সকাল তখন ৮টা বেজে ২০ মিনিট। ময়মনসিংহ নগরের টাউন হল মোড় থেকে সার্কিট হাউজ যাওয়ার সড়ক। সড়কটির ফুটপাতে সারিতে বসা অনেক তরুণ-তরুণী। অধিকাংশের চোখ আর মনোযোগ হাতে থাকা বইয়ে।
শনিবার (২৫ জুলাই) ময়মনসিংহ বিভাগীয় সরকারি গণগ্রন্থাগারের সামনের ফুটপাথের দৃশ্য এটি।
দৃশ্যটি দেখে প্রথমেই মনে হবে পরীক্ষার হলের সামনে বসে পরীক্ষার্থীদের অপেক্ষা। কিন্তু তাদের একজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারি গণগ্রন্থাগারে আসন পাওয়ার জন্য এভাবে সারিতে অপেক্ষা করছেন তারা।
সপ্তাহে পাঁচ দিন খোলা থাকে এ গণগ্রন্থাগার। পাঁচ দিনই বই পড়ার আসন ‘দখলের’ জন্য এমন লম্বা সারি পড়ে। গ্রন্থাগার খোলা হয় সকাল ৯টায়। তবে সারি শুরু হয় সকাল ৮টার আগেই। সারিতে অপেক্ষা করেও আসন না পেয়ে ফিরে যান অনেকে। যারা পান, তারা সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত টানা পড়াশোনা করেন।
দুপুরের খাবার বা প্রাকৃতিক কাজ সারার প্রয়োজনে বাইরে গেলেও আসনটি পাশের জনকে রক্ষার দায়িত্ব দিয়ে যান।
বই পড়ার জন্য তরুণ বয়সীদের এমন উপচে পড়া ভিড় দেখে কৌতুহলী হয়ে দুপুরে গণগ্রন্থাগারে যান এ প্রতিবেদক। দেখা যায়, ভেতরে ১৫০টি আসনের একটিও খালি নেই। কোথাও কোথাও পাঁচ থেকে সাতজন গ্রুপ স্টাডি করছেন। পড়ার পাশাপাশি খাতায় নোট করছেন। তাদের টেবিলে দেখা যায়, মোটা মোটা গাইড বই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসব বইয়ের অনেকগুলোই পাঠকরা নিজেদের বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছেন।
ময়মনসিংহ বিভাগীয় সরকারি গণগ্রন্থগারের জ্যেষ্ঠ লাইব্রেরিয়ান আব্বাস আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, বই পড়তে যারা আসেন, তাদের শতভাগই এমন তরুণ বয়সী। তারা ময়মনসিংহের সরকারি আনন্দ মোহন কলেজ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী।
অনেকের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শেষ, আবার অনেকের শেষ দিকে। তারা চাকরিপ্রত্যাশী। মূলত চাকরি পাওয়ার জন্য যেসব বই পড়া দরকার, তারা সেসব বই পড়েন।
আব্বাস আলী আরো বলেন, গণগ্রন্থাগারে চাকরির পরীক্ষার উপযোগী বই কম থাকায় পাঠকরা নিজেদের বাড়ি থেকে বই সঙ্গে করে নিয়ে যান। অনেকে দুপুরের খাবারও সঙ্গে নিয়ে যান। এরপর সকাল থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়েন।
বাড়ি থেকে বই নিয়ে গ্রন্থাগারে বসে পড়ার কারণ জানা যায় কয়েকজন পাঠককের সঙ্গে কথা বলে। পাঠকরা বেশিরভাগই বিভিন্ন জেলার বাসিন্দা যারা ময়মনসিংহের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করেছেন বা করছেন। তারা মেসে অথবা হলে থাকেন। মেসে বা হলে এক কক্ষে কয়েকজন থাকায় নিরবছিন্ন পড়াশোনা করতে অসুবিধা হয়। এছাড়া মেসে বা হলে কয়েকজন মিলে ‘গ্রুপ স্টাডি’ করতেও অসুবিধা। এ কারণে সরকারি গণগ্রন্থাগারে বসে পড়াশোনা করেন।
গ্রন্থাগারে পড়তে আসা সরকারি আনন্দ মোহন কলেজের শিক্ষার্থী মুশফিকুর রহমান তারেক বলেন, ‘মেসে পড়াশোনা করার চেয়ে পাঠাগারে বসে পড়লে বেশি মনোযোগ আসে। এ কারণে প্রতিদিন গ্রন্থাগারে চলে আসি।’
আরো কয়েকজন পাঠকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চাকরির উপযোগী বই গণগ্রন্থাগারে কম। তবে গ্রন্থাগার কর্তৃক্ষকে চাকরির পরীক্ষার উপযোগী বই কিনতে অনুরোধ করার পর কিছু বই সংযোজন করা হয়েছে।
এক শ্রেণির পাঠক এভাবে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আসন দখল করে রাখায় অন্য সাধারণ পাঠক পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন না, এমন মন্তব্যের জবাবে পাঠাগার কর্তৃপক্ষ জানায়, এখন সাধারণ পাঠক খুব কম আসে। বয়স্ক পাঠকরা এখন গ্রন্থাগারের সদস্য হয়ে বই বাড়িতে নিয়ে পড়েন।
ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কবি স্বাধীন চৌধুরী বলেন, তরুণ পাঠক যারা আসছেন, তারা বই পড়তেই আসেন। তাদের সর্বোচ্চ সুযোগ দেওয়া উচিত। পাশাপাশি অন্য বয়স্ক বা শিশু-কিশোর পাঠকদের জন্য প্রয়োজনে আলাদা কর্নার করা উচিত। এ জন্য প্রয়োজনে গ্রন্থাগারের পরিসর বড় করা যেতে পারে। কিন্তু কাউকে বঞ্চিত করা উচিত হবে না।
গ্রন্থাগারের জ্যেষ্ঠ লাইব্রেরিয়ান আব্বাস আলী আরো জানান, বিভাগীয় গণগ্রন্থাগারে বর্তমানে ৫০ হাজারের বেশি বই রয়েছে। গ্রন্থাগারটি সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চলতো। তবে সম্প্রতি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের নির্দেশে সময় কমিয়ে বিকেল ৪টা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। পরে তরুণ পাঠকরা গ্রন্থাগারটি সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চালু রাখার দাবি জানিয়ে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর আবেদন করেন।
আবেদনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলেও পাঠকদের অনুরোধে ৭টা পর্যন্তই গণগ্রন্থাগার খোলা রাখা হচ্ছে বলে জানান জ্যেষ্ঠ লাইব্রেরিয়ান।






