। কিন্তু একটু গভীরে তাকালে দেখা যায়, চারটির কেন্দ্রেই রয়েছে একটি শব্দ-বিচক্ষণতা। রাষ্ট্রের যেমন চরিত্র থাকে, মানুষেরও থাকে। রাষ্ট্র যেমন প্রতিটি প্রস্তাব গ্রহণ করে না, মানুষও তেমনি প্রতিটি শব্দের উত্তর দেয় না। রাষ্ট্র যেমন সব শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখে, কিন্তু কারও অধীন হয় না; মানুষও তেমনি সবার সঙ্গে সৌজন্য বজায় রাখে, কিন্তু সবার জন্য নিজের ভিতরের দরজা খুলে দেয় না। এই সপ্তাহের ঘটনাগুলো যেন সেই পুরোনো সত্যটিকেই নতুন করে মনে করিয়ে দিল।

১. চীন, মালয়েশিয়া এবং সুযোগের রাজনীতি

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা যতটা হয়েছে, অর্থনৈতিক আলোচনা ততটা হয়নি। অথচ আধুনিক কূটনীতির সাফল্য আর করমর্দনের ছবিতে মাপা হয় না; মাপা হয় বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান, বাজার এবং আস্থার অঙ্কে। মালয়েশিয়া শুধু শ্রমবাজার নয়; দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত কেন্দ্র। অন্যদিকে চীন অবকাঠামো, শিল্প, উৎপাদন এবং বিনিয়োগে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার। কিন্তু এই দুটি সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা অন্যত্র। 

বাংলাদেশের সামনে এখন ‘কার সঙ্গে যাব’, এই প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন হলো, কীভাবে সবার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ করা যায়। একসময় বিশ্বায়ন আমাদের শিখিয়েছিল দক্ষতার ভাষা। এখন ভূরাজনীতি শেখাচ্ছে স্থিতিস্থাপকতার ভাষা। সরবরাহ শৃঙ্খল বদলাচ্ছে, নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠছে, উৎপাদনের মানচিত্র পুনর্লিখিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের ভিতরেই বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। কূটনীতি কখনো পক্ষ বেছে নেওয়ার শিল্প নয়; কূটনীতি হলো বিকল্প তৈরি করার শিল্প।

২. আমেরিকার জন্মদিন, ট্রাম্প এবং বাংলাদেশের পরীক্ষা

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস সামনে। ১৭৭৬ সালের সেই ঘোষণাপত্র শুধু একটি দেশের জন্ম দেয়নি; রাষ্ট্র, স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার একটি নতুন রাজনৈতিক ধারণারও জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু আজকের আমেরিকা আর ১৭৭৬ সালের আমেরিকা এক নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের পর আবারও ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি বৈশ্বিক বাণিজ্যকে নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে। শুল্ক, প্রযুক্তি, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং নিরাপত্তা এখন একই আলোচনার অংশ।

বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ কী? অর্থ হলো, আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি কারও ঘনিষ্ঠ হওয়া নয়; বিশ্বাসযোগ্য হওয়া। যুক্তরাষ্ট্র আমাদের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার। ইউরোপ প্রধান ক্রেতা। চীন বড় বিনিয়োগকারী। ভারত অপরিহার্য প্রতিবেশী। জাপান উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগী। এদের কাউকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ লেখা সম্ভব নয়। ছোট রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভারসাম্য। একজন দক্ষ মাঝি বাতাসের সঙ্গে যুদ্ধ করেন না; তিনি শুধু পাল বদলে দেন। রাষ্ট্র পরিচালনাও তেমনি। সময়ের পরিবর্তনকে অস্বীকার করে নয়, বুঝে এগোতে হয়। যে রাষ্ট্র নিজের কম্পাস নিজে ধরে রাখতে পারে, শেষ পর্যন্ত তারাই অন্যদের কাছে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হয়ে ওঠে।

তবে একটি বিষয় আমাদের কখনো ভুলে গেলে চলবে না। ভূরাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বলে কিছু নেই, যেমন স্থায়ী শত্রুও নেই। স্থায়ী থাকে কেবল জাতীয় স্বার্থ। আজ যে দেশ আমাদের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী, কাল সে-ই কোনো বাণিজ্যিক ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নিতে পারে। আবার যে দেশ আজ শুল্ক আরোপ করছে, আগামীকাল সে-ই নতুন বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে আসতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই বাস্তবতাকে আবেগ দিয়ে নয়, প্রজ্ঞা দিয়ে বুঝতে হয়।

বাংলাদেশের সামনে আজ একটি বিরল সুযোগ রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আমরা দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থান করছি। বঙ্গোপসাগর আজ আর শুধু সমুদ্র নয়; এটি জ্বালানি, বাণিজ্য, নৌ-নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর। যে রাষ্ট্র এই পরিবর্তন বুঝতে পারবে, ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক মানচিত্রে তার অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

কিন্তু একটি বন্দর নির্মাণের চেয়েও কঠিন কাজ হলো আস্থা নির্মাণ। বিদেশি বিনিয়োগ আসে শুধু কর-সুবিধা দেখে নয়; আসে নীতির ধারাবাহিকতা, আইনের শাসন, দক্ষ মানবসম্পদ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর ভর করে। তাই কূটনীতির সাফল্য শেষ পর্যন্ত দেশের ভিতরের সুশাসনের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, ছোট রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার সামরিক শক্তি নয়; তার বিশ্বাসযোগ্যতা। একটি নির্ভরযোগ্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সবাই কাজ করতে চায়। কারণ সেখানে সিদ্ধান্ত হঠাৎ বদলে যায় না, নীতির ধারাবাহিকতা থাকে, আর প্রতিশ্রুতির মূল্য থাকে।

৩. যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিকার

আজকের পৃথিবীতে যুদ্ধ শুধু সীমান্তে হয় না; মানুষের মনেও হয়। একসময় যুদ্ধ শুরু হতো কামানের গর্জনে। এখন শুরু হয় একটি ভিডিও, একটি পোস্ট, একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্মিত ছবি কিংবা একটি বিভ্রান্তিকর শিরোনাম দিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, তথ্য এখন শুধু সংবাদ নয়; এটি একটি কৌশলগত অস্ত্র।

আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে তথ্যের অভাব নেই; বরং তথ্যের অতিরিক্ততাই মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। সত্যকে গোপন করার চেয়ে তাকে অসংখ্য শব্দের ভিড়ে হারিয়ে দেওয়া এখন অনেক সহজ। রাষ্ট্রের জন্য এটি একটি বড় শিক্ষা। বিনিয়োগ আস্থার ওপর দাঁড়ায়, আস্থা দাঁড়ায় বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের ওপর। তাই সাইবার নিরাপত্তা, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা এবং কৌশলগত যোগাযোগ আজ আর বিলাসিতা নয়; জাতীয় সক্ষমতার অংশ।

জর্জ অরওয়েল একসময় লিখেছিলেন, ক্ষমতা শুধু মানুষের ওপর নয়, সত্যের ওপরও প্রতিষ্ঠিত হতে চায়। ডিজিটাল যুগে সেই কথার নতুন অর্থ তৈরি হয়েছে। এখন যে বয়ান তৈরি করতে পারে, সে-ই অনেক সময় বাস্তবতাকেও প্রভাবিত করতে পারে। বাংলাদেশেরও তাই নিজের গল্প নিজেকেই বলতে হবে। অন্যের ভাষায় নিজের পরিচয় লিখতে গেলে, একসময় নিজের পরিচয়ই অস্পষ্ট হয়ে যায়।

৪. সব আলো পথ দেখায় না

জীবনের একটি বড় শিক্ষা হলো, সব আলো পথ দেখায় না। কিছু আলো শুধু চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। সব শব্দের উত্তর শব্দ দিয়ে দিতে হয় না। কিছু ঝড়ের সবচেয়ে ভালো উত্তর জানালা বন্ধ করে দেওয়া। কিছু দূরত্ব সম্পর্ককে রক্ষা করে। কিছু নীরবতা মর্যাদাকে বাঁচিয়ে রাখে। আজ ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র, সবাই যেন প্রতিনিয়ত প্রতিক্রিয়া জানানোর চাপে আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের এমন এক সংস্কৃতি তৈরি করেছে, যেখানে নীরবতাকে দুর্বলতা মনে করা হয়। অথচ ইতিহাস বলে, সবচেয়ে পরিণত সিদ্ধান্তগুলো প্রায়ই সবচেয়ে শান্ত পরিবেশেই নেওয়া হয়। বুদ্ধ নীরবতার শক্তি জানতেন। রবীন্দ্রনাথ নিঃসঙ্গতার শক্তি জানতেন। জীবনানন্দ জানতেন, মানুষের সবচেয়ে গভীর সংলাপ অনেক সময় নিজের সঙ্গেই হয়।

রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও তাই। যে রাষ্ট্র প্রতিটি উত্তেজনায় প্রতিক্রিয়া দেখায়, সে একসময় নিজের অগ্রাধিকার হারিয়ে ফেলে। কিন্তু যে রাষ্ট্র জানে কখন কথা বলতে হয়, কখন অপেক্ষা করতে হয়, আর কখন কেবল পর্যবেক্ষণ করতে হয়-দীর্ঘ মেয়াদে তারাই স্থিতিশীল থাকে। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে তথ্যের গতি আলোর গতির মতো, কিন্তু প্রজ্ঞার গতি এখনো মানুষের বিবেকের ওপর নির্ভরশীল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের যুক্ত করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে বিভক্তও করেছে। অ্যালগরিদম আমাদের পছন্দকে এমনভাবে পরিচালিত করে যে আমরা ধীরে ধীরে শুধু নিজের মতের প্রতিধ্বনি শুনতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। ভিন্নমত তখন আর যুক্তি নয়, শত্রু বলে মনে হয়।

এই প্রবণতা শুধু সমাজের জন্য নয়, গণতন্ত্রের জন্যও একটি নীরব ঝুঁকি। কারণ গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি মতের মিল নয়; মতের ভিন্নতাকে ধারণ করার ক্ষমতা। বাংলাদেশের মতো একটি বহুমাত্রিক সমাজে তাই সহনশীলতা শুধু নৈতিক গুণ নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনারও অপরিহার্য শর্ত। আমরা যদি প্রতিটি মতপার্থক্যকে সংঘাতে পরিণত করি, তাহলে উন্নয়নের গতি থেমে যাবে। আর যদি ভিন্নমতকে আলোচনায় রূপ দিতে পারি, তাহলে সেটিই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

শেষ কথা

একজন প্রবীণ কূটনীতিক একবার বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রের পরিপক্বতা বোঝা যায় সে কত জোরে কথা বলে তা দিয়ে নয়; সে কত মনোযোগ দিয়ে শোনে তা দিয়ে।’ এই কথাটির ভিতরে আজকের বাংলাদেশের জন্য একটি বড় শিক্ষা লুকিয়ে আছে। আমাদের এখন শুধু বিশ্বকে বোঝানোর প্রয়োজন নেই; বিশ্ব কীভাবে বদলাচ্ছে, সেটিও মনোযোগ দিয়ে শোনার প্রয়োজন আছে। কারণ ইতিহাস কখনো স্থির থাকে না। যে রাষ্ট্র পরিবর্তনের ভাষা বুঝতে পারে, ভবিষ্যৎও অনেক সময় তার পক্ষেই কথা বলে। চারটি প্রসঙ্গ-চীন ও মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্ব সংঘাত এবং নীরবতার দর্শন। আপাতদৃষ্টিতে ভিন্ন, কিন্তু মূল শিক্ষা একটিই। রাষ্ট্র পরিচালনা শেষ পর্যন্ত শক্তির নয়, চরিত্রের পরীক্ষা।

আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন বিশ্বের বড় শক্তিগুলো নিজেদের অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করছে। এই পরিবর্তনের ভিতরে বাংলাদেশের সামনে যেমন ঝুঁকি রয়েছে, তেমনি বিরল সুযোগও রয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে আমাদের প্রয়োজন আত্মবিশ্বাসী, ভারসাম্যপূর্ণ এবং দূরদর্শী রাষ্ট্রচিন্তা। সব দরজা খুলে রাখতে হয়, কিন্তু নিজের ঘরের চাবি কখনো অন্যের হাতে তুলে দেওয়া যায় না। মানুষের ক্ষেত্রেও তাই, রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও তাই। শেষ পর্যন্ত ইতিহাস তাদেরই মনে রাখে, যারা সবচেয়ে বেশি আওয়াজ করেনি; বরং সবচেয়ে স্পষ্টভাবে নিজেদের চিনেছিল।

লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ