উজানের ঢল আর টানা বৃষ্টির ফলে কুড়িগ্রামের নদ-নদীর পানি বেড়ে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। তবে পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলেও জেলার নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের ফসলি জমি ও সবজি ক্ষেতে পানি প্রবেশ করে ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতি ও কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র জানায়, কয়েকদিন পানি জমে থাকলে গাছের শিকড়ে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, পাতা হলুদ হয় এবং রোগবালাই বাড়ে। দীর্ঘসময় জলাবদ্ধতায় সবজি ও আমনের বীজতলায় ক্ষতির ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
কৃষি বিভাগ বলছে, আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ নিয়মিত অনুসরণ করলে ক্ষতি কমানো সম্ভব। পানি নেমে গেলে দ্রুত পুনর্বাসনমূলক কৃষি কার্যক্রম শুরু করা জরুরি।
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বন্যা পরিস্থিতিতে দ্রুত পরিপক্ব সবজি সংগ্রহ করতে হবে। জমিতে পানি জমলে নালা কেটে নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিতে হবে। জমির আইল উঁচু রাখতে হবে এবং আমনের বীজতলায় অতিরিক্ত পানি যেন না থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে। পানি নেমে গেলে চারা গাছের কাদা পরিষ্কার করতে হবে।
তিনি আরো বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত জমিতে স্বল্পমেয়াদি ও পানি সহনশীল ফসল চাষের প্রস্তুতি নিতে হবে। সেই সঙ্গে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ নিয়মিত অনুসরণ করতে হবে।
জানা গেছে, টানা বৃষ্টি আর উজানের ঢলে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে কুড়িগ্রামে ৪৯৯ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে আমনের বীজতলা ৭১ হেক্টর, আউশ ধান ১৫০ হেক্টর, পাট ১৬৬ হেক্টর, শাক-সবজি ৮৭ হেক্টর, চীনা ৩ হেক্টর, মরিচ ২ হেক্টর এবং চিনাবাদাম ২০ হেক্টর রয়েছে। তবে প্রায় ৩২ হাজার ৬৮০ হেক্টর জমির ফসল এখনো রক্ষা পেয়েছে।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের শোভারকুটি গ্রামের কৃষক মাসুদ রানা বলেন, বৃষ্টি ও ধরলা নদীর পানিতে ১৫ শতক পটল ক্ষেত ডুবে গেছে। পানি দ্রুত না নামলে পুরো ক্ষেত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একই গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলাম বলেন, এক একর জমির কচু ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। কয়েকদিন পানি থাকলে ফসল পচে নষ্ট হয়ে যাবে।
শুলকুর বাজার এলাকার কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, পানিতে পটল ক্ষেত তলিয়ে যাওয়ায় গাছ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
চিলমারীর চর শাখাহাতির কৃষক আফজাল আলী জানান, পাট এখনও পরিপক্ব হয়নি, কিন্তু পানি ওঠায় আগেভাগেই কাটতে হচ্ছে। না হলে গাছের গায়ে শিকড় গজিয়ে পাটের মান নষ্ট হবে।
রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের চর গতিয়াশাম এলাকার কৃষক ছাবেদ আলী বলেন, তিস্তার পানি গতিবিধি বোঝা মুশকিল। এখনি পানি বাড়ে এখনি। বৃষ্টি আর উজানের ঢলে বাদাম ক্ষেত তলিয়ে যাওয়ায় তড়িঘড়ি করে বাদাম তুলে নিয়েছি। নয়তো বন্যার পানিতে বাদাম নষ্ট হয়ে লোকসান হতো।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষিকে জলবায়ু সহনশীল করে গড়ে তোলা এখন জরুরি। আগাম সতর্কতা, আবহাওয়ার পূর্বাভাসের সঠিক ব্যবহার এবং সময়োপযোগী কৃষি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঋতুচক্রের স্বাভাবিকতা ব্যাহত হচ্ছে। ফলে যখন যেটা হওয়ার কথা তখন সেটা হচ্ছে না। বৃষ্টিপাতের সময় ও পরিমাণে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। যা সরাসরি কৃষিতে প্রভাব ফেলছে।
তিনি আরো বলেন, চলতি বছরের মে মাসে কুড়িগ্রামে ৭৮৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। যা সাম্প্রতিক সময়ে সর্বোচ্চ। গত বছরও অনিয়মিত ও অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের কারণে নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা ও ফসল ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। তাই আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে কৃষিকাজ পরিচালনা ও আগাম প্রস্তুতি নেওয়া এখন অত্যন্ত জরুরি।