বৈধ লাইসেন্স নেই, নেই পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের ন্যূনতম সদিচ্ছা। সিন্ডিকেটের হাত ধরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে এমন পাঁচ হাজার দোকানে চলছে ভেজাল খাবার বিক্রি। এতে মানব শরীরের ক্ষতি ছাড়াও সরকার বছরে রাজস্ব হারাচ্ছে প্রায় দুই কোটি টাকা।
উপজেলা পরিসংখ্যান অফিস, স্বাস্থ্য পরিদর্শক অফিস ও কাস্টমস অফিস সূত্রে জানা গেছে, রূপগঞ্জ উপজেলাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সাড়ে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার মুদি দোকান রয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে চার হাজারের নেই কোনো বৈধ নথিপত্র। দোকানগুলোর ৭০ শতাংশ ব্যবসাই চলছে আইনের তোয়াক্কা না করে। এতে সরকার প্রতিবছর দেড় থেকে দুই কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজস্বের হারানোর ক্ষতির চেয়েও বড় ক্ষতি হচ্ছে জনস্বাস্থ্যের।
রূপগঞ্জের দুই পৌরসভা ও সাত ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, একেকটি বড় দোকানে ১০ হাজার, মাঝারি দোকানে পাঁচ হাজার এবং ছোট দোকানে তিন হাজার টাকা রাজস্ব নির্ধারিত। সেই হিসেবে দুই পৌরসভায় ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া যেসব দোকান রয়েছে সেখান থেকে ৭৫ লাখ টাকা এবং সাত ইউনিয়নে এক কোটি ২৫ লাখ টাকা রাজস্ব আসার কথা। কিন্তু ট্রেড লাইসেন্স ও অন্যান্য কাগজপত্র ছাড়াই দোকান পরিচালনা করায় তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, রূপগঞ্জ বাজারে প্রায় ৯টি মুদি দোকান রয়েছে, যাদের কারো কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। ট্রেড লাইসেন্স বা ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন ছাড়াই বছরের পর বছর ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। আইনের ফাঁক গলে তারা যেমন সরকারকে রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করছেন, তেমনি জবাবদিহিতার বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রণ করছেন পুরো বাজার ব্যবস্থা।
কথা হয় বাজারের মোস্তফা স্টোরের মোস্তফা মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এতকিছু বুঝি না। আমরা ব্যবসা করি। সরকারি লোকজন মাসে মাসে আসে। টেকা নেয়।’
কয়েকজন ক্রেতার অভিযোগ, স্থানীয় প্রশাসনের কাছে এসব অনিয়মের অভিযোগ বারবার জমা পড়লেও রহস্যজনক কারণে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। ভোক্তা অধিকার দপ্তর বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ভ্রাম্যমাণ আদালত যেন এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের সামনে থমকে দাঁড়িয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ মনে করছে, প্রশাসনের নীরবতাই অসাধু ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় ঢাল।
নগরপাড়া বাজারের কয়েকজন ক্রেতা অভিযোগ করেন, এ বাজারে কোনো ক্রয়-রশিদ (ভাউচার) নেই। ইচ্ছামতো দাম বাড়িয়ে সাধারণ ক্রেতাদের ঠকাচ্ছেন তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দোকানের দৃশ্যমান স্থানে পণ্যের হালনাগাদ মূল্য তালিকা ঝুলিয়ে রাখার নিয়ম রয়েছে। তালিকা ছাড়া বেশি দামে পণ্য বিক্রি করা দণ্ডনীয় অপরাধ। কোনোভাবেই মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া পণ্য দোকানে রাখা বা বিক্রি করা যাবে না। ভেজাল বা নিম্নমানের পণ্য বিক্রি করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কিন্তু এসবের কোনো বালাই নেই রূপগঞ্জে।
সরেজমিনে অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, অনেক বড় দোকানেও কোনো ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন বা প্রয়োজনীয় নথিপত্র নেই। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ব্যবসায়ী কাঁচামালের পাইকারি দর বাড়ার আগেই পুরনো মজুত করা পণ্য বাড়তি দামে বিক্রি করছেন। মূল্য তালিকা না থাকায় ক্রেতারা দাম নিয়ে দরদাম করার সুযোগ পাচ্ছেন না।
নগরপাড়া বাজারসহ কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দোকানগুলোর বর্ধিত অংশ ও মালামাল ফুটপাত দখল করে রাখায় ক্রেতাদের চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বাজারের সরু রাস্তায় মালামাল লোড-আনলোডের কারণে দীর্ঘক্ষণ যানজট লেগে থাকে।
আনোয়ার হোসেন নামের এক ক্রেতা বলেন, নগরপাড়া বাজারে একেক দোকানে একেক দাম। কোনো তদারকি নেই। আমরা কার কাছে অভিযোগ দেব বুঝতে পারছি না।
অভিযোগ রয়েছে, রূপগঞ্জের বিভিন্ন গলিতে গড়ে ওঠা অস্থায়ী গুদামগুলোতে রাতের বেলায় নিম্নমানের পণ্য প্যাকেটজাত করা হচ্ছে, যেখানে প্রশাসনের কোনো নজরদারি নেই। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী মূল্য তালিকা প্রদর্শন ও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রি করা দণ্ডনীয় অপরাধ। অথচ রূপগঞ্জে এই আইনের কোনো প্রয়োগ নেই।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, উপজেলার প্রায় ৭ শতাংশ দোকানেরই কোনো হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স নেই। হাজার হাজার দোকান লাইসেন্সবিহীন থাকায় এবং ব্যবসায়ীরা বছরের পর বছর লাইসেন্স নবায়ন না করায় সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। নগরপাড়া বাজারের মতো প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতেও প্রায় ৮৫ শতাংশ দোকানে দৃশ্যমান কোনো মূল্য তালিকা পাওয়া যায়নি।
এছাড়া অধিকাংশ ব্যবসায়ী পাইকারি বাজার থেকে পণ্য কেনার রশিদ (ভাউচার) সংরক্ষণ করেন না, যা বাজার তদারকির ক্ষেত্রে বড় বাধা বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মতে, রূপগঞ্জের বাজারগুলোর মতো জনাকীর্ণ স্থানে খোলা অবস্থায় রাখা ও মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রির ঘটনা বেশি।
নিরাপদ খাদ্য আইন অনুযায়ী, ব্যবসায়ীদের পণ্যের মান ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাজারের বিভিন্ন দোকানে কৃত্রিম রং বা বিষাক্ত রাসায়নিকযুক্ত পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে।
উপজেলা পরিসংখ্যান অফিসের স্টোর কিপার বলেন, পেশাদার জরিপ অনুযায়ী উপজেলার বাজারগুলোতে গত কয়েক বছরে দোকানের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও সেই অনুপাতে লাইসেন্স সংগ্রহের হার বাড়েনি। অনেক ব্যবসায়ী লাইসেন্স প্রক্রিয়াকে জটিল মনে করে তা এড়িয়ে চলছেন।
কায়েতপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে দেখা যায় অনেক ব্যবসায়ী এক বছরের লাইসেন্স করে পরবর্তী কয়েক বছর আর নবায়ন করেন না।
উপজেলা স্বাস্থ্য পরিদর্শক মো. নুরুল ইসলাম বলেন, আমরা চেষ্টা করি। কিন্তু শাস্তি দেওয়ার তো দায়িত্ব আমার না। আমি বেশ কয়েকবার উপজেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর আবেদন করেছি অভিযান পরিচালনা করার জন্য। আমাদের দায়িত্ব হলো মনিটরিং করা।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আইভি ফেরদৌস বলেন, ভেজাল খাদ্য খেয়ে মানুষ কিডনি বিকলসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম জয় বলেন, রূপগঞ্জের বাজারগুলোতে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে বিপুল সংখ্যক দোকান লাইসেন্সহীন থাকায় ডাটাবেইজ প্রস্তুত করা একটি চ্যালেঞ্জ। লাইসেন্সবিহীন ব্যবসায়ীদের দ্রুত নথিপত্র হালনাগাদ করতে নোটিশ দেওয়া হবে।