বাংলাদেশ আজ এক গভীর পরিবেশগত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, দ্রুত নগরায়ন, শিল্পায়নের চাপ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহার দেশের পরিবেশগত ভারসাম্যকে ক্রমশ দুর্বল করে তুলছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, বন্যা-খরা-ঘূর্ণিঝড়ের ঘনঘনতা এবং বায়ুদূষণ এখন দৈনন্দিন বাস্তবতা। এমন প্রেক্ষাপটে পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর সরকারি উদ্যোগ কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি একটি জাতীয় পরিবেশগত পুনর্জাগরণের সম্ভাবনা।
আধুনিক বিশ্ব বর্তমানে এক অভিন্ন পরিবেশ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী সময়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যাপক ব্যবহার, বন উজাড় এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপপ্রবাহ, খরা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বেড়েছে। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে, এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে ভবিষ্যৎ মানবসভ্যতা আরো কঠিন পরিবেশগত ঝুঁকিতে পড়বে। এই সংকট মোকাবিলায় বনভূমি একটি প্রাকৃতিক সমাধান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে এখন বিশ্বের নীতি-নির্ধারকরা বনায়ন ও পুনর্বনায়নকে জলবায়ু কৌশলের কেন্দ্রে স্থান দিচ্ছেন।
এই প্রেক্ষাপটে ১৯৯২ সালের রিও আর্থ সামিট টেকসই উন্নয়নের ধারণাকে বৈশ্বিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। পরবর্তীতে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন কাঠামো সনদ (UNFCCC), কিয়োটো প্রটোকল এবং ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তি বৈশ্বিক জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রগুলোর দায়বদ্ধতা নির্ধারণ করে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের পাশাপাশি কার্বন শোষণ ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তি বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার নতুন দিকনির্দেশনা প্রদান করে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs)-তেও বন সংরক্ষণ ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে আজকের বিশ্বে পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন এবং বনায়ন কার্যক্রমকে কেবল পরিবেশগত কর্মসূচি নয়, বরং অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে বৃহৎ পরিসরের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। চীন তার 'গ্রেট গ্রিন ওয়াল' প্রকল্পের মাধ্যমে মরুকরণ রোধ ও বনায়ন সম্প্রসারণে সফল হয়েছে। ভারত ও পাকিস্তান গণভিত্তিক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে ব্যাপক সবুজায়ন ঘটিয়েছে। আফ্রিকার ইথিওপিয়া একদিনে শত কোটি গাছ লাগানোর মাধ্যমে বৈশ্বিক নজর কেড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া যুদ্ধ-পরবর্তী ধ্বংসস্তূপ থেকে পরিকল্পিত বনায়নের মাধ্যমে সবুজ অর্থনীতির উদাহরণ তৈরি করেছে। এসব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জনগণের অংশগ্রহণ থাকলে বৃহৎ বনায়ন কর্মসূচি বাস্তব ফল দিতে পারে।
বাংলাদেশের মোট ভূমির তুলনায় বন আচ্ছাদনের হার আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে কম বলে পরিবেশবিদরা মনে করেন। সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রাম, শালবন এবং উপকূলীয় বনাঞ্চল দেশের প্রধান সবুজ সম্পদ হলেও এগুলো ক্রমাগত চাপের মুখে রয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন, জনসংখ্যার চাপ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের কারণে বনভূমি সংকুচিত হচ্ছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে সবুজ স্থান কমে যাওয়ায় পরিবেশগত ভারসাম্য আরো দুর্বল হচ্ছে।
বাংলাদেশে বনায়নের ইতিহাসে সামাজিক বনায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। রাস্তার ধারে, বাঁধে ও সরকারি খাসজমিতে জনগণকে সম্পৃক্ত করে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে সবুজ আচ্ছাদন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অনেক নিম্নআয়ের পরিবার অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হয়েছে। উপকূলীয় বনায়ন ঘূর্ণিঝড় প্রতিরোধে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করছে। পাশাপাশি জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান জনগণের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি করেছে। তবে এসব কর্মসূচির একটি প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো রোপিত চারার টিকে থাকার হার তুলনামূলকভাবে কম।
স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে বনায়ন ও বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম বিভিন্ন পর্যায়ে বিস্তৃত হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ, বনসম্পদ বৃদ্ধি, উপকূলীয় সুরক্ষা ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বিভিন্ন সরকার নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে আশির দশক থেকে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এ কর্মসূচির মূল দর্শন ছিল বন সংরক্ষণকে কেবল সরকারি দায়িত্ব হিসেবে না দেখে জনগণকে এর সক্রিয় অংশীদার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা। এর ফলে রাস্তার ধারে, রেললাইনের পাশে, বাঁধের ওপর ও সরকারি খাসজমিতে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা সবুজ আচ্ছাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নিম্নআয়ের মানুষের আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে।
বঙ্গোপসাগর উপকূলে কেওড়া, গেওয়া, বাইনসহ লবণাক্ততা সহনশীল গাছ লাগিয়ে গড়ে ওঠা সবুজ বেষ্টনী ঘূর্ণিঝড়ের সময় ঢেউয়ের গতি কমিয়ে জনপদকে আংশিক সুরক্ষা দিয়েছে। সিডর, আইলা, রোয়ান ও আম্পানের মতো ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় এসব বনাঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে ভূমি গঠনে অবদান রেখেছে।
এই অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমান ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। প্রতি বছর গড়ে পাঁচ কোটি গাছ লাগানোর এই পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে তা দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এর মাধ্যমে কার্বন শোষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি, নগর তাপমাত্রা হ্রাস, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্যোগ ঝুঁকি কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়। একই সঙ্গে ফলজ ও বনজ গাছের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন আয়ের উৎস সৃষ্টি হতে পারে।
জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান, বৃক্ষমেলা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। বৃক্ষরোপণ কেবল সরকারি উদ্যোগনির্ভর না করে ব্যক্তি, পরিবার, সামাজিক সংগঠন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগে গাছ লাগাতে আগ্রহী করতে হবে। পরিবেশ সচেতনতার মাধ্যমে বাংলাদেশের বনায়ন কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অর্জন হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
এই কর্মসূচির ফলে দেশের সবুজ আচ্ছাদন বৃদ্ধি পাবে এবং কার্বন শোষণের ক্ষমতা বাড়বে। বায়ুদূষণ ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির মতো নগর সমস্যার মোকাবিলায় এটি সহায়ক হবে। উপকূলীয় এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ফলজ ও বনজ গাছের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতা বৃদ্ধিতেও এই কর্মসূচি অবদান রাখতে পারে।
তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বাংলাদেশের মতো সীমিত ভূমির দেশে ২৫ কোটি গাছ কোথায় লাগানো হবে তা ঠিক করা অত্যন্ত জরুরি। তবে দেশের বিভিন্ন স্থানে এখনও এমন বহু এলাকা, যেমন মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কের দুপাশ, রেললাইন সংলগ্ন এলাকা, নদী ও খালের পাড়, বাঁধ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, সরকারি অফিস প্রাঙ্গণ এবং বিভিন্ন অব্যবহৃত সরকারি জমি রয়েছে যেখানে পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ সম্ভব। গ্রামীণ এলাকায় বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড়, কৃষিজমির আইল ও পতিত জমিতে ফলজ ও বনজ গাছ লাগানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এর পাশাপাশি শহরাঞ্চলের পার্ক, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান ও আবাসিক এলাকায় পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ শহরের পরিবেশ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ছাদবাগান, কমিউনিটি গার্ডেন ও নগর কৃষিকেও এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।
এ উদ্যোগের সাফল্যে জনগণের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২৫ কোটি গাছ কেবল সরকারি উদ্যোগে রোপণ সম্ভব নয়। এটিকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে, যেখানে সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, কৃষক, যুবসমাজ, নারী সংগঠন ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবে। জনগণের মধ্যে চারা বিতরণ ও স্থানীয় পর্যায়ে বনায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করলে প্রকল্পের ব্যাপ্তি ও গ্রহণযোগ্যতা আরো বৃদ্ধি পাবে।
তবে অর্জনের পাশাপাশি কিছু সীমাবদ্ধতাও দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান। অনেক ক্ষেত্রে চারা রোপণের পর পর্যাপ্ত পরিচর্যার অভাবে উল্লেখযোগ্য অংশ নষ্ট হয়ে যায়। প্রকল্পের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্পষ্ট না থাকায় অনেক এলাকায় গাছ টিকে থাকতে পারেনি। কোথাও কোথাও অবৈধ দখল, বন উজাড় এবং প্রশাসনিক দুর্বলতাও বনায়ন কার্যক্রমকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে অতীত অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে বলে যে, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির প্রকৃত মূল্যায়ন করতে হলে শুধু কত গাছ লাগানো হয়েছে তা নয়, বরং কত গাছ দীর্ঘমেয়াদে টিকে আছে এবং পরিবেশগতভাবে কতটা অবদান রাখছে, সেটিকেই প্রধান বিবেচনায় আনতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মালিকানা ও রক্ষণাবেক্ষণ। জনগণ যদি বৃক্ষরোপণের সঙ্গে সরাসরি স্বার্থগতভাবে যুক্ত না হয়, তাহলে গাছ টিকে থাকার সম্ভাবনা কমে যায়। তাই ব্যক্তিগত জমিতে গাছের মালিকানা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছেই থাকা উচিত এবং সরকারি জমিতে সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে জনগণকে লাভের অংশীদার করা প্রয়োজন। এতে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ নিশ্চিত হবে।
অতীত অভিজ্ঞতা আরো দেখায় যে, বৃক্ষরোপণের প্রধান দুর্বলতা হলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। প্রথম কয়েক বছর সঠিক যত্ন না পেলে বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়। তাই সেচ, বেড়া, পরিচর্যা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ বাধ্যতামূলক করা জরুরি। আধুনিক প্রযুক্তি যেমন জিও-ট্যাগিং ও ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি গাছ ট্র্যাক করা গেলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে।
এই ধরনের বৃহৎ কর্মসূচিতে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো দুর্নীতি ও অনিয়মের ঝুঁকি। চারা সংগ্রহ, পরিবহন, বিতরণ ও রোপণের প্রতিটি ধাপে আর্থিক লেনদেন জড়িত থাকায় অতীতে নিম্নমানের চারা ক্রয়, অতিরিক্ত মূল্য প্রদর্শন, কাগজে-কলমে গাছ লাগানো দেখানো বা বাস্তবে অনুপস্থিত গাছকে হিসাবভুক্ত করার মতো অভিযোগ দেখা গেছে। ২৫ কোটি গাছের মতো বিশাল লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে এই ঝুঁকি আরো বাড়তে পারে। তাই শুরু থেকেই শক্তিশালী স্বচ্ছতা কাঠামো, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং কঠোর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা প্রয়োজন।
এর পাশাপাশি প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এত বড় কর্মসূচি একক কোনো সংস্থার পক্ষে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। বন অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা ও কৃষি বিভাগ এবং অন্যান্য উন্নয়ন সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকলে মাঠপর্যায়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। এজন্য কেন্দ্রীয় পর্যায়ে একটি শক্তিশালী সমন্বয় কাঠামো থাকা জরুরি, যা নীতি নির্ধারণের পাশাপাশি অগ্রগতি নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
অর্থায়নের ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চারা উৎপাদন, রোপণ ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণে বড় বাজেটের প্রয়োজন হবে। তবে এটিকে ব্যয় নয়, বরং বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত। কারণ পরিবেশগত ভারসাম্য, দুর্যোগ হ্রাস ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতির মাধ্যমে এটি ভবিষ্যতে বহুগুণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুফল দিতে সক্ষম। তবে অর্থায়নের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো জবাবদিহিতা। প্রতিটি গাছের তথ্য, অবস্থান ও বর্তমান অবস্থা ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব। জিও-ট্যাগিং, অনলাইন ডাটাবেস এবং নিয়মিত স্বাধীন অডিট কাগুজে সাফল্য কমিয়ে বাস্তব অগ্রগতি মূল্যায়নকে সহজ করবে। এতে জনগণের অংশগ্রহণ ও সামাজিক পর্যবেক্ষণও বৃদ্ধি পাবে।
এই কর্মসূচির সাফল্যের জন্য সঠিক প্রজাতি নির্বাচনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি অঞ্চলের মাটি ও জলবায়ুর উপযোগিতা অনুযায়ী গাছ নির্বাচন করতে হবে—উপকূলে লবণসহিষ্ণু প্রজাতি, পাহাড়ে মাটি ধারণকারী প্রজাতি এবং শহরে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে সক্ষম গাছ উপযুক্ত। বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে সাফল্য নিশ্চিত করা কঠিন। পাশাপাশি জনগণের অংশগ্রহণকে কেবল আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রকৃত মালিকানার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কৃষক ও স্থানীয় সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করে সামাজিক মালিকানা নিশ্চিত করা গেলে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সাফল্য অর্জন সম্ভব হবে।
সবশেষে বলা যায়, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কেবল একটি পরিসংখ্যানগত লক্ষ্য নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পরিবেশগত নিরাপত্তার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। এই উদ্যোগ যদি পরিকল্পিতভাবে, স্বচ্ছভাবে এবং জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি একটি সবুজ বিপ্লবের ভিত্তি স্থাপন করতে পারে। আর যদি কেবল সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে এর সম্ভাবনা অপূর্ণই থেকে যাবে। প্রকৃত সাফল্য তখনই অর্জিত হবে, যখন রোপিত প্রতিটি গাছ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি জীবন্ত আশ্রয় হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকবে।
লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট









