‘আমি একজন প্রতিবন্ধী। জমি নিয়ে বিরোধের জেরে আপন ভাই আমার বাড়ির প্রবেশপথ বন্ধ করে দিয়েছে। তিন বছর ধরে আমি ও আমার বোন গৃহবন্দী জীবনযাপন করছি। জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েও সমাধান মেলেনি।’
এক বুক কষ্ট আর হতাশা নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার আদিয়াবাদ ইউনিয়নের নয়াচর এলাকার বাসিন্দা প্রতিবন্ধী কামরুন নাহার (৩৫)। জন্মের পর পোলিও আক্রান্ত হয়ে দুই পা হারান তিনি। জীবনের প্রতিটি দিন লড়াই করে বেঁচে থাকা এই নারী এখন নিজের বাড়িতেই যেন বন্দী।
শৈশব থেকেই সংগ্রামের জীবন :
মাত্র দুই বছর বয়সে পোলিওতে আক্রান্ত হয়ে দুই পা পঙ্গু হয়ে যায় কামরুন নাহারের। এরপর থেকে হাঁটু ও দুই হাতের ভরেই চলাফেরা করেন তিনি। মা-বাবার মৃত্যুর পর বড় বোন তাসলিমা-ই হয়ে ওঠেন তার একমাত্র আশ্রয়। প্রতিবন্ধী হওয়ায় বিয়ে হয়নি কামরুন নাহারের। পৈতৃক সম্পত্তির অংশে একটি ঘর নির্মাণ করে বড় বোনকে নিয়ে বসবাস করছিলেন তিনি। জীবিকার তাগিদে হাতে চালিত সেলাই মেশিনে কাপড় সেলাইয়ের কাজ শিখেছিলেন। মানুষের কাপড় সেলাই করে যা আয় হতো, তা দিয়েই কোনো রকমে চলত দুই বোনের সংসার। কিন্তু তিন বছর আগে জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে তাদের আপন ভাই কামরুজ্জামান কামাল বাড়ির একমাত্র প্রবেশপথে বেড়া দিয়ে বন্ধ করে দেন। সেই থেকে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন দুই বোন।
বাড়ি থেকে বের হওয়ার একমাত্র ভরসা মই :
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার নয়াচর এলাকার একটি বাড়ি চারপাশে উঁচু প্রাচীর ও বেড়া দিয়ে ঘেরা। ভেতরে বসবাস করছেন কামরুন নাহার ও তার বড় বোন তাসলিমা। তাদের সঙ্গী দুটি গৃহপালিত ছাগল। বাড়ির মূল প্রবেশপথটি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ। জরুরি প্রয়োজনে খাদ্য, ওষুধ কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আনতে তাসলিমাকে একটি মই বেয়ে বাড়ির বাইরে যেতে হয়। বাড়ির পেছন দিকে অন্যের জমি দিয়ে বিকল্প যে পথ রয়েছে, বর্ষা মৌসুমে সেটিও চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে।
সবচেয়ে করুণ বিষয় হলো, গত তিন বছরে একবারও বাড়ির বাইরে যেতে পারেননি প্রতিবন্ধী কামরুন নাহার। অসুস্থ হলেও হাসপাতালে নেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। বন্ধ হয়ে গেছে তার সেলাই কাজের আয়-রোজগারের পথও।
ভুক্তভোগী কামরুন নাহার বলেন, ‘আপন ভাই আমাদের সঙ্গে এমন করবে কখনো ভাবিনি। জমি নিয়ে বিরোধের কারণে পথ বন্ধ করে দিয়েছে। তিন বছর ধরে বাড়ি থেকে বের হতে পারি না। অসুস্থ হলেও হাসপাতালে যেতে পারি না। আগে কাপড় সেলাই করে কিছু আয় করতাম, এখন সেটাও বন্ধ। প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে অনেকবার গেছি। সংসদ সদস্যসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে আবেদন জানাই, আমাদের এই দুর্ভোগের অবসান করুন।’
তাসলিমা বলেন, ‘প্রতিবন্ধী বোনকে নিয়ে তিন বছর ধরে বন্দী জীবন কাটাচ্ছি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কাছে গিয়েও কোনো প্রতিকার পাইনি। সরকারের কাছে ন্যায়বিচার চাই।’
অভিযুক্ত কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ওই জমি আমার। আমি প্রবাসে থাকাকালে আমার বোনেরা সেখানে জোরপূর্বক ঘর নির্মাণ করেছে। পরে আমার জমির ওপর দিয়ে রাস্তা দাবি করে। তারা আমার বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানি করেছে। তাই রাস্তা বন্ধ করেছি। এখানে মানবতার কোনো বিষয় নেই, এটি সম্পত্তিগত বিরোধ।
আদিয়াবাদ ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য গাজী মাজহারুল ইসলাম পলাশ বলেন, ভাই-বোনদের মধ্যে জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। বাড়ির পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রতিবন্ধী কামরুন নাহার ও তার বোন কষ্টে আছেন। চেয়ারম্যান আর আমি উভয় পক্ষকে নিয়ে একাধিকবার বসেছি। সমাধানের চেষ্টা করেছি। কিন্তু কামরুজ্জামান কামাল রাজি না হওয়ায় বিষয়টি নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়নি।
রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা বলেন, উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশে স্থানীয় চেয়ারম্যান উভয় পক্ষকে নিয়ে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেটি সফল হয়নি। বর্তমানে বিষয়টি আদালতে উভয় পক্ষ আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন। এটি বিচারাধীন। আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবেন, সে অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।






