১. বিনিয়োগ আসে আশ্বাসে নয়, আস্থায়
বাংলাদেশ নিয়ে আজকাল একধরনের অদ্ভুত দ্বৈত ছবি দেখা যায়। একদিকে আমরা বলি- দেশে সম্ভাবনা আছে, শ্রমশক্তি আছে, বাজার আছে, ভৌগোলিক সুবিধা আছে। অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যখন বাস্তবে আসতে চান, তখন তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে যায় অনুমোদনের জট, নীতির অনিশ্চয়তা, কর ও শুল্কের জটিলতা, ব্যাংকিং সমস্যার চাপ, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার অসুবিধা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট, বন্দরের ধীরগতি এবং চুক্তি বাস্তবায়নের ভরসাহীনতা।
বিনিয়োগকারীরা কবিতা শুনতে আসেন না; তাঁরা হিসাব দেখতে আসেন। তাঁরা রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়, নীতির ধারাবাহিকতা চান। তাঁরা সম্ভাবনার গল্প নয়, বাস্তব সুবিধা চান। বাংলাদেশ বহু বছর ধরে সম্ভাবনার দেশ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু শুধু সম্ভাবনা দিয়ে আর কত দিন চলবে?
আমরা অনেক সময় ভাবি, বিদেশি বিনিয়োগ মানে বিদেশিদের দয়া। আসলে তা নয়। বিনিয়োগ একটি প্রতিযোগিতা। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন- সবাই একই বিনিয়োগকারীর দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। যে দেশ দ্রুত সিদ্ধান্ত দিতে পারে, নীতি স্থির রাখতে পারে, দুর্নীতি কমাতে পারে, অবকাঠামো নিশ্চিত করতে পারে, সেই দেশই এগিয়ে যায়।
বাংলাদেশের সমস্যা সম্ভাবনার অভাব নয়; বাস্তবায়নের অভাব। এখানে বড় বড় ঘোষণা হয়, কিন্তু ছোট ছোট অনুমোদনে মাস কেটে যায়। এখানে ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের কথা বলা হয়, কিন্তু বিনিয়োগকারীকে বহু দরজায় ঘুরতে হয়। এখানে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি আছে, কিন্তু প্রশাসনিক অভ্যাসে পরিবর্তন কম।
বিদেশি বিনিয়োগ আনার জন্য সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন হলো সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা। বিনিয়োগকারী যখন বুঝবেন, নিয়ম হঠাৎ বদলাবে না, ফাইল অকারণে আটকে থাকবে না, ব্যাংকিং ব্যবস্থা কাজ করবে, মুনাফা পাঠানো যাবে, বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, আদালত বা সালিশে ন্যায়সংগত সমাধান মিলবে- তখন তিনি আসবেন।
দেশে এখন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এই সময়ে যদি অর্থনৈতিক সংস্কারকে সত্যিকার অগ্রাধিকার দেওয়া যায়, তাহলে বাংলাদেশ নতুন করে বিনিয়োগের মানচিত্রে জায়গা করে নিতে পারে। কিন্তু যদি আমরা শুধু স্লোগান, সম্মেলন, ছবি তোলা এবং বক্তৃতার মধ্যে আটকে থাকি, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগও আমাদের মতো ধৈর্য হারাবে।
২. জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের উত্থান
বাংলাদেশ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে আবার বসতে যাচ্ছে, নিঃসন্দেহে এটি বড় কূটনৈতিক অর্জন। চার দশক পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে ১৯৮৬ সালে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
এই অর্জনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব আছে। বিশ্ব এখন এক জটিল সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজাসংকট, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা, চীন-আমেরিকা প্রতিযোগিতা- সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা অস্থির। এই সময়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ শুধু আনুষ্ঠানিক বক্তৃতার মঞ্চ নয়; এটি ছোট ও মধ্যম শক্তির রাষ্ট্রগুলোর জন্য নৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থান তৈরির জায়গা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ এই সুযোগকে কীভাবে ব্যবহার করবে?
আমরা কি শুধু গর্ব করব যে বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি সভাপতি হয়েছেন, নাকি এই মঞ্চকে ব্যবহার করে জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়ন অর্থায়ন, শান্তিরক্ষা, অভিবাসন, ঋণসংকট এবং বৈশ্বিক বৈষম্য নিয়ে নেতৃত্ব দেব?
বাংলাদেশের জন্য এটি সম্মানের পাশাপাশি পরীক্ষা। কারণ আন্তর্জাতিক মঞ্চে মর্যাদা পাওয়া সহজ নয়, ধরে রাখা আরও কঠিন। জাতিসংঘে সভাপতির আসন আমাদের সামনে একটি জানালা খুলে দিয়েছে। কিন্তু জানালা খোলা থাকলেই বাতাস ঢোকে না; ঘরের ভিতরও প্রস্তুতি থাকতে হয়।
বাংলাদেশকে এখন দেখাতে হবে, সে শুধু ভোট জিততে পারে না, ধারণাও দিতে পারে। শুধু কূটনৈতিক সমর্থন আদায় করতে পারে না, বৈশ্বিক আলোচনায় অর্থবহ অবদানও রাখতে পারে।
৩. তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর : বার্তা কোথায়?
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন। এটি শুধু একটি সফর নয়; এর মধ্যে নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির একটি বার্তা আছে।
অনেকে ভেবেছিলেন, প্রথম সফর হয়তো ভারত, চীন বা সৌদি আরবে হতে পারে। কিন্তু মালয়েশিয়া বেছে নেওয়া একটি কৌশলগত ভারসাম্যের ইঙ্গিত দেয়। ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতামূলক ভূরাজনীতির মধ্যে বাংলাদেশ যেন সরাসরি কোনো শিবিরে দাঁড়ানোর বার্তা না দেয়, এই হিসাবও এখানে থাকতে পারে।
মালয়েশিয়া বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারণে। প্রথমত সেখানে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী কাজ করেন। তাঁদের রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির জন্য জরুরি। দ্বিতীয়ত মালয়েশিয়া একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, অর্থনৈতিকভাবে গতিশীল, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় রাষ্ট্র। তৃতীয়ত বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক আরও বাড়ানোর সুযোগ আছে।
কিন্তু সফর সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে ছবি ও প্রটোকলের ওপর নয়; ফলাফলের ওপর।
প্রধানমন্ত্রীর সফরে যদি শ্রমবাজারের নিরাপত্তা, অভিবাসী কর্মীদের মর্যাদা, বিনিয়োগ সহযোগিতা, প্রযুক্তি ও শিক্ষা বিনিময়, হালাল শিল্প, পর্যটন এবং অবকাঠামো বিনিয়োগের বিষয়ে বাস্তব অগ্রগতি হয়, তাহলে এই সফর অর্থবহ হবে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন আর শুধু কূটনৈতিক সৌজন্যের বিষয় হতে পারে না। এখন প্রতিটি সফরের অর্থনৈতিক হিসাব থাকতে হবে। কোন দেশে গেলাম, কাকে দেখলাম, কী ছবি তুললাম- এসবের বাইরে প্রশ্ন হবে : কী পেলাম? কত বিনিয়োগ এলো? কত কর্মসংস্থান তৈরি হলো? কত দরজা খুলল?
৪. প্রতিক্রিয়া নয়, পুনর্গঠন
রাষ্ট্রেরও মানুষের মতো আবেগ থাকে। কিন্তু পরিণত রাষ্ট্র সেই আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। প্রতিটি কথার জবাব দিতে হয় না, প্রতিটি সমালোচনার পাল্টা বিবৃতি দিতে হয় না, প্রতিটি বিরোধকে যুদ্ধ বানাতে হয় না।
পুনর্গঠন শুরু হয় তখনই, যখন প্রতিক্রিয়া শেষ হয়।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে প্রতিক্রিয়ার রাজনীতিতে অভ্যস্ত। কেউ কিছু বললে সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা কথা। কেউ প্রশ্ন তুললে সন্দেহ। কেউ ভিন্নমত দিলে শত্রুতা। ফলে আমরা নীতি নিয়ে যতটা ভাবি, শব্দ নিয়ে তার চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করি।
কিন্তু আসল শক্তি কখনো খুব শব্দ করে না। আসল শক্তি গড়ে ওঠে সংযমে, শৃঙ্খলায়, প্রস্তুতিতে। ইটের পর ইট বসিয়ে যেমন ভবন তৈরি হয়, তেমনি সংস্কারও তৈরি হয় ধৈর্য, পরিকল্পনা ও ধারাবাহিকতায়।
আজ বাংলাদেশের প্রয়োজন হলো নিজের শক্তিকে সঠিক জায়গায় ব্যবহার করা। সব বিতর্কে শক্তি খরচ করলে বিনিয়োগ সংস্কার হবে না। সব রাজনৈতিক শব্দে ডুবে গেলে জাতিসংঘের সুযোগ কাজে লাগবে না। সব প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে শত্রুতা বানালে পররাষ্ট্রনীতি ভারসাম্য হারাবে।
দূরত্ব সব সময় শীতলতা নয়; কখনো কখনো তা পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও তাই। অপ্রয়োজনীয় শব্দ, বিভ্রান্তি, ক্ষোভ ও আত্মপ্রদর্শন থেকে দূরে সরে এসে যদি বাংলাদেশ নিজেকে পুনর্গঠন করতে পারে, তাহলে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিণতি।
শেষ কথা
এই সপ্তাহের চারটি বিষয় আলাদা মনে হলেও আসলে একই সুতোয় বাঁধা। বিদেশি বিনিয়োগ আমাদের বলে- আস্থা ছাড়া অর্থনীতি এগোয় না। জাতিসংঘের মঞ্চ আমাদের বলে- মর্যাদা পেলে দায়িত্বও নিতে হয়। মালয়েশিয়া সফর আমাদের বলে- পররাষ্ট্রনীতি এখন অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ। আর পুনর্গঠনের দর্শন আমাদের বলে- শব্দ কমিয়ে কাজ বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কি আবার প্রতিক্রিয়ার পুরোনো রাজনীতিতে ফিরে যাব, নাকি শৃঙ্খলিত পুনর্গঠনের পথে হাঁটব?
বিনিয়োগকারীকে আনতে হলে রাষ্ট্রকে বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে নেতৃত্ব দিতে হলে কথার সঙ্গে কাজ মিলতে হবে। বিদেশ সফরকে অর্থবহ করতে হলে ফলাফল আনতে হবে। আর রাজনৈতিক স্থিতি আনতে হলে আমাদের প্রতিক্রিয়া নয়, সংযম শিখতে হবে।
শেষ পর্যন্ত মর্যাদা আসে না উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা থেকে। মর্যাদা আসে ধারাবাহিকতা থেকে। আস্থা আসে না প্রচারণা থেকে। আস্থা আসে অভিজ্ঞতা থেকে। আর শক্তি আসে না শব্দ থেকে। শক্তি আসে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা থেকে।
বাংলাদেশ যদি এই মুহূর্তে নিজেকে নতুনভাবে গুছিয়ে নিতে পারে, তাহলে পতনও হতে পারে পুনরারম্ভের ভাষা, সংকটও হতে পারে সংস্কারের সুযোগ।
কারণ রাষ্ট্রেরও একদিন নিজের ভিতরে শান্তির প্রজাতন্ত্র গড়তে হয়। আর সেই প্রজাতন্ত্রের প্রথম আইন খুব সহজ : কম বলো, বেশি করো।
লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ




