• ই-পেপার

সংবিধানের আলোকে সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও পাহাড়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা

ইউনূসের কালো আইনে অর্থনীতির সর্বনাশ

অদিতি করিম
ইউনূসের কালো আইনে অর্থনীতির সর্বনাশ

বিচারের আগেই কি কাউকে ফাঁসি দেওয়া যায়?

এ প্রশ্ন শুনে অনেকেই অবাক হবেন হয়তো, ভাববেন, এটা কি কখনো সম্ভব নাকি?

আমাদের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার স্বীকৃত রয়েছে। একজন নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উপযুক্ত আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগে তাকে নির্দোষ হিসেবে বিবেচনা করা আইনের শাসনের অন্যতম মৌলিক শর্ত। কিন্তু ইউনূস সরকারের দেড় বছরের শাসনকালে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং সংবিধান লঙ্ঘন করা হয়েছে প্রতি পদে। ইউনূসের শাসনামলে সবচেয়ে বড় কালো আইন ছিল দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের সংশোধন। এ আইন সংশোধন করে আন্ডার কাভার তদন্তের নামে হয়রানি, বিচারের আগেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ, সম্পত্তি ক্রোক করার মতো স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ করে দেওয়া হয়। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের দুদক সংস্কার-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের আলোকে আইন মন্ত্রণালয় থেকে দুদক আইন-২০০৪-এর অধিকতর সংশোধনের জন্য প্রজ্ঞাপন জারি করে গত ২৩ ডিসেম্বর। 

আরো পড়ুন
ঢাকার আতঙ্ক ১৩৮৭ ছিনতাইকারী

ঢাকার আতঙ্ক ১৩৮৭ ছিনতাইকারী

 

নতুন সরকার গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় ১২ মার্চ। এ দিনেই দুদক-সংক্রান্ত অধ্যাদেশসহ ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদ অধিবেশনে উত্থাপন করা হয়। ওই ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে পাস হয় ১১৩টি, বাতিল হয় সাতটি। বাকি ১৩টি অধ্যাদেশের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এর মধ্যে দুদক সংশোধন অধ্যাদেশও ছিল। আইন অনুযায়ী, গত ১২ মার্চ অধিবেশনে উত্থাপনের দিন থেকে গত ১১ এপ্রিল পর্যন্ত ৩০ দিন পার হওয়ার পর ওই ১৩টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারিয়েছে। গত ১১ এপ্রিল থেকেই আগের দুদক আইন-২০০৪ পূর্ণাঙ্গভাবে বহাল হয়েছে। 

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ গ্রহণ না করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ ওই অধ্যাদেশ ছিল সংবিধানের মূল চেতনার পরিপন্থি। এতে তদন্ত ও বিচার ছাড়াই সম্পদ জব্দ করাসহ চরম স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। কাউকে বিনা বিচারে সাজা দেওয়া কেবল বেআইনি নয়, রীতিমতো অপরাধ। কিন্তু ইউনূস সরকার দেড় বছর ধরে এই কাজটি করছে এ অধ?্যাদেশ জারি করে। ইউনূসের কালো আইন বাতিল হলেও এ আইনের আওতায় যারা হয়রানির শিকার হয়েছেন তাদের মুক্তি মেলেনি। অবৈধভাবে যাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছিল, যাদের বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় এবং যাদের সম্পত্তি বিচারের আগেই ক্রোক করা হয়েছিল, ইউনূসের কালো আইন বাতিলের ফলে সেসব কর্মকাণ্ড আপনাআপনিই আইনবহির্ভূত হয়ে যায়। তার পরও ভুক্তভোগীরা এখনো প্রতিকার পাননি।

আরো পড়ুন
অপচয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

অপচয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

 

দুর্নীতি দমন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ইউনূসের এ কালো আইনে প্রায় দেড় হাজার ব্যবসায়ী এবং নিরীহ মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। তদন্তের আগেই প্রায় ১ হাজার শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিদের বিদেশযাত্রার নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ৫৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। এর ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের অর্থনীতি। ইউনূসের এ কালো আইনের কারণে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি এবং উদ্যোক্তাদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। অনেকে ব্যবসা বন্ধ করে দেন। ফলে নতুন করে বেকার হয়ে পড়ে কয়েক লাখ মানুষ। একদিকে বেকারত্ব বেড়েছে, অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগ না হওয়ায় কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে।

ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধের কারণে বহু ভালো ব্যবসায়ী নতুন করে ঋণখেলাপি হয়েছেন। খেলাপি ঋণের কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা ধরনের সুবিধা দেওয়ার পরও চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে দেশের ৬১ তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ৪৪টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে। একসঙ্গে এতগুলো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এর আগে কখনো হয়নি বলে জানান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। কেবল দুর্বল ব্যাংক নয়, এবার আর্থিক সূচকে ভালো অবস্থানে থাকা সিটি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, উত্তরা ব্যাংক ও বিদেশি মালিকানাধীন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকেরও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এটি ইউনূসের কালো আইনের ফল। যাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে তারা ঋণ পরিশোধ করবেন কীভাবে? আজ বিশ্বায়নের যুগে  ব্যবসা করতে বিদেশ যেতেই হবে। কিন্তু বছরের পর বছর যদি উদ্যোক্তা, শিল্পপতিদের বিদেশে যেতে নিষেধাজ্ঞা থাকে তাহলে তারা ব্যবসা করবেন কীভাবে? বিদেশে যেতে না পারায় অনেকেই ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন। যার প্রভাব পড়েছে আর্থিক খাতে এবং অর্থনীতিতে।

আরো পড়ুন
বিশাল ঘাটতি মেটাতে ঋণে অর্থমন্ত্রীর বাজি!

বিশাল ঘাটতি মেটাতে ঋণে অর্থমন্ত্রীর বাজি!

 

বেসরকারি খাত এ কালো আইনের কারণে বিপর্যস্ত। দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত। ইউনূসের এ কালো আইনে দেশের অর্থনীতির সর্বনাশ হয়েছে। দুর্নীতি দমন এবং অর্থ পাচার এখন সব দেশেরই বড় সমস্যা। কিন্তু পৃথিবীর কোথাও এরকম নিকৃষ্ট কালো আইন নেই। ভারতে ১৯৮৮ সালে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন প্রণয়ন করা হয়, যা ২০১৮ সালে সংশোধন করা হয়। অন্যদিকে, অর্থ পাচার প্রতিরোধে ২০০২ সালে নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়। ভারতে দুর্নীতি তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাকে বলা হয় সিবিআই (কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা)। 

অন্যদিকে অর্থ পাচার তদন্ত করে ইডি (এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট)। ভারতের আইনে তদন্তকারী সংস্থা আদালতের রায়ের আগে কারও সম্পত্তি বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করতে পারে না। শুধু চার্জশিট প্রদানের পর আদালতের অনুমতি-সাপেক্ষে লেনদেন সীমিত করতে পারে। যেন অভিযুক্ত ব্যক্তি পুরো টাকা উত্তোলন করে নিয়ে যেতে না পারে। ভারতে বিদেশযাত্রার নিষেধাজ্ঞা জারির ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলার চার্জশিট প্রদান করতে হয়। কেবল অভিযোগ আছে এ কারণে বিদেশযাত্রার নিষেধাজ্ঞা জারি করা যায় না। এ বিষয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায় আছে। ভারতে বিশেষ পরিস্থিতিতে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে। তবে কোনো অবস্থাতেই তা অনির্দিষ্টকালের জন্য নয়। এরকম নিষেধাজ্ঞা জারির সুনির্দিষ্ট কারণ এবং সময়কাল আদালতে পেশ করতে হয়। পাকিস্তানে এখনো ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি দমন আইন কার্যকর। যে আইনে একমাত্র আদালতে দোষী প্রমাণিত হলেই কেবল তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কিংবা সম্পদ জব্দ করা যায়। পাকিস্তানে বিশেষ ক্ষমতা আইনে সর্বোচ্চ তিন মাসের জন্য বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা জারি করা যায়। এ ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণ উল্লেখ করতে হবে।

আরো পড়ুন
একনজরে আজকের কালের কণ্ঠ (৯ জুন)

একনজরে আজকের কালের কণ্ঠ (৯ জুন)

 

যুক্তরাজ্যে দুর্নীতি এবং অর্থ পাচার (Money Laundering) রোধে অত্যন্ত কঠোর আইনি কাঠামো রয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে ‘ক্লিন মানি’ বা স্বচ্ছ অর্থব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কাজ করে। ব্রিবারি অ্যাক্ট-২০১০ (Bribery Act 2010), যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুর্নীতিবিরোধী আইন, যা ২০১১ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে। এ আইনে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করার অধিকার নেই। শুধু ব্যাংক হিসাব বিবরণীর যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। প্রসিডিংস অব ক্রাইম অ্যাক্ট ২০০২ (Proceeds of Crime Act 2002-POCA) : এ আইনের অধীনে অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ (যেমন- দুর্নীতি, মাদক বা অপরাধের অর্থ) এ আইনে প্রাথমিক তদন্তের পর যুক্তিসংগত কারণ দেখিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ চিহ্নিত করে সাময়িকভাবে জব্দ করা যায়। কিন্তু এসব দেশে অন্তহীন সময়ের জন্য বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার বিধান নেই।

আরো পড়ুন
ঋণের ফাঁদে আটকা মানুষ

ঋণের ফাঁদে আটকা মানুষ

 

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী একজন ব্যক্তিকে অন্তহীন মেয়াদে বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জনস্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে বাংলাদেশের সর্বত্র অবাধ চলাফেরা, ইহার যে কোনো স্থানে বসবাস ও বসতিস্থাপন এবং বাংলাদেশ ত্যাগ ও বাংলাদেশে পুনঃপ্রবেশ করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।’ বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ দুদক বনাম জি বি হোসেন মামলার ঐতিহাসিক রায়ে বলেছে, ‘একজনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা আছে শুধু এ যুক্তিতে তাকে বিদেশে যেতে বাধা দেওয়া যায় না। কেবল ফৌজদারি মামলায় আছে এ অজুহাতে সংবিধানের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।’ (৭৪ ডিএলআর)।

ইউনূস আমলে কেবল সংবিধানের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়নি আপিল বিভাগের রায় অমান্য করে আদালত অবমাননা করা হয়েছে। বিএনপি সরকার এ কালো আইন বাতিল করেছে। কিন্তু এ আইনের মাধ্যমে যাদের সীমাহীন দুর্ভোগ হয়েছে তাদের হয়রানি থেকে মুক্তি মেলেনি। অনতিবিলম্বে সরকার এ কালো আইনের আওতায় যারা নিপীড়নের শিকার হয়েছেন তাদের পাশে দাঁড়াবে বলে আমাদের বিশ্বাস। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়ে, বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে দেশে একটি সুস্থ, স্বাভাবিক বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে সরকার আশা করি আর বিলম্ব করবে না।

দ্রুততম রায়ের নজির

কার্যকরেও সৃষ্টি হোক দৃষ্টান্ত

অনলাইন ডেস্ক
দ্রুততম রায়ের নজির
সংগৃহীত ছবি

আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় দোষী দুজনের মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হয়েছে। ঘটনার ১৯ দিনের মাথায় এবং মামলার বিচার শুরু থেকে রায়ের পর্যায়ে এসেছে মাত্র চার কার্যদিবসে। আদালত দেখালেন অনুকরণীয় নজির। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। কারণ যখন কোনো শিশু যৌন নির্যাতন, সহিংসতা কিংবা হত্যার মতো নৃশংসতম অপরাধের শিকার হয়, তখন তা শুধু পরিবার নয়, গোটা সমাজকে গভীরভাবে আহত করে। রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ব্যাপক আলোচিত এবং অতিসংবেদনশীল রামিসার ঘটনা সারা দেশে সর্বসাধারণের মনে বিস্ফোরণোন্মুখ বিক্ষোভ সৃষ্টি করে।

সব পক্ষের সক্রিয় তৎপরতায়, দ্রুততম সময়ে বিচার সম্পন্ন হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও। কারণ তিনি ঘটনার খুব অল্প সময়ের মধ্যে তার ঊর্ধ্বতন পারিষদদের নিয়ে রামিসাদের ছোট্ট বাসায় গিয়েছিলেন। অনেকটা সময় থেকে, নিহত শিশুটির পরিবারকে সান্ত্বনা এবং দ্রুত বিচারের আশ্বাস দিয়েছিলেন। স্বল্পতম সময়ের মধ্যে রায় ঘোষণায় তাঁর নির্দেশনা অবশ্যই গতি সঞ্চার করেছে।

প্রিয় কন্যাকে হারিয়ে পাগলপ্রায় পিতা বলেছেন, ‘মেয়েকে তো আর ফিরে পাব না; রায়ে সন্তুষ্ট হয়েছি। এখন দ্রুত এই রায় কার্যকর দেখতে চাই।’ তিনি পরিবারের চরম দুঃসময়ে মানসিকভাবে সহায়তা জোগানোর জন্য গণমাধ্যম, পুলিশ প্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং দেশের মানুষের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানান। কিন্তু এই সন্তুষ্টিই যেন শেষ কথা না হয়। খোদ রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা হত্যার ঘটনাটা ছিল রোমহর্ষক। এতে দেশবাসী স্তম্ভিত হয়। দ্রুত বিচার দাবিতে ফুঁসে ওঠে জনগণ। আঁচ লাগে রাষ্ট্রযন্ত্রে। তারই প্রতিফলন ঘটেছে বিচার এবং রায়ে।

কিন্তু সাধারণ ক্ষেত্রে বিভিন্ন নৃশংস হত্যাকাণ্ড, বিশেষ করে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় তদন্ত ও বিচারে ব্যাপক দীর্ঘসূত্রতাই সাধারণ চিত্র। দুর্ভাগ্যজনক যে ২০১২ সালে নিহত সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের আজও সুরাহা হয়নি। বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদছে। এই শম্ভুকগতির নেতিবাচক অভিধা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত বিচার বিভাগের। কারণ ন্যায়বিচার পাওয়ার সেটাই তো মানুষের আস্থা ও ভরসার শেষ ঠিকানা। তার গরিমা ম্লান হতে দেওয়া চলে না। সেজন্যই পর্যায়ক্রমে আলোচিত-অনালোচিত নির্বিশেষে সব মামলার বিচার নিষ্পন্ন হোক।

আর কোনোভাবেই যেন আইনের কোনো দীর্ঘসূত্রতার ফাঁকফোকরে রামিসার খুনিদের দণ্ড কার্যকর বিলম্বিত না হয়। বর্তমানে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের যে উদ্বেগজনক অবস্থা দৃশ্যমান, সেখানে দণ্ডিত খুনিদের দ্রুত ফাঁসি দৃষ্টান্তই শুধু নয়; অপরাধপ্রবণদের মনে ভীতি সৃষ্টি করবে। তাতে এ ধরনের অপরাধ কমবে, যা খুব জরুরি।

সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

সম্পর্ক উন্নয়ন দিল্লির স্বার্থেই জরুরি

রোমান উদ্দিন
সম্পর্ক উন্নয়ন দিল্লির স্বার্থেই জরুরি
রোমান উদ্দিন।

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক শুধু দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়। এটি ইতিহাস, ভৌগোলিক বাস্তবতা, নদী, সীমান্ত, বাজার, সংস্কৃতি, নিরাপত্তা এবং দুদেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিন্তু সম্পর্কের ঐতিহাসিক গভীরতা সত্ত্বেও গত কয়েক বছরে পারস্পরিক আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের জনপরিসরে একটি ধারণা ক্রমে শক্তিশালী হয়েছে যে দিল্লি বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও জনগণের চেয়ে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে বেশি স্বস্তিবোধ করে। কোনো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক যদি রাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্রে না গিয়ে, দল থেকে দলে সীমাবদ্ধ বলে প্রতীয়মান হয়, তবে তা দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হয় না। ফলে জুলাই অভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক প্রকাশ্য টানাপোড়েনে রূপ নিয়েছিল।

তবে ফেব্রুয়ারিতে নতুন নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে দিল্লি। নরেন্দ্র মোদির দ্রুত অভিনন্দন, শপথ অনুষ্ঠানে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠানো, দীনেশ ত্রিবেদীর মতো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে ঢাকায় হাইকমিশনার করার সিদ্ধান্ত এবং ভিসা, বাণিজ্য, গঙ্গা ও তিস্তা নিয়ে আলোচনায় ফেরার ইঙ্গিত স্পষ্ট করেই দেখায় যে দিল্লি ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের প্রয়োজন বুঝেছে।

এদিকে বাংলাদেশের নতুন সরকারও ভারতের সঙ্গে নিরাপত্তা, যোগাযোগ, পানি ও বাণিজ্য নিয়ে আলোচনার পথ খোলা রেখেছে। সম্পর্ক উন্নয়নে দুই দেশের যৌথ দায়িত্ব থাকলেও তুলনামূলক বড় অর্থনীতি, উদীয়মান আঞ্চলিক শক্তি, পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্র ও নিজেদের স্বার্থের বিবেচনায় এখানে ভারতের দায়িত্ব তুলনামূলকভাবে বেশি। প্রথমত এই দায়িত্বের গুরুত্ব আরো গভীরভাবে বোঝা যাবে, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে। সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।

রাশিয়া থেকে তেল কেনার ফলে গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে, যা পরবর্তী আলোচনার মাধ্যমে কিছুটা শিথিল হলেও ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এইচ-১বি ভিসাসংক্রান্ত কঠোরতা এবং ভারতকে নিয়ে মার্কিন রাজনৈতিক পরিসরে বিভিন্ন বিতর্কিত মন্তব্য দিল্লির কূটনৈতিক পরিসরে অস্বস্তি তৈরি করেছে। কিন্তু একই সময়ে ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ পাকিস্তানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সখ্য বেড়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখছে, যা পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় নতুন করে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়াতেও বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন করে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন করেছে। দীর্ঘ বিরতির পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি বাণিজ্যিক যোগাযোগ, জাহাজ চলাচল ও আকাশপথে সংযোগ আলোচনায় এসেছে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের টানাপোড়েন দিল্লির কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে উপেক্ষণীয় নয়। ইসলামাবাদের সঙ্গে ঢাকার স্বাভাবিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে ভারতের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই, যদি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক স্থিতিশীল থাকে। কিন্তু সম্পর্কের অস্বস্তি যদি অন্য শক্তির জন্য কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করে, তবে সেটি ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হওয়াই স্বাভাবিক। তাই বর্তমান আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাস্তবতায় ভারতের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন কেবল সৌজন্যমূলক কূটনীতির বিষয় নয়, বরং কৌশলগত প্রয়োজন। এটা তাদের না বোঝার কোনো কারণ নেই।

দ্বিতীয়ত চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাস্তবতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের প্রশ্নে বাংলাদেশ বহুদিন ধরে সমাধান প্রত্যাশা করছে। কিন্তু ভারতের অভ্যন্তরীণ জটিলতা ও কার্যকর অগ্রগতির অভাবে তিস্তা চুক্তি দীর্ঘদিন ঝুলে থাকায় বাংলাদেশের ভিতরে বিকল্প নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনা অনেকটাই এগিয়েছে। তবে এখানে চীনের সম্ভাব্য ভূমিকা স্বভাবতই ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়াতে পারে। তিস্তা অববাহিকার অবস্থান ভারতের সংবেদনশীল শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’-এর কাছাকাছি, যা ভারতের মূল ভূখণ্ডকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

এখানে চীনের অন্তর্ভুক্তি ভারতীয় নিরাপত্তা মহলে যথেষ্ট উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু এই উদ্বেগের কার্যকর উত্তর সন্দেহপ্রবণ ভাষা নয়। বরং ভারতের জন্য কার্যকর পথ হলো আস্থাভিত্তিক আলোচনা জোরদার করা এবং বহুদিনের অমীমাংসিত তিস্তা চুক্তির ক্ষেত্রে অগ্রগতি দৃশ্যমান করা। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান, দীর্ঘদিন তিস্তা চুক্তির পথে বাধা হিসেবে আলোচিত হয়েছে। এখন পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কেন্দ্র ও রাজ্যের সমন্বয় তৈরি হলে, তিস্তা প্রশ্নে নতুন উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। ভারতের নিজের স্বার্থেই এ সুযোগ নষ্ট করা উচিত হবে না। যদি না মমতার লাগাতার বিরোধিতা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পাতানো বিরোধিতা না হয়ে থাকে।

পাশাপাশি, গঙ্গা পানিবণ্টনও এখন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ এ বছর শেষ হবে। নতুন বাস্তবতায় এর নবায়ন বা হালনাগাদ আলোচনায় বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্সা, শুকনা মৌসুমের প্রবাহ, নদী-জীবন, কৃষি ও পরিবেশগত নিরাপত্তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন। নদী কেবল পানিবণ্টনের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের জীবন, কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে পানি কূটনীতিতে আস্থার পরিবেশ তৈরি করা দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।

তৃতীয়ত সীমান্ত ইস্যুও আস্থাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সীমান্ত হত্যা, অনুপ্রবেশ, চোরাচালান, মানব পাচার ও অবৈধ চলাচল দুই দেশের জন্যই উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু এ সমস্যার সমাধান একতরফা পদক্ষেপে সম্ভব নয়। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের দিক থেকে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ এবং নাগরিকত্ব যাচাই নিয়ে নতুন চাপ সীমান্তে অস্বস্তি বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়া কোনো ধরনের জোরপূর্বক প্রত্যাবর্তন মেনে নিতে পারে না। ভারতও যদি স্থিতিশীল সীমান্ত চায়, তবে তাকে আইনসম্মত, মানবিক ও দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর মধ্যেই কাজ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, এ ক্ষেত্রে কোনো হঠকারিতা সহ্যের পর্যায়ে বাংলাদেশ এখন আর নেই।

চতুর্থত অর্থনীতির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আয়তনে ছোট হলেও বাংলাদেশ একটি বড় জনসংখ্যার দেশ এবং ভারতের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার। ২০২৪ সালে ভারত বাংলাদেশে প্রায় ১১ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে ভারতের আমদানি মাত্র ১.৮৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। অর্থাৎ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য কাঠামোতে ভারতের লাভের পরিমাণ বহুগুণে বেশি। ফলে সম্পর্কের অবনতি হলে ভারতের উৎপাদক, রপ্তানিকারক, পরিবহন খাত এবং সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর অর্থনীতি চাপের মুখে পড়তে বাধ্য। এই বাজার ধরে রাখতে চাইলে দিল্লিকে বুঝতে হবে, রাজনৈতিক অস্বস্তি দীর্ঘ হলে ব্যবসায়িক সম্পর্কও বিকল্প পথ খুঁজে নেয়।

পঞ্চমত ভিসাসংকট ভারতের নিজের অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশিরা দীর্ঘদিন ভারতের চিকিৎসা পর্যটনের বড় অংশ। কলকাতা, চেন্নাই, দিল্লি ও বেঙ্গালুরুর বহু হাসপাতাল বাংলাদেশি রোগীর ওপর নির্ভরশীল। ২০২৪ সালে ৪ লাখ ৮২ হাজারের বেশি বাংলাদেশি চিকিৎসা ভিসায় ভারতে গেলেও ভিসা সীমাবদ্ধতা, দীর্ঘ অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার কারণে অনেক রোগী এখন থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, চীন বা মালয়েশিয়ার মতো বিকল্প গন্তব্য বিবেচনা করছেন। একবার এই অভ্যাস বদলে গেলে তা সহজে ফিরবে না। চিকিৎসা ভিসা সহজ করা তাই ভারতের হাসপাতাল, হোটেল, পরিবহন ও সেবা খাতের অর্থনৈতিক স্বার্থই রক্ষার স্বার্থেই প্রয়োজন।

অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর সঙ্গেও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। ভুটানের সঙ্গে ঐতিহ্যগত বন্ধুত্ব সত্ত্বেও সীমান্ত ইস্যুতে চীনের সঙ্গে তাদের নতুন সমঝোতা ভারতের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় ভারতবিরোধী মনোভাবের উত্থান, চীনের প্রভাব বৃদ্ধি এবং মালদ্বীপের ‘ইন্ডিয়া আউট’ নীতি ভারতের প্রভাববলয় সংকুচিত করেছে। আফগানিস্তানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে সীমিত সম্পর্ক উন্নয়ন হলেও তা এখনো বন্ধুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেনি।

এ ছাড়া পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বৈরিতা চলমান। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশই দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বাংলাদেশ এমন এক প্রতিবেশী, যার সঙ্গে স্থলসীমান্ত, নদী, বঙ্গোপসাগর, উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা, জ্বালানি, বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ একসঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ানো মানে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কৌশলকেই দুর্বল করা। এ অবস্থান রক্ষা ও শক্তিশালী করা ভারতের স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

সবকিছু বিবেচনায় তাই ভারতের সামনে এখন দুটি পথ খোলা রয়েছে। একদিকে আছে সন্দেহ, দাদাগিরির স্বস্তি, ভিসা সংকোচন, সীমান্তে কঠোরতা এবং পানিবণ্টন চুক্তিতে বিলম্বের পুরনো পথ। অন্যদিকে রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের মর্যাদাভিত্তিক সম্পর্ক, সীমান্তে আইনসম্মত আচরণ, নদীতে ন্যায্যতা, বাণিজ্যে ভারসাম্যপূর্ণ বাস্তব সহযোগিতা এবং মানুষে মানুষে যোগাযোগ বাড়ানোর নতুন পথ। দ্বিতীয় পথই তাকে দীর্ঘ মেয়াদে সৌহার্দের স্বস্তি দিতে পারে। ঢাকার সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক উন্নয়ন বাংলাদেশের জন্যও প্রয়োজন, কিন্তু ভারতের জন্য তা এখন অধিক জরুরি। কারণ উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা, লাভজনক বাজার, চিকিৎসা পর্যটন, নদী কূটনীতি, দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব এবং চীন-পাকিস্তান বাস্তবতা সবই বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। ইতিহাসের বন্ধুত্বের ধারা অব্যাহত রাখতে হলে দিল্লিকে বুঝতে হবে, বাংলাদেশকে পাশে পাওয়া, ভারতের নিজের স্বার্থেই অপরিহার্য।

লেখক : সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)

শব্দের চেয়ে কাজে ফিরুক বাংলাদেশ

জিল্লুর রহমান
শব্দের চেয়ে কাজে ফিরুক বাংলাদেশ

১. বিনিয়োগ আসে আশ্বাসে নয়, আস্থায়

বাংলাদেশ নিয়ে আজকাল একধরনের অদ্ভুত দ্বৈত ছবি দেখা যায়। একদিকে আমরা বলি- দেশে সম্ভাবনা আছে, শ্রমশক্তি আছে, বাজার আছে, ভৌগোলিক সুবিধা আছে। অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যখন বাস্তবে আসতে চান, তখন তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে যায় অনুমোদনের জট, নীতির অনিশ্চয়তা, কর ও শুল্কের জটিলতা, ব্যাংকিং সমস্যার চাপ, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার অসুবিধা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট, বন্দরের ধীরগতি এবং চুক্তি বাস্তবায়নের ভরসাহীনতা।

বিনিয়োগকারীরা কবিতা শুনতে আসেন না; তাঁরা হিসাব দেখতে আসেন। তাঁরা রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়, নীতির ধারাবাহিকতা চান। তাঁরা সম্ভাবনার গল্প নয়, বাস্তব সুবিধা চান। বাংলাদেশ বহু বছর ধরে সম্ভাবনার দেশ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু শুধু সম্ভাবনা দিয়ে আর কত দিন চলবে?

আমরা অনেক সময় ভাবি, বিদেশি বিনিয়োগ মানে বিদেশিদের দয়া। আসলে তা নয়। বিনিয়োগ একটি প্রতিযোগিতা। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন- সবাই একই বিনিয়োগকারীর দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। যে দেশ দ্রুত সিদ্ধান্ত দিতে পারে, নীতি স্থির রাখতে পারে, দুর্নীতি কমাতে পারে, অবকাঠামো নিশ্চিত করতে পারে, সেই দেশই এগিয়ে যায়।

বাংলাদেশের সমস্যা সম্ভাবনার অভাব নয়; বাস্তবায়নের অভাব। এখানে বড় বড় ঘোষণা হয়, কিন্তু ছোট ছোট অনুমোদনে মাস কেটে যায়। এখানে ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের কথা বলা হয়, কিন্তু বিনিয়োগকারীকে বহু দরজায় ঘুরতে হয়। এখানে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি আছে, কিন্তু প্রশাসনিক অভ্যাসে পরিবর্তন কম।

বিদেশি বিনিয়োগ আনার জন্য সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন হলো সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা। বিনিয়োগকারী যখন বুঝবেন, নিয়ম হঠাৎ বদলাবে না, ফাইল অকারণে আটকে থাকবে না, ব্যাংকিং ব্যবস্থা কাজ করবে, মুনাফা পাঠানো যাবে, বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, আদালত বা সালিশে ন্যায়সংগত সমাধান মিলবে- তখন তিনি আসবেন।

দেশে এখন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এই সময়ে যদি অর্থনৈতিক সংস্কারকে সত্যিকার অগ্রাধিকার দেওয়া যায়, তাহলে বাংলাদেশ নতুন করে বিনিয়োগের মানচিত্রে জায়গা করে নিতে পারে। কিন্তু যদি আমরা শুধু স্লোগান, সম্মেলন, ছবি তোলা এবং বক্তৃতার মধ্যে আটকে থাকি, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগও আমাদের মতো ধৈর্য হারাবে।

২. জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের উত্থান

বাংলাদেশ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে আবার বসতে যাচ্ছে, নিঃসন্দেহে এটি বড় কূটনৈতিক অর্জন। চার দশক পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে ১৯৮৬ সালে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

এই অর্জনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব আছে। বিশ্ব এখন এক জটিল সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজাসংকট, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা, চীন-আমেরিকা প্রতিযোগিতা- সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা অস্থির। এই সময়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ শুধু আনুষ্ঠানিক বক্তৃতার মঞ্চ নয়; এটি ছোট ও মধ্যম শক্তির রাষ্ট্রগুলোর জন্য নৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থান তৈরির জায়গা।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ এই সুযোগকে কীভাবে ব্যবহার করবে?

আমরা কি শুধু গর্ব করব যে বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি সভাপতি হয়েছেন, নাকি এই মঞ্চকে ব্যবহার করে জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়ন অর্থায়ন, শান্তিরক্ষা, অভিবাসন, ঋণসংকট এবং বৈশ্বিক বৈষম্য নিয়ে নেতৃত্ব দেব?

বাংলাদেশের জন্য এটি সম্মানের পাশাপাশি পরীক্ষা। কারণ আন্তর্জাতিক মঞ্চে মর্যাদা পাওয়া সহজ নয়, ধরে রাখা আরও কঠিন। জাতিসংঘে সভাপতির আসন আমাদের সামনে একটি জানালা খুলে দিয়েছে। কিন্তু জানালা খোলা থাকলেই বাতাস ঢোকে না; ঘরের ভিতরও প্রস্তুতি থাকতে হয়।

বাংলাদেশকে এখন দেখাতে হবে, সে শুধু ভোট জিততে পারে না, ধারণাও দিতে পারে। শুধু কূটনৈতিক সমর্থন আদায় করতে পারে না, বৈশ্বিক আলোচনায় অর্থবহ অবদানও রাখতে পারে।

৩. তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর : বার্তা কোথায়?

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন। এটি শুধু একটি সফর নয়; এর মধ্যে নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির একটি বার্তা আছে।

অনেকে ভেবেছিলেন, প্রথম সফর হয়তো ভারত, চীন বা সৌদি আরবে হতে পারে। কিন্তু মালয়েশিয়া বেছে নেওয়া একটি কৌশলগত ভারসাম্যের ইঙ্গিত দেয়। ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতামূলক ভূরাজনীতির মধ্যে বাংলাদেশ যেন সরাসরি কোনো শিবিরে দাঁড়ানোর বার্তা না দেয়, এই হিসাবও এখানে থাকতে পারে।

মালয়েশিয়া বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারণে। প্রথমত সেখানে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী কাজ করেন। তাঁদের রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির জন্য জরুরি। দ্বিতীয়ত মালয়েশিয়া একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, অর্থনৈতিকভাবে গতিশীল, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় রাষ্ট্র। তৃতীয়ত বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক আরও বাড়ানোর সুযোগ আছে।

কিন্তু সফর সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে ছবি ও প্রটোকলের ওপর নয়; ফলাফলের ওপর।

প্রধানমন্ত্রীর সফরে যদি শ্রমবাজারের নিরাপত্তা, অভিবাসী কর্মীদের মর্যাদা, বিনিয়োগ সহযোগিতা, প্রযুক্তি ও শিক্ষা বিনিময়, হালাল শিল্প, পর্যটন এবং অবকাঠামো বিনিয়োগের বিষয়ে বাস্তব অগ্রগতি হয়, তাহলে এই সফর অর্থবহ হবে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন আর শুধু কূটনৈতিক সৌজন্যের বিষয় হতে পারে না। এখন প্রতিটি সফরের অর্থনৈতিক হিসাব থাকতে হবে। কোন দেশে গেলাম, কাকে দেখলাম, কী ছবি তুললাম- এসবের বাইরে প্রশ্ন হবে : কী পেলাম? কত বিনিয়োগ এলো? কত কর্মসংস্থান তৈরি হলো? কত দরজা খুলল?

৪. প্রতিক্রিয়া নয়, পুনর্গঠন

রাষ্ট্রেরও মানুষের মতো আবেগ থাকে। কিন্তু পরিণত রাষ্ট্র সেই আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। প্রতিটি কথার জবাব দিতে হয় না, প্রতিটি সমালোচনার পাল্টা বিবৃতি দিতে হয় না, প্রতিটি বিরোধকে যুদ্ধ বানাতে হয় না।

পুনর্গঠন শুরু হয় তখনই, যখন প্রতিক্রিয়া শেষ হয়।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে প্রতিক্রিয়ার রাজনীতিতে অভ্যস্ত। কেউ কিছু বললে সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা কথা। কেউ প্রশ্ন তুললে সন্দেহ। কেউ ভিন্নমত দিলে শত্রুতা। ফলে আমরা নীতি নিয়ে যতটা ভাবি, শব্দ নিয়ে তার চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করি।

কিন্তু আসল শক্তি কখনো খুব শব্দ করে না। আসল শক্তি গড়ে ওঠে সংযমে, শৃঙ্খলায়, প্রস্তুতিতে। ইটের পর ইট বসিয়ে যেমন ভবন তৈরি হয়, তেমনি সংস্কারও তৈরি হয় ধৈর্য, পরিকল্পনা ও ধারাবাহিকতায়।

আজ বাংলাদেশের প্রয়োজন হলো নিজের শক্তিকে সঠিক জায়গায় ব্যবহার করা। সব বিতর্কে শক্তি খরচ করলে বিনিয়োগ সংস্কার হবে না। সব রাজনৈতিক শব্দে ডুবে গেলে জাতিসংঘের সুযোগ কাজে লাগবে না। সব প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে শত্রুতা বানালে পররাষ্ট্রনীতি ভারসাম্য হারাবে।

দূরত্ব সব সময় শীতলতা নয়; কখনো কখনো তা পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও তাই। অপ্রয়োজনীয় শব্দ, বিভ্রান্তি, ক্ষোভ ও আত্মপ্রদর্শন থেকে দূরে সরে এসে যদি বাংলাদেশ নিজেকে পুনর্গঠন করতে পারে, তাহলে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিণতি।

শেষ কথা

এই সপ্তাহের চারটি বিষয় আলাদা মনে হলেও আসলে একই সুতোয় বাঁধা। বিদেশি বিনিয়োগ আমাদের বলে- আস্থা ছাড়া অর্থনীতি এগোয় না। জাতিসংঘের মঞ্চ আমাদের বলে- মর্যাদা পেলে দায়িত্বও নিতে হয়। মালয়েশিয়া সফর আমাদের বলে- পররাষ্ট্রনীতি এখন অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ। আর পুনর্গঠনের দর্শন আমাদের বলে- শব্দ কমিয়ে কাজ বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কি আবার প্রতিক্রিয়ার পুরোনো রাজনীতিতে ফিরে যাব, নাকি শৃঙ্খলিত পুনর্গঠনের পথে হাঁটব?

বিনিয়োগকারীকে আনতে হলে রাষ্ট্রকে বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে নেতৃত্ব দিতে হলে কথার সঙ্গে কাজ মিলতে হবে। বিদেশ সফরকে অর্থবহ করতে হলে ফলাফল আনতে হবে। আর রাজনৈতিক স্থিতি আনতে হলে আমাদের প্রতিক্রিয়া নয়, সংযম শিখতে হবে।

শেষ পর্যন্ত মর্যাদা আসে না উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা থেকে। মর্যাদা আসে ধারাবাহিকতা থেকে।  আস্থা আসে না প্রচারণা থেকে। আস্থা আসে অভিজ্ঞতা থেকে। আর শক্তি আসে না শব্দ থেকে। শক্তি আসে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা থেকে।

বাংলাদেশ যদি এই মুহূর্তে নিজেকে নতুনভাবে গুছিয়ে নিতে পারে, তাহলে পতনও হতে পারে পুনরারম্ভের ভাষা, সংকটও হতে পারে সংস্কারের সুযোগ।

কারণ রাষ্ট্রেরও একদিন নিজের ভিতরে শান্তির প্রজাতন্ত্র গড়তে হয়। আর সেই প্রজাতন্ত্রের প্রথম আইন খুব সহজ : কম বলো, বেশি করো।

লেখক :  প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ