ঈদযাত্রায় ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ও এশিয়ান হাইওয়ের নারায়ণগঞ্জ অংশে ১০টি স্থানে যানজটে পড়তে পারে ঘরমুখী মানুষ।
মহাসড়কের শিমরাইল মোড়, সাইনবোর্ড, সানারপাড়, যাত্রামুড়া, কাঁচপুর ও মোগরাপাড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকা এবং এশিয়ান হাইওয়ের মদনপুর, নয়াপুর, বস্তল ও গাউছিয়ায় ভোগাতে পারে ভাঙাচোরা সড়ক। আর ঢাকা-সিলেট সড়কে ভোগান্তির কারণ হতে পারে অসমাপ্ত নির্মাণকাজ। এ ছাড়া অবৈধ স্থাপনা, সড়কে পশুর হাট এবং অবৈধভাবে করা গাড়ি পার্কিংয়ের মতো দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কিছু কারণ যাত্রার সময় দীর্ঘ করতে পারে।
যদিও ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে ঈদের আগে টানা ছুটি, শিল্পকারখানা ধাপে ধাপে বন্ধ করার মতো উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবু শেষ সময়ে যাত্রীর চাপে আগের ঈদের মতো এবারও যানজটে ভোগান্তির আশঙ্কা রয়েছে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, শিমরাইল মোড় থেকে মেঘনা টোলপ্লাজা পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু খানাখন্দ রয়েছে, যার কারণে দূরপাল্লার যানবাহনের গতি কম। স্থানীয়দের চলাচলের জন্য অনিয়ন্ত্রিতভাবে তিন চাকার অটোরিকশা চলাচলের কারণে এ সড়কে দুর্ঘটনা বেড়েছে। এ ছাড়া মহাসড়কের পাশে অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠার কারণে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মহাসড়ক দিয়ে দৈনিক ১৮ থেকে ২২ হাজার যানবাহন চলাচল করে। সাপ্তাহিক ছুটির দিন মহাসড়কে ২৬ থেকে ৩০ হাজার যানবাহন চলে। তবে ঈদের সময় যানবাহনের সংখ্যা অর্ধলাখ ছাড়িয়ে যায়। এ সময় টোল আদায়ের ধীরগতিতে যানজট হয়। অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ ও যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামার কারণে ঈদে যানজট বাড়তে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যানজটের নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ। এর মধ্যে রয়েছে মহাসড়কের কাঁচপুর থেকে শিমরাইল সাইনবোর্ড পর্যন্ত চার কিলোমিটার মহাসড়কে উল্টোপথে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের অবাধ চলাচল, সড়কের ওপর নিষিদ্ধ লেগুনা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার স্ট্যান্ড, বিভিন্ন পরিবহনের যত্রতত্র পার্কিং ও স্ট্যান্ড এবং মহাসড়কজুড়ে গড়ে ওঠা বিভিন্ন দোকানপাট।
কাঁচপুর সেতু থেকে শিমরাইল ও সাইনবোর্ড পর্যন্ত শত শত বাস ও মালবাহী ট্রাক পার্ক করে রাখার কারণেও যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এ ছাড়া শিমরাইল মোড়ের উত্তর পাশে মহাসড়কে সৃষ্টি হয়েছে খানাখন্দ। এসব খানাখন্দে প্রায়ই ছোট যানবাহন আটকে যাওয়ায় যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এশিয়ান হাইওয়ের মদনপুর থেকে গাউছিয়া পর্যন্ত এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক সংস্কার কাজের ধীর গতিতে কাঁচপুর থেকে গাউছিয়া পর্যন্ত প্রায়ই যানজট হচ্ছে। ফলে সড়কটিতে ঘরমুখী মানুষকে যানজটের কবলে পড়তে হবে মনে করা হচ্ছে।
জানা যায়, রাজধানী ঢাকা থেকে পূর্বাঞ্চলীয় ১৫টি জেলার যানবাহন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল হয়ে চলাচল করে। প্রতিদিন লাখো যানবাহন চলে এ মহাসড়ক দিয়ে। ব্যস্ততম মহাসড়কটির শিমরাইল অংশে প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে যানজট।
মহাসড়কের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের সঙ্গে আলাপ হলে তারা বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণে না থাকায় মহাসড়কের এই অংশ দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ পথে নিয়মিত চলাচল করে এমন যানবাহনের চালকরা বলছেন, মহাসড়কে এবার যানজটের অন্যতম কারণ হবে ছোট তিন চাকার যানবাহন। এসব যানবাহনের অবাধ চলাচলের কারণে দূরপাল্লার যানবাহনের গতি কমে যায়। অনেক জায়গায় যানজট সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া এ মহাসড়কের বিভিন্ন ইউটার্নে গাড়ি ঘোরানোর কারণেও যানজট সৃষ্টি হতে পারে। মহাসড়কের পাশে অবৈধ স্থাপনাও যানজটের জন্য দায়ী। এসব অবৈধ স্থাপনার কারণে মহাসড়কে যানবাহনের গতি কমে যাওয়ায় যানজট দেখা দেয়।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সোনারগাঁ অংশে মেঘনা সেতুর টোলপ্লাজাসহ সড়কে পার্কিং, বাজার ও অবৈধ স্থাপনার কারণে আরো সাতটি স্থানে তীব্র যানজট দেখা দিতে পারে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা না নিলে এই মহাসড়ক দিয়ে ঈদযাত্রা বিলম্বিত পারে।
মেঘনা সেতুর টোলপ্লাজায় কথা হয় কয়েকজন বাসচালকের সঙ্গে। তারা বলেন, কাঁচপুর বাসস্ট্যান্ড, মদনপুর ও মোগরাপাড়া চৌরাস্তায় বাস স্টপেজের কারণে যানজটে পড়তে হয়। সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশার কারণেও যানজট তীব্র হয়।
কাঁচপুর ওমর আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মতিউর রহমান বলেন, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে। রূপগঞ্জ অংশের ভুলতা-গাউছিয়া, কাঞ্চন সেতু, রূপসী, বরাবো ও তারাবো এলাকায় প্রতিদিনই যানজট হচ্ছে। ভুলতা-গাউছিয়ায় প্রতিদিন বহু ক্রেতা ও যানবাহন আসে। ঈদে তা বাড়বে। আশপাশের কলকারখানার গাড়ির অবৈধ পার্কিং এবং অটোরিকশা-সিএনজির অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এবং মহাসড়ক সম্প্রসারণে পুরো পথে খোঁড়াখুঁড়ির কারণে পুরো সড়কে নৈরাজ্য চলছে।।
মহাসড়কটিতে নিয়মিত চলাচলকারী তিশা পরিবহনের চালক রাসেল মিয়া বলেন, ঈদে যানজটের প্রধান কারণ হয় লোকাল যাত্রী ওঠানামা। এতে দূরপাল্লার গাড়িগুলো তাদের গতি কমাতে বাধ্য হয়। একপর্যায়ে সৃষ্টি হয় যানজট।
ইকবাল গ্রাফিক্স-এর মালিক ইকবাল হোসেন বলেন, মহাসড়কের দুই পাশে অবৈধ দোকানপাটের কারণে প্রতিদিন মহাসড়কে যানজটে আটকা পড়ে শতশত গাড়ি। এছাড়া লেগুনা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং বাস-মিনিবাসের অবৈধ স্ট্যান্ড গড়ে তুলে যানবাহনগুলো রেখে দেওয়ার কারণে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।
মনির হোসেন নামের এক আইনজীবী বলেন, প্রতিবছর ঈদের সময় মহাসড়কের এই অংশে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। তাই দ্রুত মহাসড়ক থেকে যানবাহনের অবৈধ পার্কিং, উল্টোপথে থ্রি-হুইলার চলাচল বন্ধ ও দোকানপাট উচ্ছেদ এবং লেগুনা চলাচল ও মহাসড়কে পার্কিং বন্ধ না করলে ঈদযাত্রায় এবারও যানজটের আশঙ্কা রয়েছে।
শিমরাইল এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রহিম বলেন, মাত্র কয়েকদিন বাকি রয়েছে ঈদুল আজহার। কিন্তু রহস্যজনক কারণে শিমরাইল এলাকার খানাখন্দ এখনও সংস্কার করেনি সড়ক জনপথ অধিদপ্তর।
হাইওয়ে পুলিশ (গাজীপুর অঞ্চল) সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইলের ইনচার্জ টিআই জুলহাস উদ্দিন বলেন, ঈদে ঘরমুখী মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে সেজন্য আমরা নানা পরিকল্পনা নিয়ে মহাসড়কে দায়িত্ব পালন করব। তবে শিমরাইল মোড় এলাকায় মহাসড়কের একাংশে খানাখন্দ থাকায় এ এলাকায় যানবাহন ধীরগতিতে চলছে। খুব শিগগির এসব খানাখন্দ ও সংস্কারের কাজ শেষ করার দাবি জানাচ্ছি।
কাঁচপুর হাইওয়ে থানার ওসি শামীম শেখ বলেন, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হবে। মহাসড়কে বিকল হওয়া যানবাহন দ্রুত সরাতে দুটি রেকার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, মদনপুর থেকে গাউছিয়া পর্যন্ত এশিয়ান হাইওয়ে সড়ক ও যাত্রামুড়া থেকে গাউছিয়া পর্যন্ত সড়কের নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ায় এসব এলাকায় যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)-এর নারায়ণগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহিম বলেন, ঈদকে সামনে রেখে সাধারণ মানুষ যাতে সহজে বাড়ি ফিরতে পারে, সেজন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। শিমরাইল মোড় এলাকায় সামান্য খানাখন্দ খুব শিগগির মেরামত করা হবে বলে জানান তিনি।