• ই-পেপার

সামরিক-বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের পথে বাংলাদেশ

জনআস্থা, গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব : একটি সমকালীন পর্যালোচনা

অনলাইন ডেস্ক
জনআস্থা, গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব : একটি সমকালীন পর্যালোচনা
প্রফেসর ড. মোহা. হাছানাত আলী। ছবি: সংগৃহীত

একটি রাষ্ট্রের শক্তি কেবল তার অর্থনীতি, সামরিক সক্ষমতা কিংবা অবকাঠামোগত উন্নয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে তার জনগণের আস্থা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি বিশ্বাসের মধ্যে। এই আস্থা গড়ে ওঠে দীর্ঘ সময় ধরে এবং তা রক্ষা করাও সহজ নয়। বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ঘিরে যখন নানা বিতর্ক, প্রচারণা ও পাল্টা প্রচারণা সৃষ্টি হয়, তখন জনআস্থা রক্ষার প্রশ্নটি আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কোনো সময় খুঁজে পাওয়া কঠিন, যখন রাজনৈতিক নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হয়নি। স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় প্রতিটি সরকার, প্রতিটি বড় রাজনৈতিক দল এবং প্রতিটি জাতীয় নেতা কোনো না কোনো সময়ে গণমাধ্যমের সমালোচনা, রাজনৈতিক বিরোধিতা কিংবা জনআলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন। এটি গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বাস্তবতা। কারণ গণতন্ত্রে সমালোচনা থাকবে, মতভেদ থাকবে, বিতর্ক থাকবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—সেই বিতর্ক কি তথ্যভিত্তিক, নাকি অনুমান ও প্রচারণানির্ভর?

সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ঘিরে কিছু সংবাদ, বিশ্লেষণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সম্পর্কের বিষয়টি যেভাবে আলোচিত হয়েছে, তা অনেকের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

একজন জাতীয় নেতার সঙ্গে একজন রাজনৈতিক সহকর্মীর সম্পর্ককে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে—এটি অবশ্যই তথ্য ও বাস্তবতার বিষয়। কিন্তু কোনো সম্পর্কের প্রকৃতি সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য ছাড়া জনপরিসরে নির্দিষ্ট বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হলে তা বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। আর সেই বিতর্ক যদি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সময়ের সঙ্গে মিলে যায়, তাহলে তার রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়েও আলোচনা শুরু হয়। 

প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি বিতর্কিত করার অপচেষ্টা সম্পর্কে উদ্বেগ 
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে গড়ে ওঠা ভাবমূর্তি, সামাজিক মর্যাদা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু অসমর্থিত ও প্রমাণবিহীন প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে প্রধানমন্ত্রীর ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ হিসেবে উপস্থাপনের যে প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে, তা বাস্তবতা ও প্রাসঙ্গিক তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তারেক রহমানের শিক্ষা ও রাজনৈতিক বিকাশ ঘটেছে ঢাকাকেন্দ্রিক পরিবেশে। অন্যদিকে মীর শাহে আলমের বেড়ে ওঠা ও শিক্ষাজীবন সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। উপরন্তু, তাদের বয়সের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে। ফলে ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য সুস্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকা প্রয়োজন। বগুড়ার মানুষ হিসেবে আমরা জানি যে তারেক রহমান জাতীয় পর্যায়ের নেতা, আর মীর শাহে আলম জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দলীয় দায়িত্ব পালনকারী একজন রাজনৈতিক কর্মী ও সংগঠক। সেই বিবেচনায় তাদের সম্পর্ককে নেতা-কর্মীর সম্পর্ক হিসেবে দেখাই অধিকতর বাস্তবসম্মত। এ অবস্থায় হঠাৎ করে তাদের ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের গল্প প্রচার করার পেছনে কী উদ্দেশ্য কাজ করছে, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ চীন সফরের প্রাক্কালে এ ধরনের প্রচারণা কেন সামনে আনা হলো, কারা এর পেছনে রয়েছে এবং এর মাধ্যমে কী রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করা হচ্ছে—সেসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো গোষ্ঠী বা স্বার্থান্বেষী মহল সরকারের অভ্যন্তর থেকে কিংবা বাইরে থেকে এ ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারে জড়িত কি না, তাও তদন্তসাপেক্ষ বিষয়।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; তবে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা, তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং পেশাগত মানদণ্ড অনুসরণ করাও সমানভাবে জরুরি। জনপরিসরে প্রচারিত যেকোনো তথ্যের ক্ষেত্রে সত্যতা ও নির্ভরযোগ্যতার বিষয়টি নিশ্চিত করা হলে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক ও বিভ্রান্তি এড়ানো সম্ভব হবে।

রাষ্ট্র, সরকার ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বার্থে তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতা এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক চর্চাই হওয়া উচিত আমাদের সবার প্রত্যাশা। একজন রাজনৈতিক নেতার ভাবমূর্তি রাতারাতি তৈরি হয় না। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, সাংগঠনিক দক্ষতা, জনসম্পৃক্ততা, সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা এবং জনগণের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্য দিয়ে একজন নেতা নিজের অবস্থান গড়ে তোলেন। রাজনীতিতে জনপ্রিয়তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বিশ্বাসযোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক নেতা জনপ্রিয় হতে পারেন, কিন্তু সবাই বিশ্বাসযোগ্য হন না। আবার এমন অনেক নেতা আছেন, যাদের প্রতি জনগণের আস্থা এত গভীর যে সাময়িক বিতর্ক তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে তেমনভাবে প্রভাবিত করতে পারে না। বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে আমরা এর অসংখ্য উদাহরণ দেখতে পাই। যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে গণমাধ্যমের তীব্র বিতর্ক, যুক্তরাজ্যে ব্রেক্সিট ইস্যুতে সংবাদমাধ্যমের বিভক্ত অবস্থান কিংবা ভারতে জাতীয় নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক প্রচারণা—সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে জনমত গঠনে তথ্য ও বয়ানের লড়াই কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বাংলাদেশও এই বাস্তবতার বাইরে নয়। এখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ঘিরে সংবাদ, মতামত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা এবং জনআলোচনা প্রায়ই রাজনৈতিক বাস্তবতাকে প্রভাবিত করে।

গণমাধ্যমকে বলা হয় গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ। কারণ রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থেকেও গণমাধ্যম জনগণের পক্ষে কথা বলে, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে এবং অনিয়ম তুলে ধরে। কিন্তু গণমাধ্যমের শক্তির সঙ্গে একটি বড় দায়িত্বও যুক্ত থাকে। একটি সংবাদ কেবল একটি তথ্য নয়; এটি মানুষের চিন্তা, উপলব্ধি এবং সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই কোনো রাজনৈতিক নেতা, সরকারি কর্মকর্তা বা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সত্যতা যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকের বিশ্বে ‘ফ্যাক্ট-চেকিং’ বা তথ্য যাচাই একটি প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিকতাগত চর্চা। কারণ ভুল তথ্য বা অসম্পূর্ণ তথ্য কখনো কখনো এমন প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে, যা পরবর্তীতে সংশোধন করলেও জনমনে থেকে যায়। একটি বহুল প্রচলিত কথা আছে—একটি মিথ্যা খবর পৃথিবী ঘুরে আসতে পারে, কিন্তু সত্য তখনও জুতা পরতে থাকে। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এই কথাটি আরো বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

একসময় সংবাদপত্র ও টেলিভিশন ছিল জনমত গঠনের প্রধান মাধ্যম। এখন সেই জায়গায় যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স (টুইটার), টিকটকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম মুহূর্তের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছে দিতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো, তথ্যের এই দ্রুত প্রবাহের সঙ্গে সবসময় সমান গতিতে সত্যতা যাচাই হয় না। ফলে অনেক সময় একটি অসম্পূর্ণ তথ্য বা বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা জনমনে স্থায়ী ধারণা তৈরি করে ফেলতে পারে। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ঘিরে এই বাস্তবতা আরো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন জাতীয় নেতাকে নিয়ে প্রচারিত একটি তথ্য কেবল ব্যক্তি নয়, সরকার, রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও প্রভাব ফেলতে পারে। গণতন্ত্রে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রাজনৈতিক সমালোচনা এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। একজন নেতার নীতি, সিদ্ধান্ত বা প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ। কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পারিবারিক বিষয় বা প্রমাণহীন অভিযোগের ভিত্তিতে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা হলে তা ভিন্ন মাত্রা পায়। বিশ্বের উন্নত গণতন্ত্রগুলোতে দেখা যায়, ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির পরিবর্তে নীতিকেন্দ্রিক বিতর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়নের জন্য সেই চর্চা আরো জোরদার হওয়া প্রয়োজন।

কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের বিদেশ সফর কেবল আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়; এটি অর্থনীতি, কূটনীতি, বিনিয়োগ, শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সঙ্গে সম্পর্কিত। এমন সময় কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক সামনে এলে জনমনে নানা প্রশ্ন সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। যদিও প্রতিটি ঘটনার পেছনে ষড়যন্ত্র খোঁজা যুক্তিসঙ্গত নয়, তবু সময়ের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করা জনআলোচনার অংশ হতে পারে। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে তাই দায়িত্বশীলতা ও সংবেদনশীলতা প্রয়োজন। জনআস্থা একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উন্নয়ন প্রকল্প কিংবা অবকাঠামো নির্মাণ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জনগণের আস্থা ছাড়া কোনো উন্নয়নই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। জনগণের আস্থা গড়ে ওঠে তখন, যখন তারা মনে করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ন্যায়সঙ্গত, তথ্যভিত্তিক এবং জবাবদিহিমূলকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। একইভাবে গণমাধ্যমের প্রতিও জনগণের আস্থা থাকতে হয়। কারণ গণমাধ্যম যদি বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়, তাহলে তথ্যের জায়গা দখল করে নেয় গুজব এবং বিভ্রান্তি।

বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বৈশ্বিক সম্পর্ক, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেও আরো পরিণত হতে হবে। আমাদের প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক বিতর্ক, যুক্তিনির্ভর সমালোচনা এবং দায়িত্বশীল জনআলোচনা। কোনো রাজনৈতিক নেতা, সরকার বা প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা অবশ্যই করা যাবে; বরং সেটি গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু সেই সমালোচনা হতে হবে তথ্যনির্ভর, প্রমাণসমর্থিত এবং জনস্বার্থকেন্দ্রিক।

গণতন্ত্রের শক্তি ব্যক্তি-নির্ভর নয়; এটি প্রতিষ্ঠান, তথ্য এবং জনগণের সচেতনতার ওপর নির্ভরশীল। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ঘিরে বিতর্ক থাকতেই পারে, সমালোচনাও থাকবে। কিন্তু সেই বিতর্ক যেন সত্যের অনুসন্ধানকে শক্তিশালী করে, বিভ্রান্তিকে নয়—সেই দায়িত্ব আমাদের সবার। রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ—সবাই যদি তথ্যভিত্তিক জনআলোচনাকে উৎসাহিত করে, তাহলে গণতন্ত্র আরো শক্তিশালী হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত ইতিহাস প্রচারণাকে নয়, সত্যকেই টিকিয়ে রাখে; আর জনআস্থা অর্জিত হয় বক্তব্য দিয়ে নয়, দায়িত্বশীল আচরণ ও বিশ্বাসযোগ্যতার মাধ্যমে।

লেখক: প্রফেসর ড. মোহা. হাছানাত আলী 
উপাচার্য, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়

প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার ও গণমাধ্যম: উপস্থাপন, ধারণা ও সামাজিক প্রভাব

সালমা আহ্‌মেদ
প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার ও গণমাধ্যম: উপস্থাপন, ধারণা ও সামাজিক প্রভাব

প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার এমন এক ধরনের মানসিক স্বাস্থ্যগত অবস্থা, যেখানে একজন ব্যক্তি বারবার তীব্র যৌন উত্তেজনা, যৌন কল্পনা বা যৌন আকাঙ্ক্ষা অনুভব করেন এমন ব্যক্তি, বস্তু, পরিস্থিতি বা কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে, যা প্রচলিত যৌন আচরণের সীমার বাইরে অবস্থান করে। তবে সব ধরনের অপ্রচলিত যৌন আগ্রহকে মানসিক রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। কোনো প্যারাফিলিয়া তখনই প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার হিসেবে বিবেচিত হয়, যখন তা ব্যক্তির নিজের জীবনে উল্লেখযোগ্য মানসিক কষ্ট, উদ্বেগ বা কার্যকারিতার সমস্যা সৃষ্টি করে অথবা অন্যের সম্মতি, অধিকার ও নিরাপত্তা লঙ্ঘনের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়।

এ প্রসঙ্গে অ্যালেন জে. ফ্রান্সেস উল্লেখ করেন, ‘কোনো প্যারাফিলিয়া নিজেই মানসিক ব্যাধি নয়; এটি তখনই প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডারে পরিণত হয়, যখন তা ব্যক্তির জন্য মানসিক কষ্ট, কার্যকারিতার সমস্যা বা অন্যের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।’ এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক মনোরোগবিদ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি তুলে ধরে, যেখানে অপ্রচলিত যৌন আগ্রহ এবং মানসিক ব্যাধির মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করা হয়।

বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সমাজে গণমাধ্যম মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ ও সামাজিক ধারণা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে প্যারাফিলিক আচরণ বা এ-সম্পর্কিত ঘটনা আলোচিত হতে দেখা যায়। ফলে প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার শুধু মনোবিজ্ঞান বা মনোরোগবিদ্যার বিষয় নয়; এটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক, নৈতিক ও আইনগত আলোচনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডারের ধারণা
প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডারের বিভিন্ন ধরন রয়েছে, যার মধ্যে ভয়্যারিস্টিক ডিসঅর্ডার, এক্সহিবিশনিস্টিক ডিসঅর্ডার, ফ্রোটারিস্টিক ডিসঅর্ডার, সেক্সুয়াল ম্যাসোকিজম ডিসঅর্ডার, সেক্সুয়াল স্যাডিজম ডিসঅর্ডার, পেডোফিলিক ডিসঅর্ডার, ফেটিশিস্টিক ডিসঅর্ডার এবং ট্রান্সভেস্টিক ডিসঅর্ডার উল্লেখযোগ্য। এসব অবস্থার মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে অন্যের সম্মতি ব্যতীত যৌন আচরণ বা যৌন আগ্রহ প্রকাশ পায়, যা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তির নিজস্ব মানসিক কষ্ট বা সামাজিক অকার্যকারিতাই প্রধান বিবেচ্য বিষয়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্যারাফিলিয়া এবং প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার এক নয়। কোনো অপ্রচলিত যৌন আগ্রহ যদি সম্মতিপূর্ণ হয়, কারও ক্ষতি না করে এবং ব্যক্তির জীবনে উল্লেখযোগ্য সমস্যা সৃষ্টি না করে, তবে তা সাধারণত মানসিক রোগ হিসেবে বিবেচিত হয় না। আধুনিক মনোবিজ্ঞানে এই পার্থক্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

গণমাধ্যমে প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডারের উপস্থাপন 
গণমাধ্যমের বিভিন্ন আধেয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার-সংশ্লিষ্ট আচরণ প্রায়শই যৌন অপরাধ, যৌন হয়রানি, শিশু নির্যাতন, গোপনে ছবি বা ভিডিও ধারণ এবং অন্যান্য সম্মতিহীন কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে উপস্থাপিত হয়। সংবাদমাধ্যমে এসব ঘটনা সাধারণত অপরাধমূলক আচরণ হিসেবে প্রচারিত হয়, যা জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হলেও অনেক সময় বিষয়টির মনস্তাত্ত্বিক ও চিকিৎসাগত দিকগুলো আড়ালে থেকে যায়।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যমে শিশুদের প্রতি যৌন নির্যাতন, গোপনে ভিডিও ধারণ, জনসমাগমে যৌন হয়রানি কিংবা অনলাইন যৌন অপরাধের ঘটনাগুলো নিয়মিত প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদনে অপরাধের বিবরণ গুরুত্ব পেলেও সংশ্লিষ্ট মানসিক স্বাস্থ্যগত কারণ, ঝুঁকি উপাদান এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হয়। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিষয়টি সম্পর্কে আংশিক ধারণা তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে চলচ্চিত্র, নাটক বা ওয়েব কনটেন্টে কখনও কখনও ভয়্যারিজম, ফেটিশিজম বা অন্যান্য অপ্রচলিত যৌন আচরণকে রহস্য, রোমাঞ্চ বা বিনোদনের উপাদান হিসেবে দেখানো হয়। এর ফলে দর্শকদের মধ্যে বিষয়টি সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর বা অসম্পূর্ণ ধারণা তৈরি হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে গণমাধ্যম প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডারকে কেবল বিকৃত আচরণ বা অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করে, ফলে মানসিক স্বাস্থ্যগত ব্যাখ্যা ও চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা যথাযথ গুরুত্ব পায় না।

সামাজিক ধারণা ও প্রভাব
গণমাধ্যমে প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডারের উপস্থাপন সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। যখন বিষয়টি কেবল অপরাধ বা নৈতিক বিচ্যুতি হিসেবে উপস্থাপিত হয়, তখন সমাজে এ-সম্পর্কিত ব্যক্তিদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব ও সামাজিক কলঙ্ক বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে অনেক ব্যক্তি সামাজিক লজ্জা, ভয় বা বৈষম্যের আশঙ্কায় প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। তবে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। গণমাধ্যম যৌন সহিংসতা, শিশু সুরক্ষা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং সম্মতির গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারে। পাশাপাশি এসব বিষয়ে আইনগত ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতেও গণমাধ্যম কার্যকর ভূমিকা পালন করে। সঠিক ও তথ্যভিত্তিক উপস্থাপনা জনসাধারণকে বিষয়টির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সম্পর্কে সচেতন করতে সহায়তা করে এবং ভুল ধারণা দূর করতে ভূমিকা রাখে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে এ ধরনের বিষয় নিয়ে জনআলোচনা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে অনেক সময় যাচাইবিহীন তথ্য, অতিরঞ্জিত উপস্থাপন বা ভুল ব্যাখ্যা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। তাই গণমাধ্যমের দায়িত্ব হলো সংবেদনশীল বিষয়গুলোকে তথ্যনির্ভর, মানবিক এবং নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করা।

চিকিৎসা ও সচেতনতা 
প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডারের চিকিৎসায় সাধারণত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানীর তত্ত্বাবধানে সাইকোথেরাপি, বিশেষ করে Cognitive Behavioral Therapy (CBT), ব্যবহার করা হয়। প্রয়োজন অনুসারে ওষুধ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনামূলক পদক্ষেপও গ্রহণ করা হয়। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো ক্ষতিকর আচরণ প্রতিরোধ করা, মানসিক কষ্ট কমানো এবং ব্যক্তি ও সমাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

গণমাধ্যম এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সঠিক তথ্য, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতামূলক প্রচারণার মাধ্যমে গণমাধ্যম প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করতে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণে মানুষকে উৎসাহিত করতে পারে। একই সঙ্গে যৌন শিক্ষা, সম্মতির গুরুত্ব এবং নিরাপদ সামাজিক আচরণ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাও গণমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

সমাপনী বক্তব্য
প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার একটি জটিল মনস্তাত্ত্বিক বিষয়, যার সঙ্গে ব্যক্তি, সমাজ, সংস্কৃতি এবং আইনগত বাস্তবতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। গণমাধ্যমের বিভিন্ন আধেয়তে এর উপস্থাপন জনসাধারণের ধারণা, মনোভাব এবং সামাজিক প্রতিক্রিয়া গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে বিষয়টিকে কেবল অপরাধ বা সামাজিক বিচ্যুতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এর প্রকৃত মনস্তাত্ত্বিক ও চিকিৎসাগত দিকগুলো আড়াল হয়ে যেতে পারে।

প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার সম্পর্কে গণমাধ্যমে তথ্যভিত্তিক, দায়িত্বশীল এবং মানবিক উপস্থাপন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে তেমনি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে উৎসাহ সৃষ্টি হবে এবং সমাজে বিদ্যমান ভুল ধারণা ও কলঙ্ক হ্রাস পাবে। একটি সুস্থ, নিরাপদ ও সচেতন সমাজ গঠনে এ ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ গণমাধ্যম চর্চা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক: সালমা আহমেদ
শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আট দশকে আওয়ামী লীগের অর্জন!

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু
আট দশকে আওয়ামী লীগের অর্জন!

বয়স বাড়লেই যে সব ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা বাড়ে না, তা মানুষের ক্ষেত্রে যেমন সত্য, মানুষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক কিছুর ক্ষেত্রেও সত্য। মানুষের বয়স বৃদ্ধি পেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁদের স্মৃতিভ্রম ঘটে, বার্ধক্যজনিত রোগব্যাধি তো আছেই, ভীমরতিতেও ধরে। পরিপক্বতা আসে খুব কমসংখ্যক বৃদ্ধের মধ্যে। বৃদ্ধ ব্যক্তিরা অতীতের জাবর কাটার মধ্যে সুখ খোঁজেন। যেখানে তাঁদের সামান্য ও তুচ্ছ ভূমিকা ছিল অথবা আদৌ ছিল না, সেগুলোকে ফুলিয়েফাঁপিয়ে বলেন। কোথাও তাঁদের নিন্দনীয় ভূমিকা থাকলে তা বেমালুম চেপে যাওয়ার চেষ্টা করেন। বাংলাদেশে মানবসৃষ্ট দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর বেলায়ও তাদের বয়সজনিত সমস্যাগুলোর সম্পর্ক প্রবল। দুটি দলই প্রাচীন আর দুই দিন পর ২৩ জুন আওয়ামী লীগের বয়স ৭৮ বছরে পড়বে। জামায়াতে ইসলামীর বয়স এখন ৮৫ বছর চলছে। দল দুটির মধ্যে অনেক মিল এবং অনেক অমিল আছে। ইতিহাসের মোড়ে মোড়ে তাদের অস্বস্তিকর প্রেম হয়েছে-১৯৬৫ সালে আইউব খানের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে ফাতিমা জিন্নাহকে সমর্থন জানানোর ক্ষেত্রে, ১৯৮৬ সালে এরশাদের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার জন্য আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপন সমঝোতায় উপনীত হতে এবং ১৯৯৬ সালে বিএনপিকে পরাজিত করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার ক্ষেত্রে। আওয়ামী লীগ-জামায়াত প্রেম যেমন চকিতে হয়েছিল, তেমন দ্রুততায় তাদের প্রেমের বন্ধন টুটেও গেছে। আরও মিল আছে এই দল দুটির-জামায়াতে ইসলামী ‘একাত্তরে’  তাদের ভূমিকা যথাসম্ভব আড়াল করে,  একইভাবে আওয়ামী লীগ ১৯৭৫ সালের ‘বাকশাল-কাণ্ড’ চেপে যায়। আওয়ামী লীগ শেখ মুজিবের প্রতিটি ‘স্বপ্ন’ বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর বলে দাবি করলেও ১৯৯৬-২০০১ এবং ২০০৯-২০২৪ মেয়াদে শেখ হাসিনা একটি বারের জন্যও তাঁর পিতার মহান উদ্যোগ ‘বাকশাল’ পুনঃপ্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করেননি। 

এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশে কত দলের জন্ম হয়েছে, কত দলে ভাঙচুর হয়েছে এবং অস্তিত্বহীন হয়েছে, তা গবেষণার চমৎকার বিষয় হতে পারে। ১৯০৬ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত মুসলিম লীগ পাকিস্তানের স্বাধীনতা অর্জনে একক ভূমিকা রেখেছিল। দলটি পাকিস্তান এবং পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল পূর্ব পাকিস্তানেও শাসন পরিচালনা করেছে। মুসলিম লীগ ভাঙতে ভাঙতে শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের পাতা ছাড়া বাংলাদেশের আর কোথাও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারেনি। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজাম-এ-ইসলাম, গণতন্ত্রী দল, খিলাফত-ই-রাব্বানি পার্টি সমন্বয়ে গঠিত ‘যুক্তফ্রন্ট’ পূর্ব পাকিস্তানে প্রাদেশিক সরকার গঠন করেছিল। ‘মুসলিম’ বর্জিত আওয়ামী লীগ ছাড়া একসময়ে ক্ষমতার অংশীদার দলগুলোর নাম বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসপড়ুয়ারা ছাড়া কেউ জানে না। ভেঙেছে জামায়াতে ইসলামীর মতো ক্যাডারভিত্তিক সংগঠনও-একবার মাওলানা আবদুর রহীমের নেতৃত্বে বড় আকারে, আরেকবার মাওলানা আবদুল জব্বারের নেতৃত্বে ছোট আকারে। জামায়াতের এই দুই ভগ্নাংশ এখন আর অস্তিত্বে নেই। আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বেইজিংপন্থি প্রত্যেক বাম নেতার এক একটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল ছিল। এখন একটিরও অস্তিত্ব নেই। দাপটের সঙ্গে ক্ষমতায় থাকা ও জাতীয় সংসদে কয়েক দফা বিরোধী দলে থাকা এরশাদের জাতীয় পার্টি তিন-চার খণ্ডে বিভক্ত হয়ে এখন প্রায় প্রতিটি খণ্ড নিভু নিভু অবস্থার মধ্যে আছে।১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে আওয়ামী লীগ সংবিধান সংশোধন করে নিজেরাই নিজেদের দলকে বিলুপ্ত করে বাকশাল প্রতিষ্ঠা করেছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ তাদের সাধের ফসল বাকশাল-এর ওপর ‘তাওয়াক্কুল’ বা আস্থা রাখতে পারেনি। যে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আওয়ামী নেতাদের চোখের বিষ, তাঁরা সেই সামরিক শাসকের ঘোষিত ‘পলিটিক্যাল পার্টিজ রেগুলেশন অ্যাক্ট’ (পিপিআর) বা ‘রাজনৈতিক দলবিধি’র নিয়মকানুন মেনে চলার কসম কেটে নতুন করে ‘আওয়ামী লীগ’ বাংলাদেশের রাজনীতিতে কদম রাখার অনুমতি পায়। কোনো প্রাণীর মৃত্যু হলে যেমন তাদের বয়স সেখানেই থেমে যায়, কোনো দল নিজের মৃত্যু নিশ্চিত করার পর ১৯৭৫ সালেই দলটির অস্তিত্ব শেষ হয়ে গিয়েছিল।

বর্তমান আওয়ামী লীগের বয়স গণনা করতে যুক্তির খাতিরে হলেও ১৯৭৬ সাল থেকে গণনা করাই সংগত। যখন দলটির নেতারা তাদের দ্বারা বিলুপ্ত প্রাণপ্রিয় দলকে বাংলাদেশে রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়ার আবেদন করেছিলেন। ভাগ্যের কী বিড়ম্বনা! যে দল পাকিস্তানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় লড়াই করেছে, মাত্র ছয় বছর আগে যে দলের নেতাদের নেতৃত্বে দেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে এবং স্বাধীনতা অর্জিত হওয়ামাত্র যে দলের নেতারা দেশের মা-বাপ এবং অসহায় জনগণের দণ্ডমুণ্ডের বিধাতা হয়ে উঠেছিলেন, তাঁরাই সামরিক সরকারের কাছে নিবেদন করেছেন রাজনীতি করার একটুখানি সুযোগ দিতে। সামরিক সরকার তাঁদের রাজনীতি করার ‘সদয়’ অনুমতি দান করে এবং অনুমোদন লাভের পর মিজানুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে দলটির আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। নতুন কোনো সংগঠনের সূচনা আহ্বায়ক কমিটির হাত ধরেই ঘটে। তবে ‘দল’ যেহেতু একটি ‘ধারণা’ বা ‘আদর্শ,’ অতএব এর পুনর্জন্মের সুযোগ রয়েছে। সে হিসেবে আওয়ামী লীগ যদি তাদের ১৯৪৯ সালের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে মাঝের বিরতিসহ বয়স হিসাব করে, তাহলে তা দোষণীয় হবে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মনস্তাত্ত্বিক শাখায় মানুষের ‘নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স’ (এনডিই) বা মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছেও আবার বেঁচে ওঠার মতো ১৯৭৬ সালে আওয়ামী লীগের পুনরায় রাজনীতিতে ফিরে আসার মতো দৃষ্টান্ত বিশ্বে আরও রয়েছে। রাজনৈতিক দলের এ ধরনের প্রত্যাবর্তনকে রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানে ‘আইডেনটিটি বেজড পোলারাইজেশন’ (পরিচয়ভিত্তিক মেরুকরণ) বলে বর্ণনা করা হয়েছে; অর্থাৎ এই ফিরে আসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দলের নীতির কঠোর অনুসরণের কোনো সম্পর্কের চেয়ে দেশে দৃশ্যত রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে পুরোনো সমর্থকদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক ময়দানে নিকট ভবিষ্যতে দাপুটে অবস্থান সৃষ্টি করার প্রত্যাশাই অধিক থাকে। আওয়ামী লীগের পুনরাবির্ভাবের পেছনেও নীতির ওপর অটল থাকার বালাই ছিল না। তবু স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় যেতে দীর্ঘ ২১ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। আওয়ামী লীগের পক্ষে তা-ও সম্ভব হতো না, যদি ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামী বিএনপির ওপর নানা কারণে গোস্সা হয়ে তাদের কোল থেকে নেমে না পড়ত। 

যা হোক আওয়ামী লীগের বাকশাল-পরবর্তী এবং জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন সামরিক সরকারের বদান্যতাসমৃদ্ধ পুনরাবির্ভূত আওয়ামী লীগের ভাঙন দীর্ঘস্থায়ী ছিল না। মস্কোপন্থি মহিউদ্দিন আহমদ এবং ভারতপন্থি আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে যে অংশটি বাকশাল-এর ওপরই আস্থাশীল ছিলেন, একপর্যায়ে তাঁরা উপলব্ধি করেন যে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ক্ষমতার আসনে থেকে এক নেতা এক দল বাকশালের যে ফায়দা ছিল, ক্ষমতাহীন অবস্থায় কেবল বাকশাল সাইনবোর্ড টাঙিয়ে রাজনীতিতে সুবিধা করা যাবে না। অতএব কয়েক বছর পর তাঁরা বাকশালের ওপর আস্থা হারিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। সামরিক সরকারের অনুমোদন লাভের পর আওয়ামী লীগ যখন মাঠের রাজনীতিতে অবতীর্ণ হয়, তখন দলটিতে শুরু হয় নেতৃত্বের কোন্দল। এই কোন্দলে আওয়ামী লীগ বিভক্ত হয়ে বৃহৎ অংশ আবদুল মালেক উকিলের নেতৃত্বে এবং ক্ষুদ্র অংশ মিজানুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে পরিচালিত হতে থাকে। মানুষের মন বড় বিচিত্র। অল্প সময়ের ব্যবধানে আওয়ামী লীগের একসময়ের জাঁদরেল নেতা ও সাবেক মন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরী আরেক সামরিক সরকারের প্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রস্তাব পেয়ে তা লুফে নেন এবং তাঁর অংশের আওয়ামী লীগকে দাফন করে এরশাদের জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে মোটামুটি ১ বছর ৯ মাস বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আসন অলংকৃত করেন।

মিজানুর রহমান চৌধুরী তাঁর ভাগে পড়া খণ্ডিত আওয়ামী লীগকে দাফন করে অন্যায় কিছু করেননি। তিনি এটা না করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগে বিলীন হলে কি তাঁর পক্ষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়া সম্ভব হতো? কস্মিনকালেও না! ক্ষমতার রাজনীতিতে পদ অতি গুরুত্বপূর্ণ, তা প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী পদ হোক, অথবা তাসের রাজার মতো আলংকারিক পদ হোক। এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৪ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সাত বছরে তিনি চারজনকে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেছিলেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ যতবার সরকার গঠন করেছে, ততবার তিনিই প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। দলে যদি তাঁর চেয়ে যোগ্য নেতার অস্তিত্ব থেকেও থাকে, তাহলেও তাঁর জীবদ্দশায় এই পদ যে দলের অন্য কারও ভাগ্যে নেই, তা স্বতঃসিদ্ধই ছিল। রাজনৈতিক দলের ‘ন্যাচারাল ডেথ’ বা স্বাভাবিক মৃত্যু এক বিষয়, আর সংবিধান সংশোধন করে, নতুন আইন সৃষ্টি করে ঐতিহ্যের দাবিদার, অর্জনে-অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ একটি দলকে মেরে ফেলা হত্যার মতো গুরুতর অপরাধে দোষী সাব্যস্তকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার শামিল। এ কাজটিই করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি শুধু তাঁর দলকে হত্যা করেননি, দেশের ছোটবড় সব রাজনৈতিক দলকে কবরস্থ করেছিলেন। সংবাদপত্রের প্রকাশনা নিষিদ্ধ করেছিলেন। আওয়ামী লীগ যা বিশ্বাস করে বলে তাদের দলের গঠনতন্ত্রে মুদ্রিত ছিল বা এখনো আছে, তারা যদি সেগুলো সত্যিই বিশ্বাস করত, তাহলে একদলীয়, এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক ‘বাকশালী’ শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারত না।       

আওয়ামী লীগ নেতারা মুখে গণতন্ত্রের কথা বলেন, দলটির গঠনতন্ত্রের ছত্রে ছত্রে ‘সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান, জনগণের পছন্দমতো ভোটাধিকার প্রয়োগের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, জনগণের ঐক্য ও সংহতির বিধান’ করার মতো সুন্দর সুন্দর কথামালা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব কথা বলে জনগণকে প্রলুব্ধ করে এবং ভোটের অধিকার হরণ করে কীভাবে ক্ষমতায় জেঁকে বসতে হয়, সে কৌশল আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো দলের অজানা। কিন্তু কৌশল খাটিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার পরও যদি আওয়ামী লীগ দেশ ও জনগণের জন্য ভালো কিছু করত, তাহলেও জনগণ স্বস্তিবোধ করত। কিন্তু কোনোভাবে ক্ষমতায় যাওয়ামাত্র আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীরা তালগোল পাকিয়ে ফেলে, রাজনৈতিক শিষ্টাচার হারিয়ে ফেলে, সবার মাঝে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ খুঁজে পায়। এভাবে তারা আওয়ামী লীগকে কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরতান্ত্রিক দলে পরিণত করেছিল। সবকিছু মিলিয়ে তারা দেশে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, যা থেকে তারা নিজেরাও উদ্ধার পায় না, দেশকেও বিপদের মধ্যে ফেলে। পঁচাত্তরের আগস্ট এবং চব্বিশের আগস্ট আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব নিজেরাই আমন্ত্রণ জানিয়েছিল বলা হলে কি বাড়িয়ে বলা হবে? আওয়ামী লীগ নিজের খনন করা খাদে পড়েছে। একটি বড় দল হিসেবে তারা ঘুরেফিরে বারবার ক্ষমতায় আসতে পারত। তাদের কি প্রয়োজন ছিল জাতীয়তাবাদকে উগ্র রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদের রূপ দেওয়ার? সবাই জানে ও মানে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এর চেতনা দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রকে ব্যর্থ প্রমাণ করেছে। কি প্রয়োজন ছিল দেশবাসীকে তাদের রাজনৈতিক সমর্থনের ওপর ভিত্তি করে ‘স্বাধীনতার পক্ষ’ ও ‘স্বাধীনতার বিপক্ষ’ শক্তি হিসেবে বিভক্ত করার? ভোটের রাজনীতিতে সব দলকে, সব প্রার্থীকে সব পক্ষের ভোটারের কাছে গিয়েই তো ভোট ভিক্ষা করতে হয়। পাঁচ বছর পরপর যাদের কাছে গিয়ে অবনত হতে হয়, ক্ষমতায় গিয়ে তাদের ওপর খড়গহস্ত হওয়ার পরিণতি যে কখনো শুভ হয় না, বাংলাদেশে বারবার তা প্রমাণিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতারা এখনো অনলাইনে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কোনো বিকল্প নেই’ বলে দাবি করেন। তাঁরা যদি তাঁদের নিজেদের সৃষ্ট বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধান ও আত্মসমালোচনা করতেন, ভুল থেকে কিছু সবক নিতেন, তাহলে এমন দাবি করার আগে হাজারবার ভাবতেন। দেশ কোনো দলকে নিয়ে নয়, জনগণকে নিয়ে।

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক​​​​​​​

সুইস ব্যাংকে টাকার পাহাড় : পাচারকারীরা কি আড়ালেই থেকে যাবে?

আহসান হাবিব বরুন
সুইস ব্যাংকে টাকার পাহাড় : পাচারকারীরা কি আড়ালেই থেকে যাবে?

দেশের অর্থনীতি যখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, ডলার ঘাটতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতার মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, ঠিক তখনই সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন নতুন করে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে—দেশের সম্পদ কি নীরবে বিদেশে চলে যাচ্ছে? আর সেই পাচারকারীরা কি শেষ পর্যন্ত আড়ালেই থেকে যাবে?

২০২৫ সালের শেষে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্র্যাংক। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই আমানত বেড়েছে প্রায় ৪১ শতাংশ। বৈশ্বিকভাবে যখন সুইস ব্যাংকে বিদেশি আমানত কমছে, তখন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই উল্টো প্রবণতা শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্নও উত্থাপন করছে বটে।

সুইস ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের ধনকুবের, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিক, কর ফাঁকিদাতা এবং অর্থ পাচারকারীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সুইজারল্যান্ড তার ব্যাংকিং গোপনীয়তার নীতিতে কিছুটা পরিবর্তন এনেছে, তবু আমানতকারীদের পরিচয় এখনো কঠোরভাবে সুরক্ষিত। ফলে সুইস ব্যাংকে থাকা অর্থের মালিক কারা—সেই প্রশ্নের উত্তর সাধারণত জনসমক্ষে আসে না।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরো স্পর্শকাতর। কারণ দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কোনো বাংলাদেশি নাগরিক বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া বিদেশি ব্যাংকে অর্থ জমা রাখতে পারেন না। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই জানিয়েছে, এ ধরনের কোনো বিশেষ অনুমোদন কাউকে দেওয়া হয়নি। ফলে সুইস ব্যাংকে জমা থাকা এই বিপুল অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

প্রশ্ন হলো, এই অর্থ কোথা থেকে এলো?

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের প্রধান কয়েকটি পথ বহুদিন ধরেই পরিচিত। আমদানিতে অতিরিক্ত মূল্য দেখানো, রপ্তানিতে কম মূল্য দেখানো, হুন্ডি, ভিওআইপি ব্যবসা, বিদেশে ঘুষ ও কমিশন লেনদেন, এমনকি নগদ ডলার পাচার—সব মিলিয়ে একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক বছরের পর বছর ধরে সক্রিয় রয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এসব পদ্ধতির অনেকগুলোই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থার চোখের সামনে সংঘটিত হয়েছে।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক মইনুল ইসলাম যথার্থই বলেছেন, স্বৈরশাসনের পতনের পরও অর্থ পাচার বন্ধ হয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে নতুন বাস্তবতায় তা আরো জটিল রূপ নিয়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের বিপরীতে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচারের সুযোগও বেড়েছে বলে তিনি মনে করেন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অর্থ পাচার কেবল অর্থনৈতিক অপরাধ নয়; এটি রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডেরও একটি রূপ। কারণ যে অর্থ দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিনিয়োগ হতে পারত, শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারত কিংবা অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহৃত হতে পারত, সেই অর্থ বিদেশে চলে গিয়ে অন্য দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অন্তর্বর্তী সরকার যখন বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, ঠিক সেই সময়েও সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি আমানত বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে পাচারকারীরা শুধু সক্রিয়ই নয়, তারা এখনো নিজেদের নিরাপদ মনে করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সিপিডির নেতৃত্বে প্রণীত শ্বেতপত্রে যে তথ্য উঠে এসেছে তা আরো ভয়াবহ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। স্থানীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা। সংখ্যাটি এতটাই বিশাল যে তা দেশের গত কয়েক বছরের সম্মিলিত জাতীয় বাজেটকেও ছাড়িয়ে যায়। এই অর্থ দিয়ে কত কিছু করা যেত?

অর্থনীতির ভাষায় এটিকে বলা হয় ‘অপর্চুনিটি কস্ট’ বা হারানো সম্ভাবনার মূল্য। এই অর্থ দিয়ে অসংখ্য পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা সম্ভব ছিল। লাখো তরুণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারত। দেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত আমূল পরিবর্তিত হতে পারত।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই অর্থের একটি বড় অংশ আজ বিদেশি ব্যাংক, বিলাসবহুল সম্পত্তি এবং অফশোর কম্পানির পেছনে লুকিয়ে আছে।

এখানে আরেকটি রাজনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। সাধারণত জাতীয় নির্বাচনের আগে অর্থ পাচারের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ক্ষমতার পরিবর্তনের আশঙ্কা এবং জবাবদিহির ভয় অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তি ও কালোটাকার মালিককে বিদেশে অর্থ সরিয়ে নিতে উদ্বুদ্ধ করে। ২০২৫ সালও ছিল এমন একটি সময়, যখন নির্বাচনী রাজনীতির নানা আলোচনা ও অনিশ্চয়তা বিরাজমান ছিল। ফলে অর্থ পাচারের প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার পেছনে এই কারণও ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে কেবল রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে দায়ী করলে ভুল হবে। প্রকৃত সমস্যা আরো গভীরে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হলেও বাস্তবে বড় অর্থ পাচারকারীদের বিচারের নজির খুবই সীমিত। অনেক সময় ছোটখাটো দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও শত শতকোটি টাকা বিদেশে পাচারকারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ফলে সমাজে একটি বিপজ্জনক বার্তা প্রতিষ্ঠিত হয়—ক্ষমতা ও প্রভাব থাকলে অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই সমস্যার মোকাবেলায় কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। নাইজেরিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন এবং দক্ষিণ কোরিয়া বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক আইনি লড়াই চালিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সফলতাও এসেছে। মালয়েশিয়ার কুখ্যাত 1MDB কেলেঙ্কারির অর্থ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। নাইজেরিয়া সাবেক সামরিক শাসক সানি আবাচার পাচার করা শত শত মিলিয়ন ডলার ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।

বাংলাদেশও চাইলে পারে। কিন্তু এর জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দক্ষ তদন্ত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল অপরিহার্য।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বলছে, পাচার রোধ ও অর্থ ফেরাতে কাজ চলছে। বিভিন্ন দেশে পাচারকারীদের সম্পদ জব্দ করার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু জনগণ এখন শুধু উদ্যোগ নয়, ফলাফল দেখতে চায়। কারা এই অর্থ পাচার করেছে? কত টাকা দেশে ফিরেছে? কতজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে? কতজন সাজা পেয়েছে? এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত জনমনে সন্দেহ থেকেই যাবে।

সুইস ব্যাংকে থাকা ৮৩ কোটি ৪১ লাখ ফ্র্যাংক হয়তো সমগ্র পাচারকৃত অর্থের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। কারণ বর্তমান বিশ্বে অর্থ পাচারের গন্তব্য শুধু সুইজারল্যান্ড নয়; দুবাই, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মালয়েশিয়া, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ এবং বিভিন্ন ট্যাক্স হ্যাভেনও সমানভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে প্রকৃত চিত্র হয়তো প্রকাশিত সংখ্যার চেয়েও অনেক বড়।

একটি দেশের অর্থনীতি শুধু বাজেট, প্রবৃদ্ধি কিংবা রিজার্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; এটি দাঁড়িয়ে থাকে জনগণের আস্থা, সুশাসন এবং আইনের শাসনের ওপর। যখন সাধারণ মানুষ কর দেয়, ব্যাংকে সঞ্চয় রাখে, বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠায়—তখন তারা ধরে নেয় রাষ্ট্র তাদের অর্থ নিরাপদ রাখবে। কিন্তু যদি সেই রাষ্ট্রের ভেতর থেকেই অর্থ পাচারের মহোৎসব চলে, তাহলে জনগণের আস্থার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কেবল সুইস ব্যাংকে কত টাকা আছে, তা নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো—যারা দেশের সম্পদ বিদেশে সরিয়ে নিয়েছে, তাদের কি কখনো জবাবদিহির মুখোমুখি করা যাবে? নাকি তারা চিরকাল আইনের নাগালের বাইরে থেকেই যাবে?জাতি সেই উত্তর জানতে চায়। কারণ অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু অর্থ উদ্ধারের লড়াই নয়; এটি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লড়াই, রাষ্ট্রের মর্যাদা রক্ষার লড়াই এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার সুরক্ষার লড়াই। এখানে আমি বলতে চাই, সুইস ব্যাংকে টাকার পাহাড় যত বড়ই হোক, তার চেয়েও বড় হওয়া উচিত রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করার সংকল্প। অন্যথায় পাচারকারীরা শুধু আড়ালেই থাকবে না, ভবিষ্যতের আরো অনেক পাচারকারীর জন্য পথও তৈরি করে যাবে। সুতরাং সর্বাগ্রে পাচারকারীদের চিহ্নিত করে জাতির সামনে তাদের পরিচয় উন্মোচন করা সবচেয়ে বেশি জরুরি।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক