kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৫ কার্তিক ১৪২৮। ২১ অক্টোবর ২০২১। ১৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

সিসা বার থেকেই সর্বনাশা মাদকে

► মেশানো হয় গাঁজা, ইয়াবাসহ মাদকের উপাদান; আড্ডায় ভিন্ন মাদকে আসক্তি
► নিষিদ্ধ হলেও নিকোটিনের পরিমাণ বিতর্কে চালু অর্ধশত লাউঞ্জ

এস এম আজাদ   

৯ আগস্ট, ২০২১ ০২:৪০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সিসা বার থেকেই সর্বনাশা মাদকে

গত ১৫ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাফিজুর রহমানের প্রকাশ্যে আত্মহত্যা করার মর্মান্তিক ঘটনার সূত্র ধরে আলোচনায় আসে নতুন মাদক লাইসার্জিক এসিড ডাইইথ্যালামাইড (এলএসডি)। পুলিশের অভিযানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আট শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তারের পর জানা যায়, সিসা বারের আড্ডা থেকে এলএসডি গ্রুপ তৈরি করেন তাঁরা। কয়েকজনের কাছ থেকে সিসার উপাদানও জব্দ করা হয়। সম্প্রতি র‌্যাবের অভিযানে এলএসডি, আইসসহ নতুন মাদক উদ্ধারের সময়ও মিলেছে সিসার উপাদান।

গত ২৮ জানুয়ারি উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরের ব্যাম্বো শুট নামে একটি রেস্টুরেন্টে ভেজাল মদ সেবন করে অসুস্থ হয়ে পড়া তিন শিক্ষার্থী পরে মারা যান। ওই ঘটনার তদন্তকারীরা জানান, রেস্টুরেন্টে সিসা লাউঞ্জের আড্ডা থেকে মাদক সেবনে আসক্ত হন শিক্ষার্থীরা। কয়েক দিন আগে ঢাকায় শুরু

হওয়া মাদক-প্রতারণাসহ অনৈতিক কারবারের বিরুদ্ধে অভিযানে প্রযোজক নজরুল ইসলাম রাজসহ কয়েকজনের বাসা থেকেও জব্দ করা হয়েছে সিসার উপাদান। তদন্তকারীরা বলছেন, সিসা লাউঞ্জে মদের বারের মতোই আলো-আঁধারী পরিবেশে আড্ডাবাজি এবং গাঁজা, ইয়াবা, মদসহ বিভিন্ন মাদক সেবন থেকে ভয়ংকর মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে তরুণ প্রজন্ম।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি), পুলিশ, র‌্যাবসহ গোয়েন্দারা সিসা বারে গিয়ে তরুণ-তরুণীদের ভয়ংকরভাবে মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ার তথ্য পেয়েছে অনেক আগেই। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের নতুন আইনে সিসা নিষিদ্ধও করা হয়েছে। সিসার ফ্লেভারে অ্যালকোহল, ইয়াবা, গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য মিশিয়ে তরুণ সেবীদের আসক্ত করে তোলার চেষ্টা করছেন অসাধু কারবারিরা। সিসা লাউঞ্জ থেকেই উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা মাদকের গ্যাং গ্রুপে জড়িয়ে পড়ছে। কিছু রেস্টুরেন্টে খাবারের পর ‘ডেজার্টের’ আদলে সিসা পরিবেশন করা হয়।

আইনের ফাঁকে এসব সিসার লাউঞ্জ চালাচ্ছেন রেস্টুরেন্ট ও হোটেল ব্যবসায়ীরা। আইনে উল্লেখ আছে, সিসার মলাসেস বা ফ্লেভারে ২ শতাংশের বেশি নিকোটিন থাকলে তা অবৈধ। কম নিকোটিন আছে দাবি করে বহাল থাকতে চাইছেন মালিকরা। ঢাকার সাতটি সিসা বারের মালিক অভিযান ঠেকাতে উচ্চ আদালতে রিটও করেছেন। তবে ডিএনসি ২৩টি সিসা লাউঞ্জ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে যাচাই করে প্রতিটিতে ২ শতাংশের বেশি নিকোটিন পেয়েছে। অথচ ফ্লেভারের প্যাকে ২ শতাংেশর কম লেখা ছিল। সিসার ফ্লেভারে আর কী উপাদান আছে, তা পরীক্ষার জন্য ভিন্ন পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে প্রভাবশালী সিসা লাউঞ্জের মালিকদের রিট করে বহাল থাকার চেষ্টায় অভিযান থেকে পিছু হটেছেন বলে দাবি করছেন ডিএনসির কর্মকর্তারা। তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, অভিযান বন্ধ রাখতে ঘুষও দিচ্ছে সিসা লাউঞ্জগুলো। এ কারণে অভিযান নিয়ে চলছে লুকোচুরি। এখন বন্ধ থাকলেও লকডাউন শিথিল হলেই মালিকরা সিসা বারগুলো চালুর প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। লকডাউনের মধ্যে হাউস পার্টিতে মদের সঙ্গে সিসা সরবরাহ করেন লাউঞ্জের কারবারিরা। এমন কয়েকটি হাউস পার্টিতে অভিযান চালিয়েছে পুলিশ ও র‌্যাব। আরো অন্তত ৪০টি নজরদারিতে আছে।

ডিএনসির মহাপরিচালক (ডিজি) মো. আব্দুস সবুর মণ্ডল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সিসার ব্যাপারে আমাদের নজরদারি আছে। রিট করার পরও আমরা আলামত সংগ্রক করে পরীক্ষা করছি। এবারের পরীক্ষার রিপোর্ট এলেই অ্যাকশনে যাব।’

গত ১১ মে গুলশানে আরএম সেন্টারে তারকা দম্পতি ওমর সানী ও মৌসুমীর ছেলে ফারদিন এহসান স্বাধীনের মালিকানাধীন ‘মনটানা লাউঞ্জ’ নামে সিসা বারে অভিযান চালিয়ে ১১ জনকে আটক করে গুলশান থানা পুলিশ। এ ঘটনায় মামলা হলেও মালিকদের আসামি করা হয়নি। ঘটনার পর ওমর সানী তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, গুলশান-বনানীতে আরো ৩০-৪০টি সিসা লাউঞ্জ চলছে। রেস্টুরেন্টে সিসা বিক্রি নিষিদ্ধ, তা তাঁদের জানাই ছিল না! গত ২ জুন রাতে ধানমণ্ডি ১৫ নম্বরের ওজং রেস্টুরেন্টে সিসার উপাদানসহ ২৫ তরুণ-তরুণীকে আটক করে ডিবি পুলিশের রমনা বিভাগ। পরে আটককৃতদের ছেড়ে দেওয়া হলেও এ ব্যাপারে কিছুই জানাননি ডিবির কর্মকর্তারা।

জানা গেছে, ২০১৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর থেকে ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮’ কার্যকর হয়েছে। ওই নতুন আইনে সিসাকে মাদকদ্রব্যের ‘খ’ শ্রেণির তালিকাভুক্ত করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নতুন আইনে মাদক সম্পর্কিত অপরাধ প্রমাণিত হলে ন্যূনতম এক বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও নগদ অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীরা আইনের তোয়াক্কা করছেন না। চলতি বছরের শুরুতে ঢাকার সাতটি সিসা লাউঞ্জের মালিক আদালতে রিট করার পর ডিএনসি ঢাকা উত্তরের ১৯টি, দক্ষিণের দুটি এবং চট্টগ্রামের দুটি সিসা লাউঞ্জের নমুনা সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় পরীক্ষাগারে পাঠায়। এই পরীক্ষায় দেখা গেছে, ২৩টি লাউঞ্জেরই সিসার মধ্যে ২ শতাংশের বেশি নিকোটিন আছে। অথচ প্যাকেটে ২ শতাংশের কম লেখা আছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ধারণা করছেন, সিসার ফ্লেভাবে বেশি পরিমাণে নিকোটিনের সঙ্গে পরিবেশনের সময় অ্যালকোহল, ইয়াবা, গাঁজাসহ মাদক মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে মাদকতা তৈরি হলে তরুণ-তরুণীরা আসক্ত হয়ে পড়ছে। 

রাজধানীর সবচেয়ে বেশি সিসা লাউঞ্জ আছে বনানী ও গুলশান এলাকায়। গতকাল রবিবার সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, রেস্টুরেন্ট ও হোটেলের লাউঞ্জগুলো লকডাউনে বন্ধ রাখা হলেও শিগগিরই চালুর প্রস্তুতি চলছে।  বনানীর ডি-ব্লকের ১০ নম্বর রোডের ৬৬ নম্বর বাড়িতে আরগিলা, বনানী কবরস্থানের কাছে ফিউশান হান্ট, বনানীর ই-ব্লকের ১২/বি রোডের ৭৭ নম্বর বাড়িতে আল গ্রিসিনো, বনানীর জি-ব্লকের ১১ নম্বর রোডের ৩২ নম্বর বাড়িতে ব্ল্যাক ব্রিচ কিচেন অ্যান্ড লাউঞ্জ, ১৫৩ নম্বর বাড়িতে মিন্ট আল্ট্রা লাউঞ্জ এবং বনানী ১১ নম্বর রোডের এআর রেস্টুরেন্ট সিসা বার লুকোচুরি করে চলছে করোনাকালেও। আল গ্রিসিনোর সামনে এক নিরাপত্তাকর্মী জানান, এখন দিনে তালা মারাই থাকে। রাতে দু-একজন আসে। তবে ১১ তারিখের পর আবার চালু হবে।’ গুলশানের আরএম সেন্টারে অবস্থিত মন্টানা লাউঞ্জ, ডাউন টাউন, কিউডিএস ও কোর্ট ইয়ার্ড বাজার নামের সিসা লাউঞ্জও বন্ধ হয়নি। লকডাউনে আপাতত বন্ধ আছে।

সূত্র মতে, এসব লাউঞ্জ থেকে সিসার ফ্লেভার পরীক্ষায় বেশি নিকোটিন পাওয়া যায়। একইভাবে বনানীর ফ্লোর-সিক্স রিলোডেড, লাল সোফা, কিউডিএস, রিলোডেট, গোল্ডেন টিউলিপ, টিজেএস, পেট্টাস ও ফারহান নাইট, দ্য নিউ ঢাকা ক্যাফে অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে, বনানী ১১ নম্বর রোডের এইচ-ব্লকের ৫২ নম্বর বাড়িতে অবস্থিত প্লাটিনাম গ্র্যান্ড আবাসিক হোটেলে সিসা পরিবেশন করা হয়। সূত্র জানায়, ধানমণ্ডির ২৭ নম্বর রোডে এলএইচএফ ফুড, সাতমসজিদ রোডে ঝাল লাউঞ্জ, এইচটুও, অ্যারাবিয়ান নাইটস, ধানমণ্ডির ৬ নম্বর রোডে লাউঞ্জ সিক্স, সেভেন টুয়েলভ, ফুড কিংসহ ১০টি সিসা বার এবং উত্তরা এলাকায় ৪ নম্বর সেক্টরে হাঙরি আই-১, হাঙরি আই-২, উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরে ক্যাফে মিররসহ ১২টি সিসা বার রয়েছে।

জানতে চাইলে ডিএনসির সহকারী পরিচালক (ঢাকা উত্তর) মেহেদী হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রিট করার কারণে উপাদান পরীক্ষা ছাড়া আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি না। তবে খবর পেলে অভিযান চালাই। এক মাস আগে প্লাটিনাম স্যুট নামে একটি লাউঞ্জ থেকে উপাদান নিয়ে পরীক্ষা করে বেশি নিকোটিন পেয়েছি। সেটি বন্ধ আছে।’



সাতদিনের সেরা