ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিক সম্পাদক জিসান মিয়া প্রধানের কুমিল্লা থেকে ‘নিখোঁজ’ হওয়ার পর উদ্ধার এবং পরে গ্রেপ্তারের বিষয়টি সংসদকে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও ভ্রূণ নষ্টের মামলা ও উদ্ধার প্রক্রিয়ার বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরেন তিনি। তবে জিসান ইস্যুতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের একটি অংশ কার্যবিবরণী থেকে বাদ (এক্সপাঞ্জ) দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বিরোধী দল।
রবিবার (১৪ জুন) সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ৩০০ বিধিতে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিবৃতি দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এই তথ্য ও ঘটনার বিবরণ তুলে ধরলে সরকারি ও বিরোধী পক্ষের সংসদ সদস্যদের মাঝে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
সংসদ অধিবেশন চলাকালে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের অনুমতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ৩০০ বিধিতে বক্তব্য দেন। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সংসদকে অবহিত করেন, দুর্নীতির মামলায় পলাতক সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দুবাই থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই ঘোষণার পরপরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছাত্রশিবিরের সদ্য বহিষ্কৃত সহকারী আন্তর্জাতিক বিষয়ক নেতা জিসানের গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গটি সংসদে উত্থাপন করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জিসানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিবরণ দিয়ে সংসদে বলেন, কয়েক মাস আগে ফেসবুকের মাধ্যমে এক বিধবা নারীর সঙ্গে জিসানের পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এক পর্যায়ে ওই নারী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে জিসান তার ওপর ভ্রূণ নষ্ট করার চাপ দেন এবং ওষুধ সেবনের মাধ্যমে গর্ভপাত ঘটানো হয়। এই কাজে জিসানের চাচাতো ভাই রাসেল আহমেদ একটি দোকান থেকে ওষুধ এনে সহযোগিতা করেন।
পরবর্তীতে গত ১১ জুন (বৃহস্পতিবার) জিসান বিয়ে না করার টালবাহানায় নিজেই আত্মগোপনে চলে যান এবং চাচাতো ভাইয়ের মাধ্যমে থানায় একটি নিখোঁজের জিডি করান। পুলিশ অনুসন্ধানের পর লাকসাম এলাকা থেকে জিসানকে উদ্ধার করে। জিসান উদ্ধারের খবর পেয়ে ভুক্তভোগী ওই নারী বাদী হয়ে কুমিল্লা দাউদকান্দি মডেল থানায় জিসানকে প্রধান আসামি করে ধর্ষণ ও ভ্রূণ নষ্টের অভিযোগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর সংসদে তীব্র আপত্তি জানান বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। স্পিকারের অনুমতি নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার শুরুতে তিনি সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশকে ধন্যবাদ জানান।
তবে শিবির নেতার প্রসঙ্গ তোলায় প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি সংসদ তুলতে দেওয়া উচিত হয়নি। একটি বিতর্কিত বিষয় এভাবে তোলা বাংলাদেশের ইতিহাসে এটিই প্রথম।’
তখন ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘এ বিষয়টি আমি জানতাম না। যেমন প্রথম বিষয়টিও আমার জানা ছিল না।’
পরে বিরোধীদলীয় উপনেতা বলেন, ‘একটি দলকে নিয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে এটি তোলা হয়েছে।’
তবে জিসান ইস্যুতে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইচ্ছাকৃতভাবে জিসান প্রসঙ্গে এই বক্তব্য দিয়েছেন, যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে বিরোধী দলকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করা।’
এ সময় বিরোধীদলীয় উপনেতা জানতে চান, জিসান কোথায় আছে? জিসানকে কারো সঙ্গে কথা বলতে দেওয়া হয়নি কেন। মেয়েটাকেও কথা বলতে দেওয়া হয়নি। এখানে কি প্লট তৈরি করা হচ্ছে? কোনটা সঠিক, এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এমন অনেক ঘটনা ঘটলেও শুধু এটিই সংসদে তোলা হলো।
তিনি অবিলম্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া জিসানসংক্রান্ত বক্তব্যটি সংসদের কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ বা বাদ দেওয়ার দাবি জানান।
ডা. আবদুল্লাহ তাহেরের দাবির পর বিরোধী দলের সব সংসদ সদস্য নিজ নিজ আসন থেকে দাঁড়িয়ে যান। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও জবাব দেওয়ার জন্য নিজের আসনে দাঁড়িয়ে থাকেন।
ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বিরোধীদলীয় উপনেতাকে থামতে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বারবার বসে পড়ার অনুরোধ জানালেও উভয় পক্ষই দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকায় সংসদে চরম উত্তেজনা ও হট্টগোল তৈরি হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে ডেপুটি স্পিকার জানান, ৩০০ বিধির আওতায় প্রদত্ত বিবৃতির ওপর সাধারণত কোনো প্রশ্ন করা বা বিতর্ক করার সুযোগ থাকে না। তবে নিয়ম মেনে স্পষ্টীকরণের প্রশ্ন করা যেতে পারে।
তিনি সবাইকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে রুলিং দেন যে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য যদি সংসদীয় রীতির বাইরে প্রমাণিত হয়, তবে তা বিধি অনুযায়ী এক্সপাঞ্চ করা হবে।
ডেপুটি স্পিকারের কঠোর নির্দেশনায় দীর্ঘ সময় পর উভয় পক্ষ আসনে বসলে সংসদের পরবর্তী স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হয়।










