• ই-পেপার

যুদ্ধে ইরান কেন হারবে না

জ্বালানি নিরাপত্তা থেকে জ্বালানি স্বাধীনতার পথে: বাজেটের করণীয়

অধ্যাপক সাকিব বিন আমিন
জ্বালানি নিরাপত্তা থেকে জ্বালানি স্বাধীনতার পথে: বাজেটের করণীয়
অধ্যাপক সাকিব বিন আমিন। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ এখন জ্বালানি নিরাপত্তা। গত কয়েক বছরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ডলারের সংকট এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা আমাদের স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে যে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ালেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। বরং প্রয়োজন একটি বৈচিত্র্যময়, টেকসই এবং অর্থনৈতিকভাবে সহনশীল জ্বালানি ব্যবস্থা, যা বৈশ্বিক ধাক্কা মোকাবিলা করে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। জ্বালানি নিরাপত্তা আজ আর শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, শিল্প প্রতিযোগিতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে জ্বালানি খাতে নেওয়া প্রতিটি নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। বাজেটে বৈদ্যুতিক যানবাহন, সৌরবিদ্যুৎ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কর ও শুল্ক সুবিধার যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এসব উদ্যোগ কতটা সুসংগঠিত ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হিসেবে বাস্তবায়িত হয় তার ওপর।

আরো পড়ুন
নেহরুকে ছাড়িয়ে ভারতের দীর্ঘতম সময়ের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোদি

নেহরুকে ছাড়িয়ে ভারতের দীর্ঘতম সময়ের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোদি

 

বর্তমানে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন মিশ্রণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ৫.৪৯ শতাংশ। অথচ বহু বছর ধরে বিভিন্ন জাতীয় পরিকল্পনা ও নীতিমালায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। লক্ষ্য ছিল নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ১০ শতাংশে উন্নীত করা, কিন্তু বাস্তবতা এখনো সেই লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে। এই ব্যবধান শুধু নীতিগত দুর্বলতার নয়; এটি বাস্তবায়ন সক্ষমতা, বিনিয়োগ পরিবেশ, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতিরও প্রতিফলন। একদিকে আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছি, অন্যদিকে বাস্তব বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতি সেই অনুপাতে এগোয়নি। ফলে নীতি ও বাস্তবতার মধ্যে একটি স্পষ্ট ব্যবধান তৈরি হয়েছে, যা এখন দূর করা জরুরি।

বাংলাদেশে জ্বালানিতে আমদানিনির্ভরতা রয়েছে। এলএনজি, কয়লা এবং তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তাকে এখন শুধু জ্বালানি সরবরাহের প্রশ্ন হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যের অস্থিরতা দেখিয়েছে যে,  আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা অর্থনীতিকে বহিরাগত ধাক্কার প্রতি আরো সংবেদনশীল করে তোলে। তাই জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এখন কেবল পরিবেশগত নয়, অর্থনৈতিক প্রয়োজনও।

আরো পড়ুন
বৃক্ষরোপণে ৫৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকার প্রণোদনা

বৃক্ষরোপণে ৫৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকার প্রণোদনা

 

এ কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগকে ব্যয় নয়, বরং ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে তোলার একটি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। যদি জাতীয় বাজেটে ধারাবাহিকভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামো, গবেষণা, প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো যায়, তাহলে আগামী দশকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্যভাবে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা উভয়ই শক্তিশালী করতে পারবে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বিশেষভাবে সম্ভাবনাময়। সীমিত ভূমি সম্পদের কারণে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন সবসময় সহজ নয়। কিন্তু শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক ভবন এবং আবাসিক স্থাপনায় রুফটপ সোলার দ্রুত সম্প্রসারণ করা সম্ভব। ইতোমধ্যে শিল্প খাতে এর সফল ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। নেট মিটারিং সম্প্রসারণ, সহজ অর্থায়ন এবং আমদানি শুল্ক হ্রাসের মাধ্যমে এই খাতকে আরো এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে নীতিগত স্থিতিশীলতা ও দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়াও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি, বিদ্যুৎ হুইলিং সুবিধা এবং বিনিয়োগবান্ধব নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন, যা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সহায়ক হবে।

আরো পড়ুন
ভোটের দায়িত্বে মারা গেলে পরিবার পাবে ১০ লাখ টাকা

ভোটের দায়িত্বে মারা গেলে পরিবার পাবে ১০ লাখ টাকা

 

একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন অত্যন্ত জরুরি। অতীতে উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর বেশি জোর দেওয়া হলেও সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো সেই হারে উন্নত হয়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। নবায়নযোগ্য জ্বালানির বৃহৎ পরিসরের সংযোজনের জন্যও শক্তিশালী গ্রিড অবকাঠামো অপরিহার্য। 

ভবিষ্যতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো জ্বালানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি। সৌর ও বায়ুশক্তির মতো নবায়নযোগ্য উৎস সবসময় সমানভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে না। তাই ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম বা বিইএসএসে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এখনই যদি প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা ও প্রণোদনা দেওয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বৃহৎ পরিসরের সংযোজন এবং গ্রিডের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা অনেক সহজ হবে। বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাটারি প্রযুক্তির খরচও দ্রুত কমছে। ফলে জ্বালানি সংরক্ষণ প্রযুক্তিকে বৃহত্তর পরিসরে গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে।

আরো পড়ুন
মারা গেছেন প্রখ্যাত তামিল চলচ্চিত্র পরিচালক ভারতীরাজা

মারা গেছেন প্রখ্যাত তামিল চলচ্চিত্র পরিচালক ভারতীরাজা

 

বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসারও জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বাংলাদেশে পরিবহন খাত আমদানিকৃত জ্বালানির অন্যতম বড় ভোক্তা। তাই ইভি ব্যবহারের বিস্তার, চার্জিং অবকাঠামো নির্মাণ এবং স্থানীয় ব্যাটারি শিল্পের বিকাশ জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে জ্বালানি নিরাপত্তার সবচেয়ে অবহেলিত ক্ষেত্র সম্ভবত জ্বালানি দক্ষতা। শিল্প, বাণিজ্য এবং আবাসিক খাতে আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব। যে জ্বালানি ব্যবহারই করতে হয় না, সেটিই সবচেয়ে সস্তা, সবচেয়ে নিরাপদ এবং সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি। তাই জ্বালানি দক্ষতাকে বাজেটের কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, কারণ সাশ্রয় করা জ্বালানিই সবচেয়ে সাশ্রয়ী এবং সবচেয়ে টেকসই জ্বালানি। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, জ্বালানি দক্ষতায় বিনিয়োগের আর্থিক প্রতিফলন অনেক ক্ষেত্রে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের তুলনায় দ্রুত পাওয়া যায়। ফলে এটি একই সঙ্গে ব্যয় সাশ্রয়, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত সুবিধা নিশ্চিত করতে পারে।

আরো পড়ুন
কেনিয়ায় ইবোলা কোয়ারেন্টাইন কেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, গুলিতে নিহত ১

কেনিয়ায় ইবোলা কোয়ারেন্টাইন কেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, গুলিতে নিহত ১

 

বাংলাদেশ আজ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন জ্বালানি নীতিতে সাহসী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আধুনিক গ্রিড ব্যবস্থা, জ্বালানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং জ্বালানি দক্ষতায় বিনিয়োগ শুধু পরিবেশ রক্ষার জন্য নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পূর্বশর্ত।

জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ সেই পরিবর্তনের ভিত্তি রচনা করতে পারে। আজকের বিনিয়োগই আগামী দিনের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি নির্ধারণ করবে। এখন প্রয়োজন সঠিক অগ্রাধিকার, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকার। যদি আমরা আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আধুনিক অবকাঠামো এবং দক্ষ জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দিকে দৃঢ়ভাবে এগোতে পারি, তাহলে বাংলাদেশ শুধু জ্বালানি নিরাপত্তাই অর্জন করবে না; বরং জ্বালানি স্বাধীনতার দিকে একটি দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার সুরক্ষা এবং টেকসই উন্নয়নের একটি শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

লেখক: অর্থনীতি বিভাগ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
জ্বালানি অর্থনীতি, জলবায়ু নীতি ও টেকসই উন্নয়ন গবেষক
 

পবিত্রতার আড়ালে অন্ধকার: মাদরাসা শিক্ষায় শিশু সুরক্ষার সংকট

প্রদীপ্ত মোবারক
পবিত্রতার আড়ালে অন্ধকার: মাদরাসা শিক্ষায় শিশু সুরক্ষার সংকট
সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী ধারা হলো মাদরাসা শিক্ষা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মাদরাসাগুলো ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা, নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং মানবিক চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের লক্ষাধিক শিক্ষার্থী মাদরাসায় শিক্ষা গ্রহণ করছে এবং পরবর্তীতে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখছে। ফলে মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন অপরাধমূলক ঘটনার আলোকে সম্পূর্ণভাবে মূল্যায়ন করা যেমন অযৌক্তিক, তেমনি এই ব্যবস্থার অভ্যন্তরে বিদ্যমান বাস্তব সমস্যাগুলোকে অস্বীকার করাও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়।

তবে একটি কঠিন বাস্তবতা হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাদরাসাকেন্দ্রিক শিশু যৌন নির্যাতন, যৌন হয়রানি এবং বলাৎকারের একাধিক ঘটনা জনসমক্ষে এসেছে। গণমাধ্যম, আদালত এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনে এমন বহু ঘটনার তথ্য উঠে এসেছে, যা সমাজকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। এসব ঘটনা কেবল ফৌজদারি অপরাধ নয়; এগুলো ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিকতা, মানবিকতা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পবিত্র সম্পর্কের প্রতি এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা।

একজন শিক্ষক কেবল পাঠদানকারী নন; তিনি একজন অভিভাবক, পথ প্রদর্শক ও আদর্শ নির্মাতা। সেই শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানের কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি যখন একটি শিশুর ওপর যৌন নির্যাতন চালায়, তখন তা শুধু একটি ব্যক্তিগত অপরাধে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের বিশ্বাস ও আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিশেষত ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘটিত এ ধরনের অপরাধ সমাজে আরো গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, কারণ মানুষ এসব প্রতিষ্ঠানকে নৈতিকতার নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত।

তবে একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য স্বীকার করা প্রয়োজন, যৌন নির্যাতন কোনো একক শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা নয়। সাধারণ বিদ্যালয়, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, আবাসিক প্রতিষ্ঠান, ক্রীড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, এতিমখানা, এমনকি পারিবারিক পরিবেশেও শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা যৌন সহিংসতার শিকার হয়। তাই সমস্যাটিকে শুধুমাত্র “মাদরাসার সমস্যা” হিসেবে চিহ্নিত করলে প্রকৃত সমস্যার গভীরে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। মূল সমস্যা হলো ক্ষমতার অপব্যবহার, জবাবদিহিতার অভাব, নীরবতার সংস্কৃতি এবং শিশু সুরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা।

তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, মাদরাসাকেন্দ্রিক ঘটনাগুলো কেন বিশেষভাবে আলোচিত হয়? এর অন্যতম কারণ হলো দেশের বহু মাদরাসা আবাসিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়, যেখানে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্য, অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং স্বাধীন তদারকির ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। কিছু প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ এবং অন্ধ আনুগত্যের সংস্কৃতিও সমস্যা সৃষ্টি করে। ফলে কোনো শিক্ষার্থী নির্যাতনের শিকার হলেও ভয়, সামাজিক লজ্জা, ধর্মীয় অপব্যাখ্যা কিংবা প্রতিষ্ঠানের চাপের কারণে সহজে অভিযোগ জানাতে পারে না।

বিশ্বব্যাপী শিশু অধিকার বিষয়ক গবেষণাগুলো দেখায় যে, অধিকাংশ যৌন নির্যাতনের ঘটনা অপরিচিত ব্যক্তির দ্বারা নয়; বরং পরিচিত, বিশ্বাসভাজন এবং কর্তৃত্বশীল ব্যক্তিদের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। এ বাস্তবতা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কারণ শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষক বা কর্তৃপক্ষকে বিশ্বাস করে এবং তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে মানসিকভাবে দ্বিধাগ্রস্ত থাকে।

এই প্রেক্ষাপটে শিশু সুরক্ষাকে শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় নীতিতে পরিণত করা জরুরি। প্রতিটি মাদরাসায় বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারী এবং অভিভাবকদের জন্য যৌন নির্যাতন প্রতিরোধবিষয়ক সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। আবাসিক প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত তদারকি, পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, অভিযোগ গ্রহণের স্বাধীন কাঠামো এবং প্রয়োজনে মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু একাডেমিক যোগ্যতা নয়, নৈতিকতা, আচরণগত ইতিহাস এবং পেশাগত উপযুক্ততাও গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে তা প্রতিষ্ঠান রক্ষার নামে গোপন করা যাবে না। অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। কারণ অপরাধ আড়াল করা মানে অপরাধকে উৎসাহিত করা এবং ভবিষ্যতে আরো শিশুদের ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়া।

এখানে আলেম সমাজ, ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং মাদরাসা পরিচালনা কমিটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামসহ বিশ্বের সব প্রধান ধর্মই শিশু নির্যাতন, শোষণ ও অবিচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। ফলে ধর্মের নামে অপরাধীকে রক্ষা করা বা প্রতিষ্ঠানের সুনামের অজুহাতে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া প্রকৃত ধর্মীয় মূল্যবোধের পরিপন্থী। বরং সত্য প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা।

গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। একদিকে অপরাধকে আড়াল করা যাবে না, অন্যদিকে কয়েকজন অপরাধীর কারণে পুরো মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা বা একটি বৃহৎ ধর্মীয় সম্প্রদায়কে দোষারোপ করাও সমাধান নয়। প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক আলোচনা, গঠনমূলক সমালোচনা এবং কার্যকর সংস্কার উদ্যোগ।

পরিশেষে বলা যায়, মাদরাসা শিক্ষা বাংলাদেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠান মানুষের নৈতিক বিকাশের কথা বলে, সেখানে যদি শিশু নির্যাতন বা বলাৎকারের মতো জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হয়, তবে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, সমগ্র সমাজের জন্য লজ্জার বিষয়। এই কলঙ্ক দূর করার একমাত্র পথ হলো সত্যকে স্বীকার করা, অপরাধীদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা প্রদর্শন করা, শিশুদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া এবং একটি জবাবদিহিমূলক ও মানবিক শিক্ষা পরিবেশ গড়ে তোলা। কারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত পরিচয় তার ভবন, পাঠ্যক্রম বা সুনামে নয়; বরং সেখানে অধ্যয়নরত প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং মানবিক অধিকার সুরক্ষিত থাকার মধ্যেই নিহিত।

লেখক : কলামিস্ট ও জনসংযোগ প্রধান, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।

রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, পুলিশি ক্ষমতা ও জনশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে সহিংসতা

ড. মো. রুহুল আমিন সরকার
রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, পুলিশি ক্ষমতা ও জনশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে সহিংসতা
সংগৃহীত ছবি

রাষ্ট্র একটি সংগঠিত রাজনৈতিক কাঠামো, যেখানে নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, জনসংখ্যা, সরকার এবং সর্বোপরি সার্বভৌমত্ব বিদ্যমান থাকে। এই চারটি উপাদান ছাড়া কোনো রাষ্ট্র কল্পনা করা যায় না। সার্বভৌমত্ব হলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা, যার মাধ্যমে রাষ্ট্র তার নিজস্ব ভূখণ্ডে আইন প্রণয়ন, প্রয়োগ এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখে। এই ক্ষমতার অন্যতম বাস্তব রূপ হলো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে পুলিশ। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পুলিশকে রাষ্ট্রের “ভৌত ক্ষমতার একমাত্র বৈধ প্রয়োগকারী বাহিনী” হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ রাষ্ট্র ছাড়া আর কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সংগঠন আইনগতভাবে বলপ্রয়োগের অধিকার রাখে না।

এই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি সংঘটিত দুটি দৃশ্যমান ঘটনা—একটিতে ট্রাফিক পুলিশকে প্রকাশ্যে আক্রমণ ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার চিত্র, অন্যটিতে একটি জনসমাগমে পুলিশি যানবাহন ঘিরে ভাঙচুর ও আক্রমণাত্মক আচরণ—রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা, আইন এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। এই ঘটনাগুলো শুধুমাত্র একটি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যত্যয় নয়, বরং রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ও বৈধ ক্ষমতার উপর সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

প্রথম ঘটনাটিতে দেখা যায়, নগর সড়কে দায়িত্ব পালনরত একজন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যকে কয়েকজন ব্যক্তি শারীরিকভাবে আক্রমণ করছে। একজন আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাকে কর্তব্যরত অবস্থায় আঘাত করা শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, এটি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিকে আক্রমণের শামিল। কারণ পুলিশ ব্যক্তি হিসেবে সেখানে উপস্থিত নয়; সে রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে আইন প্রয়োগ করছে। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, যানবাহন চলাচল নিয়মিত রাখা, এবং জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ।

দ্বিতীয় ঘটনাটিতে দেখা যায়, একটি এলাকায় পুলিশি যানবাহনকে ঘিরে জনসমাগম সৃষ্টি হয়েছে এবং সেখানে উত্তেজিত জনতা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে। এমন পরিস্থিতি কেবল বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে না, বরং রাষ্ট্রের চলমান প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকেও অকার্যকর করার চেষ্টা হিসেবে দেখা যায়। কারণ পুলিশের যানবাহন রাষ্ট্রীয় শক্তির চলমান প্রতীক, যা আইন প্রয়োগের সরাসরি মাধ্যম।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব অনুযায়ী, বিশেষ করে ম্যাক্স ওয়েবারের ধারণা অনুসারে, রাষ্ট্র হলো এমন একটি রাজনৈতিক সংগঠন যা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বৈধ বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকার রাখে। এই “একচেটিয়া বলপ্রয়োগের অধিকার” (Monopoly of Legitimate Violence) রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের মূল ভিত্তি। অর্থাৎ, যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া বলপ্রয়োগ শুরু করে বা রাষ্ট্রের প্রতিনিধি বাহিনীর উপর আক্রমণ করে, তবে তা রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ করে।

এই দুটি ঘটনার আলোকে আমরা দেখতে পাই, পুলিশ কেবল একটি প্রশাসনিক সংস্থা নয়; এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের বাস্তব প্রতিফলন। পুলিশের ওপর আক্রমণ মানে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কোনো কর্মকর্তার ওপর আক্রমণ নয়, বরং রাষ্ট্রের আইন, শৃঙ্খলা এবং কর্তৃত্বের ওপর আঘাত। এই কারণে বিশ্বের সকল আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই পুলিশকে বিশেষ আইনি সুরক্ষা প্রদান করা হয়।

রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ধারণা আরো গভীরভাবে বুঝতে হলে এর অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক দুই দিক বিবেচনা করতে হয়। বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব মানে অন্য কোনো রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকা, আর অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব মানে নিজের ভূখণ্ডে আইন প্রয়োগের পূর্ণ ক্ষমতা। পুলিশ এই অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বের বাস্তব রূপ। যখন কোনো জনতা বা ব্যক্তি পুলিশের ওপর আক্রমণ করে, তখন তা অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করার চেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হয়।

আইনের দৃষ্টিতে এই ধরনের আক্রমণ গুরুতর অপরাধ। বাংলাদেশ দণ্ডবিধি অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীর ওপর আক্রমণ, সরকারি কাজে বাধা প্রদান এবং সরকারি সম্পত্তি ক্ষতিসাধন একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কারণ এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং জনগণের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

এই ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে, তা হলো সমাজে আইন মানার সংস্কৃতি। একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয় যখন তার নাগরিকরা স্বেচ্ছায় আইন মেনে চলে। আইনকে বাধ্যতামূলক শাস্তির ভয় থেকে নয়, বরং সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে মানা উচিত। কিন্তু যখন এই দায়িত্ববোধ দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্রকে তার বলপ্রয়োগের ক্ষমতা ব্যবহার করতে হয়। পুলিশ সেই বলপ্রয়োগের বৈধ বাহন।

ট্রাফিক পুলিশ একজন সাধারণ নাগরিকের চলাচলকে সীমাবদ্ধ করছে না; বরং সকল নাগরিকের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করছে। উদাহরণস্বরূপ, যদি ট্রাফিক নিয়ম না মানা হয়, তবে সড়কে দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পায়, প্রাণহানি ঘটে এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। তাই পুলিশের নিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকা আসলে নাগরিকদের সুরক্ষার জন্যই।

দ্বিতীয় ঘটনায় দেখা ভিড় বা আক্রমণাত্মক আচরণ সমাজে এক ধরনের ভ্রান্ত বার্তা দেয় যে, আইন ভাঙা বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করা গ্রহণযোগ্য। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। রাষ্ট্র যদি তার আইন প্রয়োগের ক্ষমতা হারায়, তবে সেটি আর রাষ্ট্র থাকে না; সেটি বিশৃঙ্খল জনসমষ্টিতে পরিণত হয়।

রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকে থাকে তিনটি স্তম্ভের ওপর—আইন, শৃঙ্খলা এবং বৈধ বলপ্রয়োগ। পুলিশ এই তিনটির মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। বিচার বিভাগ আইন ব্যাখ্যা করে, প্রশাসন নীতি বাস্তবায়ন করে, আর পুলিশ মাঠপর্যায়ে তা কার্যকর করে। এই সমন্বয় ভেঙে গেলে রাষ্ট্র অকার্যকর হয়ে পড়ে।

এ ছাড়া, পুলিশের ওপর আক্রমণ সমাজে নেতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলে। এটি আইন মানার প্রবণতা কমিয়ে দেয় এবং অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। কারণ অপরাধীরা তখন মনে করে যে রাষ্ট্রের প্রয়োগ ক্ষমতা দুর্বল। ফলে ছোট অপরাধ থেকে শুরু করে বড় ধরনের অপরাধ পর্যন্ত বিস্তার লাভ করতে পারে।

তবে এই ধরনের পরিস্থিতি বিশ্লেষণে শুধু শাস্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নয়, সামাজিক ও আচরণগত বিশ্লেষণও জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে জনঅসন্তোষ, ভুল বোঝাবুঝি, বা তাৎক্ষণিক উত্তেজনা থেকেও এমন ঘটনা ঘটে। কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর উপর আক্রমণ কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হলো—সে তার নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করবে, আবার একই সঙ্গে আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবে। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চ্যালেঞ্জ। পুলিশ এই ভারসাম্যের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে।

উল্লেখিত দুটি ঘটনার মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হয় যে, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কেবল সংবিধান বা লিখিত নথিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রতিদিনের বাস্তব কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হয়। একজন ট্রাফিক পুলিশ যখন সড়কে দাঁড়িয়ে নিয়ম বাস্তবায়ন করে, তখনই রাষ্ট্র তার সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করে। আবার সেই পুলিশ যদি আক্রমণের শিকার হয়, তবে সেটি রাষ্ট্রের ক্ষমতার ওপর আঘাত হিসেবে বিবেচিত হয়।

অতএব, রাষ্ট্র, পুলিশ এবং জনগণ—এই তিনটি উপাদান একে অপরের পরিপূরক। জনগণ ছাড়া রাষ্ট্র অর্থহীন, রাষ্ট্র ছাড়া পুলিশ অকার্যকর, আর পুলিশ ছাড়া রাষ্ট্রের আইন বাস্তবায়ন অসম্ভব। তাই এই তিনটির মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধ অত্যন্ত জরুরি।

পরিশেষে বলা যায়, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। আইনকে সম্মান করা, পুলিশের কাজে সহযোগিতা করা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখা একটি সভ্য সমাজের পরিচয়। পুলিশের ওপর আক্রমণ মানে কেবল একটি ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়, বরং সমগ্র রাষ্ট্র কাঠামোর ওপর আঘাত। তাই এই ধরনের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের উচিত একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ, আইননিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সমাজ গঠন করা, যেখানে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ থাকে এবং আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হয়।

লেখক : অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার, সিআইডি

২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ : বাংলাদেশের সবুজ ভবিষ্যতের রূপরেখা

ড. মোঃ মিজানুর রহমান
২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ : বাংলাদেশের সবুজ ভবিষ্যতের রূপরেখা
প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশ আজ এক গভীর পরিবেশগত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, দ্রুত নগরায়ন, শিল্পায়নের চাপ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহার দেশের পরিবেশগত ভারসাম্যকে ক্রমশ দুর্বল করে তুলছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, বন্যা-খরা-ঘূর্ণিঝড়ের ঘনঘনতা এবং বায়ুদূষণ এখন দৈনন্দিন বাস্তবতা। এমন প্রেক্ষাপটে পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর সরকারি উদ্যোগ কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি একটি জাতীয় পরিবেশগত পুনর্জাগরণের সম্ভাবনা।

আধুনিক বিশ্ব বর্তমানে এক অভিন্ন পরিবেশ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী সময়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যাপক ব্যবহার, বন উজাড় এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপপ্রবাহ, খরা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বেড়েছে। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে, এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে ভবিষ্যৎ মানবসভ্যতা আরো কঠিন পরিবেশগত ঝুঁকিতে পড়বে। এই সংকট মোকাবিলায় বনভূমি একটি প্রাকৃতিক সমাধান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে এখন বিশ্বের নীতি-নির্ধারকরা বনায়ন ও পুনর্বনায়নকে জলবায়ু কৌশলের কেন্দ্রে স্থান দিচ্ছেন।

এই প্রেক্ষাপটে ১৯৯২ সালের রিও আর্থ সামিট টেকসই উন্নয়নের ধারণাকে বৈশ্বিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। পরবর্তীতে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন কাঠামো সনদ (UNFCCC), কিয়োটো প্রটোকল এবং ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তি বৈশ্বিক জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রগুলোর দায়বদ্ধতা নির্ধারণ করে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের পাশাপাশি কার্বন শোষণ ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তি বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার নতুন দিকনির্দেশনা প্রদান করে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs)-তেও বন সংরক্ষণ ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে আজকের বিশ্বে পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন এবং বনায়ন কার্যক্রমকে কেবল পরিবেশগত কর্মসূচি নয়, বরং অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে বৃহৎ পরিসরের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। চীন তার 'গ্রেট গ্রিন ওয়াল' প্রকল্পের মাধ্যমে মরুকরণ রোধ ও বনায়ন সম্প্রসারণে সফল হয়েছে। ভারত ও পাকিস্তান গণভিত্তিক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে ব্যাপক সবুজায়ন ঘটিয়েছে। আফ্রিকার ইথিওপিয়া একদিনে শত কোটি গাছ লাগানোর মাধ্যমে বৈশ্বিক নজর কেড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া যুদ্ধ-পরবর্তী ধ্বংসস্তূপ থেকে পরিকল্পিত বনায়নের মাধ্যমে সবুজ অর্থনীতির উদাহরণ তৈরি করেছে। এসব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জনগণের অংশগ্রহণ থাকলে বৃহৎ বনায়ন কর্মসূচি বাস্তব ফল দিতে পারে।

বাংলাদেশের মোট ভূমির তুলনায় বন আচ্ছাদনের হার আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে কম বলে পরিবেশবিদরা মনে করেন। সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রাম, শালবন এবং উপকূলীয় বনাঞ্চল দেশের প্রধান সবুজ সম্পদ হলেও এগুলো ক্রমাগত চাপের মুখে রয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন, জনসংখ্যার চাপ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের কারণে বনভূমি সংকুচিত হচ্ছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে সবুজ স্থান কমে যাওয়ায় পরিবেশগত ভারসাম্য আরো দুর্বল হচ্ছে।

বাংলাদেশে বনায়নের ইতিহাসে সামাজিক বনায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। রাস্তার ধারে, বাঁধে ও সরকারি খাসজমিতে জনগণকে সম্পৃক্ত করে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে সবুজ আচ্ছাদন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অনেক নিম্নআয়ের পরিবার অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হয়েছে। উপকূলীয় বনায়ন ঘূর্ণিঝড় প্রতিরোধে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করছে। পাশাপাশি জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান জনগণের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি করেছে। তবে এসব কর্মসূচির একটি প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো রোপিত চারার টিকে থাকার হার তুলনামূলকভাবে কম।

স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে বনায়ন ও বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম বিভিন্ন পর্যায়ে বিস্তৃত হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ, বনসম্পদ বৃদ্ধি, উপকূলীয় সুরক্ষা ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বিভিন্ন সরকার নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে আশির দশক থেকে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এ কর্মসূচির মূল দর্শন ছিল বন সংরক্ষণকে কেবল সরকারি দায়িত্ব হিসেবে না দেখে জনগণকে এর সক্রিয় অংশীদার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা। এর ফলে রাস্তার ধারে, রেললাইনের পাশে, বাঁধের ওপর ও সরকারি খাসজমিতে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা সবুজ আচ্ছাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নিম্নআয়ের মানুষের আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে।

বঙ্গোপসাগর উপকূলে কেওড়া, গেওয়া, বাইনসহ লবণাক্ততা সহনশীল গাছ লাগিয়ে গড়ে ওঠা সবুজ বেষ্টনী ঘূর্ণিঝড়ের সময় ঢেউয়ের গতি কমিয়ে জনপদকে আংশিক সুরক্ষা দিয়েছে। সিডর, আইলা, রোয়ান ও আম্পানের মতো ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় এসব বনাঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে ভূমি গঠনে অবদান রেখেছে।

এই অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমান ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। প্রতি বছর গড়ে পাঁচ কোটি গাছ লাগানোর এই পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে তা দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এর মাধ্যমে কার্বন শোষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি, নগর তাপমাত্রা হ্রাস, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্যোগ ঝুঁকি কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়। একই সঙ্গে ফলজ ও বনজ গাছের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন আয়ের উৎস সৃষ্টি হতে পারে।

জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান, বৃক্ষমেলা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। বৃক্ষরোপণ কেবল সরকারি উদ্যোগনির্ভর না করে ব্যক্তি, পরিবার, সামাজিক সংগঠন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগে গাছ লাগাতে আগ্রহী করতে হবে। পরিবেশ সচেতনতার মাধ্যমে বাংলাদেশের বনায়ন কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অর্জন হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

এই কর্মসূচির ফলে দেশের সবুজ আচ্ছাদন বৃদ্ধি পাবে এবং কার্বন শোষণের ক্ষমতা বাড়বে। বায়ুদূষণ ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির মতো নগর সমস্যার মোকাবিলায় এটি সহায়ক হবে। উপকূলীয় এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ফলজ ও বনজ গাছের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতা বৃদ্ধিতেও এই কর্মসূচি অবদান রাখতে পারে।

তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বাংলাদেশের মতো সীমিত ভূমির দেশে ২৫ কোটি গাছ কোথায় লাগানো হবে তা ঠিক করা অত্যন্ত জরুরি। তবে দেশের বিভিন্ন স্থানে এখনও এমন বহু এলাকা, যেমন মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কের দুপাশ, রেললাইন সংলগ্ন এলাকা, নদী ও খালের পাড়, বাঁধ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, সরকারি অফিস প্রাঙ্গণ এবং বিভিন্ন অব্যবহৃত সরকারি জমি রয়েছে যেখানে পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ সম্ভব। গ্রামীণ এলাকায় বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড়, কৃষিজমির আইল ও পতিত জমিতে ফলজ ও বনজ গাছ লাগানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এর পাশাপাশি শহরাঞ্চলের পার্ক, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান ও আবাসিক এলাকায় পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ শহরের পরিবেশ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ছাদবাগান, কমিউনিটি গার্ডেন ও নগর কৃষিকেও এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।

এ উদ্যোগের সাফল্যে জনগণের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২৫ কোটি গাছ কেবল সরকারি উদ্যোগে রোপণ সম্ভব নয়। এটিকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে, যেখানে সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, কৃষক, যুবসমাজ, নারী সংগঠন ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবে। জনগণের মধ্যে চারা বিতরণ ও স্থানীয় পর্যায়ে বনায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করলে প্রকল্পের ব্যাপ্তি ও গ্রহণযোগ্যতা আরো বৃদ্ধি পাবে।

তবে অর্জনের পাশাপাশি কিছু সীমাবদ্ধতাও দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান। অনেক ক্ষেত্রে চারা রোপণের পর পর্যাপ্ত পরিচর্যার অভাবে উল্লেখযোগ্য অংশ নষ্ট হয়ে যায়। প্রকল্পের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্পষ্ট না থাকায় অনেক এলাকায় গাছ টিকে থাকতে পারেনি। কোথাও কোথাও অবৈধ দখল, বন উজাড় এবং প্রশাসনিক দুর্বলতাও বনায়ন কার্যক্রমকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে অতীত অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে বলে যে, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির প্রকৃত মূল্যায়ন করতে হলে শুধু কত গাছ লাগানো হয়েছে তা নয়, বরং কত গাছ দীর্ঘমেয়াদে টিকে আছে এবং পরিবেশগতভাবে কতটা অবদান রাখছে, সেটিকেই প্রধান বিবেচনায় আনতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মালিকানা ও রক্ষণাবেক্ষণ। জনগণ যদি বৃক্ষরোপণের সঙ্গে সরাসরি স্বার্থগতভাবে যুক্ত না হয়, তাহলে গাছ টিকে থাকার সম্ভাবনা কমে যায়। তাই ব্যক্তিগত জমিতে গাছের মালিকানা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছেই থাকা উচিত এবং সরকারি জমিতে সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে জনগণকে লাভের অংশীদার করা প্রয়োজন। এতে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ নিশ্চিত হবে।

অতীত অভিজ্ঞতা আরো দেখায় যে, বৃক্ষরোপণের প্রধান দুর্বলতা হলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। প্রথম কয়েক বছর সঠিক যত্ন না পেলে বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়। তাই সেচ, বেড়া, পরিচর্যা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ বাধ্যতামূলক করা জরুরি। আধুনিক প্রযুক্তি যেমন জিও-ট্যাগিং ও ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি গাছ ট্র্যাক করা গেলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে।

এই ধরনের বৃহৎ কর্মসূচিতে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো দুর্নীতি ও অনিয়মের ঝুঁকি। চারা সংগ্রহ, পরিবহন, বিতরণ ও রোপণের প্রতিটি ধাপে আর্থিক লেনদেন জড়িত থাকায় অতীতে নিম্নমানের চারা ক্রয়, অতিরিক্ত মূল্য প্রদর্শন, কাগজে-কলমে গাছ লাগানো দেখানো বা বাস্তবে অনুপস্থিত গাছকে হিসাবভুক্ত করার মতো অভিযোগ দেখা গেছে। ২৫ কোটি গাছের মতো বিশাল লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে এই ঝুঁকি আরো বাড়তে পারে। তাই শুরু থেকেই শক্তিশালী স্বচ্ছতা কাঠামো, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং কঠোর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা প্রয়োজন।

এর পাশাপাশি প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এত বড় কর্মসূচি একক কোনো সংস্থার পক্ষে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। বন অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা ও কৃষি বিভাগ এবং অন্যান্য উন্নয়ন সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকলে মাঠপর্যায়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। এজন্য কেন্দ্রীয় পর্যায়ে একটি শক্তিশালী সমন্বয় কাঠামো থাকা জরুরি, যা নীতি নির্ধারণের পাশাপাশি অগ্রগতি নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।

অর্থায়নের ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চারা উৎপাদন, রোপণ ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণে বড় বাজেটের প্রয়োজন হবে। তবে এটিকে ব্যয় নয়, বরং বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত। কারণ পরিবেশগত ভারসাম্য, দুর্যোগ হ্রাস ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতির মাধ্যমে এটি ভবিষ্যতে বহুগুণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুফল দিতে সক্ষম। তবে অর্থায়নের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো জবাবদিহিতা। প্রতিটি গাছের তথ্য, অবস্থান ও বর্তমান অবস্থা ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব। জিও-ট্যাগিং, অনলাইন ডাটাবেস এবং নিয়মিত স্বাধীন অডিট কাগুজে সাফল্য কমিয়ে বাস্তব অগ্রগতি মূল্যায়নকে সহজ করবে। এতে জনগণের অংশগ্রহণ ও সামাজিক পর্যবেক্ষণও বৃদ্ধি পাবে।

এই কর্মসূচির সাফল্যের জন্য সঠিক প্রজাতি নির্বাচনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি অঞ্চলের মাটি ও জলবায়ুর উপযোগিতা অনুযায়ী গাছ নির্বাচন করতে হবে—উপকূলে লবণসহিষ্ণু প্রজাতি, পাহাড়ে মাটি ধারণকারী প্রজাতি এবং শহরে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে সক্ষম গাছ উপযুক্ত। বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে সাফল্য নিশ্চিত করা কঠিন। পাশাপাশি জনগণের অংশগ্রহণকে কেবল আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রকৃত মালিকানার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কৃষক ও স্থানীয় সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করে সামাজিক মালিকানা নিশ্চিত করা গেলে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সাফল্য অর্জন সম্ভব হবে।

সবশেষে বলা যায়, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কেবল একটি পরিসংখ্যানগত লক্ষ্য নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পরিবেশগত নিরাপত্তার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। এই উদ্যোগ যদি পরিকল্পিতভাবে, স্বচ্ছভাবে এবং জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি একটি সবুজ বিপ্লবের ভিত্তি স্থাপন করতে পারে। আর যদি কেবল সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে এর সম্ভাবনা অপূর্ণই থেকে যাবে। প্রকৃত সাফল্য তখনই অর্জিত হবে, যখন রোপিত প্রতিটি গাছ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি জীবন্ত আশ্রয় হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকবে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট