টানা চার দিনের অবিরাম বর্ষণে পাহাড় যেন আবারও তার ভয়ংকর রূপ দেখাল। একদিকে ফুলে-ফেঁপে ওঠা পাহাড়ি ছড়া ও নদী, অন্যদিকে নরম হয়ে যাওয়া পাহাড়ের ঢাল। সব মিলিয়ে আতঙ্কে কাটছে বান্দরবানের মানুষের দিন-রাত। বুধবার সকালে সেই আতঙ্ক বাস্তবে রূপ নেয়। বান্দরবান পৌরসভার কালাঘাটা বড়ুয়াপাড়া এলাকায় পাহাড়ধসে একটি পাকা দালানসহ অন্তত ৭টি বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে অল্পের জন্য বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো গেলেও আহত হয়েছেন ৩ জন।
স্থানীয়রা জানান, কয়েকদিন ধরেই পাহাড়ে ফাটল দেখা দিয়েছিল। টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি আলগা হয়ে পড়ায় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে অনেক পরিবার আগেভাগেই নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়। সেই সতর্কতাই শেষ পর্যন্ত বহু প্রাণ বাঁচিয়েছে।
বুধবার সকাল ১০টার দিকে পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কালাঘাটা বড়ুয়াপাড়া এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। ধসে নিপুণ বড়ুয়া, রন বড়ুয়া, অঞ্জনা বড়ুয়া, সুমন বড়ুয়াসহ কয়েকটি পরিবারের বসতঘর ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অঞ্জনা বড়ুয়াসহ তিনজন আহত হন। একটি পাকা ঘর সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি আরো ৭টি ঘরের বড় অংশ মাটির নিচে চাপা পড়ে।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সদস্যরা জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর থেকেই পাহাড় থেকে মাটি খসে পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ মনে হওয়ায় তারা রাতেই ঘর ছেড়ে আত্মীয়স্বজন ও নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যান। রাত প্রায় ২টার দিকে বিকট শব্দে পাহাড়ের বিশাল অংশ ধসে পড়ে তাদের বসতঘরের ওপর। সকালে ফিরে এসে তারা দেখেন, বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা ঘরবাড়ি মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলমান ভারী বৃষ্টিতে শুধু পৌর এলাকাই নয়, জেলার ৭টি উপজেলাজুড়েই ছোট-বড় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটছে। বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ের ঢাল ধসে যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে এবং নতুন করে ঝুঁকিতে পড়ছেন পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী মানুষ। তবে এখন পর্যন্ত কোথাও প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। ঘটনার পর বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মেজর সায়েমের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা উদ্ধার ও ঝুঁকি মূল্যায়নের কাজ চালান। তারা পাহাড়ঘেঁষা ঝুঁকিপূর্ণ বসতিতে থাকা মানুষদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানান।
বান্দরবান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ভারপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল মান্নান আনসারী বলেন, ‘পাহাড়ধসে সাতটি বসতঘর ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সৌভাগ্যক্রমে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। ক্ষতিগ্রস্ত ও আশপাশের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হলেও অনেকে এখনো ঘর ছাড়তে অনীহা দেখাচ্ছেন, যা বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।’

বান্দরবান সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মারুফা সুলতানা খান হিরা মনি জানান, পৌরসভার কালাঘাটা বড়ুয়াপাড়া ও সুয়ালক এলাকায় এ পর্যন্ত ৭টি বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা কাজ করছেন এবং আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নেওয়া পরিবারগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।