বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ এখন জ্বালানি নিরাপত্তা। গত কয়েক বছরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ডলারের সংকট এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা আমাদের স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে যে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ালেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। বরং প্রয়োজন একটি বৈচিত্র্যময়, টেকসই এবং অর্থনৈতিকভাবে সহনশীল জ্বালানি ব্যবস্থা, যা বৈশ্বিক ধাক্কা মোকাবিলা করে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। জ্বালানি নিরাপত্তা আজ আর শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, শিল্প প্রতিযোগিতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে জ্বালানি খাতে নেওয়া প্রতিটি নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। বাজেটে বৈদ্যুতিক যানবাহন, সৌরবিদ্যুৎ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কর ও শুল্ক সুবিধার যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এসব উদ্যোগ কতটা সুসংগঠিত ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হিসেবে বাস্তবায়িত হয় তার ওপর।
বর্তমানে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন মিশ্রণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ৫.৪৯ শতাংশ। অথচ বহু বছর ধরে বিভিন্ন জাতীয় পরিকল্পনা ও নীতিমালায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। লক্ষ্য ছিল নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ১০ শতাংশে উন্নীত করা, কিন্তু বাস্তবতা এখনো সেই লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে। এই ব্যবধান শুধু নীতিগত দুর্বলতার নয়; এটি বাস্তবায়ন সক্ষমতা, বিনিয়োগ পরিবেশ, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতিরও প্রতিফলন। একদিকে আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছি, অন্যদিকে বাস্তব বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতি সেই অনুপাতে এগোয়নি। ফলে নীতি ও বাস্তবতার মধ্যে একটি স্পষ্ট ব্যবধান তৈরি হয়েছে, যা এখন দূর করা জরুরি।
বাংলাদেশে জ্বালানিতে আমদানিনির্ভরতা রয়েছে। এলএনজি, কয়লা এবং তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তাকে এখন শুধু জ্বালানি সরবরাহের প্রশ্ন হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যের অস্থিরতা দেখিয়েছে যে, আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা অর্থনীতিকে বহিরাগত ধাক্কার প্রতি আরো সংবেদনশীল করে তোলে। তাই জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এখন কেবল পরিবেশগত নয়, অর্থনৈতিক প্রয়োজনও।
এ কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগকে ব্যয় নয়, বরং ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে তোলার একটি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। যদি জাতীয় বাজেটে ধারাবাহিকভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামো, গবেষণা, প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো যায়, তাহলে আগামী দশকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্যভাবে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা উভয়ই শক্তিশালী করতে পারবে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বিশেষভাবে সম্ভাবনাময়। সীমিত ভূমি সম্পদের কারণে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন সবসময় সহজ নয়। কিন্তু শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক ভবন এবং আবাসিক স্থাপনায় রুফটপ সোলার দ্রুত সম্প্রসারণ করা সম্ভব। ইতোমধ্যে শিল্প খাতে এর সফল ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। নেট মিটারিং সম্প্রসারণ, সহজ অর্থায়ন এবং আমদানি শুল্ক হ্রাসের মাধ্যমে এই খাতকে আরো এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে নীতিগত স্থিতিশীলতা ও দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়াও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি, বিদ্যুৎ হুইলিং সুবিধা এবং বিনিয়োগবান্ধব নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন, যা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সহায়ক হবে।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন অত্যন্ত জরুরি। অতীতে উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর বেশি জোর দেওয়া হলেও সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো সেই হারে উন্নত হয়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। নবায়নযোগ্য জ্বালানির বৃহৎ পরিসরের সংযোজনের জন্যও শক্তিশালী গ্রিড অবকাঠামো অপরিহার্য।
ভবিষ্যতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো জ্বালানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি। সৌর ও বায়ুশক্তির মতো নবায়নযোগ্য উৎস সবসময় সমানভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে না। তাই ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম বা বিইএসএসে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এখনই যদি প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা ও প্রণোদনা দেওয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বৃহৎ পরিসরের সংযোজন এবং গ্রিডের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা অনেক সহজ হবে। বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাটারি প্রযুক্তির খরচও দ্রুত কমছে। ফলে জ্বালানি সংরক্ষণ প্রযুক্তিকে বৃহত্তর পরিসরে গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে।
বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসারও জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বাংলাদেশে পরিবহন খাত আমদানিকৃত জ্বালানির অন্যতম বড় ভোক্তা। তাই ইভি ব্যবহারের বিস্তার, চার্জিং অবকাঠামো নির্মাণ এবং স্থানীয় ব্যাটারি শিল্পের বিকাশ জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে জ্বালানি নিরাপত্তার সবচেয়ে অবহেলিত ক্ষেত্র সম্ভবত জ্বালানি দক্ষতা। শিল্প, বাণিজ্য এবং আবাসিক খাতে আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব। যে জ্বালানি ব্যবহারই করতে হয় না, সেটিই সবচেয়ে সস্তা, সবচেয়ে নিরাপদ এবং সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি। তাই জ্বালানি দক্ষতাকে বাজেটের কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, কারণ সাশ্রয় করা জ্বালানিই সবচেয়ে সাশ্রয়ী এবং সবচেয়ে টেকসই জ্বালানি। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, জ্বালানি দক্ষতায় বিনিয়োগের আর্থিক প্রতিফলন অনেক ক্ষেত্রে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের তুলনায় দ্রুত পাওয়া যায়। ফলে এটি একই সঙ্গে ব্যয় সাশ্রয়, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত সুবিধা নিশ্চিত করতে পারে।
বাংলাদেশ আজ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন জ্বালানি নীতিতে সাহসী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আধুনিক গ্রিড ব্যবস্থা, জ্বালানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং জ্বালানি দক্ষতায় বিনিয়োগ শুধু পরিবেশ রক্ষার জন্য নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পূর্বশর্ত।
জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ সেই পরিবর্তনের ভিত্তি রচনা করতে পারে। আজকের বিনিয়োগই আগামী দিনের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি নির্ধারণ করবে। এখন প্রয়োজন সঠিক অগ্রাধিকার, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকার। যদি আমরা আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আধুনিক অবকাঠামো এবং দক্ষ জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দিকে দৃঢ়ভাবে এগোতে পারি, তাহলে বাংলাদেশ শুধু জ্বালানি নিরাপত্তাই অর্জন করবে না; বরং জ্বালানি স্বাধীনতার দিকে একটি দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার সুরক্ষা এবং টেকসই উন্নয়নের একটি শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
লেখক: অর্থনীতি বিভাগ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
জ্বালানি অর্থনীতি, জলবায়ু নীতি ও টেকসই উন্নয়ন গবেষক









