জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার তালোড়া-বাইগুনি খাল পুনঃখনন প্রকল্পে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসছে। প্রথমে শ্রমনির্ভর প্রকল্পে ভেকু (এক্সকাভেটর) মেশিন দিয়ে অধিকাংশ কাজ করানো এবং প্রকৃত শ্রমিকের পরিবর্তে কাগজে অতিরিক্ত শ্রমিক দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। এবার সেই প্রকল্পের শ্রমিক তালিকা পর্যালোচনায় বেরিয়ে এসেছে নতুন অনিয়ম। তালিকায় প্রকল্প সভাপতির আপন ছোট ভাই, ভাতিজা, ভাগিনা, চাচাতো ভাই, মামাসহ একাধিক নিকট আত্মীয়-স্বজন এবং স্বচ্ছল পরিবারের সদস্যদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি স্থানীয়দের দাবি, অন্য এলাকার কয়েকজনের নামও শ্রমিক হিসেবে দেখানো হয়েছে।
এদিকে প্রকল্পের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারায় বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যে ৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছেন, তদন্তে অনিয়মের সত্যতা মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি) আওতায় উদয়পুর ইউনিয়নের তালোড়া-বাইগুনি এলাকায় ২ হাজার ১০০ মিটার খাল পুনঃখননের জন্য প্রায় ৫২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। চলতি বছরের মে মাসে প্রকল্পটির উদ্বোধন করা হয় এবং ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রকল্পের জন্য ১২৫ জন শ্রমিকের তালিকা জমা দেন প্রকল্প সভাপতি ও স্থানীয় বিএনপি নেতা আমজাদ হোসেন।
তবে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। খালের অধিকাংশ অংশই ভেকু মেশিন দিয়ে খনন করা হয়েছে। কোথাও কোথাও হাতে গোনা কয়েকজন শ্রমিককে কোদাল দিয়ে কাজ করতে দেখা গেলেও স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্প চলাকালে কোনো দিনই ৬০ থেকে ৬৫ জনের বেশি শ্রমিক মাঠে কাজ করেননি। অথচ সরকারি নথিতে প্রতিদিন ১২৫ জন শ্রমিক কাজ করেছেন বলে দেখানো হয়েছে।
শ্রমিক তালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৩ নম্বর তুহিন মাহমুদ, ৮ নম্বর আবুল হোসেন, ১৮ নম্বর সাজ্জাদুল ইসলাম, ২১ নম্বর আনোয়ার হোসেন, ৪৩ নম্বর রমজান আলী প্রামাণিক, ৪৫ নম্বর রেজাউল হক, ৫৭ নম্বর এনামুল হক সরকার, ৬১ নম্বর রুবেল হোসেন, ৬৬ নম্বর মফিদুল ইসলাম, ৬৭ নম্বর মামুনুর রশিদ প্রামাণিক, ৭৮ নম্বর তারেকুল ইসলাম, ৮২ নম্বর তৌফিকুল ইসলাম, ৯৬ নম্বর এনামুল হক প্রামাণিক, ৯৭ নম্বর মাহমুদুল হাসান এবং ১১৬ নম্বর আবু জাহের ফকিরসহ একাধিক ব্যক্তি পেশাদার দিনমজুর নন। তার পরও তাঁদের নাম শ্রমিক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আরো অভিযোগ রয়েছে, তালিকার ৩৯ ও ৫৫ নম্বরে থাকা আলমগীর এবং হোসেন আমিনুল ইসলাম প্রকল্প সভাপতি আমজাদ হোসেনের আপন ছোট ভাই। ২৪ নম্বর জিয়াউর রহমান ও ৩৪ নম্বর সুজাউল ইসলাম তাঁর চাচাতো ভাই, ৬৮ নম্বর সানাউল হক মণ্ডল তাঁর মামা এবং ৯৫ নম্বর এসআই পাশা তাঁর আপন ভাতিজা। একই তালিকার ৪২ নম্বরে থাকা এম এ ফারুক হোসেন স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার শ্যালক বলেও অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয়রা আরো অভিযোগ করেন, শুধু আত্মীয়দের নাম অন্তর্ভুক্ত করেই ক্ষান্ত হননি প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা, শ্রমিকদের ব্যাংক হিসাবও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। তাঁদের দাবি, শ্রমিক তালিকার ৬১ নম্বর রুবেল হোসেনের ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে প্রকল্প সভাপতির ছোট ভাই আরিফুল ইসলামের মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। একইভাবে ৬০ নম্বর হাফেজ আকন্দের চেকে আরিফুল ইসলাম স্বাক্ষর করে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করেছেন। ওই হিসাবের সঙ্গে আবার প্রকল্প সভাপতির মেয়ে আমিনা খাতুন তিশার মোবাইল নম্বর যুক্ত করা হয়েছে। বিষয়গুলো সরকারি অর্থ উত্তোলনে অনিয়মের সন্দেহ আরো জোরালো করেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শ্রমিক তালিকাভুক্ত কয়েকজন ব্যক্তি বলেন, ‘তাঁদের কখনোই ওই প্রকল্পে কাজ করতে দেওয়া হয়নি। তালিকায় নাম রাখার কথা বলে আগে থেকেই তাঁদের কাছ থেকে চেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। পরে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে কারো হাতে ৫০০ টাকা, কারও হাতে এক থেকে দেড় হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। আবার কেউ কোনো টাকাই পাননি। অথচ তাঁদের ব্যাংক হিসাব থেকে দুই কিস্তিতে প্রায় ১০ হাজার টাকা করে উত্তোলন করা হয়েছে।
স্থানীয় বিএনপি নেতা ও তালোড়া-বাইগুনি গ্রামের বাসিন্দা সুমির জালাল বলেন, ‘শ্রমিক তালিকায় ব্যাপক অনিয়ম করা হয়েছে। আমজাদ হোসেন একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না। মাঠে সর্বোচ্চ ৬০ থেকে ৭০ জন শ্রমিক কাজ করেছে। বাকি অধিকাংশই প্রকল্প সভাপতির আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিত লোকজন। পুরো বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প সভাপতি আমজাদ হোসেন বলেন, ‘এখন প্রকল্পের কাজ করবো না তো কি চুরি করে খাব? শ্রমিকের তালিকায় আমার ভাই, ভাতিজা ও স্বজনদের নাম আছে তো কী হয়েছে? কী লেখার আছে লিখেন তো?
১২৫ জন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করেছেন—এমন দাবির পক্ষে ভিডিও বা অন্য কোনো প্রমাণ আছে কি না জানতে চাইলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হাসিবুল ইসলাম তা দেখাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘শ্রমিক তালিকায় প্রকল্প সভাপতির কয়েকজন নিকট আত্মীয় এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার আত্মীয়ের নাম থাকার বিষয়টি তাঁদের নজরে এসেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় বরাদ্দকৃত ৫২ লাখ টাকার মধ্যে ৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীম আরা বলেন, ‘শ্রমিকের তালিকায় অনিয়ম হওয়ার কথা নয়। কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় বিলের একটি অংশ পরিশোধ না করে ফেরত দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’