মিনেসোটার ডাউন টাউন মিনিয়াপলিস থেকে চব্বিশ কিলোমিটার দূরে ছিমছাম সুন্দর ছোট্ট উপশহর বারন্সভিলের অবস্থান। এই ছোট শহরটার আয়তন প্রায় ২৭ বর্গ মাইল। আর এখানেই ১৭৬০ একর জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মোট ৭৬ টি পার্ক। ফলে বারন্সভিল শহরের যে কোন যায়গায় বসবাসরত যেকোন নাগরিক বাসা থেকে বেরিয়ে কয়েক কদম হাঁটলেই একটা পার্কের সন্ধান পেয়ে যাবেন। এতগুলো পার্কের মধ্যে একটি পার্ক নিকলে অ্যাভেন্যু এর পাশ ঘেঁষে ৭৬ একর জায়গা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এর নাম ক্রস টাউন ওয়েস্ট পার্ক। এই পার্কে আছে হাঁটার জন্য লম্বা একটা ট্রেইল। আছে মাঝারি সাইজের দুটো লেক। আর সারা পার্ক জুড়ে ছড়িয়ে আছে এলম, গ্রিন অ্যাশ, ম্যাপেল, বার্চ, ওক ও জানা-অজানা হরেক রকমের গাছ গাছালি।
পার্কের ভেতর হাঁটাচলা করলেই গভীর বনে হাঁটার অনুভূতিটা সহজেই পাওয়া যায়। সারা সামার জুড়ে লেক দুটোর টইটুম্বুর স্বচ্ছ কালচে নীল জলে বিচরন করে এক ঝাঁক বিভিন্ন প্রজাতির হাঁস, মিনি আকারের কচ্ছপ আর বেশ কিছু সাদা আর খয়েরি রঙের বক; যাদের মূল উদ্দেশ্য লেক থেকে মাছ শিকার করে উদর পূর্তি করা। ট্রেইল’এর আশেপাশের জংগলে বিচরন করে অসংখ্য কাঠবিড়ালি আর ছাই রঙের খরগোশ।মাঝে মাঝে এক রঙা হরিন এবং টার্কি প্রজাতির মোরগেরও দেখা মেলে।
একদিন এই ট্রেইল দিয়ে হাঁটতে যেয়ে লেকের মাঝ বরাবর উঠে যাওয়া কাঠের পাটাতনের ব্রিজে দাঁড়িয়ে এক ককেসিয়ান মহিলাকে দেখতে পেলাম। তিনি পরম মমতায়, নিবিষ্ট মনে একটা প্যাকেট থেকে ওটের তৈরি রুটি বের করে পানিতে ছুঁড়ে ফেলছেন। আর ব্রিজের নিচে এক দঙ্গল খাদ্য রসিক হাঁস সেগুলো কব্জা করতে চারিদিকে পাঁয়তারা করছে। এর মাঝে বেশ কয়েকটা মিনি কচ্ছপ পানির নীচে সাঁতরাতে সাঁতরাতে খোল থেকে মুখটা পানির উপরে তুলে ওটের টুকরোগুলো ধরতে প্রানন্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু হাঁসগুলোর দাপট আর দ্রুত গতির কারনে তাদের সব প্রচেষ্টা’ই বারংবার ব্যর্থ হচ্ছে।
আরেকদিন দেখি সেই মহিলাই একটা ব্যাগ হাতে ট্রেইল ধরে ধীর গতিতে হেঁটে যাচ্ছেন আর তার পেছনে পেছনে এক ঝাঁক হাঁস প্যাক প্যাক শব্দ করে তাকে অনুসরন করছে। একদম যেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা আর তার অনুগত অনুসারী। কোন কোন দিন দেখি প্রচণ্ড বাতাসের কারনে রাস্তা জুড়ে পরে থাকা গাছের ভাঙ্গা ডাল আর লতা পাতাগুলো সরিয়ে পরম যত্নে রাস্তার পাশে সরিয়ে রাখছেন। আবার কোন কোন দিন দেখি পার্কের বেঞ্চে তিনি ধ্যানরত ঋষির মত নির্বাক হয়ে বসে আছেন আর তার পায়ের আশেপাশে বেশ কয়েকটা কাঠবেড়ালি আর খরগোশ ঘুরে ঘুরে রাস্তা থেকে খাদ্য দানা তুলে নিয়ে উদরস্ত করছে। মানুষ আর প্রাণীর শান্তিপূর্ণ সহঅবস্থান দেখে বিস্মিত হই। ধারনা করি এই মহিলা নিশ্চিত পার্কের কোন কর্মকর্তা হবেন। কিন্তু আমার ধারনা ভ্রান্ত ছিল।
বাঙ্গাল আর মার্কিনীদের সাংস্কৃতিক আচার ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রেই বিপরীতধর্মী। এখানে ট্রেইল ধরে হাঁটার সময় পাশ দিয়ে অতিক্রম করে যাওয়া মার্কিনীরা মৃদু হাসি দিয়ে ‘হাই’ শব্দটা উচ্চারণ করে। আর আবহাওয়া চমত্কার হলে ‘নাইস ওয়েদার’ বা ‘লাভলি ডে’ এ ধরনের মন্তব্য করে পাশ কেটে বেরিয়ে যায়। মার্কিনীদের এ ধরনের ব্যবহার ভাল লাগে আর মনটাকে করে তোলে প্রফুল্ল। তেমনি দারুন এই মহিলার সাথে হাই হ্যালো করতে করতে একদিন পরিচয় হয়ে গেল। নাম তার প্যাটরিসিয়া লিলি। তুলা রাশির জাতিকা এই মহিলার জন্ম ১৯৫৩ সালের অকটোবর মাসের ১৮ তারিখ বরফ ঝরা এক শীতের রাতে। মহিলা একজন পাক্কা মিনেসোটিয়ান। অর্থাত্ এই মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যে তিনি জন্ম গ্রহন করেছেন, শৈশব, কৈশোর আর যৌবনে এখানেই বেড়ে উঠেছেন। বিয়ে, চাকুরি-বাকরি করে এখানেই স্থিতু হয়েছেন। এখন অনেক দিন ধরে একাকী অবসর কাটাচ্ছেন। পার্কের অতি নিকটেই তার নিজের বাড়ি, এখন তিনি সেখানেই থাকেন। অবাক বিষয় হল তিনি কখনোই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে সফর করেননি এবং অনেক মার্কিনীর মত বহিঃবিশ্ব সম্পর্কে তার ধারনা একেবারেই সীমিত।
প্যাটরিসিয়া খোদ রাজধানী মিনিয়াপলিস‘এর কেন্দ্র সেন্টপলে জীবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন। বেবি বুমার জেনেরেশানে জন্মগ্রহনকারী এই মহিলার ছিল আরও সাত ভাই বোন। বাবা ছিলেন একজন সেলসম্যান আর পরিবারের আকার ছিল যথেষ্ট বড়। তাই পরিবারের কষ্ট লাঘব করতে হাইস্কুল পার হয়েই স্বাধীন জীবিকা অর্জনের জন্য মাত্র ১৭ বছর বয়সে প্যাটরিসিয়া ঘর হতে বেরিয়ে পরেন। আকাশ পথে উড়ালের স্বপ্ন তার অনেক দিনের। তাই এয়ারলাইনস‘এ এয়ার হোস্টেসের চাকুরী নিয়ে বহু বছর আমেরিকার আকাশ পথে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়িয়েছেন। পরে এক রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ির সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে চাকুরী ছেড়ে দেন এবং নিজেকে হোম মেকারে রুপান্তরিত করেন। দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে তার একটা ছেলে সন্তানও জন্ম গ্রহন করে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে লাঙ্গ ক্যানসারে ছেলে মৃত্যু বরন করে। ছেলের মৃত্যুর পর প্যাটরিসিয়া মানব কল্যানে নিজেকে নিয়োজিত করে কেয়ার গিভারের চাকুরী গ্রহন করেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে অসংখ্য প্রবীণ দম্পতির দেখভাল করেন। অবসর গ্রহনের পর বর্তমানে তিনি তার সাধ্যের মধ্যে প্রাণপরিবেশ রক্ষায় নিজেকে নিবেদিত রেখেছেন।
প্রাণীকুলের প্রতি নিবেদিত প্রাণ এই নারী ছোট বেলা থেকেই বিপন্ন এবং অকুলে ডোবা প্রাণীদের বিভিন্ন যায়গা থেকে খুঁজে বের করে নিজের বাসস্থানে নিরাপদ আশ্রয় দিতেন। এই তালিকা খুবই লম্বা আর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত আছে অসংখ্য প্রাণী। যেমনঃ কুকুর, বেড়াল, খরগোশ, টিয়া এবং গিনিপিগ। প্যাটরিসিয়ার যুক্তি খুবই সরল-প্রাণীরা অবলা। বিশেষ করে তারা যখন সংকটে পরে, তখন তাদের দেখভাল করার কেউ থাকে না। কাজেই মানবকুলের দায়িত্ব অবলা এই প্রাণীদের রক্ষনাবেক্ষনের জন্য খোলা মনে এগিয়ে আসা। প্রাণীদের কেবল খাবার দিলে হবে না, তাদের অস্তিত্ব রক্ষা করার জন্য পরিবেশের যত্ন নিতে হবে। পরিবেশকে নিরাপত্তা দিলেই প্রাণীরা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারবে। পার্কের কোন বেতন ভোগী কর্মকর্তা না হয়েও কেবল এ যুক্তিতে ভদ্রমহিলা পার্কের পরিবেশ সংরক্ষনের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে অষ্টমের পেয়াদার মত প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছেন। খ্রিস্টান ক্যাথলিক ধর্ম পালনকারী প্যাটরিসিয়া তার এই কল্যান মুখি কাজের জন্য ধর্মীয় নির্দেশাবলীকে সব চেয়ে বড় অনুপ্ররনা বিবেচনা করেন, আর প্রায়ই বলেন-জেসাস সেজ লাভ দাই নেইবার, বি ইট আ হিউম্যান বিং অর এন অ্যানিম্যাল।
আর দশটা সাধারণ মার্কিনীর মত প্যাটরিসিয়া আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে মোটেই মাথা ঘামায় না। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কি ধরনের ঘটনা ঘটছে, সে বিষয়ে তার একেবারেই কোন ধারনা নেই। তার চিন্তা ভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গি সব কিছুই ঘুরপাক খায় মার্কিন মুলুক নিয়ে। এর বাইরে যে বিশাল একটা জনগোষ্ঠি আর বহু দেশের অস্তিত্ব আছে সে সম্পর্কে তার ইষত্ ধারনা আছে। কিন্ত নেই একবিন্দুও কৌতূহল। এ ক্ষেত্রে সে সাধারণ মার্কিনীদের চিন্তা ভাবনার আদর্শ প্রতিবিম্ব। প্যাটরিসিয়া লিলি অবশ্যই জানে বিশ্বে অনেক দেশ আছে যেগুলো অনুন্নত এবং ভঙ্গুর। এ দেশগুলোর জনগন অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল। তাই সে মনে করে উন্নত দেশগুলোর উচিত পৃথিবীর সকল সম্পদের সুসম বণ্টন করে আদর্শিক ভাবে একটা ইউটোপিআন বিশ্ব সৃষ্টি করা। তবে সম্পদের সুসম বণ্টন কিভাবে করা যায়, আন্তর্জাতিক রাজনীতি সম্পর্কে স্বল্প ধারনা থাকায়, সে যথাযথ বিশ্লেষণ করতে পারে না। দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশ সম্পর্কে প্যাটরিসিয়া লিলির কোন ধারনা নেই। গুগল ম্যাপ আর ইন্টারনেট খুলে তাকে জ্ঞাণ দিতে হল। আর যখনি বলা হল বাঙালি সমাজের সংস্কৃতি, ধ্যান-ধারনা, জীবনযাপন ও আচার-ব্যবহার অনেকাংশে মার্কিনীদের বিপরীত মুখি। কেন জানি তখন সে অনুসন্ধিত্সু মন নিয়ে বাংলাদেশকে দেখার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করল। সুযোগ সুবিধা মত তাকে বাংলাদেশ সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানাব। এই অপেক্ষায় আছি।
লেখক : বিশেষ লেখক, কালের কণ্ঠ, যুক্তরাষ্ট্র




