• ই-পেপার

২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ : বাংলাদেশের সবুজ ভবিষ্যতের রূপরেখা

যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি: বর্তমান সরকার যা করতে পারে

মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া
যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি: বর্তমান সরকার যা করতে পারে
মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির দোহাই দিয়ে রাজস্ব সংগ্রহ ও রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমেরিকায় আমদানিতব্য দ্রব্যাদির উপর অযৌক্তিক হারে (১০ শতাংশ থেকে ১৪৫ শতাংশ পর্যন্ত) শুল্কারোপ করেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার খেয়ালখুশিমতো বিভিন্ন দেশের উপর আরোপিত এ শুল্ক আবার হ্রাস-বৃদ্ধিও করেন। যখন মনে করেন, কোনো দেশ তার প্রস্তাবিত শুল্কারোপে নতজানু হয়ে অনুকূল সাড়া দিচ্ছে না, তখন শুল্কের পরিমাণ বাড়িয়ে দেন। একপর্যায়ে চীনের রপ্তানির উপর ১৪৫ শতাংশ এবং ভারতের রপ্তানির উপর ১০০ শতাংশ শুল্কারোপের ঘোষণা দেন। ২০২৫ সালের মার্চ-এপ্রিল থেকে জুলাই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকারপ্রাপ্ত ৬০টি দেশের ওপর শুল্কারোপের তাণ্ডব চলতে থাকে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে  এটি একটি নজিরবিহীন ঘটনা। গত ২ এপ্রিল ২০২৫ ট্রাম্প প্রশাসন নির্বাহী  আদেশ নং- ১৪২৫৭ জারির মাধ্যমে বাংলাদেশি পণ্যের উপর ৩৭ শতাংশ অতিরিক্ত পাল্টা শুল্ক আরোপ করে।
 
বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনার পর এ  শুল্ক ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের বার্ষিক রপ্তানি ৮.২ থেকে ৮.৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য যা একক রাষ্ট্র হিসেবে সর্বোচ্চ রপ্তানি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে বার্ষিক আমদানি প্রায় ২.৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য, অর্থাৎ বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র বছরে বাংলাদেশে প্রায় ১.২বিলিয়ন মূল্যের সেবা রপ্তানি করে। তাছাড়া বাংলাদেশে আমেরিকার বৈদেশিক বিনিয়োগ একক দেশ হিসেবে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যেই ট্রাম্পের অতিরিক্ত শুল্কারোপ। এর ফলে আমেরিকায় বাংলাদেশি রপ্তানি পণ্যে মোট শুল্কের পরিমাণ (২০ +১৫)= ৩৫ শতাংশ দাঁড়ায়।

যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য আহ্বান করলে এ পর্যন্ত বাংলাদেশসহ ৯টি দেশ আলাদা আলাদা এআরটি (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড) স্বাক্ষর করে। দেশগুলো হলো কম্বোডিয়া, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, আর্জেন্টিনা, তাইওয়ান, ইন্দোনেশিয়া, ইকুয়েডর, মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ। বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র এআরটি স্বাক্ষরিত হয়  ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখ। এ চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে শুল্ক আরও ১ শতাংশ কমে  ১৯ শতাংশে স্থির হয়। 

যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষরের পর দেশের সুশীল সমাজ, গবেষক, সাংবাদিক, থিংক ট্যাংক এ চুক্তির বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন যে, এটি একটি অসম বাণিজ্য চুক্তি, যা বাস্তবায়িত হলে আমেরিকা-যুক্তরাষ্ট্র বেশি লাভবান হবে, বাংলাদেশের লাভ হবে সামান্য। প্রথম আলোর বিশিষ্ট সাংবাদিক ও অর্থনীতিবিদ শওকত হোসেন ৪-৫ মে, ২০২৬ উক্ত কাগজে প্রকাশিত তার নিবন্ধে এ চুক্তি নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের এ সম্পর্কীত নিবন্ধটি প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয় ৯ মে, ২০২৬ তারিখে। এর আগে লেখক  ও গবেষক কল্লোল মোস্তফার বিশ্লেষণ প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয় ২০-২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। অধ্যাপক এম এম আকাশের লেখা পর্যালোচনা দৈনিক বার্তায় প্রকাশিত হয় ১৩ মে, ২০২৬। এছাড়াও পত্রিকার পাতায় বিভিন্ন লেখকের বেশ ক’টি বিশ্লেষণ/অভিমত/আলোচনা পড়ে আমার মনে হয়েছে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের চিন্তা ও বিবেচনার জন্য কিছু লেখা প্রয়োজন।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয় ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, অর্থাৎ দেশের ত্রয়োদশ সাধারণ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রণীত খসড়া চুক্তিটি পাওয়ার পর সরকারের হাতে বেশ কয়েক মাস সময় ছিল। এ সময়ে পর্যাপ্ত হোম ওয়ার্ক অর্থাৎ স্টেক হোল্ডারস কনসালটেশন, আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক কিংবা বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা ইত্যাদি হয়েছে কি না, তা জানা যায়নি। প্রতিপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় নেতৃত্ব দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন, বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমানসহ মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা, ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশের দূতাবাসের কর্মকর্তারা। ব্যবসায়ী বা বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের কাউকে আলোচনায় যুক্ত করা হয়নি। অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে চুক্তিটি পর্যালোচনা ও স্বাক্ষরিত হয়। সাবেক উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সাংবাদিকগণ তাকে এ চুক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান যে, চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বে অন্তর্বর্তী সরকার দেশের প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামাতে ইসলামীর সঙ্গে আলোচনা করেছে, যদিও জামায়াতে ইসলামী ইতিমধ্যে বলে দিয়েছে যে, তাদের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার আলোচনা করেনি।

অভিজ্ঞ মহলের কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- এমন একটি স্পর্শকাতর বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষরে তাড়াহুড়ার কি প্রয়োজন ছিল? কয়েকদিন পরেই নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার আসবে জেনেও চুক্তিটি স্বাক্ষরে কিছুদিন বিলম্ব করা গেল না কেন? দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, স্বার্থ ইত্যাদি বিবেচনায় যারা ভুক্তভোগী, উপকারভোগী কিংবা বাস্তবায়নকারী তাদের সঙ্গে কি চুক্তির সংশ্লিষ্ট ধারাসমূহ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে? চুক্তিটির বিষয়ে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখারই বা কারণ কি? এসব প্রশ্নের উত্তর অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে আছে বলে মনে হয় না।

তাড়াহুড়া করে চুক্তি করায় জনমনে সন্দেহে দানা বেঁধেছে। যদিও চুক্তিটি যেকোনো পক্ষের ৬০ দিনের নোটিশে বাতিল করার শর্ত আছে, তথাপি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রভাবশালী দেশের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল করা যেকোনো সরকারের পক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কয়েকটি বিদেশী সংস্থার সাথে আরও বেশ ক’টি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি হয়েছে, যেগুলোতে দরকষাকষি (নেগোসিয়েশন) হয়েছে সামান্যই। বিএনপি-জামাত উভয় দলই নির্বাচনের বিষয়ে এত বেশি আগ্রহী ছিল যে, তারা মুহম্মদ ইউনুস সরকারের কোনো কাজেই প্রশ্ন তোলেনি। নির্বাচনের মাত্র ৩ দিন আগে বাংলাদেশের স্বার্থের বিপক্ষে যায় এরূপ একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে অন্তর্বর্তী সরকার এর বাস্তবায়নের দায় চাপিয়ে গেলেন নির্বাচিত বিএনপি সরকারের ঘাড়ে।

চুক্তির কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারার বিষয়াবলী নিয়ে নিম্নে আলোচনা করা হচ্ছে: 

৩২ পৃষ্ঠার এই চুক্তিতে মাত্র ৬টি ধারায় অসংখ্য অনুচ্ছেদ রয়েছে। আবার চুক্তিটি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে তার উল্লেখ পরিশিষ্টে রয়েছে। পরিশিষ্টের সব সংযুক্তিই চুক্তির অংশ। এই পারস্পরিক বাণিজ্যিক চুক্তিতে বাংলাদেশের ওপর বাধ্যবাধকতাই বেশি, সে তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বাধ্যবাধকতা খুবই কম। সাংবাদিক শওকত হোসেনের ভাষায় ‘বাংলাদেশকে মানতে হবে ১৩১ শর্ত, আর যুক্তরাষ্ট্রকে মানতে হবে মাত্র ৬টি শর্ত’। 

যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক (১৬+৩৭=৫৩ শতাংশ) আরোপের কারণে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানিকারক তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের হৈচৈ ও হা-হুতাশ বন্ধ করার জন্য যে চুক্তি করা হলো তার মাধ্যমে ৩৪ শতাংশ শুল্কে আমাদের তৈরি পোশাক আমেরিকার বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হলো। কিন্তু বিনিময়ে দেশের ১৮ কোটি মানুষের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৯২২টি পণ্য চুক্তি কার্যকর হওয়ার দিন থেকে শুল্কমুক্ত হবে এবং আগামী ১০ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের ৭১৩২টি পণ্যের শুল্ক তুলে নিতে হবে। বিনিময়ে বাংলাদেশ ১৬৩৮টি পণ্যে শুল্ক ছাড় সুবিধা পাবে।

এক হিসাবে দেখা গেছে, এ শুল্ক ছাড়ের ফলে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১৩২৭ কোটি টাকা শুল্ক হারাবে (সিপিডি), তবে উপরিউক্ত নির্ধারিত পণ্য ব্যতিত অন্যান্য পণ্যে বাংলাদেশ নির্ধারিত হারে শুল্ক বসাতে পারবে, যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক বসাবে।

অশুল্ক বাধা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ক ধারায় ১১টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। পরীক্ষা, মান যাচাই বা ব্র্যান্ড উল্লেখ ইত্যাদির অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের আমদানি বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগার থেকে সনদপ্রাপ্ত হলে বাংলাদেশ কোনো অতিরিক্ত শর্ত আরোপ করতে পারবে না। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের মান যাচাই চলবে না। চুক্তির শর্তানুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি পণ্যের জন্য বাংলাদেশি বাজারে অগ্রাধিকার দিতে হবে। স্বাস্থ্য বা নিরাপত্তার কারণে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে তা হতে হবে বিজ্ঞানভিত্তিক ও ঝুঁকিভিত্তিক। বাংলাদেশ এমন কোনো স্বাস্থ্যবিধি বা মানদণ্ড দেবে না, যাতে মার্কিন পণ্য অন্য দেশের তুলনায় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। 

বাংলাদেশ মেধাস্বত্বের সুরক্ষা দেবে, অর্থাৎ মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার মতো ব্যবস্থা নিতে হবে। মেধাস্বত্ব যাচাইয়ের জন্য শুল্ক স্টেশনে বাংলাদেশ যে ব্যবস্থা নেবে তা যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা যাচাই করতে পারবেন।

যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজেদের শ্রমিক ও ব্যবসা রক্ষায় সীমান্তে কোনো নিয়ম চালু করে, বাংলাদেশ সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিল রেখে কাজ করবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজেদের রপ্তানিকারকদের কর ছাড় দেয়, বাংলাদেশ এর বিরোধিতা করবে না। বাংলাদেশ এমন ভ্যাট ধার্য করবে না যাতে যুক্তরাষ্ট্রের কম্পানির প্রতি বৈষম্য হয়।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামাফিক চলতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি তার নিজের স্বার্থে কোনো দেশের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের শুল্ক বা অশুল্ক প্রতিবন্ধকতা আরোপ করে, তাহলে চুক্তির এই ধারা অনুযায়ী সে দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য যতই লাভজনক হোক বা কৌশলগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ হোক, বাংলাদেশকে তখন যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া পদক্ষেপের অনুরূপ ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার তৃতীয় দেশের মালিকানাধীন কোনো কম্পানি বাংলাদেশ থেকে খুব কম দামে রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ক্ষতিগ্রস্ত করলে বাংলাদেশ ব্যবস্থা নেবে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে তথ্য দেবে। 

জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ পণ্য বা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এমনভাবে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেবে যাতে তা যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ম বা ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। বাংলাদেশ নিজের আইনের সীমার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করবে, যাতে কেউ লেনদেনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি আইন ভঙ্গ করতে না পারে। বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগের তথ্যও যুক্তরাষ্ট্রকে প্রদান করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ডিজিটাল পণ্যের সঙ্গে বাংলাদেশ কোনো বৈষম্য করতে পারবে না। ‘ব্যবসা প্রয়োজনে’ বাংলাদেশের ডিজিটাল তথ্যের ডাটা অন্য দেশে বা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোনো ধরনের বাধা দিতে পারবে না।

বাংলাদেশ তার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ খাতকে এমনভাবে মার্কিন কম্পানির জন্য উন্মুক্ত করবে, যাতে মার্কিন কম্পানি বাংলাদেশের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও জ্বালানি কেবল অনুসন্ধান, উত্তোলন, শোধন, প্রক্রিয়াজাতকরণ পরিবহন ও বিতরণই করতে পারবে না, মার্কিন কম্পানি সেটা ইচ্ছামাফিক রপ্তানিও  করতে পারবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ মার্কিন কম্পানির সঙ্গে কোনো বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারবে না।
যুক্তরাষ্ট্র লিখিতভাবে চাইলে বাংলাদেশ ভর্তুকি সংক্রান্ত তথ্য দেবে। এ ধরনের ভর্তুকি বা সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ও বিনিয়োগে অসাম্য তৈরি হলে বাংলাদেশ তা কমাতে পদক্ষেপ নেবে। জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এমন কোনো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকেও যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি ব্যতিত ভর্তুকি দেওয়া যাবে না।

অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কীত ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিদেশ থেকে কী কী বিনিয়োগ, কী কী শর্তে আসছে তার তথ্য যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে বাংলাদেশ সহযোগিতা করবে। যদি তারা মনে করে বাংলাদেশে আসা প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো দেশের বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি, তাহলে সেই বিনিয়োগ বন্ধ করার জন্য চাপ দিতে পারবে। 

বাংলাদেশ অবাজার (নন মার্কেট) অর্থনীতির কোনো দেশের সঙ্গে মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো বাণিজ্য চুক্তি করতে পারবে না। অবাজার অর্থনীতির দেশ বলতে চীন, রাশিয়া ও ভিয়েতনামকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশকে এসব দেশের সঙ্গে কোনো ধরনের নতুন বাণিজ্য চুক্তি করা থেকে বিরত রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা বাড়াতে হবে এবং সুনির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা সীমিত করতে হবে। 

আরো বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা বাণিজ্য সহজতর ও জোরদার করবে। প্রকারান্তরে সাময়িক ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মুখাপেক্ষী করে তোলা হয়েছে। 

পারমানবিক প্রযুক্তি ব্যবহারে কতিপয় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। মার্কিন স্বার্থকে হুমকীর মুখে ফেলে এমন কোনো দেশ থেকে বাংলাদেশ নতুন করে নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর, ফুয়েল রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কেনার চুক্তি করতে পারবে না। অর্থাৎ বাংলাদেশ যদি নতুন করে কোনো পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমেই করতে হবে। তবে ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র চুক্তি এর বাইরে থাকবে।

দ্রব্যাদি ক্রয় বিক্রয়ের জন্য বীমা করার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক রিইন্সুরেন্স প্রথা তুলে নিতে হবে। ফলে মার্কিন বীমা কম্পানিগুলোকে তাদের অন্তত ৫০ শতাংশ ব্যবসা সাধারণ বীমা করপোরেশনকে দিতে হবে না।
 
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের রপ্তানি মূল্যের চেয়ে আমদানি মূল্য কম। তাতে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি থাকে। সেজন্য এ চুক্তি অনুযায়ীই বাংলাদেশকে বাধ্যতামূলকভাবে আরো বেশি আমদানি করতে হবে। এখানে তাৎক্ষণিক প্রয়োজন কিংবা মূল্য কিছুই বিবেচ্য নয়। আমরা ভারত কিংবা চীন থেকে যত আমদানি করি তার প্রায় এক দশমাংশ রপ্তানি করি। আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি পূরণের জন্য আমরা ভারত ও চীনকে অধিক আমদানির জন্য বাধ্য করতে পারি না। চুক্তির শর্তানুযায়ী, কিছু পণ্য আমাদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রায় বিনা শুল্কে আমদানি করতে হবে। যেমন- মাছ, হাঁস-মুরগি, ডিম, মাংস, দুধ ও দুগ্ধজাত কয়েকশ পণ্য। এগুলো আমাদের দেশেই উৎপন্ন হয়। এসবের উৎপাদনে দেশে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু করপোরেট গোষ্ঠীর ব্যবসা নিশ্চিত করার জন্য এগুলো আমাদের বাধ্যতামূলক আমদানি করতে হবে, যাতে দেশে বহু মানুষের কর্মসংস্থান বিপন্ন হবে। এসব আমদানিতে পণ্যের মান যাচাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড সেফটি অ্যান্ড ইনসপেকশন সার্ভিসের সার্টিফিকেটই মেনে নিতে হবে। বাংলাদেশ যদি হালাল সনদ বাধ্যতামূলক করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব সনদদাতা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের শর্ত পূরণ করবে, তাদের হালাল সনদ বাংলাদেশকে মেনে নিতে হবে। বার্ড ফ্লু ধরা পড়লে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পুরো অঙ্গরাজ্য থেকে পোলট্রি, ডিম বা সংশ্লিষ্ট পণ্য আমদানি বন্ধ করতে পারবে না। নিষেধাজ্ঞা শুধু আক্রান্ত এলাকার ১০ কিলোমিটার জোনে সীমিত রাখতে হবে।
 
মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির কারণে বাংলাদেশের ঔষধ শিল্প বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা প্রথম আলোতে ২২ এপ্রিল, ২০২৬ প্রকাশিত মাহা মির্জার বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়। আইপি আইনের বাধ্যবাধকতা, বন্দরে ডিজিটাল এনফোর্সমেন্ট, আমেরিকা থেকে অবাধে ঔষধ আমদানি আমাদের ঔষধ শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। অথচ এলডিসি হওয়ার কারণে আমাদের ঔষধ কম্পানিগুলো এতদিন ঔষধ কাঁচামাল ক্রয়ে ব্র্যান্ডগুলোকে পেটেন্ট ফি দিতে হতো না। এ সুবিধা আমাদের ঔষধ কম্পানীগুলোর ২০৩৩ সাল পর্যন্ত ভোগ করার কথা থাকলেও মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির কারণে পেটেন্ট ফি দিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি পূরণের জন্য বাংলাদেশকে বাধ্যতামূলকভাবে কতিপয় পণ্য ক্রয় করতে হবে। যথা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রতিবছর ৭ লাখ মেট্রিকটন গম, ১.২৫ বিলিয়ন ডলারের সয়াবিন, ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের তুলা কিনতে হবে। এছাড়া কিনতে হবে ১৪টি বোয়িং বিমান, ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের এলএনজি।

এ যাবৎ বাংলাদেশ তুলা, সয়াবিন, গম, এলএনজি প্রতিযোগিতামূলক দরে যেখানে অপেক্ষাকৃত কম দামে পাওয়া যায় সেখান থেকে কিনত। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি দামে সেগুলো কিনতে হবে, যদিও গম, সয়াবিন প্রভুতি ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র গুণগত মানের দিক দিয়ে উঁচু মানের যুক্তি দেখাচ্ছে।

চুক্তি কার্যকর করার জন্য দুই পক্ষ নিজেদের আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে লিখিতভাবে জানালে ৬০ দিন পর চুক্তি চালু হবে। আবার যেকোনো পক্ষ ৬০ দিনের নোটিশ দিয়ে চুক্তি বাতিল করতে পারবে।

বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে এ যাবৎ যে ৯টি দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, তার মধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তির ভাষা সর্বাধিক কঠোর, আধিপত্যপূর্ণ ও বাধ্যতামূলক শর্তাদিযুক্ত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের অনুকূল, তথা বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী। চুক্তিপত্রে কেবল আমদানি পণ্যের শুল্ক নয় বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ও নিয়ন্ত্রণকাঠামো ঢেলে সাজানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যকে শুল্ক ছাড়ের সুবিধা দিলে এমএফএন নীতির কারণে অন্য দেশগুলোকে একই সুবিধা দিতে হতে পারে। এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পথ রুদ্ধ হতে পারে। প্রয়োজন থাকুক আর নাই থাকুক ‘খাদ্য নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য, পোলট্রি ও ডেইরি পণ্য আমদানি করতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তার অজুহাতে তেল ও এলএনজি আমদানি করতে হবে। অতিরিক্ত সংখ্যক বিমান চালানো, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা ও সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও ১৪টি বোয়িং বিমান ক্রয়ের চুক্তি করতে হয়েছে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে অপেক্ষাকৃত কম দামে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি করে। যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের চাহিদা ও প্রয়োজনের কারণেই তাদের আমদানিকারকরা বাংলাদেশ থেকে পোশাক কেনে। এটি তাদের কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়। বাংলাদেশ থেকে না কিনলে অন্য কোনো দেশ থেকে তাদের এসব সামগ্রী ক্রয় করতে হবে। বাণিজ্য সমতা আনার অজুহাতে বাধ্যতামূলকভাবে ক্রয়ের তালিকায় যেসব দ্রব্যাদি তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, বাংলাদেশ সেসব এ যাবৎ মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে অপেক্ষাকৃত সাশ্রয়ীমূল্যে ক্রয় করে আসছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের যে পাল্টা শুল্কের কারণে অতি দ্রুততার সঙ্গে বাংলাদেশ এ চুক্তিতে রাজি হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ আদালত দুই দফায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আরোপিত শুল্ক বাতিল করেছে। ফলে চুক্তির তাৎপর্য ও প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশে কমে গেছে। এ চুক্তির দরকষাকষি ও স্বাক্ষরের সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশ পক্ষের অন্যতম ব্যক্তি সাবেক বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জাতীয় নির্বাচনের পর সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘হয়তো এ চুক্তি বাতিল হতে পারে।’ নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার এ চুক্তি মানবে কি না, এ বিষয়ে তিনি সন্দিহান ছিলেন।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতিহারে পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ মূলনীতির কথা বলা হয়েছে। ‘পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং জনগণের কল্যাণ সর্বাগ্রে প্রাধান্য পাবে। সমতা, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে বাংলাদেশ একটি আত্মমর্যাদাশীল, সক্রিয় ও দায়িত্বশীল বৈশ্বিক অবস্থান গ্রহণ করবে।’
মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির বিভিন্ন ধারায় যেভাবে আমাদের সার্বভৌমত্ব জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি রয়েছে এবং

বাংলাদেশের জন্য অসমতা, অন্যায্যতা এবং অসম্মানজনক ধারা রয়েছে তা বিএনপির রাষ্ট্রনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যদি নির্বাচনের ৩ দিন পূর্বে এটি স্বাক্ষর না করত, তবে রাজনৈতিক সরকার চুক্তির বর্তমান অবস্থায় এটি স্বাক্ষর করত কিনা সন্দেহ রয়েছে। কোনো জবাবদিহিমূলক সরকার জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিতে পারে না।

বাণিজ্য চুক্তিটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়নি। এটি মন্ত্রিসভা অনুসমর্থন করার পর যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে জানানো হলে একটি নির্দিষ্ট তারিখ থেকে চুক্তিটি কার্যকর হবে। তবে চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার পূর্বেই অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান বিএনপি সরকার এর বাস্তবায়ন শুরু করেছে। গম আমদানির চুক্তি হয়েছে ২০২৫ সালের ২০ জুলাই। প্রতিবছর অন্তত ৭ লাখ মেট্রিক টন করে ৫ বছর গম কিনতে হবে। বোয়িং থেকে ১৪টি বিমান আমদানির চুক্তি হয়েছে ৩০ এপ্রিল ২০২৬। যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘমেয়াদী এলএনজি আমদানির চুক্তি হয়েছে ২০২৫ সালের ২৪ জানুয়ারি। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের জ্বালানি কিনবে। আরো আমদানি চুক্তি পাইপলাইনে আছে বলে শোনা যাচ্ছে। এছাড়া মে’ ২০২৬ মাসের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সহযোগিতার একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছেন।

এমতাবস্থায় এ অসম এবং বাংলাদেশের জন্য আত্মঘাতী চুক্তি বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে সরকার যদি একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন বা বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে চুক্তিটি পর্যালোচনা করে অনুসমর্থনের পূর্বেই সংশোধনের পদক্ষেপ নেয় এবং উভয়পক্ষের জন্য মর্যাদাপূর্ণ ও লাভজনক একটি চুক্তিতে উপনীত হতে পারে তবে দেশ ও সরকারের জন্য তা মঙ্গলজনক হবে। কোনো বিশেষ রাষ্ট্রের সঙ্গে জোটভুক্ত না হয়ে সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রেখে চলতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভূক্ত দেশগুলোর মোট আমদানি যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্র যে রপ্তানি সুবিধা চাচ্ছে ইউরোপের দেশগুলো তা চাইলে বাংলাদেশকে অনুরূপ সুবিধা দিতে হবে। ব্যবসা বাণিজ্য ও সামরিক ক্ষেত্রে কোন বিশেষ দেশের সঙ্গে বিশেষ চুক্তি করা হলে অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার যদি চুক্তির শর্তাদি পরিবর্তন  করতে নমনীয় না হয়, তবে চুক্তি বাতিলের পথে এগুতে হবে।

লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যান, সাবেক রাষ্ট্রদূত

ইউনূসের কালো আইনে অর্থনীতির সর্বনাশ

অদিতি করিম
ইউনূসের কালো আইনে অর্থনীতির সর্বনাশ

বিচারের আগেই কি কাউকে ফাঁসি দেওয়া যায়?

এ প্রশ্ন শুনে অনেকেই অবাক হবেন হয়তো, ভাববেন, এটা কি কখনো সম্ভব নাকি?

আমাদের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার স্বীকৃত রয়েছে। একজন নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উপযুক্ত আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগে তাকে নির্দোষ হিসেবে বিবেচনা করা আইনের শাসনের অন্যতম মৌলিক শর্ত। কিন্তু ইউনূস সরকারের দেড় বছরের শাসনকালে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং সংবিধান লঙ্ঘন করা হয়েছে প্রতি পদে। ইউনূসের শাসনামলে সবচেয়ে বড় কালো আইন ছিল দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের সংশোধন। এ আইন সংশোধন করে আন্ডার কাভার তদন্তের নামে হয়রানি, বিচারের আগেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ, সম্পত্তি ক্রোক করার মতো স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ করে দেওয়া হয়। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের দুদক সংস্কার-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের আলোকে আইন মন্ত্রণালয় থেকে দুদক আইন-২০০৪-এর অধিকতর সংশোধনের জন্য প্রজ্ঞাপন জারি করে গত ২৩ ডিসেম্বর। 

আরো পড়ুন
ঢাকার আতঙ্ক ১৩৮৭ ছিনতাইকারী

ঢাকার আতঙ্ক ১৩৮৭ ছিনতাইকারী

 

নতুন সরকার গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় ১২ মার্চ। এ দিনেই দুদক-সংক্রান্ত অধ্যাদেশসহ ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদ অধিবেশনে উত্থাপন করা হয়। ওই ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে পাস হয় ১১৩টি, বাতিল হয় সাতটি। বাকি ১৩টি অধ্যাদেশের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এর মধ্যে দুদক সংশোধন অধ্যাদেশও ছিল। আইন অনুযায়ী, গত ১২ মার্চ অধিবেশনে উত্থাপনের দিন থেকে গত ১১ এপ্রিল পর্যন্ত ৩০ দিন পার হওয়ার পর ওই ১৩টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারিয়েছে। গত ১১ এপ্রিল থেকেই আগের দুদক আইন-২০০৪ পূর্ণাঙ্গভাবে বহাল হয়েছে। 

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ গ্রহণ না করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ ওই অধ্যাদেশ ছিল সংবিধানের মূল চেতনার পরিপন্থি। এতে তদন্ত ও বিচার ছাড়াই সম্পদ জব্দ করাসহ চরম স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। কাউকে বিনা বিচারে সাজা দেওয়া কেবল বেআইনি নয়, রীতিমতো অপরাধ। কিন্তু ইউনূস সরকার দেড় বছর ধরে এই কাজটি করছে এ অধ?্যাদেশ জারি করে। ইউনূসের কালো আইন বাতিল হলেও এ আইনের আওতায় যারা হয়রানির শিকার হয়েছেন তাদের মুক্তি মেলেনি। অবৈধভাবে যাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছিল, যাদের বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় এবং যাদের সম্পত্তি বিচারের আগেই ক্রোক করা হয়েছিল, ইউনূসের কালো আইন বাতিলের ফলে সেসব কর্মকাণ্ড আপনাআপনিই আইনবহির্ভূত হয়ে যায়। তার পরও ভুক্তভোগীরা এখনো প্রতিকার পাননি।

আরো পড়ুন
অপচয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

অপচয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

 

দুর্নীতি দমন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ইউনূসের এ কালো আইনে প্রায় দেড় হাজার ব্যবসায়ী এবং নিরীহ মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। তদন্তের আগেই প্রায় ১ হাজার শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিদের বিদেশযাত্রার নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ৫৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। এর ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের অর্থনীতি। ইউনূসের এ কালো আইনের কারণে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি এবং উদ্যোক্তাদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। অনেকে ব্যবসা বন্ধ করে দেন। ফলে নতুন করে বেকার হয়ে পড়ে কয়েক লাখ মানুষ। একদিকে বেকারত্ব বেড়েছে, অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগ না হওয়ায় কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে।

ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধের কারণে বহু ভালো ব্যবসায়ী নতুন করে ঋণখেলাপি হয়েছেন। খেলাপি ঋণের কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা ধরনের সুবিধা দেওয়ার পরও চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে দেশের ৬১ তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ৪৪টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে। একসঙ্গে এতগুলো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এর আগে কখনো হয়নি বলে জানান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। কেবল দুর্বল ব্যাংক নয়, এবার আর্থিক সূচকে ভালো অবস্থানে থাকা সিটি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, উত্তরা ব্যাংক ও বিদেশি মালিকানাধীন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকেরও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এটি ইউনূসের কালো আইনের ফল। যাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে তারা ঋণ পরিশোধ করবেন কীভাবে? আজ বিশ্বায়নের যুগে  ব্যবসা করতে বিদেশ যেতেই হবে। কিন্তু বছরের পর বছর যদি উদ্যোক্তা, শিল্পপতিদের বিদেশে যেতে নিষেধাজ্ঞা থাকে তাহলে তারা ব্যবসা করবেন কীভাবে? বিদেশে যেতে না পারায় অনেকেই ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন। যার প্রভাব পড়েছে আর্থিক খাতে এবং অর্থনীতিতে।

আরো পড়ুন
বিশাল ঘাটতি মেটাতে ঋণে অর্থমন্ত্রীর বাজি!

বিশাল ঘাটতি মেটাতে ঋণে অর্থমন্ত্রীর বাজি!

 

বেসরকারি খাত এ কালো আইনের কারণে বিপর্যস্ত। দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত। ইউনূসের এ কালো আইনে দেশের অর্থনীতির সর্বনাশ হয়েছে। দুর্নীতি দমন এবং অর্থ পাচার এখন সব দেশেরই বড় সমস্যা। কিন্তু পৃথিবীর কোথাও এরকম নিকৃষ্ট কালো আইন নেই। ভারতে ১৯৮৮ সালে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন প্রণয়ন করা হয়, যা ২০১৮ সালে সংশোধন করা হয়। অন্যদিকে, অর্থ পাচার প্রতিরোধে ২০০২ সালে নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়। ভারতে দুর্নীতি তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাকে বলা হয় সিবিআই (কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা)। 

অন্যদিকে অর্থ পাচার তদন্ত করে ইডি (এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট)। ভারতের আইনে তদন্তকারী সংস্থা আদালতের রায়ের আগে কারো সম্পত্তি বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করতে পারে না। শুধু চার্জশিট প্রদানের পর আদালতের অনুমতি-সাপেক্ষে লেনদেন সীমিত করতে পারে। যেন অভিযুক্ত ব্যক্তি পুরো টাকা উত্তোলন করে নিয়ে যেতে না পারে। ভারতে বিদেশযাত্রার নিষেধাজ্ঞা জারির ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলার চার্জশিট প্রদান করতে হয়। কেবল অভিযোগ আছে এ কারণে বিদেশযাত্রার নিষেধাজ্ঞা জারি করা যায় না। এ বিষয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায় আছে। ভারতে বিশেষ পরিস্থিতিতে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে। তবে কোনো অবস্থাতেই তা অনির্দিষ্টকালের জন্য নয়। এরকম নিষেধাজ্ঞা জারির সুনির্দিষ্ট কারণ এবং সময়কাল আদালতে পেশ করতে হয়। পাকিস্তানে এখনো ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি দমন আইন কার্যকর। যে আইনে শুধু আদালতে দোষী প্রমাণিত হলেই কেবল তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কিংবা সম্পদ জব্দ করা যায়। পাকিস্তানে বিশেষ ক্ষমতা আইনে সর্বোচ্চ তিন মাসের জন্য বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা জারি করা যায়। এ ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণ উল্লেখ করতে হবে।

আরো পড়ুন
একনজরে আজকের কালের কণ্ঠ (৯ জুন)

একনজরে আজকের কালের কণ্ঠ (৯ জুন)

 

যুক্তরাজ্যে দুর্নীতি এবং অর্থ পাচার (Money Laundering) রোধে অত্যন্ত কঠোর আইনি কাঠামো রয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে ‘ক্লিন মানি’ বা স্বচ্ছ অর্থব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কাজ করে। ব্রিবারি অ্যাক্ট-২০১০ (Bribery Act 2010), যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুর্নীতিবিরোধী আইন, যা ২০১১ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে। এ আইনে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করার অধিকার নেই। শুধু ব্যাংক হিসাব বিবরণীর যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। প্রসিডিংস অব ক্রাইম অ্যাক্ট ২০০২ (Proceeds of Crime Act 2002-POCA) : এ আইনের অধীনে অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ (যেমন—দুর্নীতি, মাদক বা অপরাধের অর্থ) এ আইনে প্রাথমিক তদন্তের পর যুক্তিসংগত কারণ দেখিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ চিহ্নিত করে সাময়িকভাবে জব্দ করা যায়। কিন্তু এসব দেশে অন্তহীন সময়ের জন্য বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার বিধান নেই।

আরো পড়ুন
ঋণের ফাঁদে আটকা মানুষ

ঋণের ফাঁদে আটকা মানুষ

 

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী একজন ব্যক্তিকে অন্তহীন মেয়াদে বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জনস্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে বাংলাদেশের সর্বত্র অবাধ চলাফেরা, ইহার যে কোনো স্থানে বসবাস ও বসতিস্থাপন এবং বাংলাদেশ ত্যাগ ও বাংলাদেশে পুনঃপ্রবেশ করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।’ বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ দুদক বনাম জি বি হোসেন মামলার ঐতিহাসিক রায়ে বলেছে, ‘একজনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা আছে শুধু এ যুক্তিতে তাকে বিদেশে যেতে বাধা দেওয়া যায় না। কেবল ফৌজদারি মামলায় আছে এ অজুহাতে সংবিধানের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।’ (৭৪ ডিএলআর)।

ইউনূস আমলে কেবল সংবিধানের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়নি আপিল বিভাগের রায় অমান্য করে আদালত অবমাননা করা হয়েছে। বিএনপি সরকার এ কালো আইন বাতিল করেছে। কিন্তু এ আইনের মাধ্যমে যাদের সীমাহীন দুর্ভোগ হয়েছে তাদের হয়রানি থেকে মুক্তি মেলেনি। অনতিবিলম্বে সরকার এ কালো আইনের আওতায় যারা নিপীড়নের শিকার হয়েছেন তাদের পাশে দাঁড়াবে বলে আমাদের বিশ্বাস। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়ে, বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে দেশে একটি সুস্থ, স্বাভাবিক বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে সরকার আশা করি আর বিলম্ব করবে না।

দ্রুততম রায়ের নজির

কার্যকরেও সৃষ্টি হোক দৃষ্টান্ত

অনলাইন ডেস্ক
দ্রুততম রায়ের নজির
সংগৃহীত ছবি

আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় দোষী দুজনের মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হয়েছে। ঘটনার ১৯ দিনের মাথায় এবং মামলার বিচার শুরু থেকে রায়ের পর্যায়ে এসেছে মাত্র চার কার্যদিবসে। আদালত দেখালেন অনুকরণীয় নজির। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। কারণ যখন কোনো শিশু যৌন নির্যাতন, সহিংসতা কিংবা হত্যার মতো নৃশংসতম অপরাধের শিকার হয়, তখন তা শুধু পরিবার নয়, গোটা সমাজকে গভীরভাবে আহত করে। রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ব্যাপক আলোচিত এবং অতিসংবেদনশীল রামিসার ঘটনা সারা দেশে সর্বসাধারণের মনে বিস্ফোরণোন্মুখ বিক্ষোভ সৃষ্টি করে।

সব পক্ষের সক্রিয় তৎপরতায়, দ্রুততম সময়ে বিচার সম্পন্ন হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও। কারণ তিনি ঘটনার খুব অল্প সময়ের মধ্যে তার ঊর্ধ্বতন পারিষদদের নিয়ে রামিসাদের ছোট্ট বাসায় গিয়েছিলেন। অনেকটা সময় থেকে, নিহত শিশুটির পরিবারকে সান্ত্বনা এবং দ্রুত বিচারের আশ্বাস দিয়েছিলেন। স্বল্পতম সময়ের মধ্যে রায় ঘোষণায় তার নির্দেশনা অবশ্যই গতি সঞ্চার করেছে।

প্রিয় কন্যাকে হারিয়ে পাগলপ্রায় পিতা বলেছেন, ‘মেয়েকে তো আর ফিরে পাব না; রায়ে সন্তুষ্ট হয়েছি। এখন দ্রুত এই রায় কার্যকর দেখতে চাই।’ তিনি পরিবারের চরম দুঃসময়ে মানসিকভাবে সহায়তা জোগানোর জন্য গণমাধ্যম, পুলিশ প্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং দেশের মানুষের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানান। কিন্তু এই সন্তুষ্টিই যেন শেষ কথা না হয়। খোদ রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা হত্যার ঘটনাটা ছিল রোমহর্ষক। এতে দেশবাসী স্তম্ভিত হয়। দ্রুত বিচার দাবিতে ফুঁসে ওঠে জনগণ। আঁচ লাগে রাষ্ট্রযন্ত্রে। তারই প্রতিফলন ঘটেছে বিচার এবং রায়ে।

কিন্তু সাধারণ ক্ষেত্রে বিভিন্ন নৃশংস হত্যাকাণ্ড, বিশেষ করে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় তদন্ত ও বিচারে ব্যাপক দীর্ঘসূত্রতাই সাধারণ চিত্র। দুর্ভাগ্যজনক যে ২০১২ সালে নিহত সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের আজও সুরাহা হয়নি। বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদছে। এই শম্ভুকগতির নেতিবাচক অভিধা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত বিচার বিভাগের। কারণ ন্যায়বিচার পাওয়ার সেটাই তো মানুষের আস্থা ও ভরসার শেষ ঠিকানা। তার গরিমা ম্লান হতে দেওয়া চলে না। সেজন্যই পর্যায়ক্রমে আলোচিত-অনালোচিত নির্বিশেষে সব মামলার বিচার নিষ্পন্ন হোক।

আর কোনোভাবেই যেন আইনের কোনো দীর্ঘসূত্রতার ফাঁকফোকরে রামিসার খুনিদের দণ্ড কার্যকর বিলম্বিত না হয়। বর্তমানে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের যে উদ্বেগজনক অবস্থা দৃশ্যমান, সেখানে দণ্ডিত খুনিদের দ্রুত ফাঁসি দৃষ্টান্তই শুধু নয়; অপরাধপ্রবণদের মনে ভীতি সৃষ্টি করবে। তাতে এ ধরনের অপরাধ কমবে, যা খুব জরুরি।

সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

সম্পর্ক উন্নয়ন দিল্লির স্বার্থেই জরুরি

রোমান উদ্দিন
সম্পর্ক উন্নয়ন দিল্লির স্বার্থেই জরুরি
রোমান উদ্দিন।

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক শুধু দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়। এটি ইতিহাস, ভৌগোলিক বাস্তবতা, নদী, সীমান্ত, বাজার, সংস্কৃতি, নিরাপত্তা এবং দুদেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিন্তু সম্পর্কের ঐতিহাসিক গভীরতা সত্ত্বেও গত কয়েক বছরে পারস্পরিক আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের জনপরিসরে একটি ধারণা ক্রমে শক্তিশালী হয়েছে যে দিল্লি বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও জনগণের চেয়ে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে বেশি স্বস্তিবোধ করে। কোনো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক যদি রাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্রে না গিয়ে, দল থেকে দলে সীমাবদ্ধ বলে প্রতীয়মান হয়, তবে তা দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হয় না। ফলে জুলাই অভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক প্রকাশ্য টানাপোড়েনে রূপ নিয়েছিল।

তবে ফেব্রুয়ারিতে নতুন নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে দিল্লি। নরেন্দ্র মোদির দ্রুত অভিনন্দন, শপথ অনুষ্ঠানে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠানো, দীনেশ ত্রিবেদীর মতো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে ঢাকায় হাইকমিশনার করার সিদ্ধান্ত এবং ভিসা, বাণিজ্য, গঙ্গা ও তিস্তা নিয়ে আলোচনায় ফেরার ইঙ্গিত স্পষ্ট করেই দেখায় যে দিল্লি ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের প্রয়োজন বুঝেছে।

এদিকে বাংলাদেশের নতুন সরকারও ভারতের সঙ্গে নিরাপত্তা, যোগাযোগ, পানি ও বাণিজ্য নিয়ে আলোচনার পথ খোলা রেখেছে। সম্পর্ক উন্নয়নে দুই দেশের যৌথ দায়িত্ব থাকলেও তুলনামূলক বড় অর্থনীতি, উদীয়মান আঞ্চলিক শক্তি, পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্র ও নিজেদের স্বার্থের বিবেচনায় এখানে ভারতের দায়িত্ব তুলনামূলকভাবে বেশি। প্রথমত এই দায়িত্বের গুরুত্ব আরো গভীরভাবে বোঝা যাবে, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে। সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।

রাশিয়া থেকে তেল কেনার ফলে গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে, যা পরবর্তী আলোচনার মাধ্যমে কিছুটা শিথিল হলেও ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এইচ-১বি ভিসাসংক্রান্ত কঠোরতা এবং ভারতকে নিয়ে মার্কিন রাজনৈতিক পরিসরে বিভিন্ন বিতর্কিত মন্তব্য দিল্লির কূটনৈতিক পরিসরে অস্বস্তি তৈরি করেছে। কিন্তু একই সময়ে ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ পাকিস্তানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সখ্য বেড়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখছে, যা পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় নতুন করে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়াতেও বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন করে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন করেছে। দীর্ঘ বিরতির পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি বাণিজ্যিক যোগাযোগ, জাহাজ চলাচল ও আকাশপথে সংযোগ আলোচনায় এসেছে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের টানাপোড়েন দিল্লির কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে উপেক্ষণীয় নয়। ইসলামাবাদের সঙ্গে ঢাকার স্বাভাবিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে ভারতের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই, যদি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক স্থিতিশীল থাকে। কিন্তু সম্পর্কের অস্বস্তি যদি অন্য শক্তির জন্য কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করে, তবে সেটি ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হওয়াই স্বাভাবিক। তাই বর্তমান আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাস্তবতায় ভারতের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন কেবল সৌজন্যমূলক কূটনীতির বিষয় নয়, বরং কৌশলগত প্রয়োজন। এটা তাদের না বোঝার কোনো কারণ নেই।

দ্বিতীয়ত চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাস্তবতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের প্রশ্নে বাংলাদেশ বহুদিন ধরে সমাধান প্রত্যাশা করছে। কিন্তু ভারতের অভ্যন্তরীণ জটিলতা ও কার্যকর অগ্রগতির অভাবে তিস্তা চুক্তি দীর্ঘদিন ঝুলে থাকায় বাংলাদেশের ভিতরে বিকল্প নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনা অনেকটাই এগিয়েছে। তবে এখানে চীনের সম্ভাব্য ভূমিকা স্বভাবতই ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়াতে পারে। তিস্তা অববাহিকার অবস্থান ভারতের সংবেদনশীল শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’-এর কাছাকাছি, যা ভারতের মূল ভূখণ্ডকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

এখানে চীনের অন্তর্ভুক্তি ভারতীয় নিরাপত্তা মহলে যথেষ্ট উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু এই উদ্বেগের কার্যকর উত্তর সন্দেহপ্রবণ ভাষা নয়। বরং ভারতের জন্য কার্যকর পথ হলো আস্থাভিত্তিক আলোচনা জোরদার করা এবং বহুদিনের অমীমাংসিত তিস্তা চুক্তির ক্ষেত্রে অগ্রগতি দৃশ্যমান করা। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান, দীর্ঘদিন তিস্তা চুক্তির পথে বাধা হিসেবে আলোচিত হয়েছে। এখন পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কেন্দ্র ও রাজ্যের সমন্বয় তৈরি হলে, তিস্তা প্রশ্নে নতুন উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। ভারতের নিজের স্বার্থেই এ সুযোগ নষ্ট করা উচিত হবে না। যদি না মমতার লাগাতার বিরোধিতা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পাতানো বিরোধিতা না হয়ে থাকে।

পাশাপাশি, গঙ্গা পানিবণ্টনও এখন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ এ বছর শেষ হবে। নতুন বাস্তবতায় এর নবায়ন বা হালনাগাদ আলোচনায় বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্সা, শুকনা মৌসুমের প্রবাহ, নদী-জীবন, কৃষি ও পরিবেশগত নিরাপত্তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন। নদী কেবল পানিবণ্টনের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের জীবন, কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে পানি কূটনীতিতে আস্থার পরিবেশ তৈরি করা দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।

তৃতীয়ত সীমান্ত ইস্যুও আস্থাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সীমান্ত হত্যা, অনুপ্রবেশ, চোরাচালান, মানব পাচার ও অবৈধ চলাচল দুই দেশের জন্যই উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু এ সমস্যার সমাধান একতরফা পদক্ষেপে সম্ভব নয়। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের দিক থেকে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ এবং নাগরিকত্ব যাচাই নিয়ে নতুন চাপ সীমান্তে অস্বস্তি বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়া কোনো ধরনের জোরপূর্বক প্রত্যাবর্তন মেনে নিতে পারে না। ভারতও যদি স্থিতিশীল সীমান্ত চায়, তবে তাকে আইনসম্মত, মানবিক ও দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর মধ্যেই কাজ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, এ ক্ষেত্রে কোনো হঠকারিতা সহ্যের পর্যায়ে বাংলাদেশ এখন আর নেই।

চতুর্থত অর্থনীতির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আয়তনে ছোট হলেও বাংলাদেশ একটি বড় জনসংখ্যার দেশ এবং ভারতের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার। ২০২৪ সালে ভারত বাংলাদেশে প্রায় ১১ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে ভারতের আমদানি মাত্র ১.৮৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। অর্থাৎ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য কাঠামোতে ভারতের লাভের পরিমাণ বহুগুণে বেশি। ফলে সম্পর্কের অবনতি হলে ভারতের উৎপাদক, রপ্তানিকারক, পরিবহন খাত এবং সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর অর্থনীতি চাপের মুখে পড়তে বাধ্য। এই বাজার ধরে রাখতে চাইলে দিল্লিকে বুঝতে হবে, রাজনৈতিক অস্বস্তি দীর্ঘ হলে ব্যবসায়িক সম্পর্কও বিকল্প পথ খুঁজে নেয়।

পঞ্চমত ভিসাসংকট ভারতের নিজের অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশিরা দীর্ঘদিন ভারতের চিকিৎসা পর্যটনের বড় অংশ। কলকাতা, চেন্নাই, দিল্লি ও বেঙ্গালুরুর বহু হাসপাতাল বাংলাদেশি রোগীর ওপর নির্ভরশীল। ২০২৪ সালে ৪ লাখ ৮২ হাজারের বেশি বাংলাদেশি চিকিৎসা ভিসায় ভারতে গেলেও ভিসা সীমাবদ্ধতা, দীর্ঘ অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার কারণে অনেক রোগী এখন থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, চীন বা মালয়েশিয়ার মতো বিকল্প গন্তব্য বিবেচনা করছেন। একবার এই অভ্যাস বদলে গেলে তা সহজে ফিরবে না। চিকিৎসা ভিসা সহজ করা তাই ভারতের হাসপাতাল, হোটেল, পরিবহন ও সেবা খাতের অর্থনৈতিক স্বার্থই রক্ষার স্বার্থেই প্রয়োজন।

অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর সঙ্গেও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। ভুটানের সঙ্গে ঐতিহ্যগত বন্ধুত্ব সত্ত্বেও সীমান্ত ইস্যুতে চীনের সঙ্গে তাদের নতুন সমঝোতা ভারতের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় ভারতবিরোধী মনোভাবের উত্থান, চীনের প্রভাব বৃদ্ধি এবং মালদ্বীপের ‘ইন্ডিয়া আউট’ নীতি ভারতের প্রভাববলয় সংকুচিত করেছে। আফগানিস্তানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে সীমিত সম্পর্ক উন্নয়ন হলেও তা এখনো বন্ধুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেনি।

এ ছাড়া পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বৈরিতা চলমান। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশই দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বাংলাদেশ এমন এক প্রতিবেশী, যার সঙ্গে স্থলসীমান্ত, নদী, বঙ্গোপসাগর, উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা, জ্বালানি, বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ একসঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ানো মানে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কৌশলকেই দুর্বল করা। এ অবস্থান রক্ষা ও শক্তিশালী করা ভারতের স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

সবকিছু বিবেচনায় তাই ভারতের সামনে এখন দুটি পথ খোলা রয়েছে। একদিকে আছে সন্দেহ, দাদাগিরির স্বস্তি, ভিসা সংকোচন, সীমান্তে কঠোরতা এবং পানিবণ্টন চুক্তিতে বিলম্বের পুরনো পথ। অন্যদিকে রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের মর্যাদাভিত্তিক সম্পর্ক, সীমান্তে আইনসম্মত আচরণ, নদীতে ন্যায্যতা, বাণিজ্যে ভারসাম্যপূর্ণ বাস্তব সহযোগিতা এবং মানুষে মানুষে যোগাযোগ বাড়ানোর নতুন পথ। দ্বিতীয় পথই তাকে দীর্ঘ মেয়াদে সৌহার্দের স্বস্তি দিতে পারে। ঢাকার সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক উন্নয়ন বাংলাদেশের জন্যও প্রয়োজন, কিন্তু ভারতের জন্য তা এখন অধিক জরুরি। কারণ উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা, লাভজনক বাজার, চিকিৎসা পর্যটন, নদী কূটনীতি, দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব এবং চীন-পাকিস্তান বাস্তবতা সবই বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। ইতিহাসের বন্ধুত্বের ধারা অব্যাহত রাখতে হলে দিল্লিকে বুঝতে হবে, বাংলাদেশকে পাশে পাওয়া, ভারতের নিজের স্বার্থেই অপরিহার্য।

লেখক : সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)