kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২২ শ্রাবণ ১৪২৭। ৬ আগস্ট  ২০২০। ১৫ জিলহজ ১৪৪১

বাংলাদেশে পেঁয়াজের উৎপাদন ও আমদানি : একটি পর্যালোচনা

ড. মো. কামরুল হাসান   

৩০ জুন, ২০২০ ১৭:০১ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



বাংলাদেশে পেঁয়াজের উৎপাদন ও আমদানি : একটি পর্যালোচনা

বাংলাদেশের জনসাধারণের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর অন্যতম অপরিহার্য ও জনপ্রিয় খাদ্য উপকরণ হলো পেঁয়াজ। পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশে সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হলেও দক্ষিণ এশিয়ার খাদ্যে পেঁয়াজ একটি মৌলিক উপকরণ; এবং প্রায় সব রান্নায়ই মসলা হিসেবে ব্যবহূত হয়। পেঁয়াজে আমিষ, ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, লৌহ, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, পটাসিয়াম, সালফার ইত্যাদি পুষ্টি উপাদান রয়েছে এবং রোগ প্রতিরোধী নানা ঔষধি গুণের কারণে সারা বিশ্বেই এর বিস্তর চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই কমবেশি পেঁয়াজের আবাদ হলেও বিশ্বের মোট উত্পাদনে চীন (২৫ শতাংশ) ও ভারত (২৩ শতাংশ) প্রায় অর্ধেক জোগান দিয়ে থাকে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে পেঁয়াজের উৎপাদন যেমন ক্রমান্বয়ে বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে এর আমদানিনির্ভরতা। পরিসংখ্যানে কিছুটা গরমিল থাকলেও গত চার-পাঁচ বছরে পেঁয়াজের উৎপাদন ১৭-১৮ লাখ মেট্রিক টনে মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে (বিবিএস, ২০১৭, ২০১৯)। বিপরীতে ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে গত পাঁচ বছরে আমদানির পরিমাণ প্রায় আড়াই গুণ বেড়েছে।

বাংলাদেশে পেঁয়াজের আবাদ, উৎপাদন ও ফলন
বিগত ১০ বছরের পেঁয়াজের উৎপাদনচিত্র থেকে দেখা যায়, ২০০৮-০৯ সালে ১.০৮ লাখ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করে উৎপাদন পাওয়া গিয়েছিল ৭.৩৫ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ হেক্টরপ্রতি ফলন হয়েছিল ৬.৮১ টন। পরবর্তী ১০ বছরে আবাদি জমি ও উৎপাদনের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বেড়ে ২০১৭-১৮ সালে ১.৭৮ লাখ হেক্টর জমি থেকে উৎপাদন পাওয়া গেছে ১৭.৩৮ লাখ টন। অর্থাৎ ১০ বছরে চাষাধীন জমির পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৬৫ শতাংশ এবং উৎপাদনের পরিমাণ বেড়েছে ১৩৬ শতাংশ বা ২.৩৬ গুণ। মূলত নতুন জাত ও উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি ব্যবহারের দ্বারা হেক্টরপ্রতি ফলন বৃদ্ধির কারণে এই বর্ধিত উৎপাদন পাওয়া গেছে। এই সময়কালে হেক্টরপ্রতি ফলন ৬.৮১ টন থেকে বেড়ে ৯.৭৬ টন হয়েছে।

বিগত বছরগুলোতে পেঁয়াজের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়লেও তা অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল হওয়ায় বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়েছে। ২০০৮-০৯ সালে যেখানে পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে ১.৩৪৭ লাখ টন, সেখানে ২০১৭-১৮ সালে আমদানির পরিমাণ দাঁড়ায় ১০.৬৪৩ লাখ টন। অর্থাৎ ১০ বছরে উৎপাদন বেড়েছে ২.৩৬ গুণ আর আমদানি বেড়েছে ৭.৯ গুণ। ২০১৪-১৫ সাল থেকে গত চার বছরে উৎপাদনের পরিমাণ স্থিতিশীল (১৭-১৮ লাখ টন) থাকলেও আমদানির পরিমাণ সোয়া চার লাখ টন থেকে বেড়ে সাড়ে ১০ লাখ টন হয়েছে। ২০১৪-১৫ সালে দেশে পেঁয়াজের জোগান (অভ্যন্তরীণ উৎপাদন + আমদানি) যেখানে ২১.২৭৪ লাখ টন ছিল, সেখানে চার বছরের ব্যবধানে ২০১৭-১৮ সালে তা বেড়ে ২৮.০২৩ লাখ টন হয়েছে। অর্থাত্ পেঁয়াজের জোগান বেড়েছে প্রায় ৩২ শতাংশ।

পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা
পেঁয়াজের জোগান বৃদ্ধির এই প্রবণতাকে চাহিদা বৃদ্ধির ফল বলে গণ্য করা যেতে পারে। হাউসহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে ২০১৬ প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ২০১০ সালে মাথাপিছু দৈনিক পেঁয়াজের ভোগ ছিল ২২ গ্রাম, যা ২০১৬ সালে ৩১.০৪ গ্রামে উন্নীত হয় (বিবিএস, ২০১৯)। অর্থাত্ বার্ষিক মাথাপিছু ১.৫১ গ্রাম হারে পেঁয়াজের চাহিদা বেড়েছে। সেই হিসাবে ২০১৭-১৮ সালে পেঁয়াজের মাথাপিছু দৈনিক চাহিদা দাঁড়ায় (৩১.০৪+১.৫২×২=) ৩৪.০৮ গ্রাম। ২০১৭-১৮ সালের জনসংখ্যা দ্বারা গুণ করে ভোগের জন্য পেঁয়াজের মোট বার্ষিক চাহিদা পাওয়া যায় (৩৪.০৬×১৬.৫০×৩৬৫/১০০০=) ২০.৫১ লাখ টন। তা ছাড়া পেঁয়াজের বীজ উত্পাদন এবং মুড়িকাটা পেঁয়াজ উত্পাদনের জন্য পেঁয়াজের ব্যবহার রয়েছে। বাংলাদেশে মোট ১.৭১ লাখ হেক্টর (পেঁয়াজ আবাদের জমির ৮২ শতাংশ) জমি আবাদের জন্য প্রয়োজনীয় চারা উত্পাদনে যে বীজের প্রয়োজন হয় তার জন্য পেঁয়াজ কন্দ লাগে ০.০৪৩ লাখ টন। আবার ০.৩১২ লাখ হেক্টর (পেঁয়াজ আবাদের জমির ১৫ শতাংশ) জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ উত্পাদনের জন্য পেঁয়াজ কন্দের প্রয়োজন হয় ০.৪৬৮ লাখ টন (হেক্টরপ্রতি ১.৫ টন হিসাবে)। এর বাইরে পেঁয়াজের আরেকটি ব্যবহার হলো প্রসেসিংশিল্প ও ঔষধশিল্প, বিশেষ করে ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রেও প্রায় ১ লাখ টন পেঁয়াজের ব্যবহার রয়েছে। তাহলে সব মিলিয়ে পেঁয়াজের বার্ষিক নিট চাহিদা দাঁড়ায় ২২.০২১ লাখ টন।

পেঁয়াজের বার্ষিক জোগান
২০১৭-১৮ সালে পেঁয়াজের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ছিল ১৭.৩৮ লাখ টন। কিন্তু পেঁয়াজ পচনশীল পণ্য বলে মোট উত্পাদনের প্রায় ২৫ শতাংশ সংগ্রহোত্তর অপচয় হিসেবে গণ্য করা হয়। ফলে ব্যবহারের উপযোগী পেঁয়াজের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৩.০৩৫ লাখ টন। আবার ওই বছরের আমদানীকৃত পেঁয়াজের একটি অংশও বিতরণ পর্যায়ে ক্ষতি হয়, যা কমবেশি ৫ শতাংশ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। সেই হিসাবে আমদানীকৃত ১০.৬৪৩ লাখ টন পেঁয়াজের মধ্যে ব্যবহারের উপযোগী পেঁয়াজ হলো ১০.১১ লাখ টন। ফলে মানুষের ব্যবহারের জন্য নিট প্রাপ্য পেঁয়াজের পরিমাণ হলো (১৩.০৩৫+১০.১১=) ২৩.১৪৫ লাখ টন। এখানে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা ২২.০২১ লাখ টনের বিপরীতে সরবরাহ ২৩.১৪৬ লাখ টন। অর্থাত্ চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কিছুটা বেশি। পেঁয়াজ পচনশীল পণ্য বলে বাজারে এর সরবরাহ সব সময় কিছুটা বেশি রাখা হয়।

পেঁয়াজের ভোগ (Consumption)
পেঁয়াজের ভোগ সময়ের সঙ্গে বেড়েছে। ১৯৯৫ সালে সেখানে পেঁয়াজের মাথাপিছু দৈনিক ভোগ ছিল ১১.৬০ গ্রাম, ২১ বছরের ব্যবধানে তা প্রায় তিন গুণ বেড়ে ২০১৬ সালে মাথাপিছু দৈনিক ৩১.০৪ গ্রাম হয়েছে। শুধু ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সময়কালে পেঁয়াজের মাথাপিছু বার্ষিক ভোগ ১.৫১ গ্রাম হারে বেড়েছে। বিগত ২১ বছরের (১৯৯৫ থেকে ২০১৬) মাথাপিছু পেঁয়াজ ভোগের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে ২০১৬ সালের পর পেঁয়াজের মাথাপিছু ভোগ বার্ষিক ১.৫১ গ্রাম হারের চেয়ে বেশি পরিমাণে বেড়েছে। মানুষের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির ফলে মাথাপিছু পেঁয়াজের ব্যবহার বৃদ্ধি খুবই স্বাভাবিক। মাথাপিছু চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ২০১৭ সালে বাংলাদেশে আগত প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর চাহিদাও এখানে বিবেচনাযোগ্য।

পেঁয়াজ আবাদ ও উৎপাদন সম্পর্কিত তথ্যে অসামঞ্জস্য
পেঁয়াজ চাষের এলাকা এবং উৎপাদনের যে পরিসংখ্যান পাওয়া যায় তা মূলত দুটি উৎস থেকে। একটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) এবং অন্যটি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। পেঁয়াজ চাষের এলাকা এবং উৎপাদনের যে হিসাব এ দুই সূত্র থেকে পাওয়া যায় তার মধ্যে বিস্তর ব্যবধান রয়েছে। যেমন—২০১৭-১৮ সালে ডিএইর হিসাব অনুযায়ী ২.০৭ লাখ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করে ২৩.৩ লাখ টন উত্পাদন পাওয়া গেছে, যেখানে বিবিএস ওই বছর বলছে ১.৭৮ লাখ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করে ১৭.৩৮ লাখ টন পেঁয়াজ কন্দ উৎপাদিত হয়েছে। পূর্ববর্তী বছরগুলোতেও অনুরূপ ব্যবধান সুস্পষ্ট। চাষের এলাকা এবং উৎপাদন—উভয়ের ক্ষেত্রেই ডিএইর প্রাক্কলন বিবিএসের প্রাক্কলনের চেয়ে বেশি। ডিএইর উৎস থেকে উৎপাদনের যে তথ্য পাওয়া যায় তা বিবিএস উেসর উত্পাদন থেকে অনেক বেশি। আবার পেঁয়াজ চাষের আওতাধীন এলাকার মধ্যেও অসামঞ্জস্য রয়েছে। ২০০৮-০৯ সাল থেকে ২০১৭-১৮ সাল পর্যন্ত বিবিএস ও ডিএই সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেখা যায় যে পেঁয়াজ আবাদি জমি ডিএইর হিসাবে বিবিএসের হিসাব থেকে ১৩-৪৬ শতাংশ বেশি দেখানো হয়েছে। আবার উৎপাদনের ক্ষেত্রে আরো বেশি ব্যবধান পরিলক্ষিত হয়েছে। এই সময়কালে বিভিন্ন বছরে ডিএইর হিসাবে ১৩-৯২ শতাংশ বেশি উত্পাদন দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে কাদের পরিসংখ্যান অসামঞ্জস্যপূর্ণ বা ত্রুটিযুক্ত তা বলার মতো যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত গবেষকদের কাছে নেই। তবে এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে একই বিষয়ে দুই রকম তথ্য বাস্তবিকভাবে হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এই অসামঞ্জস্য দূর করার জন্য ডিএই ও বিবিএস আলোচনাক্রমে সম্মিলিত সিদ্ধান্তে আসতে পারে।

পেঁয়াজ আমদানির ফলে দেশের ব্যয় বৃদ্ধি
পেঁয়াজ আমদানির ফলে দেশের প্রকৃত ব্যয় নিশ্চিতভাবেই বেড়েছে। এই ব্যয় বৃদ্ধি দুই দিক থেকে সংঘটিত হয়েছে। প্রথমত, প্রতিবছর বেশি পরিমাণে পেঁয়াজ আমদানি করতে হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববাজারে পেঁয়াজের দর প্রতিবছরই কিছু না কিছু বেড়েছে। বাংলাদেশে পেঁয়াজের আমদানিচিত্র থেকে দেখা যায় যে ২০০৮-০৯ সালে ১.৩৪৭ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ২২২.৩১ কোটি টাকা, যা ১০ বছরের ব্যবধানে ২০১৭-১৮ সালে ১৫.৩৫ গুণ বেড়ে ৩৪১২.২৭ কোটি টাকা হয়েছে। অর্থাৎ আমদানির পরিমাণ ৭.৯ গুণ বাড়লেও ব্যয় বেড়েছে ১৫.৩৫ গুণ। এমনকি গত পাঁচ বছরে (২০১৪-২০১৮) আড়াই গুণ আমদানি বৃদ্ধির বিপরীতে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৪.৬৫ গুণ। সুতরাং এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে বিগত বছরগুলোতে পেঁয়াজের আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আমদানি ব্যয় বর্ধিত হরে বেড়েছে। ২০০৮-০৯ সালকে ভিত্তি বিবেচনা করে পেঁয়াজ আমদানির পরিমাণের তুলনামূলক বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায় যে ১০ বছরে পেঁয়াজ আমদানির পরিমাণ বেড়েছে ৬৯০ শতাংশ। কিন্তু এই সময়কালে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ১৪৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ আমদানি ব্যয় বর্ধিত হারে বেড়েছে।

বাংলাদেশে পেঁয়াজের ২০২১ সালের প্রাক্কলিত চাহিদা
বাংলাদেশে ২০১৮ সালে পেঁয়াজের সরবরাহ ছিল ২৮.০২৩ লাখ টন, যা থেকে সংগ্রহোত্তর ক্ষতি এবং আমদানীকৃত পেঁয়াজের বিতরণ পর্যায়ে ক্ষতি বাদ দিয়ে মানুষের জন্য নিট প্রাপ্যতা ছিল ২৩.১৪৬ লাখ টন। কিন্তু মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবছরই পেঁয়াজের চাহিদা কিছু না কিছু বাড়ছে। এ অবস্থায় ২০২১ সালের জন্য প্রস্তুতকৃত চাহিদার প্রাক্কলন থেকে দেখা যায়, পেঁয়াজের নিট চাহিদা হবে ২৫.৭৯ লাখ টন। এই পরিমাণ পেঁয়াজের চাহিদা পূরণ করতে হলে পেঁয়াজ উৎপাদন করতে হবে ৩৪.৩৯ লাখ টন। কারণ উৎপাদিত পেঁয়াজের ২৫ শতাংশ সংগ্রহোত্তর ক্ষতি হয়ে থাকে। এখানে খাদ্য হিসেবে মাথাপিছু বার্ষিক ভোগ ২ গ্রাম হারে বৃদ্ধি বিবেচনা করা হয়েছে। তা ছাড়া পেঁয়াজের অন্যান্য ব্যবহার তিন বছরে ১০ শতাংশ বাড়তে পারে বলে ধরা হয়েছে।

চাহিদা পূরণ এবং উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ
পেঁয়াজের অভ্যন্তরীণ উত্পাদন ও চাহিদার মধ্যে যে বিস্তর ব্যবধান, যা প্রতিবছরই বাড়ছে, তা পূরণের জন্য বর্ধিত হারে পেঁয়াজ আমদানি করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি এবং বেশি পরিমাণে আমদানি করার কারণে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে, ২০১৭-১৮ সালে যার পরিমাণ ছিল ৩৪১২.২৭ কোটি টাকা। দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন পর্যায়ক্রমে বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানো প্রয়োজন। এর জন্য নিম্নরূপ পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে :

১. উচ্চফলনশীল জাত এবং উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদ : বাংলাদেশে কৃষক পর্যায়ে পেঁয়াজের গড় ফলন ৯ থেকে ১০.৪ টন। কিন্তু বারি উদ্ভাবিত উন্নত জাতগুলোর গড় ফলন ১৪ থেকে ২২ টন। প্রচলিত স্থানীয় জাতের পরিবর্তে উচ্চফলনশীল জাতগুলোর আবাদ বাড়িয়ে এবং পরিমিত পরিমাণে সার, সেচের ব্যবহার করে গড় ফলন বাড়িয়ে বর্তমানের চেয়ে চার-পাঁচ লাখ টন বেশি উৎপাদন পাওয়া সম্ভব।

২. পেঁয়াজ চাষের এলাকা সম্প্রসারণ : বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট বিভাগের বিস্তীর্ণ এলাকা রবি মৌসুমে অনাবাদি থাকে। মূলত আমন ধান কাটার পর সেচ সুবিধা না থাকায় এসব অঞ্চলে বোরো ফসলের আবাদ করা যায় না। পেঁয়াজ চাষে খুবই কম পানির প্রয়োজন হয়। শুধু এক থেকে তিনটি হালকা সেচ দিয়েই পেঁয়াজের ভালো ফলন পাওয়া যায়। এসব এলাকার এক লাখ হেক্টর জমি পর্যায়ক্রমে পেঁয়াজ চাষের আওতায় আনতে পারলে ১০-১২ লাখ টন পেঁয়াজ উত্পাদন করা যেতে পারে।

৩. আন্ত ফসল হিসেবে এবং বসতবাড়ির আঙিনায় চাষ : কুমিল্লা, রংপুর, দিনাজপুর, নওগাঁ ও বরেন্দ্র এলাকায় ভুট্টা, কচুমুখি, মরিচসহ শীতকালীন বেশ কিছু ফসলের সঙ্গে আন্ত ফসল হিসেবে পেঁয়াজের চাষ করা যায়। টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, রংপুর, দিনাজপুর, নওগাঁ ও বরেন্দ্র এলাকায় স্বল্পমূল্যের ফসলগুলোর পরিবর্তে লাভজনকভাবে পেঁয়াজের চাষ করা যেতে পারে। তা ছাড়া পার্বত্য জেলাসহ সারা দেশের বসতবাড়ি ও কিচেন গার্ডেনে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ (বারি পেঁয়াজ ২, ৩ ও ৫) চাষ করেও দৈনন্দিন চাহিদা অনেকাংশে মেটানো সম্ভব।

৪. বাজার তদারকি এবং উত্পাদন মৌসুমে আমদানি নিয়ন্ত্রণ : বাজারে পেঁয়াজের জোগান যেন কেউ বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, তার জন্য নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা রাখতে হবে। দাম কিছুটা বাড়ালেই খুচরা ব্যবসায়ী ও ভোক্তারা যেন হুজুগে বেশি মাত্রায় কিনে মজুদ না করে, তার জন্য সচেতনতা তৈরি করতে হবে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলে বাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। দেশীয় উত্পাদন সক্ষমতা বাড়াতে উত্পাদন মৌসুমে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রাখতে হবে। কৃষক উত্পাদন মৌসুমে যেন ভালো দাম পায়, তার ব্যবস্থা করতে হবে এবং প্রয়োজনে ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ করে দিতে হবে। শুধু ঘাটতি মৌসুমে (সেপ্টেম্বর-নভেম্বর মাসে) এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে পেঁয়াজের দর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পরিলক্ষিত হলেই আমদানির ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

৫. উপকরণে ভর্তুকি এবং ঋণ সুবিধার সম্প্রসারণ : মৌসুমে পেঁয়াজের দাম যাতে খুব বেশি কমে না যায়, তার জন্য পেঁয়াজ চাষিদের উত্পাদন খরচের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে তাদের উপকরণ খরচে ভর্তুকি দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পেঁয়াজকে শুধু মসলাপণ্য হিসেবে গণ্য না করে বিদ্যমান স্বল্প সুদে (৪ শতাংশ হারে) ঋণ সুবিধার পরিধি বাড়াতে হবে, যাতে বেশিসংখ্যক কৃষক পেঁয়াজ উৎপাদনে উৎসাহী হয়; এবং এতে পেঁয়াজের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ বাড়বে।

৬. গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সংরক্ষণাগার তৈরি : পেঁয়াজের উচ্চফলনশীল জাত এবং পেঁয়াজ সংরক্ষণে টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনের গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পেঁয়াজের উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনে সংশ্লিষ্ট গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বরাদ্দ বাড়াতে হবে। তা ছাড়া পেঁয়াজ উত্পাদন এলাকায় পাঁচ-ছয় লাখ টন সংরক্ষণ উপযোগী বিশেষ ধরনের কোল্ড স্টোরেজ (৪ থেকে ১০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা ও ৩৫-৪৫ শতাংশ আর্দ্রতা) নির্মাণ করে ঘাটতি মৌসুমের জন্য সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

৭. উন্নত প্রযুক্তির বিষয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ : দেশের যেসব অঞ্চলে পেঁয়াজ উত্পাদনে তুলনামূলক সুবিধা রয়েছে (ফরিদপুর, পাবনা, নাটোর, রাজশাহী), সেসব অঞ্চলের কৃষকদের পেঁয়াজ উৎপাদন ও সংরক্ষণে উন্নত প্রযুক্তির বিষয়ে প্রশিক্ষণদানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

লেখক : মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রধান, কৃষি অর্থনীতি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা