বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন কক্সবাজারের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় এনজিওগুলোর অংশীদারত্ব বাড়িয়ে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
রবিবার (২১ জুন) কক্সবাজারে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ে আয়োজিত সেমিনারে এ দাবি জানানো হয়। ‘কক্সবাজার সিএসও এনজিও ফোরাম’ (সিসিএনএফ) এবং ‘কোস্ট ফাউন্ডেশন’ যৌথভাবে এই সেমিনারের আয়োজন করে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মো. ইকবাল উদ্দিন। তিনি বলেন, কক্সবাজারভিত্তিক এবং স্থানীয় জনগণের নেতৃত্বে পরিচালিত সংগঠনগুলোকে রোহিঙ্গা মানবিক কার্যক্রমে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। এর পাশাপাশি তিনি স্থানীয় এনজিওর সংজ্ঞা পুনর্র্নিধারণ এবং জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও আরআরআরসির অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
সেমিনারে জানানো হয়, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১৬ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সংকটের জন্য আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার পরিমাণ ক্রমেই কমে আসছে।
চলতি ২০২৬ সালের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের (জেআরপি) আওতায় কক্সবাজার ও ভাসানচরে অবস্থানরত রোহিঙ্গা এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু জুনের বর্তমান সময় পর্যন্ত পাওয়া গেছে মাত্র ৩৬৮ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার, যা মোট চাহিদার অর্ধেকেরও কম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের অভিবাসনের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। শরণার্থী শিবিরের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি এর বিকল্প উৎস অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গা কো-অর্ডিনেশন প্ল্যাটফর্মের প্রধান ডেভিড বাগডেন সংকটকালীন মুহূর্তে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানান। তবে সংকট সমাধানে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভূমিকার ওপর বিশেষ জোর দেন তিনি।
অন্যদিকে, ইউএনএইচসিআরের স্ট্র্যাটেজিক ওভারসাইট সার্ভিসের প্রধান মার্সেল গ্রোগান নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও শরণার্থীদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখার আহ্বান জানান।
মুক্ত আলোচনায় বক্তারা শরণার্থী শিবিরের পরিবেশ পুনরুদ্ধার, নিরাপত্তা জোরদার, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান প্রতিরোধ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবি জানান।
উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় এনজিওগুলোকে উপেক্ষা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন বক্তারা। তারা বলেন, জাতিসংঘের ঘোষিত ‘হিউম্যানিটারিয়ান রিসেট’ নীতিতে স্থানীয় নেতৃত্বাধীন মানবিক কার্যক্রম ও সরাসরি তহবিল বণ্টনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
সংকট উত্তরণে বক্তারা একটি নতুন ‘জয়েন্ট রিপ্যাট্রিয়েশন প্ল্যান (জেআরপি ২.০)’ প্রণয়নের প্রস্তাব দেন। তারা আশা প্রকাশ করেন, এই নতুন পরিকল্পনাটি মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য একটি কার্যকর রোডম্যাপ হিসেবে কাজ করবে।




