সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী হামলা, অপহরণ এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের যে উদ্বেগজনক বিস্তার দেখা যাচ্ছে, তা জনমনে গভীর উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করেছে। প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে আসছে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, গুলি করে টাকা ছিনতাই, ব্যবসায়ীর ওপর হামলা কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর সশস্ত্র আক্রমণের ঘটনা। এসব ঘটনা শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং এগুলো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর সামনে একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত বহন করছে।
রাজধানীর মতিঝিলে শাপলা চত্বরে প্রকাশ্যে ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১৭ লাখ টাকা ছিনতাই, আদাবরে বিকাশ এজেন্টকে কুপিয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা লুট, মোহাম্মদপুরে দুই বোনের ছিনতাইয়ের শিকার হওয়া কিংবা সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে ছিনতাইকারীর হামলায় এক নারীর মৃত্যুর ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। আরো উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব অপরাধের অনেকগুলো ঘটছে জনসমাগমপূর্ণ এলাকায়, দিনের আলোতে এবং সিসিটিভির উপস্থিতিতে।
অপরাধীরা এখন আর গোপনে নয়, প্রকাশ্যেই ধারালো অস্ত্র প্রদর্শন করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, কয়েক মিনিটের মধ্যে সংঘবদ্ধভাবে হামলা চালিয়ে অপরাধীরা নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও এখন অপরাধীদের হামলার শিকার হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ, রূপগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া কিংবা রাজধানী ঢাকায় সাম্প্রতিক বিভিন্ন অভিযানে র্যাব ও পুলিশের সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা প্রমাণ করে যে, কিছু অপরাধী গোষ্ঠী আইনকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো দুঃসাহস অর্জন করেছে। একটি রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে বড় সতর্কবার্তা আর কি হতে পারে?
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে পুলিশের ওপর ২৮৩টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে সারা দেশে অপরাধবিরোধী অভিযানে বিপুল সংখ্যক অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। শুধু মে মাসেই ৫১ হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে। এসব তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয়তার প্রমাণ দিলেও একই সঙ্গে এটাও নির্দেশ করে যে অপরাধের বিস্তার কতটা গভীর ও ব্যাপক।
অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পরিসংখ্যান আরো উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। মাত্র দুই মাসে ৬০৫টি খুন, ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি, ১৯৬টি অপহরণ এবং দুই হাজারেরও বেশি চুরির ঘটনা ঘটেছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রায় সাড়ে তিন হাজার ঘটনা সমাজের নৈতিক ও নিরাপত্তাগত সংকটকেও স্পষ্ট করে। প্রশ্ন হলো, কেন বাড়ছে এসব অপরাধ?
অপরাধ বিশ্লেষকরা কয়েকটি কারণের কথা উল্লেখ করছেন। প্রথমত, অপরাধীদের মধ্যে আইনের প্রতি ভয় কমে গেছে। দ্বিতীয়ত, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের বিস্তার ঘটেছে। তৃতীয়ত, স্থানীয় পর্যায়ে কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আশ্রয়-প্রশ্রয় অপরাধীদের সাহস জোগাচ্ছে। চতুর্থত, কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি এবং মাদকের বিস্তার নতুন প্রজন্মের একটি অংশকে অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তবে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে পুলিশে গ্রুপিং, নৈতিক মনোবল ও পেশাদারিত্বের সংকট।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বলে, শুধু অপরাধী গ্রেপ্তার করলেই অপরাধ নির্মূল হয় না। অপরাধের অর্থায়ন, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, অস্ত্র সরবরাহ চক্র এবং গডফাদারদের বিচারের আওতায় আনতে না পারলে অপরাধ বারবার নতুন রূপে ফিরে আসে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর কিংবা জাপান—সব দেশেই সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে নেটওয়ার্কভিত্তিক গোয়েন্দা কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশেও এখন সেই বাস্তবতা উপলব্ধি করার সময় এসেছে। মাঠের কর্মী বা ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করা অবশ্যই জরুরি; কিন্তু যারা তাদের পরিচালনা করছে, অর্থ জোগাচ্ছে কিংবা রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে রক্ষা করছে, তাদের আইনের আওতায় আনতে না পারলে পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক যথার্থই বলেছেন, শুধু মাঠপর্যায়ের অপরাধীদের গ্রেপ্তার করলে হবে না; তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধেও সমান কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এই বক্তব্য বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের দাবি অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ অপরাধীদের বিরুদ্ধে আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বাহিনীকে আরও জনবান্ধব ও কার্যকর করার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, জনগণ পরিসংখ্যান ও কথার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় নিজের অভিজ্ঞতাকে। একজন নাগরিক যখন রাতের বেলা নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন না, একজন ব্যবসায়ী যখন নগদ অর্থ নিয়ে চলতে ভয় পান, একজন নারী যখন প্রকাশ্যে ছিনতাইকারীর হামলায় প্রাণ হারান, তখন জনগণের কাছে নিরাপত্তা পরিস্থিতির মূল্যায়ন ভিন্ন হয়ে দাঁড়ায়।
তাই এখন প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। প্রথমত, রাজধানীসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি আরও বাড়াতে হবে। সিসিটিভি নেটওয়ার্ক, স্মার্ট মনিটরিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অপরাধ বিশ্লেষণ ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।
দ্বিতীয়ত, কিশোর গ্যাং ও মাদকচক্রের বিরুদ্ধে বিশেষ সামাজিক ও প্রশাসনিক কর্মসূচি নিতে হবে। শুধু গ্রেপ্তার নয়, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সমাজকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
তৃতীয়ত, চাঁদাবাজি, দখলবাজি এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের অর্থনৈতিক উৎস বন্ধ করতে হবে। অপরাধের অর্থনীতি ধ্বংস করতে না পারলে অপরাধও টিকে থাকবে। এতে আমার ন্যূনতম সন্দেহ নেই।
চতুর্থত, বিচার প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করতে হবে। অপরাধী যদি জানে যে অপরাধের দ্রুত বিচার ও নিশ্চিত শাস্তি হবে, তাহলে অপরাধের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।
পঞ্চমত, রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক ক্ষমতা কিংবা সামাজিক প্রভাব নির্বিশেষে সবার জন্য সমান আইন নিশ্চিত করতে হবে। আইনের চোখে সবাই সমান—এই বার্তাটি বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত না হলে অপরাধীরা কখনোই ভয় পাবে না।
অর্থনীতি, অবকাঠামো, ডিজিটাল অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। কিন্তু জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে এসব অর্জনের সুফল জনগণের কাছে পুরোপুরি পৌঁছাবে না। বিনিয়োগ, পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা কিংবা সামাজিক স্থিতিশীলতা—সবকিছুর ভিত্তি হলো নিরাপত্তা।
পরিশেষে বলতে চাই, রাষ্ট্রের প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব নাগরিকের জীবন ও সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। তাই জননিরাপত্তাকে কোনোভাবেই একটি সাধারণ প্রশাসনিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি জাতীয় উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল ভিত্তি। সুতরাং অপরাধীদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি কার্যকর ভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে হবে এবং জনগণের মধ্যে নিরাপত্তার অনুভূতি ফিরিয়ে আনতে হবে।
কারণ একটি নিরাপদ বাংলাদেশই হতে পারে একটি সমৃদ্ধ, বিনিয়োগবান্ধব, মানবিক এবং আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশের ভিত্তি। জননিরাপত্তা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। আর সেই অধিকার নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক











