আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রতিরক্ষা বাজেটের গুরুত্ব দিনে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, কারণ নিরাপত্তা এখন আর কেবল প্রচলিত যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি প্রযুক্তি, তথ্য, সাইবার সক্ষমতা এবং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে একটি দেশের প্রতিরক্ষা বাজেট তার সার্বভৌমত্ব রক্ষা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব আজ আর কেবল একটি স্থির ধারণা নয়; এটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতির প্রভাবাধীন একটি গতিশীল বাস্তবতা। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতিযোগিতা এবং সামুদ্রিক শক্তির পুনর্বিন্যাস দক্ষিণ এশিয়াকে নতুন কৌশলগত গুরুত্ব দিয়েছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়ছে। ফলে জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং রাষ্ট্রনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রয়োজন।
ভারত, মায়ানমার ও বঙ্গোপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সামুদ্রিক রুটের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই কৌশলগত অবস্থান যেমন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করে, তেমনি নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়ায়। বঙ্গোপসাগরে বাণিজ্যিক প্রবাহ বৃদ্ধির সম্ভাবনা এবং যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের ভূখণ্ড ও সমুদ্রসীমাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরেছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে একাধিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান ও বিচ্ছিন্ন সহিংসতা দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগের বিষয়। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ, রাখাইনের অস্থিরতা এবং রোহিঙ্গা সংকট অস্ত্র, মাদক ও মানবপাচারের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, সীমান্ত সংযোগ ও সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিশেষ চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।
অন্যদিকে, বঙ্গোপসাগর এখন বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সামরিক কৌশলের অন্যতম কেন্দ্র। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ, ভারতের ‘সাগর’ নীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল এই অঞ্চলের গুরুত্ব আরো বাড়িয়েছে। ফলে সমুদ্র নিরাপত্তা, সামুদ্রিক সম্পদ, বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং জ্বালানি অনুসন্ধান বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হয়ে উঠেছে। সার্বিকভাবে, বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং কৌশলগত প্রতিরক্ষা সক্ষমতার মধ্যে সমন্বিত ভারসাম্য বজায় রাখা অপরিহার্য।
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাজেট গত এক দশকে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেলেও এই বৃদ্ধি কতটা কার্যকরভাবে সামরিক সক্ষমতায় রূপান্তরিত হয়েছে, সেটিই আজ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। ২০১৬–১৭ অর্থবছরে প্রতিরক্ষা খাতে মোট বরাদ্দ ছিল প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে ২০২০ সালের পর বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যয় ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায় এবং সাম্প্রতিক প্রবণতা অনুযায়ী ২০২৬–২৭ অর্থবছরে তা ৫০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত এক দশকে প্রতিরক্ষা বাজেটের গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৬ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, যা সামগ্রিক বাজেট বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও আঞ্চলিক অনেক দেশের তুলনায় তুলনামূলকভাবে সংযত।
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাজেট ও সক্ষমতা বৃদ্ধির বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, গত এক দশকে বাজেট পরিমাণগতভাবে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও এর কাঠামোগত ব্যবহার এবং গুণগত রূপান্তর নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে গেছে। মোট প্রতিরক্ষা ব্যয়ের একটি বড় অংশ নিয়মিতভাবে বেতন-ভাতা, প্রশাসনিক ব্যয়, প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ এবং লজিস্টিক ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হয়। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই সামরিক শক্তিগুলোর ক্ষেত্রেও পরিচালন ব্যয় একটি বড় অংশ দখল করে। তবে পার্থক্য হলো উন্নত দেশগুলো একই সঙ্গে গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং আধুনিকায়নে উচ্চ অনুপাত বজায় রাখতে সক্ষম হয়, যা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এখনো তুলনামূলকভাবে সীমিত।
বাংলাদেশের সামরিক আধুনিকায়নে গত দুই দশকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে—নৌবাহিনীর সাবমেরিন ও ফ্রিগেট সংযোজন, বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধবিমান উন্নয়ন, এবং স্থলবাহিনীর সাঁজোয়া যান ও যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন। তবে এই অগ্রগতিকে যদি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেখা হয়, তাহলে দেখা যায় একই সময়ে ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোও বহুমুখী আধুনিকায়ন কৌশল অনুসরণ করেছে, বিশেষ করে সমুদ্র নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়—বাংলাদেশের বর্তমান সক্ষমতা ভবিষ্যতের বহুমাত্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতটা যথেষ্ট।
বিশ্ব পরিস্থিতি বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ আধুনিক যুদ্ধের প্রকৃতি সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন করেছে। সেখানে দেখা গেছে সস্তা কিন্তু কার্যকর ড্রোন প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট-ভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য, সাইবার যুদ্ধ এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার প্রচলিত ভারী সামরিক শক্তির সঙ্গে সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই ধরনের বাস্তবতা ইসরায়েল-হামাস সংঘাত এবং আজারবাইজান-আর্মেনিয়া যুদ্ধে স্পষ্টভাবে দেখা গেছে, যেখানে ড্রোন ও তথ্যযুদ্ধ যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রেখেছে। এই তুলনায় ন্যাটো দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য, তাদের প্রতিরক্ষা বাজেটের বড় অংশ এখন 'ডিজিটাল ডিফেন্স', এআই-ভিত্তিক সিস্টেম এবং স্পেস টেকনোলজিতে ব্যয় করছে, যা বাংলাদেশের বিনিয়োগ কাঠামোর তুলনায় অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর।
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর কাঠামোগত ভারসাম্য। ভারতের উদাহরণ এখানে উল্লেখযোগ্য—যেখানে প্রতিরক্ষা বাজেটের একটি বড় অংশ নতুন অস্ত্র ক্রয়, গবেষণা এবং দেশীয় উৎপাদন খাতে ব্যয় করা হচ্ছে। একইভাবে তুরস্ক গত এক দশকে 'Bayraktar' ড্রোনসহ নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলে বৈশ্বিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও ইসরায়েলও উচ্চমাত্রার প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলে আমদানিনির্ভরতা অনেকাংশে কমিয়েছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) এবং উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ এখনো তুলনামূলকভাবে সীমিত।
ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল। দক্ষিণ চীন সাগর ও বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ এবং ভারতের SAGAR নীতি একত্রে এই অঞ্চলকে একটি প্রতিযোগিতামূলক কৌশলগত মঞ্চে পরিণত করেছে। শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকট দেখিয়েছে যে ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য হারালে ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি দ্রুত বেড়ে যায়। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মতো 'balanced engagement strategy' অনুসরণ করতে হয়, যেখানে কোনো একক শক্তির ওপর অতিনির্ভরতা তৈরি হয় না।
অন্যদিকে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শুধু সরঞ্জাম ক্রয়ের ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা ও শিল্পভিত্তিক সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া এবং তুরস্কের অভিজ্ঞতা দেখায় যে, ধারাবাহিক ১০–২০ বছরের ডিফেন্স স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান ছাড়া টেকসই আধুনিকায়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশেও এ ধরনের সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা ক্রমশ বাড়ছে।
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কাঠামোকে ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উপযোগী করতে হলে কেবল বাজেট বৃদ্ধির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও কৌশলগত নীতি কাঠামোর দিকে অগ্রসর হওয়া জরুরি। বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশটি এমন এক অবস্থানে রয়েছে, যেখানে সীমান্ত নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সংকট, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি একত্রে একটি জটিল ও বহুমাত্রিক নিরাপত্তা পরিবেশ তৈরি করেছে। ফলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন এখন আর কেবল সামরিক বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, পররাষ্ট্রনীতি এবং অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি সমন্বিত রাষ্ট্রনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
এই বাস্তবতায় প্রতিরক্ষা বাজেটকে শুধুমাত্র একটি বার্ষিক ব্যয় হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে যেভাবে বাজেট প্রতি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা পরিমাণগত অগ্রগতি নির্দেশ করলেও এর কাঠামোগত ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ বাজেটের একটি বড় অংশ স্বাভাবিকভাবেই বেতন-ভাতা, প্রশাসনিক ব্যয়, প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ এবং লজিস্টিক ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হয়। এসব ব্যয় অপরিহার্য হলেও এগুলোর ওপর অতিনির্ভরতা থাকলে আধুনিকায়ন, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং নতুন সক্ষমতা অর্জনের জন্য যে অংশটি প্রয়োজন, তা তুলনামূলকভাবে সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে বাজেট বৃদ্ধি পেলেও তার প্রভাব সরাসরি যুদ্ধ সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সমানুপাতিকভাবে প্রতিফলিত হয় না।
আধুনিক যুদ্ধের প্রকৃতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, যেখানে প্রচলিত অস্ত্রশক্তির পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ড্রোন প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্যাটেলাইটভিত্তিক নজরদারি এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এখন প্রতিরক্ষা সক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যয়ের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে এই খাতগুলোতে বিনিয়োগ এখনো তুলনামূলকভাবে সীমিত। এর ফলে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি প্রযুক্তিগত ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা শুধুমাত্র প্রচলিত সামরিক শক্তি দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।
এই প্রেক্ষাপটে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বাজেটের পাশাপাশি এর গুণগত ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাজেট কতটা বৃদ্ধি পেল, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই অর্থের বিনিময়ে কী ধরনের কৌশলগত সক্ষমতা অর্জিত হলো। নতুন প্রযুক্তি কতটা যুক্ত হলো, দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা কতটা তৈরি হলো, এবং আধুনিক যুদ্ধ পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রস্তুতি কতটা গড়ে উঠল—এই প্রশ্নগুলোই প্রকৃত মূল্যায়নের মানদণ্ড হওয়া উচিত। একই সঙ্গে গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি না করলে দীর্ঘমেয়াদে প্রযুক্তিগত নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে না।
বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের ধীরে ধীরে বিকাশ। বর্তমানে কিছু প্রতিষ্ঠান সীমিত পরিসরে রক্ষণাবেক্ষণ ও উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করলেও এগুলোকে পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা শিল্প কাঠামোতে রূপান্তর করা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায় যে যেসব দেশ ধাপে ধাপে প্রযুক্তি হস্তান্তর, যৌথ উৎপাদন এবং গবেষণা সহযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের শিল্পভিত্তি তৈরি করেছে, তারা কেবল ব্যয় নিয়ন্ত্রণেই সফল হয়নি বরং কৌশলগত স্বাধীনতাও অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই ধরনের ধীরে অগ্রসরমান শিল্পায়ন কৌশল ভবিষ্যৎ নির্ভরতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এছাড়া প্রতিরক্ষা কৌশলে বহুমুখী আন্তর্জাতিক অংশীদারি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে কৌশলগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তবসম্মত কৌশল হতে পারে, যেখানে প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ এবং সরঞ্জাম সংগ্রহের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য থাকবে এবং কোনো একক নির্ভরতা তৈরি হবে না।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি কেবল বাজেট বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি, প্রযুক্তিনির্ভর এবং সমন্বিত কৌশলগত কাঠামো, যেখানে বাজেট, প্রযুক্তি, শিল্প উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা একসঙ্গে কাজ করবে। বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতায় এই ধরনের সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জের উপযোগী করে তোলা কঠিন হবে। তাই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এখনই নীতি, পরিকল্পনা এবং সক্ষমতার মধ্যে একটি গভীর কাঠামোগত রূপান্তর প্রয়োজন, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার ভিত্তি শক্তিশালী করবে। বাজেট বৃদ্ধি শুধু পরিসংখ্যানগত উন্নতি নয়, বরং বাস্তব কৌশলগত সক্ষমতায় রূপান্তরিত হতে পারে।
লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট




