একসময় যিনি আওয়ামী লীগ সরকারের বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থাকার অভিযোগে একের পর এক মামলার আসামি হয়েছেন, জেল খেটেছেন, চাকরি হারিয়েছেন এবং বছরের পর বছর আত্মগোপনে থেকেছেন, সেই গোলাম কিবরিয়া এখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) কর্মকর্তা এবং সংস্থাটির অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি গোলাম কিবরিয়াকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
ডিএসসিসির সাম্প্রতিক এ সিদ্ধান্ত ঘিরে নগর ভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। একপক্ষ বলছে, তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত। অন্যদিকে আরেকপক্ষের দাবি, এটি মূলত সংস্থার অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ের অংশ।
সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গোলাম কিবরিয়ার কর্মজীবন কেবল একটি সরকারি চাকরির গল্প নয়; বরং তা রাজনৈতিক নিপীড়ন, মামলা-মোকদ্দমা এবং দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসও বহন করে।
তথ্যানুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে তার বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় মোট ২৬টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে পল্টন থানায় ৮টি, রমনা থানায় ৮টি, শাহবাগ থানায় ৪টি, শ্যামপুর থানায় ২টি, ওয়ারী থানায় ২টি এবং যাত্রাবাড়ী থানায় ২টি মামলা ছিল।
২০১৮ সালের ২৯ এপ্রিল গ্রেপ্তার হওয়ার পর তিনি টানা ৪ মাস ৬ দিন কারাগারে ছিলেন। শুধু তিনি নন, তার পরিবারের সদস্যরাও মামলার ভার বহন করেছেন। তার সেজ ভাইয়ের বিরুদ্ধে ২৯টি এবং বাবার বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়েছিল বলে জানা গেছে। পরিবারের কয়েকজন সদস্যকেও বিভিন্ন সময় কারাবরণ করতে হয়েছে।
সহকর্মীদের দাবি, এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি সরকারবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং সাম্প্রতিক জুলাই আন্দোলনেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, রাজনৈতিক মামলার পাশাপাশি প্রশাসনিকভাবেও নানা চাপের মুখে পড়েছিলেন গোলাম কিবরিয়া। প্রায় ছয় বছর চাকরিচ্যুত অবস্থায় থাকতে হয়েছে তাকে। দীর্ঘ আইনি ও প্রশাসনিক লড়াইয়ের পর তিনি আবার দায়িত্বে ফেরেন।
ফিরে এসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে সরব হন এবং অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। ফলে সংস্থার ভেতরে তার একটি প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি হয়।
সাময়িক বরখাস্তের আদেশে বলা হয়েছে, বিভিন্ন বিশ্বস্ত সূত্র থেকে প্রাপ্ত অভিযোগের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন টেন্ডার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ, মার্কেটের দোকান বরাদ্দ ও পরিচালনায় অনিয়ম, দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
তবে আদেশে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা, অভিযোগকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়নি। অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণও প্রকাশ করা হয়নি।
আদেশে বলা হয়েছে, তদন্ত কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে সদর দপ্তরে সংযুক্ত রেখে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
ডিএসসিসির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, সংস্থার ভেতরে বর্তমানে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে এক ধরনের অদৃশ্য দ্বন্দ্ব চলছে।
তাদের ভাষ্য, অতীতে সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত কিছু কর্মকর্তা নতুন পরিস্থিতিতেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন। এ অবস্থায় অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতিকে সরিয়ে দিতে পারলে তাদের জন্য পরিস্থিতি সহজ হবে।
এক কর্মকর্তা বলেন, ‘নগর ভবনে এখন বিভিন্ন পক্ষ সক্রিয়। কে কতটা প্রভাবশালী হবে, তা নিয়েই মূল প্রতিযোগিতা। গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত হোক, কিন্তু অভিযোগের প্রকৃতি স্পষ্ট না করেই সাময়িক বরখাস্ত করায় অনেকের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।’
বিতর্ক ও আলোচনা চললেও নিজে খুব বেশি কথা বলতে রাজি নন গোলাম কিবরিয়া। যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে, সেই অভিযোগের তদন্ত হচ্ছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’
গোলাম কিবরিয়ার সাময়িক বরখাস্তের ঘটনা শুধু একজন কর্মকর্তার প্রশাসনিক শাস্তির বিষয় নয়; এটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ তদন্তের স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার রাজনীতির প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে- এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। আবার অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলে প্রশ্ন উঠবে, একজন কর্মকর্তাকে কিসের ভিত্তিতে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো এবং তার পেশাগত ও ব্যক্তিগত ক্ষতির দায় কে নেবে।