• ই-পেপার

সীমান্তে পুশ ইন প্রতিরোধে বিজিবির দৃঢ় অবস্থান

বেনজীর গ্রেপ্তার : রুই-কাতলাও ধরা পড়ছে সরকারের জালে!

আহসান হাবিব বরুন
বেনজীর গ্রেপ্তার : রুই-কাতলাও ধরা পড়ছে সরকারের জালে!
বেনজীর আহমেদ

ক্ষমতা মানুষকে অনেক কিছু দিতে পারে—প্রভাব, প্রতিপত্তি, সম্পদ, ভয় প্রদর্শনের সামর্থ্য এবং কখনো কখনো নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবার বিভ্রমও। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম সৌন্দর্য হলো, প্রকৃতি ও ইতিহাস শেষ পর্যন্ত কাউকেই ছাড় দেয় না। সময়ের আদালত অনেক দেরিতে বসলেও তার রায় সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষগুলোকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।

বাংলাদেশের সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের দুবাইয়ে গ্রেপ্তারের ঘটনাটি ঠিক তেমনই এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হয়ে উঠতে পারে। কারণ এটি কেবল একজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার গ্রেপ্তারের খবর নয়; এটি এমন এক ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে উচ্চারিত প্রশ্ন, যে সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে অনেকের কাছে অপ্রতিরোধ্য, অজেয় এবং জবাবদিহির ঊর্ধ্বে বলে মনে হয়েছে।

তাই বেনজীরের এই গ্রেপ্তার নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ বেনজীর আহমেদ শুধু একজন ব্যক্তি নন; তিনি একটি সময়ের প্রতীক, একটি ক্ষমতার কাঠামোর প্রতীক এবং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর অন্যতম মুখ।

আমার বিবেচনায়, বাংলাদেশের ইতিহাসে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন কিংবা প্রশাসনিক অসদাচরণের অভিযোগে প্রকৃত অর্থে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জবাবদিহির মুখোমুখি করার নজির খুবই কম। অনেক সময় জনমতের চাপ সামাল দিতে কিংবা আইনের শাসনের একটি প্রতীকী চিত্র তুলে ধরতে কিছু ছোটখাটো ব্যক্তিকে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে, কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করা রুই-কাতলাদের অধিকাংশই ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছে।

সেই বাস্তবতায় বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের ঘটনাটি একটি নতুন বার্তা বহন করে। এটি দেখিয়ে দেয় যে রাষ্ট্র যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কূটনৈতিক দক্ষতা এবং আইনি প্রস্তুতি নিয়ে এগোতে চায়, তাহলে পৃথিবীর কোনো প্রান্তই অপরাধীর জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে না।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, ইন্টারপোলের সহায়তা এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র ও বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগরী দুবাই থেকে এমন একজন প্রভাবশালী সাবেক কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা নিঃসন্দেহে সরকারের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক অর্জন হিসেবেই বিবেচিত হবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই।

এই ঘটনার আরেকটি রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। দেশের বাইরে অবস্থানরত বহু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কাছেও এটি একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ কিংবা উত্তর আমেরিকায় অবস্থান করে যারা মনে করেন অতীতের ক্ষমতা, অর্থ কিংবা আন্তর্জাতিক যোগাযোগ তাদের জন্য স্থায়ী সুরক্ষা নিশ্চিত করবে, তাদের জন্য এই ঘটনা নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত বহন করছে। অন্তত জনমনে এমন ধারণা আরো শক্তিশালী হয়েছে যে আইনের দীর্ঘ হাত একসময় অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

ফলে স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনাকে অনেকেই আওয়ামী লীগের দেশত্যাগী নেতাকর্মীদের জন্য একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখছেন। যারা বিদেশের মাটিতে বসে দ্রুত রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন দেখছেন কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করার চেষ্টা করছেন, তাদের কাছেও এই গ্রেপ্তার একটি নতুন ও বিপজ্জনক বার্তা বহন করে। পৃথিবী এখন অনেক ছোট। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার যুগে কোনো প্রভাব, কোনো অর্থ, কোনো রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা বিদেশি আশ্রয় আর চূড়ান্ত নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। তবে আমার কাছে এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি অন্যত্র।

এখানে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করতে চাই। ২০০৮ সালে আমি বাংলাদেশ টেলিভিশনে কর্মরত ছিলাম। ১/১১ সরকারের সময়ে পুলিশ সংস্কার নিয়ে আমি বেনজীর আহমেদের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। সে সময় তিনি পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি অর্থ ও উন্নয়ন হিসেবে কর্মরত ছিলেন। আজকের বিতর্কিত ও আলোচিত বেনজীরকে ঘিরে জনমনে যে চিত্রটি বিদ্যমান, সেই মানুষটিকে তখন আমার মোটেও দাম্ভিক বা অহংকারী মনে হয়নি। বরং তাকে একজন মেধাবী, আত্মবিশ্বাসী এবং প্রতিশ্রুতিশীল পুলিশ কর্মকর্তা বলেই মনে হয়েছিল।

কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই মানুষটিকেই আমরা এক ভিন্ন রূপে দেখেছি। এখানেই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে—সমস্যা কি শুধু একজন বেনজীর আহমেদ, নাকি সেই রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক কাঠামোও, যা একজন কর্মকর্তাকে ধীরে ধীরে এতটা ক্ষমতাবান, এতটা প্রভাবশালী এবং শেষ পর্যন্ত এতটা বিতর্কিত করে তুলতে পারে?

আমি বিশ্বাস করি, কোনো বেনজীর একদিনে তৈরি হন না। তাকে তৈরি করে একটি সংস্কৃতি, একটি রাজনৈতিক পরিবেশ এবং একটি শাসনব্যবস্থা। আমাদের দেশে গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক কাঠামো থাকলেও বহু সময় তার আড়ালে স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতার চর্চা হয়েছে। ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ, জবাবদিহির অভাব, প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা এবং ব্যক্তি-নির্ভর শাসনব্যবস্থা মিলেই এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করে, যেখানে কিছু কর্মকর্তা নিজেদের রাষ্ট্রের সেবক নয়, বরং রাষ্ট্রের মালিক ভাবতে শুরু করেন।

আজকের বেনজীর একদিন হঠাৎ করে তৈরি হননি। ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক প্রশ্রয়, জবাবদিহির অভাব এবং ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতি মিলেই এমন বাস্তবতার জন্ম দেয়। ফলে কেবল একজন ব্যক্তির পতনে সন্তুষ্ট হলে চলবে না; বরং সেই পরিবেশ এবং সংস্কৃতিরও অবসান ঘটাতে হবে, যা নতুন নতুন বেনজীর তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করে।

আমার কাছে বেনজীরের গ্রেপ্তারের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য এখানেই। এটি শুধু অতীতের অভিযোগ ও বিতর্কের বিচার প্রক্রিয়ার বিষয় নয়; এটি বর্তমান এবং ভবিষ্যতের জন্যও একটি শক্তিশালী সতর্কবার্তা। প্রশাসন, পুলিশ কিংবা রাষ্ট্রযন্ত্রের যেকোনো স্তরে যারা ক্ষমতার মোহে নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করেন, যারা মনে করেন পদ-পদবি ও প্রভাব-প্রতিপত্তি তাদের চিরস্থায়ী নিরাপত্তা দেবে, তাদের জন্য এই ঘটনা গভীরভাবে ভাবার বিষয়।

বাংলাদেশের সামনে আজ একটি ঐতিহাসিক সুযোগ উপস্থিত হয়েছে। আমরা কি শুধু একজন ব্যক্তিকে বিচারের মুখোমুখি করেই সন্তুষ্ট থাকব, নাকি সেই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতিরও পরিবর্তন ঘটাব, যা ক্ষমতার অপব্যবহারকে উৎসাহিত করে? আমরা কি শুধু লেজ ধরে টানাটানি করব, নাকি সমস্যার মূল শিকড়ে হাত দেব?

কারণ প্রকৃত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে, নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করতে হলে এবং ন্যায়বিচারকে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় মূল্যবোধে পরিণত করতে হলে প্রয়োজন আমূল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।

রাষ্ট্রকে ব্যক্তির চেয়ে শক্তিশালী করতে হবে, প্রতিষ্ঠানকে দলের চেয়ে শক্তিশালী করতে হবে এবং আইনকে ক্ষমতার চেয়ে শক্তিশালী করতে হবে।

নচেৎ ইতিহাসের চাকা ঘুরতেই থাকবে। নাম বদলাবে, মুখ বদলাবে, কিন্তু বেনজীরেরা হারিয়ে যাবে না।

একজনের পতনের পর আরেকজনের উত্থান ঘটবে। প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কি সেই অন্তহীন চক্র ভাঙতে প্রস্তুত, নাকি আমরা আবারও একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখব?

এখানে একটি সত্য আমাদের সবারই মনে রাখা উচিত। রাজনীতিবিদ, আমলা, সামরিক কর্মকর্তা, বেসামরিক প্রশাসনের সদস্য কিংবা ব্যবসায়ী—পদ ও পরিচয় যাই হোক না কেন, অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অবৈধ সম্পদের অহংকার কখনো কোনো মানুষকে প্রকৃত শান্তি দিতে পারে না। বিলাসবহুল বাড়ি, বিদেশি ব্যাংক হিসাব কিংবা ক্ষমতার চাকচিক্য হয়তো সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার বিবেকের কাছে নির্দোষ থাকার শক্তি।

পৃথিবীতে গভীর রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ার মতো বড় প্রাপ্তি খুব কমই আছে। আর সেই প্রশান্তি অর্থ, ক্ষমতা কিংবা প্রভাব দিয়ে কেনা যায় না; সেটি অর্জন করতে হয় সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং নৈতিক সাহসের মাধ্যমে।

পরিশেষে বলতে চাই, হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারকে শুধুমাত্র একজন সাবেক আইজিপির গ্রেপ্তার হিসেবে মনে রাখবে না। তারা এটিকে মনে রাখবে এমন এক মুহূর্ত হিসেবে, যখন বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ক্ষমতার দুর্গে আঘাত হানার সাহস দেখিয়েছিল। যখন রাষ্ট্র অন্তত প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিল যে পদ-পদবি, অর্থ-বিত্ত, প্রভাব-প্রতিপত্তি কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় কোনো ব্যক্তিকে আইনের ঊর্ধ্বে তুলে দিতে পারে না।

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে সরকার আসবে, সরকার যাবে; রাজনৈতিক দল পরিবর্তিত হবে, ক্ষমতার পালাবদল হবে; কিন্তু কোনো নাগরিককে বিচার এড়াতে দেশ ছেড়ে পালাতে হবে না, কোনো কর্মকর্তাকে ক্ষমতার জোরে নিজেকে রাষ্ট্রের চেয়ে বড় ভাবার সুযোগ দেওয়া হবে না। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে আইনের নিরাপত্তা ভোগ করবে সাধারণ মানুষও, আবার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তিও একই আইনের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য হবে। সুতরাং নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন যদি সত্যিই বাস্তবায়ন করতে হয়, তাহলে এখনই নতুন অঙ্গীকারের সময়। ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান; ক্ষমতা নয়, জবাবদিহি; ভয় নয়, স্বাধীনতা; আনুগত্য নয়, ন্যায়বিচার—এই দর্শনের ওপরই গড়ে উঠতে পারে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন
ই-মেইল: [email protected] 

সীমারেখার রাজনীতি

জিল্লুর রহমান
সীমারেখার রাজনীতি

সীমারেখার রাজনীতি

১. বাজেটের অঙ্ক, টাকার প্রশ্ন

বাংলাদেশের প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিঃসন্দেহে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট। সংখ্যার ভাষায় এটি এক মহাকাব্য। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো, কৃষি-প্রায় সবখানেই বরাদ্দ বেড়েছে। সরকারের বক্তব্য পরিষ্কার : মানুষকে কেন্দ্র করে উন্নয়নের ধারাকে আরও শক্তিশালী করা হবে। কাগজকলমে আপত্তি করার খুব বেশি কিছু নেই। শিক্ষায় বিনিয়োগ দরকার, স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ দরকার, সামাজিক সুরক্ষা দরকার। একটি সুস্থ ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠী ছাড়া কোনো দেশ দীর্ঘমেয়াদে এগোতে পারে না। এ নিয়ে বিতর্কের সুযোগ খুব কম।

কিন্তু একটি প্রশ্ন প্রতি বছরই যেন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। টাকা কোথায়? আমরা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছি, যেখানে বাজেট নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই ব্যয়ের তালিকা সামনে আসে। কে কত পেল, কোন মন্ত্রণালয় কত বাড়তি বরাদ্দ পেল, কোন খাতে নতুন প্রকল্প হলো-এসব নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু সেই অর্থ কোথা থেকে আসবে, সেটি নিয়ে আলোচনা তুলনামূলক কম। বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে একটি অদ্ভুত প্রবণতার মধ্যে পড়েছে। আমরা ব্যয় নিয়ে ক্রমেই বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়েছি, কিন্তু আয় নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম বাস্তববাদী হয়েছি। অর্থনীতির মৌলিক সত্য হচ্ছে, রাষ্ট্র সম্পদ সৃষ্টি করে না; রাষ্ট্র সম্পদ সৃষ্টির পরিবেশ তৈরি করে। সম্পদ সৃষ্টি করে কৃষক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও বাজার। এ কারণেই বেসরকারি খাতের প্রশ্নটি আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সামাজিক উন্নয়ন অবশ্যই উন্নয়ন, কিন্তু শুধু সামাজিক ব্যয় উন্নয়ন নয়। নতুন সম্পদ সৃষ্টি ছাড়া সামাজিক ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না।

একসময় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের একটি বিখ্যাত উক্তি ছিল- ‘Money is no problem।’ বছরের পর বছর এই বাক্য নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। কেউ বলেছেন এটি আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ, কেউ বলেছেন অতিরিক্ত আশাবাদ। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে মনে হয়, আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়তো এখন সত্যিই ‘Money।’ পরিকল্পনার অভাব নেই। প্রকল্পের অভাব নেই। স্বপ্নেরও অভাব নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, সম্পদ কোথায়?

তার ওপর কালোটাকা সাদা করার সুযোগ আবারও আলোচনায় এসেছে। বাস্তববাদী অর্থনীতিবিদরা হয়তো বলবেন, কিছু অর্থ বাজারে ফিরবে। কিন্তু রাষ্ট্রের নৈতিক বার্তাটি কী? যে নাগরিক নিয়ম মেনে কর দেন, আর যে বছরের পর বছর কর ফাঁকি দেন-রাষ্ট্র কি তাদের একই কাতারে দাঁড় করাবে? অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত শুধু টাকার বিষয় নয়। এটি আস্থার বিষয়। আর আস্থা একবার হারিয়ে গেলে তা বাজেট বক্তৃতা দিয়ে ফিরিয়ে আনা যায় না।

২. কাঁটাতারের ওপারে

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ইতিহাসে একটি অদ্ভুত দ্বৈধতা আছে। ঢাকায় বৈঠক হয়, দিল্লিতে করমর্দন হয়, যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হয়। তারপর সীমান্তে গিয়ে দেখা যায় অন্য এক বাস্তবতা। সাম্প্রতিক ‘পুশইন’ ইস্যু সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে বন্ধুত্বের ভাষা, অন্যদিকে সীমান্তে উত্তেজনা। এ যেন একই বইয়ের দুই বিপরীত অধ্যায়। বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত পৃথিবীর অন্যতম জটিল সীমান্ত। একই ভাষা, একই ইতিহাস, একই সংস্কৃতি, একই নদী-কিন্তু মাঝখানে কাঁটাতার। অনেক সময় মনে হয়, সীমান্তের দুই পাশের মানুষ একই গল্পের দুই চরিত্র।

নবনিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী সম্প্রতি বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষ একই আকাশের নিচে একই বেদনা অনুভব করে। কথাটি কূটনৈতিক শোনাতে পারে, কিন্তু এর মধ্যে গভীর বাস্তবতা আছে। বর্ষার মেঘ পাসপোর্ট দেখে আসে না। নদীর পানি ভিসা নিয়ে প্রবাহিত হয় না। প্রকৃতির কোনো সীমান্ত নেই। সীমান্ত আছে রাষ্ট্রের। সেই কারণেই সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় আবেগের চেয়ে বাস্তববাদ বেশি জরুরি। ভারত এখন ‘স্মার্ট বর্ডার’ প্রকল্পের কথা বলছে। প্রযুক্তি, সেন্সর, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সব মিলিয়ে নতুন ধরনের সীমান্ত নিরাপত্তা।

প্রযুক্তি দরকার। কিন্তু প্রযুক্তি কখনো বিশ্বাসের বিকল্প নয়। ভালো প্রতিবেশী হতে হলে আগে একে অপরের সীমারেখাকে সম্মান করতে হয়। রবার্ট ফ্রস্টের বিখ্যাত কবিতার একটি লাইন আছে-Good fences make good neighbours. ভালো বেড়া কখনো শত্রুতা সৃষ্টি করে না। বরং ভুল বোঝাবুঝি কমায়। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কও সম্ভবত এখন সেই বাস্তববাদী পর্যায়ে প্রবেশ করছে, যেখানে আবেগের পাশাপাশি সীমারেখার গুরুত্বও সমানভাবে স্বীকৃত হবে।

৩. রাজনীতি : বক্তৃতা নয়, প্রতিষ্ঠান

রাজনীতির একটি বড় সমস্যা হচ্ছে, আমরা প্রায়ই ব্যক্তি আর প্রতিষ্ঠানকে গুলিয়ে ফেলি। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ব্যক্তিত্বের আকর্ষণ সব সময়ই প্রবল। নেতা অনেক সময় প্রতিষ্ঠানকে ছাপিয়ে যান। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা ভিন্ন। একজন নেতা একটি নির্বাচন জিততে পারেন। কিন্তু একটি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায় প্রতিষ্ঠান। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষাও সেখানেই। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। জনগণের প্রত্যাশা বেড়েছে। রাজনৈতিক উত্তেজনা কমেছে, কিন্তু অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ বেড়েছে। এখন জনগণ শুধু বক্তৃতা শুনতে চায় না। তারা জানতে চায়- বিদ্যুতের অবস্থা কী? বিনিয়োগ কোথায়? কর্মসংস্থান কত তৈরি হলো? বিচারব্যবস্থা কতটা কার্যকর? আইনশৃঙ্খলা কতটা উন্নত হলো?

অর্থাৎ রাজনীতি এখন ধীরে ধীরে আবেগের পরীক্ষাগার থেকে প্রশাসনিক সক্ষমতার পরীক্ষাগারে প্রবেশ করছে। এটি ভালো লক্ষণ। কারণ গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে ফলাফল। উইনস্টন চার্চিল একবার বলেছিলেন, রাজনীতিবিদ পরবর্তী নির্বাচনের কথা ভাবেন, রাষ্ট্রনায়ক পরবর্তী প্রজন্মের কথা ভাবেন। বাংলাদেশের সামনে এখন সেই চ্যালেঞ্জ। আমরা কি আগামী নির্বাচনের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনা করব, নাকি আগামী প্রজন্মের জন্য? এ প্রশ্নের উত্তরই আগামী কয়েক বছর বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করবে।

৪. সীমারেখার দর্শন

আমাদের সমাজে একটি অদ্ভুত ভুল ধারণা আছে। অনেকে মনে করেন, কারও কাছাকাছি থাকা মানেই প্রভাবশালী হওয়া। কেউ ক্ষমতার কেন্দ্রের আশপাশে ঘোরাফেরা করছেন, ছবি তুলছেন, নাম ব্যবহার করছেন-তাহলেই যেন তিনি ক্ষমতাবান। বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন। প্রভাব আর প্রবেশাধিকার এক জিনিস নয়। প্রকৃত প্রভাব আসে বিশ্বাস থেকে। অনধিকার প্রবেশ থেকে নয়। আমাদের সময়ের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, অনেকেই সমালোচনাকে পেশা বানিয়ে ফেলেছেন। তারা পরিবর্তন চান না, তারা মনোযোগ চান। বিশৃঙ্খলা তাদের জ্বালানি। প্রতিক্রিয়া তাদের অক্সিজেন। আর মনোযোগ তাদের মুদ্রা। এ কারণেই সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ সমালোচক সব সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নন। অনেক সময় তারা কেবল নিজেদের অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়ার ভয় পান।

একটি পুরোনো প্রবাদ আছে- ‘Never wrestle with a pig. You both get dirty, and the pig likes it.’ রাজনীতি, সমাজ, এমনকি ব্যক্তিগত জীবনেও কথাটি প্রযোজ্য। যারা বিশৃঙ্খলার প্রতি আসক্ত, তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র বিতর্ক নয়। সীমারেখা। কারণ কোনো পরিবার সীমারেখা ছাড়া টেকে না। কোনো প্রতিষ্ঠান সীমারেখা ছাড়া টেকে না। কোনো রাষ্ট্র সীমারেখা ছাড়া টেকে না। এমনকি গণতন্ত্রও সীমারেখার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। আইনের সীমা ছাড়া স্বাধীনতা অরাজকতায় পরিণত হয়। ক্ষমতার সীমা ছাড়া নেতৃত্ব কর্তৃত্ববাদে পরিণত হয়। সম্পর্কের সীমা ছাড়া ভালোবাসা নির্ভরতায় পরিণত হয়। সীমারেখা নিষ্ঠুরতা নয়। সীমারেখা হলো শাসন।

শেষ কথা

এ সপ্তাহের চারটি ঘটনা-বাজেট, সীমান্ত, রাজনীতি এবং ব্যক্তিগত সীমারেখা-একই গল্পের চারটি সংস্করণ। বাজেট আমাদের শিখিয়েছে সম্পদের সীমা আছে। সীমান্ত আমাদের শিখিয়েছে ভূখণ্ডের সীমা আছে। রাজনীতি আমাদের শিখিয়েছে ক্ষমতার সীমা আছে। আর জীবন আমাদের শিখিয়েছে মানুষেরও সীমা আছে। সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্র নিজেদের সীমা ভুলে যায়। আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় শক্তি অর্থ নয়। সবচেয়ে বড় শক্তি ক্ষমতাও নয়। সবচেয়ে বড় শক্তি আত্মনিয়ন্ত্রণ।

যে রাষ্ট্র নিজের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে সমৃদ্ধ হয়। যে দেশ নিজের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে নিরাপদ থাকে। যে নেতা নিজের ক্ষমতার সীমা বোঝেন, তিনি দীর্ঘস্থায়ী হন। আর যে মানুষ নিজের জীবনের সীমারেখা আঁকতে পারেন, শেষ পর্যন্ত তিনিই শান্তিতে থাকেন। কারণ সভ্যতার ইতিহাস মূলত একটিই গল্প বলে, স্বাধীনতা কখনো সীমারেখার বিপরীতে দাঁড়ায় না; স্বাধীনতা টিকে থাকে সীমারেখার ভিতরেই।

লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ

জাতীয় প্রতিরক্ষায় সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সামরিক বাজেটের বাস্তবতা

ড. মোঃ মিজানুর রহমান
জাতীয় প্রতিরক্ষায় সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সামরিক বাজেটের বাস্তবতা
প্রতীকী ছবি

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রতিরক্ষা বাজেটের গুরুত্ব দিনে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, কারণ নিরাপত্তা এখন আর কেবল প্রচলিত যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি প্রযুক্তি, তথ্য, সাইবার সক্ষমতা এবং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে একটি দেশের প্রতিরক্ষা বাজেট তার সার্বভৌমত্ব রক্ষা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।

বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব আজ আর কেবল একটি স্থির ধারণা নয়; এটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতির প্রভাবাধীন একটি গতিশীল বাস্তবতা। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতিযোগিতা এবং সামুদ্রিক শক্তির পুনর্বিন্যাস দক্ষিণ এশিয়াকে নতুন কৌশলগত গুরুত্ব দিয়েছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়ছে। ফলে জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং রাষ্ট্রনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রয়োজন।

ভারত, মায়ানমার ও বঙ্গোপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সামুদ্রিক রুটের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই কৌশলগত অবস্থান যেমন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করে, তেমনি নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়ায়। বঙ্গোপসাগরে বাণিজ্যিক প্রবাহ বৃদ্ধির সম্ভাবনা এবং যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের ভূখণ্ড ও সমুদ্রসীমাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরেছে।

বাংলাদেশ বর্তমানে একাধিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান ও বিচ্ছিন্ন সহিংসতা দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগের বিষয়। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ, রাখাইনের অস্থিরতা এবং রোহিঙ্গা সংকট অস্ত্র, মাদক ও মানবপাচারের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, সীমান্ত সংযোগ ও সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিশেষ চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।

অন্যদিকে, বঙ্গোপসাগর এখন বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সামরিক কৌশলের অন্যতম কেন্দ্র। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ, ভারতের ‘সাগর’ নীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল এই অঞ্চলের গুরুত্ব আরো বাড়িয়েছে। ফলে সমুদ্র নিরাপত্তা, সামুদ্রিক সম্পদ, বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং জ্বালানি অনুসন্ধান বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হয়ে উঠেছে। সার্বিকভাবে, বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং কৌশলগত প্রতিরক্ষা সক্ষমতার মধ্যে সমন্বিত ভারসাম্য বজায় রাখা অপরিহার্য।

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাজেট গত এক দশকে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেলেও এই বৃদ্ধি কতটা কার্যকরভাবে সামরিক সক্ষমতায় রূপান্তরিত হয়েছে, সেটিই আজ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। ২০১৬–১৭ অর্থবছরে প্রতিরক্ষা খাতে মোট বরাদ্দ ছিল প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে ২০২০ সালের পর বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যয় ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায় এবং সাম্প্রতিক প্রবণতা অনুযায়ী ২০২৬–২৭ অর্থবছরে তা ৫০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত এক দশকে প্রতিরক্ষা বাজেটের গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৬ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, যা সামগ্রিক বাজেট বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও আঞ্চলিক অনেক দেশের তুলনায় তুলনামূলকভাবে সংযত।

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাজেট ও সক্ষমতা বৃদ্ধির বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, গত এক দশকে বাজেট পরিমাণগতভাবে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও এর কাঠামোগত ব্যবহার এবং গুণগত রূপান্তর নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে গেছে। মোট প্রতিরক্ষা ব্যয়ের একটি বড় অংশ নিয়মিতভাবে বেতন-ভাতা, প্রশাসনিক ব্যয়, প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ এবং লজিস্টিক ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হয়। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই সামরিক শক্তিগুলোর ক্ষেত্রেও পরিচালন ব্যয় একটি বড় অংশ দখল করে। তবে পার্থক্য হলো উন্নত দেশগুলো একই সঙ্গে গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং আধুনিকায়নে উচ্চ অনুপাত বজায় রাখতে সক্ষম হয়, যা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এখনো তুলনামূলকভাবে সীমিত।

বাংলাদেশের সামরিক আধুনিকায়নে গত দুই দশকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে—নৌবাহিনীর সাবমেরিন ও ফ্রিগেট সংযোজন, বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধবিমান উন্নয়ন, এবং স্থলবাহিনীর সাঁজোয়া যান ও যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন। তবে এই অগ্রগতিকে যদি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেখা হয়, তাহলে দেখা যায় একই সময়ে ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোও বহুমুখী আধুনিকায়ন কৌশল অনুসরণ করেছে, বিশেষ করে সমুদ্র নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়—বাংলাদেশের বর্তমান সক্ষমতা ভবিষ্যতের বহুমাত্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতটা যথেষ্ট।

বিশ্ব পরিস্থিতি বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ আধুনিক যুদ্ধের প্রকৃতি সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন করেছে। সেখানে দেখা গেছে সস্তা কিন্তু কার্যকর ড্রোন প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট-ভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য, সাইবার যুদ্ধ এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার প্রচলিত ভারী সামরিক শক্তির সঙ্গে সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই ধরনের বাস্তবতা ইসরায়েল-হামাস সংঘাত এবং আজারবাইজান-আর্মেনিয়া যুদ্ধে স্পষ্টভাবে দেখা গেছে, যেখানে ড্রোন ও তথ্যযুদ্ধ যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রেখেছে। এই তুলনায় ন্যাটো দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য, তাদের প্রতিরক্ষা বাজেটের বড় অংশ এখন 'ডিজিটাল ডিফেন্স', এআই-ভিত্তিক সিস্টেম এবং স্পেস টেকনোলজিতে ব্যয় করছে, যা বাংলাদেশের বিনিয়োগ কাঠামোর তুলনায় অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর।

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর কাঠামোগত ভারসাম্য। ভারতের উদাহরণ এখানে উল্লেখযোগ্য—যেখানে প্রতিরক্ষা বাজেটের একটি বড় অংশ নতুন অস্ত্র ক্রয়, গবেষণা এবং দেশীয় উৎপাদন খাতে ব্যয় করা হচ্ছে। একইভাবে তুরস্ক গত এক দশকে 'Bayraktar' ড্রোনসহ নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলে বৈশ্বিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও ইসরায়েলও উচ্চমাত্রার প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলে আমদানিনির্ভরতা অনেকাংশে কমিয়েছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) এবং উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ এখনো তুলনামূলকভাবে সীমিত।

ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল। দক্ষিণ চীন সাগর ও বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ এবং ভারতের SAGAR নীতি একত্রে এই অঞ্চলকে একটি প্রতিযোগিতামূলক কৌশলগত মঞ্চে পরিণত করেছে। শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকট দেখিয়েছে যে ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য হারালে ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি দ্রুত বেড়ে যায়। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মতো 'balanced engagement strategy' অনুসরণ করতে হয়, যেখানে কোনো একক শক্তির ওপর অতিনির্ভরতা তৈরি হয় না।

অন্যদিকে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শুধু সরঞ্জাম ক্রয়ের ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা ও শিল্পভিত্তিক সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া এবং তুরস্কের অভিজ্ঞতা দেখায় যে, ধারাবাহিক ১০–২০ বছরের ডিফেন্স স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান ছাড়া টেকসই আধুনিকায়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশেও এ ধরনের সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা ক্রমশ বাড়ছে।

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কাঠামোকে ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উপযোগী করতে হলে কেবল বাজেট বৃদ্ধির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও কৌশলগত নীতি কাঠামোর দিকে অগ্রসর হওয়া জরুরি। বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশটি এমন এক অবস্থানে রয়েছে, যেখানে সীমান্ত নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সংকট, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি একত্রে একটি জটিল ও বহুমাত্রিক নিরাপত্তা পরিবেশ তৈরি করেছে। ফলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন এখন আর কেবল সামরিক বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, পররাষ্ট্রনীতি এবং অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি সমন্বিত রাষ্ট্রনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

এই বাস্তবতায় প্রতিরক্ষা বাজেটকে শুধুমাত্র একটি বার্ষিক ব্যয় হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে যেভাবে বাজেট প্রতি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা পরিমাণগত অগ্রগতি নির্দেশ করলেও এর কাঠামোগত ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ বাজেটের একটি বড় অংশ স্বাভাবিকভাবেই বেতন-ভাতা, প্রশাসনিক ব্যয়, প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ এবং লজিস্টিক ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হয়। এসব ব্যয় অপরিহার্য হলেও এগুলোর ওপর অতিনির্ভরতা থাকলে আধুনিকায়ন, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং নতুন সক্ষমতা অর্জনের জন্য যে অংশটি প্রয়োজন, তা তুলনামূলকভাবে সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে বাজেট বৃদ্ধি পেলেও তার প্রভাব সরাসরি যুদ্ধ সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সমানুপাতিকভাবে প্রতিফলিত হয় না।

আধুনিক যুদ্ধের প্রকৃতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, যেখানে প্রচলিত অস্ত্রশক্তির পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ড্রোন প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্যাটেলাইটভিত্তিক নজরদারি এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এখন প্রতিরক্ষা সক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যয়ের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে এই খাতগুলোতে বিনিয়োগ এখনো তুলনামূলকভাবে সীমিত। এর ফলে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি প্রযুক্তিগত ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা শুধুমাত্র প্রচলিত সামরিক শক্তি দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।

এই প্রেক্ষাপটে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বাজেটের পাশাপাশি এর গুণগত ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাজেট কতটা বৃদ্ধি পেল, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই অর্থের বিনিময়ে কী ধরনের কৌশলগত সক্ষমতা অর্জিত হলো। নতুন প্রযুক্তি কতটা যুক্ত হলো, দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা কতটা তৈরি হলো, এবং আধুনিক যুদ্ধ পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রস্তুতি কতটা গড়ে উঠল—এই প্রশ্নগুলোই প্রকৃত মূল্যায়নের মানদণ্ড হওয়া উচিত। একই সঙ্গে গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি না করলে দীর্ঘমেয়াদে প্রযুক্তিগত নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের ধীরে ধীরে বিকাশ। বর্তমানে কিছু প্রতিষ্ঠান সীমিত পরিসরে রক্ষণাবেক্ষণ ও উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করলেও এগুলোকে পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা শিল্প কাঠামোতে রূপান্তর করা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায় যে যেসব দেশ ধাপে ধাপে প্রযুক্তি হস্তান্তর, যৌথ উৎপাদন এবং গবেষণা সহযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের শিল্পভিত্তি তৈরি করেছে, তারা কেবল ব্যয় নিয়ন্ত্রণেই সফল হয়নি বরং কৌশলগত স্বাধীনতাও অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই ধরনের ধীরে অগ্রসরমান শিল্পায়ন কৌশল ভবিষ্যৎ নির্ভরতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এছাড়া প্রতিরক্ষা কৌশলে বহুমুখী আন্তর্জাতিক অংশীদারি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে কৌশলগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তবসম্মত কৌশল হতে পারে, যেখানে প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ এবং সরঞ্জাম সংগ্রহের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য থাকবে এবং কোনো একক নির্ভরতা তৈরি হবে না।

সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি কেবল বাজেট বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি, প্রযুক্তিনির্ভর এবং সমন্বিত কৌশলগত কাঠামো, যেখানে বাজেট, প্রযুক্তি, শিল্প উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা একসঙ্গে কাজ করবে। বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতায় এই ধরনের সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জের উপযোগী করে তোলা কঠিন হবে। তাই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এখনই নীতি, পরিকল্পনা এবং সক্ষমতার মধ্যে একটি গভীর কাঠামোগত রূপান্তর প্রয়োজন, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার ভিত্তি শক্তিশালী করবে। বাজেট বৃদ্ধি শুধু পরিসংখ্যানগত উন্নতি নয়, বরং বাস্তব কৌশলগত সক্ষমতায় রূপান্তরিত হতে পারে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

সাহসী হোন—আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বার্ধক্য বরণ করুন

হাসান আলী
সাহসী হোন—আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বার্ধক্য বরণ করুন
সংগৃহীত ছবি

প্রতি বছর ১৫ জুন বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়—বার্ধক্য কোনো দুর্বলতা নয়, জীবনের একটি স্বাভাবিক ও মর্যাদাপূর্ণ অধ্যায়। অথচ বিশ্বের বহু দেশের মতো বাংলাদেশেও অনেক প্রবীণ অবহেলা, বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হন। এই বাস্তবতা যেমন উদ্বেগজনক, তেমনি এটি আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও তুলে ধরে—প্রবীণদের জন্য এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে তারা নিরাপদ, সম্মানিত এবং আত্মবিশ্বাসী জীবনযাপন করতে পারেন।

আমরা সবাই জানি, জন্মের পর শৈশব, কৈশোর, যৌবন পেরিয়ে একদিন বার্ধক্য আসে। এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং জীবনের স্বাভাবিক পরিণতি। কিন্তু আমাদের সমাজে বার্ধক্যকে অনেক সময় ভয়, নির্ভরশীলতা কিংবা অসহায়ত্বের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ফলে অনেক মানুষ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। বাস্তবে বার্ধক্যকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই; প্রয়োজন শুধু প্রস্তুতি, সচেতনতা এবং আত্মবিশ্বাস।

বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নয়ন, গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ফলে আগামী বছরগুলোতে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা আরো বাড়বে। এই পরিবর্তনকে সমস্যা হিসেবে নয়, বরং সামাজিক বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। কারণ আজ যারা তরুণ, তারাই আগামী দিনের প্রবীণ।
দুঃখজনকভাবে অনেক প্রবীণ আজ শারীরিক নির্যাতনের চেয়ে বেশি ভোগেন মানসিক অবহেলা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতায়। পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাঁদের মতামত উপেক্ষা করা হয়, তাঁদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, কখনও কখনও তাঁদের বোঝা হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। অনেক প্রবীণ একাকীত্ব, হতাশা এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটান। অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা, চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ এবং সামাজিক সম্পর্কের সংকোচন তাঁদের জীবনকে আরো কঠিন করে তোলে।

তবে এই চিত্রের পরিবর্তন সম্ভব। পরিবর্তনের প্রথম ধাপ হলো আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। প্রবীণদের করুণা নয়, মর্যাদা দিতে হবে। তাঁদের দুর্বল নয়, অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার হিসেবে দেখতে হবে। পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র—সবার দায়িত্ব প্রবীণদের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

একই সঙ্গে প্রবীণদেরও নিজেদের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। শারীরিক সুস্থতা রক্ষা, আর্থিক পরিকল্পনা, সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং মানসিকভাবে সক্রিয় থাকা একটি সুন্দর বার্ধক্যের ভিত্তি। অবসরের পর জীবন থেমে যায় না; বরং এটি হতে পারে নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন সম্পর্ক এবং নতুন অবদানের সময়। সমাজসেবা, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কিংবা পরিবারের নতুন প্রজন্মকে পথ দেখানোর মাধ্যমে প্রবীণরা সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।

বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস আমাদের শুধু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলতে শেখায় না; এটি আমাদের শেখায় প্রবীণদের মর্যাদা ও অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে। নির্যাতনমুক্ত বার্ধক্য নিশ্চিত করতে হলে পরিবারে ভালোবাসা, সমাজে সচেতনতা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর নীতি ও সেবার সমন্বয় প্রয়োজন। প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, আইনি সুরক্ষা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ আজ সময়ের দাবি।

সবচেয়ে বড় কথা, বার্ধক্যকে ভয় নয়, গ্রহণ করতে শিখতে হবে। জীবনের প্রতিটি বয়সের যেমন সৌন্দর্য আছে, তেমনি বার্ধক্যেরও রয়েছে নিজস্ব মর্যাদা, প্রজ্ঞা এবং গভীরতা। বয়স বাড়া মানেই জীবন থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়; বরং জীবনকে নতুনভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ।

এই বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবসে আসুন আমরা প্রতিজ্ঞা করি—প্রবীণদের প্রতি সম্মান দেখাব, তাঁদের অধিকার রক্ষা করব এবং তাঁদের অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়ন করব। একই সঙ্গে নিজেদের ভবিষ্যতের জন্যও প্রস্তুত হব। কারণ একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তার প্রবীণদের প্রতি আচরণে প্রতিফলিত হয়।

তাই আসুন, আমরা সবাই বলি—সাহসী হোন, আত্মবিশ্বাসের সাথে বার্ধক্য বরণ করুন। বার্ধক্য জীবনের শেষ অধ্যায় নয়; এটি প্রজ্ঞা, মর্যাদা এবং মানবিকতার এক অনন্য সময়।

লেখক : প্রবীণ বিষয়ক লেখক-সংগঠক