• ই-পেপার

প্রবীণদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চাই

শব্দের চেয়ে কাজে ফিরুক বাংলাদেশ

জিল্লুর রহমান
শব্দের চেয়ে কাজে ফিরুক বাংলাদেশ

১. বিনিয়োগ আসে আশ্বাসে নয়, আস্থায়

বাংলাদেশ নিয়ে আজকাল একধরনের অদ্ভুত দ্বৈত ছবি দেখা যায়। একদিকে আমরা বলি- দেশে সম্ভাবনা আছে, শ্রমশক্তি আছে, বাজার আছে, ভৌগোলিক সুবিধা আছে। অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যখন বাস্তবে আসতে চান, তখন তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে যায় অনুমোদনের জট, নীতির অনিশ্চয়তা, কর ও শুল্কের জটিলতা, ব্যাংকিং সমস্যার চাপ, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার অসুবিধা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট, বন্দরের ধীরগতি এবং চুক্তি বাস্তবায়নের ভরসাহীনতা।

বিনিয়োগকারীরা কবিতা শুনতে আসেন না; তাঁরা হিসাব দেখতে আসেন। তাঁরা রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়, নীতির ধারাবাহিকতা চান। তাঁরা সম্ভাবনার গল্প নয়, বাস্তব সুবিধা চান। বাংলাদেশ বহু বছর ধরে সম্ভাবনার দেশ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু শুধু সম্ভাবনা দিয়ে আর কত দিন চলবে?

আমরা অনেক সময় ভাবি, বিদেশি বিনিয়োগ মানে বিদেশিদের দয়া। আসলে তা নয়। বিনিয়োগ একটি প্রতিযোগিতা। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন- সবাই একই বিনিয়োগকারীর দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। যে দেশ দ্রুত সিদ্ধান্ত দিতে পারে, নীতি স্থির রাখতে পারে, দুর্নীতি কমাতে পারে, অবকাঠামো নিশ্চিত করতে পারে, সেই দেশই এগিয়ে যায়।

বাংলাদেশের সমস্যা সম্ভাবনার অভাব নয়; বাস্তবায়নের অভাব। এখানে বড় বড় ঘোষণা হয়, কিন্তু ছোট ছোট অনুমোদনে মাস কেটে যায়। এখানে ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের কথা বলা হয়, কিন্তু বিনিয়োগকারীকে বহু দরজায় ঘুরতে হয়। এখানে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি আছে, কিন্তু প্রশাসনিক অভ্যাসে পরিবর্তন কম।

বিদেশি বিনিয়োগ আনার জন্য সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন হলো সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা। বিনিয়োগকারী যখন বুঝবেন, নিয়ম হঠাৎ বদলাবে না, ফাইল অকারণে আটকে থাকবে না, ব্যাংকিং ব্যবস্থা কাজ করবে, মুনাফা পাঠানো যাবে, বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, আদালত বা সালিশে ন্যায়সংগত সমাধান মিলবে- তখন তিনি আসবেন।

দেশে এখন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এই সময়ে যদি অর্থনৈতিক সংস্কারকে সত্যিকার অগ্রাধিকার দেওয়া যায়, তাহলে বাংলাদেশ নতুন করে বিনিয়োগের মানচিত্রে জায়গা করে নিতে পারে। কিন্তু যদি আমরা শুধু স্লোগান, সম্মেলন, ছবি তোলা এবং বক্তৃতার মধ্যে আটকে থাকি, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগও আমাদের মতো ধৈর্য হারাবে।

২. জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের উত্থান

বাংলাদেশ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে আবার বসতে যাচ্ছে, নিঃসন্দেহে এটি বড় কূটনৈতিক অর্জন। চার দশক পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে ১৯৮৬ সালে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

এই অর্জনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব আছে। বিশ্ব এখন এক জটিল সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজাসংকট, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা, চীন-আমেরিকা প্রতিযোগিতা- সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা অস্থির। এই সময়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ শুধু আনুষ্ঠানিক বক্তৃতার মঞ্চ নয়; এটি ছোট ও মধ্যম শক্তির রাষ্ট্রগুলোর জন্য নৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থান তৈরির জায়গা।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ এই সুযোগকে কীভাবে ব্যবহার করবে?

আমরা কি শুধু গর্ব করব যে বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি সভাপতি হয়েছেন, নাকি এই মঞ্চকে ব্যবহার করে জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়ন অর্থায়ন, শান্তিরক্ষা, অভিবাসন, ঋণসংকট এবং বৈশ্বিক বৈষম্য নিয়ে নেতৃত্ব দেব?

বাংলাদেশের জন্য এটি সম্মানের পাশাপাশি পরীক্ষা। কারণ আন্তর্জাতিক মঞ্চে মর্যাদা পাওয়া সহজ নয়, ধরে রাখা আরও কঠিন। জাতিসংঘে সভাপতির আসন আমাদের সামনে একটি জানালা খুলে দিয়েছে। কিন্তু জানালা খোলা থাকলেই বাতাস ঢোকে না; ঘরের ভিতরও প্রস্তুতি থাকতে হয়।

বাংলাদেশকে এখন দেখাতে হবে, সে শুধু ভোট জিততে পারে না, ধারণাও দিতে পারে। শুধু কূটনৈতিক সমর্থন আদায় করতে পারে না, বৈশ্বিক আলোচনায় অর্থবহ অবদানও রাখতে পারে।

৩. তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর : বার্তা কোথায়?

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন। এটি শুধু একটি সফর নয়; এর মধ্যে নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির একটি বার্তা আছে।

অনেকে ভেবেছিলেন, প্রথম সফর হয়তো ভারত, চীন বা সৌদি আরবে হতে পারে। কিন্তু মালয়েশিয়া বেছে নেওয়া একটি কৌশলগত ভারসাম্যের ইঙ্গিত দেয়। ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতামূলক ভূরাজনীতির মধ্যে বাংলাদেশ যেন সরাসরি কোনো শিবিরে দাঁড়ানোর বার্তা না দেয়, এই হিসাবও এখানে থাকতে পারে।

মালয়েশিয়া বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারণে। প্রথমত সেখানে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী কাজ করেন। তাঁদের রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির জন্য জরুরি। দ্বিতীয়ত মালয়েশিয়া একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, অর্থনৈতিকভাবে গতিশীল, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় রাষ্ট্র। তৃতীয়ত বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক আরও বাড়ানোর সুযোগ আছে।

কিন্তু সফর সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে ছবি ও প্রটোকলের ওপর নয়; ফলাফলের ওপর।

প্রধানমন্ত্রীর সফরে যদি শ্রমবাজারের নিরাপত্তা, অভিবাসী কর্মীদের মর্যাদা, বিনিয়োগ সহযোগিতা, প্রযুক্তি ও শিক্ষা বিনিময়, হালাল শিল্প, পর্যটন এবং অবকাঠামো বিনিয়োগের বিষয়ে বাস্তব অগ্রগতি হয়, তাহলে এই সফর অর্থবহ হবে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন আর শুধু কূটনৈতিক সৌজন্যের বিষয় হতে পারে না। এখন প্রতিটি সফরের অর্থনৈতিক হিসাব থাকতে হবে। কোন দেশে গেলাম, কাকে দেখলাম, কী ছবি তুললাম- এসবের বাইরে প্রশ্ন হবে : কী পেলাম? কত বিনিয়োগ এলো? কত কর্মসংস্থান তৈরি হলো? কত দরজা খুলল?

৪. প্রতিক্রিয়া নয়, পুনর্গঠন

রাষ্ট্রেরও মানুষের মতো আবেগ থাকে। কিন্তু পরিণত রাষ্ট্র সেই আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। প্রতিটি কথার জবাব দিতে হয় না, প্রতিটি সমালোচনার পাল্টা বিবৃতি দিতে হয় না, প্রতিটি বিরোধকে যুদ্ধ বানাতে হয় না।

পুনর্গঠন শুরু হয় তখনই, যখন প্রতিক্রিয়া শেষ হয়।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে প্রতিক্রিয়ার রাজনীতিতে অভ্যস্ত। কেউ কিছু বললে সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা কথা। কেউ প্রশ্ন তুললে সন্দেহ। কেউ ভিন্নমত দিলে শত্রুতা। ফলে আমরা নীতি নিয়ে যতটা ভাবি, শব্দ নিয়ে তার চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করি।

কিন্তু আসল শক্তি কখনো খুব শব্দ করে না। আসল শক্তি গড়ে ওঠে সংযমে, শৃঙ্খলায়, প্রস্তুতিতে। ইটের পর ইট বসিয়ে যেমন ভবন তৈরি হয়, তেমনি সংস্কারও তৈরি হয় ধৈর্য, পরিকল্পনা ও ধারাবাহিকতায়।

আজ বাংলাদেশের প্রয়োজন হলো নিজের শক্তিকে সঠিক জায়গায় ব্যবহার করা। সব বিতর্কে শক্তি খরচ করলে বিনিয়োগ সংস্কার হবে না। সব রাজনৈতিক শব্দে ডুবে গেলে জাতিসংঘের সুযোগ কাজে লাগবে না। সব প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে শত্রুতা বানালে পররাষ্ট্রনীতি ভারসাম্য হারাবে।

দূরত্ব সব সময় শীতলতা নয়; কখনো কখনো তা পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও তাই। অপ্রয়োজনীয় শব্দ, বিভ্রান্তি, ক্ষোভ ও আত্মপ্রদর্শন থেকে দূরে সরে এসে যদি বাংলাদেশ নিজেকে পুনর্গঠন করতে পারে, তাহলে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিণতি।

শেষ কথা

এই সপ্তাহের চারটি বিষয় আলাদা মনে হলেও আসলে একই সুতোয় বাঁধা। বিদেশি বিনিয়োগ আমাদের বলে- আস্থা ছাড়া অর্থনীতি এগোয় না। জাতিসংঘের মঞ্চ আমাদের বলে- মর্যাদা পেলে দায়িত্বও নিতে হয়। মালয়েশিয়া সফর আমাদের বলে- পররাষ্ট্রনীতি এখন অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ। আর পুনর্গঠনের দর্শন আমাদের বলে- শব্দ কমিয়ে কাজ বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কি আবার প্রতিক্রিয়ার পুরোনো রাজনীতিতে ফিরে যাব, নাকি শৃঙ্খলিত পুনর্গঠনের পথে হাঁটব?

বিনিয়োগকারীকে আনতে হলে রাষ্ট্রকে বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে নেতৃত্ব দিতে হলে কথার সঙ্গে কাজ মিলতে হবে। বিদেশ সফরকে অর্থবহ করতে হলে ফলাফল আনতে হবে। আর রাজনৈতিক স্থিতি আনতে হলে আমাদের প্রতিক্রিয়া নয়, সংযম শিখতে হবে।

শেষ পর্যন্ত মর্যাদা আসে না উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা থেকে। মর্যাদা আসে ধারাবাহিকতা থেকে।  আস্থা আসে না প্রচারণা থেকে। আস্থা আসে অভিজ্ঞতা থেকে। আর শক্তি আসে না শব্দ থেকে। শক্তি আসে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা থেকে।

বাংলাদেশ যদি এই মুহূর্তে নিজেকে নতুনভাবে গুছিয়ে নিতে পারে, তাহলে পতনও হতে পারে পুনরারম্ভের ভাষা, সংকটও হতে পারে সংস্কারের সুযোগ।

কারণ রাষ্ট্রেরও একদিন নিজের ভিতরে শান্তির প্রজাতন্ত্র গড়তে হয়। আর সেই প্রজাতন্ত্রের প্রথম আইন খুব সহজ : কম বলো, বেশি করো।

লেখক :  প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ

সরকারের ১০০ দিন : প্রধানমন্ত্রীর অর্জন ও জনগণের প্রত্যাশা

ড. মো. মিজানুর রহমান
সরকারের ১০০ দিন : প্রধানমন্ত্রীর অর্জন ও জনগণের প্রত্যাশা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি : পিএমও

যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনকে কেবল একটি প্রশাসনিক সময়কাল হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটি সরকারের রাজনৈতিক দর্শন, নেতৃত্বের ধরন, রাষ্ট্র পরিচালনার অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার একটি প্রাথমিক নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সময়ে জনগণ সাধারণত নতুন নেতৃত্বের মধ্যে তাদের প্রত্যাশার প্রতিফলন খুঁজে পায় এবং মূল্যায়ন করে যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, রাজনৈতিক বক্তব্য ও বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্যে কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক মেরুকরণ, প্রশাসনিক জটিলতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা চলে আসছে, সেখানে প্রথম ১০০ দিন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এই সময়ের কর্মকাণ্ডে অনেকের কাছে রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন ধারা, অগ্রাধিকার ও রাজনৈতিক বার্তা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে, যা ভবিষ্যতের জন্য আশাবাদের ভিত্তি তৈরি করেছে।

এই ১০০ দিনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের ব্যক্তিগত আচরণ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তুলনামূলক সংযম ও সরলতার প্রবণতা অনেকের নজর কেড়েছে। অতীতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতা প্রায়ই ব্যক্তিপূজা, অতিরিক্ত প্রচার, নিরাপত্তা প্রদর্শন এবং প্রটোকলনির্ভর শাসনের সঙ্গে জড়িত ছিল। সেই তুলনায় নতুন নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রচারণার পরিবর্তে প্রশাসনিক কাজ, নীতিগত সিদ্ধান্ত ও জনসম্পৃক্ততাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র যে জনগণের, সেই বার্তাই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় সাশ্রয়, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় অপচয় কমানোর লক্ষ্যে গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ জনগণের মধ্যে আশাবাদের সঞ্চার করেছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের মানুষ রাষ্ট্রের অর্থ অপচয়, অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর, বিলাসবহুল সরকারি ব্যয় এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এসেছে। সেই প্রেক্ষাপটে ব্যয়সংকোচন, জবাবদিহিতা ও দক্ষতাভিত্তিক প্রশাসন গড়ে তোলার প্রচেষ্টাকে অনেকেই ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখছেন। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, এই মানসিকতার পেছনে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অভিজ্ঞতার গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। তিনি এমন একটি রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে উঠেছেন, যার ইতিহাস বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতন, ক্ষমতার পরিবর্তন, আন্দোলন-সংগ্রাম, নির্বাসন, মামলা-মোকদ্দমা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ফলে শৈশব থেকেই তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার উত্থান-পতন, রাজনৈতিক সংকট, জনআকাঙ্ক্ষা এবং নেতৃত্বের বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন।

অনেকের মতে, পারিবারিক ট্র্যাজেডি, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাত, প্রবাসজীবন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং নানা প্রতিকূল অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে অবস্থান করে দীর্ঘ সময় দেশ ও রাজনীতিকে পর্যবেক্ষণ করার অভিজ্ঞতা তাকে রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা সম্পর্কে আরও বাস্তববাদী ও সচেতন করে তুলেছে। সমর্থকদের একটি অংশ মনে করেন, এসব অভিজ্ঞতা তাঁকে ক্ষমতার বাহ্যিক চাকচিক্য, ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রচারণা বা আনুষ্ঠানিক জাঁকজমকের চেয়ে প্রশাসনিক কার্যকারিতা, জনকল্যাণ এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানে বেশি মনোযোগী করেছে। প্রথম ১০০ দিনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সেই অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক পরিপক্বতার প্রতিফলন দেখা গেছে বলেই অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন।

প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও কর্মচাঞ্চল্য ও জবাবদিহি বৃদ্ধির প্রচেষ্টা লক্ষ করা গেছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে সংসদই জনগণের প্রতিনিধিত্ব ও জবাবদিহির প্রধান মঞ্চ। সেই বিবেচনায় সংসদীয় কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণ, কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিতি এবং প্রশাসনিক কাজের সরাসরি তদারকি ইতিবাচকভাবে আলোচিত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো ধীরগতি, ফাইলজট, সিদ্ধান্তহীনতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সমালোচনার মুখে ছিল। এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী নেতৃত্বের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা প্রশাসনকে আরো কার্যকর ও কর্মমুখী করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর জোর দেওয়ার ফলে প্রশাসনকে জনসেবামুখী করার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের স্থায়িত্ব নির্ভর করবে এগুলো কতটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় তার ওপর, কারণ দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের অগ্রগতি ব্যক্তি নয়, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল।

মানবিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও কিছু উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন দুর্ঘটনা, অপরাধ এবং সামাজিক ট্র্যাজেডির শিকার পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো, তাদের কথা শোনা এবং ন্যায়বিচারের আশ্বাস দেওয়ার ঘটনাগুলো রাষ্ট্রের মানবিক চেহারাকে সামনে এনেছে। অনেক সময় ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে রাষ্ট্র তাদের কষ্টকে স্বীকার করছে—এই অনুভূতি। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে সমবেদনা জানানো এবং বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার জনগণের মধ্যে আস্থা বাড়িয়েছে। দীর্ঘদিনের বিচারহীনতা ও মামলার দীর্ঘসূত্রতার বাস্তবতায় এই প্রতিশ্রুতি একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের প্রত্যাশাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমাত্রিক কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় কোনো রাষ্ট্র এককভাবে চলতে পারে না; বরং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা অপরিহার্য। ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সহযোগিতাও জাতীয় স্বার্থের জন্য প্রয়োজনীয়। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার, মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগকে অনেকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে তুরস্ক, পাকিস্তান, চীনসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টাকে বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব এবং আঞ্চলিক পরিবর্তনশীল বাস্তবতা বিবেচনায় আধুনিক ও সক্ষম সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলা সময়ের দাবি। আধুনিকায়ন, প্রশিক্ষণ উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির আলোচনা জাতীয় নিরাপত্তাকে নতুনভাবে গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত বহন করে। একই সঙ্গে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর ভূমিকা শুধু প্রতিরক্ষায় নয়; দুর্যোগ মোকাবিলা, শান্তিরক্ষা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে প্রথম ১০০ দিনে কিছু ইতিবাচক প্রবণতা ও উদ্যোগ জনগণের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে জনগণের প্রত্যাশা কেবল সূচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তারা ধারাবাহিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক রূপ এবং দীর্ঘমেয়াদি বাস্তব ফলাফল দেখতে চায়। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সাময়িক জনপ্রিয়তা নয়; বরং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, সুশাসন, জবাবদিহিতা, মানবিকতা এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক নীতিই একটি দেশকে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। তাই এই ইতিবাচক বার্তাগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রগঠনের ভিত্তিতে রূপান্তরিত করতে পারলেই এই সময়কাল ভবিষ্যতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

জনগণের প্রত্যাশা
বাংলাদেশের জনগণ দীর্ঘদিন ধরেই একটি গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ এবং জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা করে আসছে। প্রতিটি নতুন সরকারকে ঘিরে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা থাকে যে দেশ আরও উন্নত, স্থিতিশীল এবং সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে। আগামী দিনের সরকারের প্রতিও জনগণের প্রত্যাশা এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলা, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও জাতীয় স্বার্থ হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

জনগণ আশা করে যে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং যোগ্যতাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ গুরুত্বপূর্ণ সব ক্ষেত্রে মেধা, দক্ষতা এবং সততাকে প্রধান বিবেচনায় এনে এমন একটি সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা হবে, যেখানে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে যোগ্যতা অধিক গুরুত্ব পাবে। এর মাধ্যমে জনগণের আস্থা আরো সুদৃঢ় হবে এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘ মেয়াদে আরো শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হবে।

একই সঙ্গে জনগণ একটি কার্যকর ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, শক্তিশালী আইনের শাসন এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন প্রত্যাশা করে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের বিশ্বাস আরও বৃদ্ধি পাবে। জনগণের প্রত্যাশা, আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে এবং কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করবে না।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি আগামী দিনের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বলে জনগণ মনে করে। দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য। জনগণ বিশ্বাস করে, একটি শক্তিশালী অর্থনীতিই রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি রচনা করে।

ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের প্রতিও জনগণের প্রত্যাশা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা আশা করে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দক্ষ, অভিজ্ঞ ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব নিশ্চিত করা হবে এবং দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্বলতা কাটিয়ে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও আস্থাভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। এর ফলে বিনিয়োগ, সঞ্চয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্ষেত্রেও জনগণের প্রত্যাশা স্পষ্ট। তারা এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চায়, যেখানে নাগরিকরা নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবে, ব্যবসা-বাণিজ্য নির্বিঘ্নে পরিচালিত হবে এবং অপরাধ দমনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আরও আধুনিক, দক্ষ ও জনবান্ধব ভূমিকা পালন করবে। একই সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে কৃত্রিম সংকট, অসাধু সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজির মতো সমস্যাগুলো কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে—এমন প্রত্যাশাও জনগণের রয়েছে।

সংস্কারের প্রশ্নে জনগণ একটি সুস্পষ্ট, বাস্তবসম্মত এবং সময়োপযোগী রোডম্যাপ দেখতে চায়। রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে যে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হয়ে আসছে, সেগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে আরও কার্যকর, আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে—এটাই মানুষের প্রত্যাশা। জনগণ চায় সংস্কার যেন শুধু ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন নিয়ে আসে।
জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নেও মানুষের প্রত্যাশা অত্যন্ত গভীর। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও স্বাধীনতার পক্ষ ও বিপক্ষের বিতর্ককে কেন্দ্র করে জাতিকে বিভক্ত রাখার পরিবর্তে একটি সমন্বিত জাতীয় পরিচয় গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা আজ আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে। একই সময়ে স্বাধীন হওয়া দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনাম জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে উন্নয়নের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বাংলাদেশের জনগণও আশা করে যে অতীতের বিভেদ, বিরোধ ও প্রতিহিংসার রাজনীতি অতিক্রম করে জাতীয় ঐক্য, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তোলা হবে।

একই সঙ্গে জনগণ বিশ্বাস করে যে একটি কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল বিরোধী দলের উপস্থিতি অপরিহার্য। বিরোধী দলকে প্রতিপক্ষ নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করার রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠলে গণতন্ত্র আরও পরিণত হবে। মতপার্থক্যকে সংঘাত হিসেবে না দেখে উন্নয়ন ও নীতিনির্ধারণে বহুমাত্রিক চিন্তার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা গেলে রাষ্ট্র আরও শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে উঠবে।

এককথায়, জনগণের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, বরং প্রতিষ্ঠান-কেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানই একটি দেশকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে পারে। তাই আগামী দিনের সরকারের প্রতি জনগণের আহ্বান—জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ঐক্য, গণতন্ত্র, সুশাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ, আধুনিক ও মর্যাদাবান বাংলাদেশ গড়ে তোলার পথে দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে যাওয়া।

পরিশেষে বলা যায়, জনগণ আগামী দিনের সরকারের কাছে শুধু শাসন নয়, বরং একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, সুশাসন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় ঐক্যের প্রত্যাশা করে। প্রথম দিকের ইতিবাচক উদ্যোগগুলো জনগণের মধ্যে আশার সঞ্চার করলেও সেই আশাকে স্থায়ী আস্থায় রূপ দিতে হলে সংস্কার, জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার এবং জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমে ধারাবাহিক অগ্রগতি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। জনগণ বিশ্বাস করে, যদি সরকারদলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়, যোগ্যতা ও সততার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করে এবং সব নাগরিককে সঙ্গে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গঠনে কাজ করে, তবে দেশ উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও সমৃদ্ধির এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করবে। সেই প্রত্যাশাই আজ বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং আগামী দিনের পথচলার প্রধান প্রেরণা।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
[email protected]

শূন্যরেখায় ঠেলে দেওয়া জীবন

মো. নুরে আলম
শূন্যরেখায় ঠেলে দেওয়া জীবন
সংগৃহীত ছবি

গত ৯ মে শপথ নিয়েই পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির দোর্দণ্ড প্রতাপশালী নেতা শুভেন্দু অধিকারী একটি ঘোষণা দিয়েছিলেন। কথাগুলো খুব ছকে বাঁধা ছিল না, বরং ছিল উসকানিমূলক—‘অনুপ্রবেশকারীদের’ পুলিশ বা আদালতের কাঠগড়ায় নেওয়ার বদলে সরাসরি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হবে। রাজনৈতিক মঞ্চের সেই হুংকারের প্রভাব পড়তে সময় লাগেনি। মে মাসের শেষ সপ্তাহ পেরোতেই আমরা দেখলাম, বিএসএফ নারী-শিশুসহ নানা বয়সের মানুষকে দল বেঁধে ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ বা ‘শূন্যরেখা’য় ঠেলে দিচ্ছে। রাতারাতি যেন শুরু হলো মানুষ খেদানো উৎসব।

বাংলাদেশের সাতক্ষীরা, যশোর, মহেশপুর থেকে শুরু করে উত্তরের ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় কিংবা লালমনিরহাটের সীমান্তগুলোতে এখন টানটান উত্তেজনা। তবে এবার একটা নতুন চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিজিবি কেবল কড়া নজরদারিই করছে না, স্থানীয় সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তুলেছে অভেদ্য এক প্রতিরোধ। গত কয়েক দিনেই, বিশেষ করে জুনের প্রথম সপ্তাহে অন্তত ১০ থেকে ১৫টি বড় ধরনের পুশ ইনের অপচেষ্টা রুখে দিয়েছে বিজিবি। শূন্যরেখায় দাঁড়িয়ে থাকা হতভাগ্য মানুষগুলোকে হয় বিএসএফ বাধ্য হয়ে ফিরিয়ে নিয়েছে, নয়তো বিজিবির ‘পুশ ব্যাক’-এর মুখে পড়েছে।

কিন্তু এই ‘পুশ ইন’ তো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এ এক পুরোনো রাজনৈতিক ব্যাধির পুনরাবৃত্তি। ১৯৯৮ সালে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট যখন ক্ষমতায় এলো, তখন থেকেই এই অমানবিক খেলা শুরু। ২০০২-০৩ সালে সেটা রূপ নিয়েছিল চরম উন্মাদনায়, জন্ম হয়েছিল ‘পুশ ইন’ শব্দটির। সেবার রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে শূন্যরেখায় পড়ে থাকা মানুষের ছবিগুলো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ঝড় তুলেছিল। এরপর ২০০৪ সালে ইউপিএ জোট আসার পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয় ঠিকই, কিন্তু ২০১৪ সালে এনডিএ এবং ২০১৬ সালে আসামে বিজেপি ক্ষমতায় ফেরার পর এই ছাইচাপা আগুন আবার জ্বলে ওঠে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের আগস্টে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা তো রীতিমতো ঢাকঢোল পিটিয়ে পুশ ইন শুরুর ঘোষণা দিয়েছিলেন।

পরিসংখ্যানের পাতা উল্টালে চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। সংবাদমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের ৭ মে থেকে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ৮ মাসে দেশের ৩২টি জেলার সীমান্ত দিয়ে ২ হাজার ৪৭৯ জনকে ঠেলে পাঠিয়েছে বিএসএফ। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এর মধ্যে অন্তত ১২০ জন ছিলেন জন্মসূত্রে খাঁটি ভারতীয় নাগরিক!

ঘটনা শুধু সংখ্যায় আটকে নেই, মানুষের পরিচয়ের ধরনও পাল্টেছে। গত বছরের মে মাসে পুশ ইনের যে ‘নতুন মাত্রা’ দেখা গেল, তা রীতিমতো ভয়াবহ। আগে সাধারণত বাংলাভাষী মুসলিমদের ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে ঠেলে দেওয়া হতো। এবার তার সঙ্গে যুক্ত হলো মায়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা এবং খোদ ভারতের গুজরাট বা পশ্চিমবঙ্গ থেকে ধরে আনা হতভাগ্য মানুষেরা।

এসব মানুষের পেছনের গল্পগুলো শুনলে সভ্যতার মাথা হেঁট হয়ে আসে। ওড়িশার ৭৩ বছর বয়সী হিন্দিভাষী শেখ আবদুর জব্বার। গত ২৫ ডিসেম্বর কনকনে শীতের রাতে পরিবারের ১৪ জন সদস্যসহ তাকে চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে ঠেলে দেওয়া হয়। একইভাবে গত বছর ২০ আগস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে অন্তঃসত্ত্বা সোনালী বিবিকে স্বামী-সন্তানসহ রাতের আঁধারে পুশ ইন করা হয়। পরে খোদ ভারতীয় আদালতের নির্দেশে ৫ ডিসেম্বর তাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয় ভারত। আর আসামের নলবাড়ীর ৭০-ঊর্ধ্ব সাকিনা বিবির ঘটনা তো পুরো বিশ্বের সামনে ভারতের চরম অমানবিক রূপটা উন্মোচন করে দিয়েছে। থানায় ‘একটা সই’ করার কথা বলে তাকে তুলে নিয়ে গত সেপ্টেম্বরে কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে ঠেলে দেওয়া হয়। এই ৪ জুন (২০২৬) ভারতের ‘স্ক্রোল’ পত্রিকাও প্রতিবেদন ছেপেছে—এক বছর পার হলেও সাকিনা বিবি এখনো ঢাকার কোনো এক বস্তিতে আটকে আছেন, নিজের ভিটামাটিতে ফিরতে পারেননি।

কী অদ্ভুত এক রাষ্ট্রযন্ত্র! নিজের দেশের নাগরিককে কেবল ধর্মীয় বা ভাষাগত পরিচয়ের কারণে রাতের অন্ধকারে অন্য দেশের ঘাড়ের ওপর ফেলে দিচ্ছে। ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত প্রাকৃতিকভাবে কোনো দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর দিয়ে বিভক্ত নয়। একই পরিবারের এক ভাইয়ের বাড়ি ভারতে, অন্য ভাইয়ের বাংলাদেশে—এমন জনপদ এখানে ভূরি ভূরি। সেখানে কেউ অবৈধ যাতায়াত করলে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর বদলে রাষ্ট্র যখন নিজেই ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’-এ ঠেলে দেয়, তখন বুঝতে হবে এর পেছনে আইনি নয়, বরং ঘোরতর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করছে।

ভারতের এই আচরণের কঠোর সমালোচনা করে খোদ তাদেরই স্বনামধন্য ম্যাগাজিন ‘ফ্রন্টলাইন’ লিখেছে, ‘সীমান্ত নিয়ে বাগাড়ম্বর নির্বাচনে জয় এনে দিতে পারে এবং দৃশ্যমান পদক্ষেপের জন্য জনদাবিকে তুষ্ট করতে পারে; কিন্তু বাংলাদেশ নিছক প্রতিবেশী নয়। দেশের অভ্যন্তরে হাততালি কুড়ানোর জন্য প্রান্তজুড়ে অস্থিরতা সৃষ্টির এই সীমান্তনীতি বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে উপেক্ষার ঝুঁকি তৈরি করে।’

কথাটা আক্ষরিক অর্থেই সত্য। পুশ ইনের নামে ভারত আসলে দ্বিগুণ মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। একদিকে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার ক্ষুণ্ন করছে, অন্যদিকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া বাঁধাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতেও বিষয়টি অগ্রহণযোগ্য। জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান অনুযায়ী, ‘কোনো মানুষকে কেবল রাজনৈতিক ফায়দা বা সন্দেহবশত তার ভিটামাটি থেকে উচ্ছেদ করে শূন্যরেখায় ফেলে রাখা চরম মানবতাবিরোধী অপরাধ; রাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্ব রক্ষার নামে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার ও সম্মান কেড়ে নিতে পারে না।’

তাহলে সমাধান কোথায়? অতীত বলছে, কেবল সামরিক প্রতিরোধ দিয়ে এর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বর্তমানের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, অর্থাৎ বিজিবির কড়া নজরদারি ও স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা—অবশ্যই প্রশংসনীয় এবং এটি চালিয়ে যেতে হবে। তবে ভবিষ্যতের সুরক্ষার জন্য আমাদের কূটনৈতিক টেবিলে শক্তভাবে বসতে হবে।

আন্তর্জাতিক মহলকে তথ্য-প্রমাণসহ জানাতে হবে, ভারত কিভাবে দ্বিপক্ষীয় সীমান্ত ব্যবস্থাপনা চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে। পুশ ইনের শিকার হওয়া প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিকের পূর্ণাঙ্গ নথিপত্র জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে তুলে ধরতে হবে। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ও উগ্র জাতীয়তাবাদের বলি যেন বাংলাদেশকে হতে না হয়, সে জন্য ঢাকা-নয়াদিল্লির মধ্যে সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন চাপ প্রয়োগ প্রয়োজন।

প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক হবে সম্মানজনক, গায়ের জোরের নয়। রাতের অন্ধকারে নিরীহ নারী-শিশু আর বৃদ্ধদের সীমান্তে ঠেলে দিয়ে কেউ যদি ভাবে এটা বীরত্ব, তবে বলতে হয়, সেই রাষ্ট্র তার মানবতার শেষ তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এই অমানবিক পুশ ইন অবিলম্বে বন্ধ হোক, সেটাই এখন ভূ-রাজনৈতিক এবং মানবিক—উভয় দিক থেকেই সময়ের দাবি।

লেখক : সাংবাদিক

প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ১০০ দিন

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু
প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ১০০ দিন

বাংলাদেশের সাড়ে তিন মাস বয়সি সরকারের কার্যকাল দেখে সামনে পড়ে থাকা অবশিষ্ট চার বছর সাড়ে আট মাস মেয়াদে তারা কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে, তা সম্পূর্ণ মূল্যায়নের জন্য অত্যন্ত অল্প সময়। শেখ হাসিনার অধীনে কার্যত ব্যক্তিনির্ভর বাংলাদেশে নতুন একটি সরকার যত বিপুল ভোটেই নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করুক না কেন, তাদের যদি মেয়াদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দলীয়, প্রশাসনিক ও বিরোধীদলীয় চাপের মধ্যে কাটাতে হয়, তাহলেও বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকবে না। অতএব তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার গত ফেব্রুয়ারি মাসে রাষ্ট্রক্ষমতার দায়িত্ব নিয়ে যে সামান্য সময় কাটিয়েছে, এর মধ্যে সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতা মূল্যায়নের চেষ্টা অযৌক্তিক। তবে ক্ষমতায় যাওয়ামাত্র সরকার কী করবে, তার বড় ধরনের পূর্বাভাস দেওয়ার উদ্দেশ্যে জনগণের মস্তিষ্কে চাপ সৃষ্টির কাজটি প্রায় প্রতিটি দেশে প্রতিটি নতুন সরকারই করে। চমক দেখাতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করেই ‘১০০ দিনের কর্মসূচি’ ঘোষণা করেন, বাংলাদেশে অতীতে শেখ হাসিনা তা করেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও অনেকটা প্রথামত ‘১০০ দিনের কর্মসূচি’ ঘোষণা করে তা শেষও করেছেন।

বাংলাদেশের মতো ক্ষুদ্র আয়তনের স্বল্পোন্নত দেশের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ১০০ দিনে  মহাশক্তিধর আমেরিকার প্রেসিডেন্টের মতো চমক দেখানো সম্ভব নয় এবং তারেক রহমানও তা দেখাননি। তবে এ সময়ে তিনি বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কিছু কিছু কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন- ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের মাসিক ভাতা, প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্কুল ড্রেস বিতরণসহ আর্থিক প্রণোদনা, স্নাতক পর্যায়ে মেয়েদের বিনা বেতনে অধ্যয়নের সুযোগ, খাল খননসহ বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন। কিন্তু এসব কি উল্লেখ করার মতো কোনো সাফল্য বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সূচনা? এ কথা বললে বোধ হয় দোষণীয় হবে না যে সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমান তাঁর ‘প্রথম ১০০ দিনে’ উল্লেখ করার মতো কিছু দেখাতে পারেননি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অবস্থা শোচনীয়, ব্যাংকিং খাতে সৃষ্ট চরম বিশৃঙ্খলা কাটিয়ে ওঠার কোনো বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ না করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। শিশুহত্যা ও শিশু-ধর্ষণের ঘটনা ভয়াবহ বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশে উচ্চফলনশীল ফসলের উৎপাদনের মতো কয়েক গুণ বেড়েছে চাঁদাবাজি। বিশেষ করে ভোগ্যপণ্য পরিবহনকারী ট্রাক এবং বাজারে বেপরোয়া চাঁদাবাজির কারণে খাদ্যসামগ্রীর মূল্য বেড়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। এ পরিস্থিতিতে জনগণের মধ্যে এত ক্ষোভ বিরাজ করছে, এটিকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে ঘাপটি মেরে থাকা কিছু খোলস থেকে কচ্ছপ মাথা বের করার মতো গলা বাড়িয়ে এমনও বলার চেষ্টা করছে, ‘আওয়ামী আমলেই ভালো ছিলাম।’

তারেক রহমান দীর্ঘ সতেরো বছর পর দেশের মাটিতে পা রেখে তাঁর স্বপ্নের কথা বলেছিলেন, জনগণ আশায় ছিল, তিনি তাঁর স্বপ্ন তুলে ধরবেন প্রথম ১০০ দিনে। তারা আশাহত হয়েছে তাদের নেতার স্বপ্নের ব্যাখ্যা না পেয়ে।

কথিত ‘প্রথম ১০০ দিন’ অনুকরণের মাঝে যদি চমক দেখানোর মতো কিছু না থাকে, তাহলে অর্থহীনভাবে অন্য কারও দেখাদেখি তা অনুকরণ করা কোনোভাবে সংগত হতে পারে না। আমাদের সরকারগুলো যেখান থেকে এসব অনুকরণ করতে শেখে, সেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম ১০০ দিনে ১৪৩টি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন, যা এই সময়সীমার মধ্যে অতীতের যেকোনো প্রেসিডেন্টের জারি করা নির্বাহী আদেশসংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। ট্রাম্পের এসব আদেশের কোনো কোনোটি ছিল দুনিয়াকাঁপানো আদেশ, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানিকারক বিশ্বের প্রায় সব দেশের রপ্তানিপণ্যের ওপর বর্ধিত শুল্কহার আরোপ; অভিবাসননীতি সংস্কার এবং অবৈধ অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে ঢালাওভাবে বহিষ্কার; বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশসহ কয়েকটি দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা; বহু দেশের নাগরিকদের বিভিন্ন ক্যাটাগরির ভিসা প্রদানে কঠোর যাচাইবাছাই পদ্ধতি চালু; ফেডারেল ব্যয়সংকোচননীতির আওতায় একাধিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা ইত্যাদি। বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর তৃতীয় মেয়াদের প্রথম ১০০ দিনে অনেকগুলো বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প, কৃষি সংস্কারসহ গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পরিকল্পনা অনুমোদন করেছেন, যার মধ্যে মহারাষ্ট্রে মেগা বন্দর স্থাপন প্রকল্প; বিশ্বের শীর্ষ ১০ বন্দরের একটি গভীর-ড্রাফট বন্দর প্রকল্প; ২৫ হাজার গ্রামকে শহরের সঙ্গে যুক্ত করতে ৬২ হাজার কিলোমিটার রাস্তা ও সেতু নির্মাণ প্রকল্প; আটটি নতুন রেললাইন স্থাপন, মেট্রো সম্প্রসারণসহ অসংখ্য প্রকল্প। বাংলাদেশ ছোট ও দুর্বল অর্থনীতির দেশ হোক, লক্ষ্য যদি সুদূরপ্রসারী না হয়, তাহলে শুধু বিভিন্ন ধরনের কার্ড ইস্যু করার মধ্য দিয়ে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণের চেষ্টা জাতীয় উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে না।   

বিশ্বজুড়ে প্রায় সব দেশে সরকার ও রাজনীতিবিদদের ওপর থেকে জনগণের বিশ্বাস ও আস্থা কমে গেছে। একধরনের ঘৃণাও জন্মেছে। এজন্য রাজনীতিবিদরাই দায়ী। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁরা জনগণকে যে প্রতিশ্রুতি দেন, নির্বাচিত হয়ে তা ভুলে যান। তাঁরা সরকারি দায়িত্ব পেয়ে অবাধে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন করেন, নিজেদের ব্যবসাবাণিজ্যের ডালপালা সম্প্রসারণ করেন এবং যত্রতত্র তাঁদের পদের দাপট দেখিয়ে জনগণকে তটস্থ রাখেন। ২০০৯-২০২৪ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় মাঠে সক্রিয় রাজনীতিবিদদের এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে রীতিমতো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিল। রাষ্ট্রীয় সম্পদ তো বটেই, আওয়ামী লীগ বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত সাধারণ নাগরিকদের জমিজমা, ব্যবসা, এমনকি ব্যাংকের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখল করাকে তাদের অধিকারে পরিণত করেছিল। ২০২৪-এর আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাদের অন্যায়গুলো জনগণের সামনে আসতে শুরু করে। আওয়ামী সুবিধাভোগীরা পালিয়ে বাঁচলেও দখল-লুণ্ঠনের যে ঐতিহ্য তারা রেখে গেছে, তার ওপর এখন যারা জাঁকিয়ে বসেছে সম্ভবত তারা নতুন সরকারেরই সুবিধাভোগী গোষ্ঠী। তাদের ওপর সরকারের প্রশ্রয় থাকলে আরও অনেকে একই ধরনের অবৈধ সুবিধা গ্রহণে উৎসাহিত হয়ে শেষ পর্যন্ত সরকারের গলার কাঁটায় পরিণত হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের পরিণতিই বর্তমান সরকারের জন্য উত্তম শিক্ষা ও সতর্কতা।

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, অতীতের রাজনৈতিক সরকারগুলোর জাতীয় স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড যখনই সীমা ছাড়িয়ে গেছে, জনগণ তাদের ওপর ক্ষমতাসীন দলের গুন্ডা-মস্তানদের নির্যাতন, নিষ্পেষণ, শোষণে অতিষ্ঠ হয়ে সৃষ্টিকর্তা ছাড়া তাদের অসহায়ত্বের ফরিয়াদ আর কারও কাছে জানাতে পারেনি, তখন সংবিধানবহির্ভূত সরকারের আগমনকেও তারা অন্তত স্বাগত জানিয়েছে রাজনৈতিক দলনপীড়ন থেকে তাৎক্ষণিক স্বস্তি লাভ করায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারকে সতর্ক হয়ে পা ফেলতে হবে। ইতোমধ্যে জনগণ কোনো কোনো মন্ত্রীর অতিকথনে বিরক্ত। তাঁদের মুখের লাগাম টেনে না ধরলে তাঁরাই সরকারের প্রতি এখন পর্যন্ত বিদ্যমান ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও জন-আস্থায় ফাটল ধরাতে ভূমিকা পালন করবেন।

সাড়ে তিন মাস দীর্ঘ কোনো সময় নয়। তবু সবাই দেখতে চায়, সূচনাটা কীভাবে হলো। কোনো কিছুর শুরু প্রায়ই ইঙ্গিত দেয়, দিনের বাকি অংশ কীভাবে যাবে। সেদিক থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত ‘প্রথম ১০০ দিন’ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারত, যদি এ সময়ের মধ্যে তাঁর সরকারের পক্ষে প্রকৃত অর্থেই জাতীয় পর্যায়ে চমক সৃষ্টির মতো কোনো ঘোষণা দেওয়া সম্ভব হতো। দুঃখজনকভাবে তা হয়নি। একটি রাজনৈতিক সরকারের উদ্যোগ, আইনের শাসনের প্রতি নিষ্ঠা, জনগণের কাছে ভালো থাকা এবং অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সফলতা ব্যাপকভাবে নির্ভর করে প্রশাসনের নিরপেক্ষতার ওপর। বিএনপি সরকার ইতোমধ্যে দৃশ্যত প্রশাসনের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা শুভ আলামত নয়। আওয়ামী লীগ সরকারকে বাংলাদেশে চিরস্থায়ী সরকার ভেবে আওয়ামী পৃষ্ঠপোষকতায় লালিত আমলারা প্রশাসনকে যেভাবে দুর্বল, দুর্নীতিগ্রস্ত বা আত্মস্বার্থকেন্দ্রিক দলদাসে পরিণত করেছিল, তার চড়ামূল্য দিতে হচ্ছে শেখ হাসিনাসহ তার দলের সর্বস্তরের নেতাদের। বিএনপির ক্ষেত্রে এর পুনরাবৃত্তি না ঘটুক।

সাবেক সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা তাঁর ওপর আস্থা না রাখা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মাঝে ছিলেন গুম-খুন-নিপীড়ন চালিয়ে ও মিথ্যা মামলায় বছরের পর বছর কারাগারে আটক রাখার ভীতি সৃষ্টি করে এবং আত্মবিরোধী প্রচারণায় নিজেকে সন্তুষ্ট রেখে। যেকোনো কর্তৃত্ববাদী শাসকের মতো শেখ হাসিনাও তাঁর ওপর জনগণের নিঃশর্ত আস্থা কামনা করতেন। তাঁর মরহুম পিতা শেখ মুজিবুর রহমানও তা চাইতেন। এই অগণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষা পিতা ও কন্যার ভাগ্যে নির্মম পরিণতি ডেকে এনেছে। অতএব ইতিহাসই বাংলাদেশের জনগণকে শিখিয়েছে, ক্ষমতাসীন কারও ওপর আস্থা স্থাপন করা উচিত নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত না তাঁরা তাঁদের ক্ষমতার সীমা ও মেয়াদের মধ্যে থেকে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জনকল্যাণমূলক কাজ করেন, ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করেন, দুর্নীতিপরায়ণদের বিচারের আওতায় আনেন, যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান করেন।  বাংলাদেশের মতো ভঙ্গুর রাজনৈতিক কাঠামো, যেখানে বারবার কর্তৃত্ববাদী শাসন ফিরে আসে, তা প্রতিহত করার জন্য প্রয়োজন গণতান্ত্রিক রীতিনীতি মেনে আইনের শাসনের পথে জবাবদিহিমূলক সরকার নিশ্চিত করা। নতুন সরকারের কাছে এটাই জনগণের প্রত্যাশা।

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক