kalerkantho

রবিবার । ৯ কার্তিক ১৪২৭। ২৫ অক্টোবর ২০২০। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

যান্ত্রিক নগরেই সবুজের দোলা

শাখাওয়াত হোসাইন   

২ অক্টোবর, ২০২০ ০২:২৫ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



যান্ত্রিক নগরেই সবুজের দোলা

রান্না উনুনে দিতেই সাফিয়ানা সুলতানা টের পেলেন ঘরের কাঁচা মরিচ শেষ! তার পরও তিনি নির্ভার। দ্রুত লিফট চেপে ছুটলেন ছাদে। সেখানেই আছে তাঁর এক সবুজ পৃথিবী। সবজি আর ফুলে-ফলে ভরা সেই ছাদ বাগিচায় সব কিছুই মেলে। সেখান থেকেই একমুঠো কাঁচা মরিচ এনে সহজেই রান্নার পাট চুকালেন। সবজি কিনতে সাফিয়ানার বাজারে ছুটতে হয় না, তা-ও অনেক দিন হলো। রাজধানীর বারিধারার ৫৩ নম্বর সড়কের ৪১ নম্বর বাড়ির ছাদজুড়ে সবুজের যেন অবিরাম দোলা। সেই দোলাতেই যেন সাফিয়ানা সুলতানার পরম শান্তি।

ইট-পাথরের এই যান্ত্রিক নগরে সবুজের দেখা এখন অনেকটাই ‘দুর্লভ’। যান্ত্রিক নগর জীবনে একচিলতে আনন্দ খুঁজতে রাজধানীর অনেকেরই এখন ছাদবাগানে মনোযোগ। চিলেকোঠায় বাহারি গাছের পরিচর্যায় নাগরিকরা উপভোগ্য করে তুলছে তিক্ত সময়টা। করোনার এই দুঃসময়ে থিতু হওয়া জীবনের গতি ফেরাতে জুতসই অনুষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছে ছাদবাগান। ছাদে প্রবেশাধিকারের ফ্যাকরায় রাজধানীর বেশির ভাগ ভাড়াটিয়ার জন্য বাগিচা বানানোর কাজটা বেশ কঠিন। এ ব্যাপারে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যেও রয়েছে সহযোগিতার সংকট।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় প্রায় সাড়ে চার লাখ ছাদ রয়েছে। এসব ছাদের জায়গার পরিমাণ সাড়ে চার হাজার হেক্টরের বেশি। আরো সহজভাবে বললে ঢাকার বাড়িগুলোর ছাদের আয়তন একটি বড় উপজেলার মোট আয়তনের বেশি। তার পরও তেমন সবুজ দেখায় না রাজধানীর স্যাটেলাইট ছবি। অনেক বাড়ির মালিকের ছাদবাগানের প্রতি অনীহাই এর অন্যতম কারণ। আবার বাগানের খরচের কথা চিন্তা করে আগ্রহ উবে যায় অনেকের। বাগান করতে টবে যে পরিমাণ মাটি প্রয়োজন হয়, তার সংস্থান করাটাও অনেকের ঝামেলা মনে হয়।

ঢাকায় কত শতাংশ বাড়ির ছাদে বাগান রয়েছে সে ব্যাপারে সঠিক তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। কারণ ছাদবাগান নিয়ে বিক্ষিপ্তভাবে কাজ করছে বিভিন্ন সংস্থা। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণার তথ্য বলছে, ঢাকার ছাদবাগানের মালিকদের মধ্যে ৪১ শতাংশ তরুণ, ৩০ শতাংশ মধ্যবয়সী আর ২৯ শতাংশ বয়স্ক।         

রাজধানীর ভাটারার খন্দকার মোড়ের এক বাড়ির মালিক মোরশেদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রী ছাদবাগানে বেশ আগ্রহী। বেশ কয়েকটি টবে গাছও লাগিয়েছে। ছাদে আরো গাছ লাগানোর জায়গা আছে। কিন্তু টবের মাটির সংস্থান করা বেশ কষ্টকর। এ ছাড়া সিঁড়ি বেয়ে সাততলার ওপরে শ্রমিক দিয়ে মাটি ওঠানোও বেশ ব্যয়বহুল।’

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, আবাসিক এলাকার বিভিন্ন বাড়ির ছাদে দুলছে বাহারি গাছ। বাজারের সবজির কীটনাশক ভীতিতে রাজধানীর বাড়িওয়ালাদের ছাদে সবজি চাষই হচ্ছে বেশি। বেগুন, টমেটো, ঢেঁড়স, ক্যাপসিকাম, লালশাক, ডাঁটাশাক, পুঁইশাক এবং কলমিশাকের মতো মৌসুমি সবজিগুলো চাষ করে সহজেই পরিবারের চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে। কাঁচা মরিচ, ধনেপাতা, বিলাতি ধনিয়া এবং পুদিনা পাতার মতো মসলা জাতীয় গাছও রয়েছে বেশ। গোলাপ, ঝুমকো জবা, মাধবীলতা, বাগানবিলাস, রক্তজবা, বেলি, হাসনাহেনা, রঙ্গন, নয়নতারা, সন্ধ্যামালতীসহ হরেক জাতের ফুল গাছের টব থরে থরে সাজানো অনেকের ছাদবাগানে। এসব গাছের মধ্যে বারোমাসি ফুলও রয়েছে। এ ছাড়া কোনো কোনো বাগানে ফুলের রঙের সমন্বয়ে সাজানো হয়েছে টব। দুর্বা ফুলও আকর্ষণীয় করে তুলেছে বাগানের আঙিনা। এর বাইরে ফল গাছের মধ্যে রয়েছে আঙুর, পেয়ারা, দেশি-বিদেশি কমলা ও মাল্টা, আম, ডালিম, সফেদা, বরই, লেবু, বিলিম্বি এবং ড্রাগন ফল। অ্যালোভেরা, তুলসী, থানকুনি এবং চিরতার মতো ঔষধি গাছও লাগানো হচ্ছে অনেকের ছাদ বাগিচায়।

ছাদবাগানের ব্যাপারে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর হাছিনা বারি চৌধুরী বলেন, ‘ছাদবাগানের প্রতি ঢাকাবাসীর আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে নারীরা ছাদবাগানের প্রতি বেশি মনোযোগী। তবে এখনো সিটি করপোরেশন তেমন কোনো সহযোগিতা করতে পারছে না। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলব।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা