kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১২ রজব ১৪৪২

গ্রাম থেকে কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে ঘুঘু পাখি

স্বপন কুমার ঢালী, বেতাগী (বরগুনা)   

২৩ জানুয়ারি, ২০২১ ০১:৩৩ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গ্রাম থেকে কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে ঘুঘু পাখি

উপকূলীয় জনপদ বরগুনার বেতাগী উপজেলায় এক সময় প্রচুর ঘুঘু পাখি দেখা যেত। আবার অনেকে খাঁচায় করে বাসাতেও পুষত। গ্রাম-বাংলার একসময়ের চির পরিচিত ঘুঘু পাখি এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। অথচ একসময় গ্রাম-বাংলার কৃষকের মাঠের ধান ঘরে উঠছে এই আনন্দে ঘুঘুর ডাকে মুখরিত হয়ে উঠত পরিবেশ।

এক সময় ধানের জমিতে ঘুঘু পাখির উৎপাত কৃষককে আনন্দ দিত। ঝোপ-জঙ্গল, খোলা মাঠ, গ্রাম বা আশপাশে বড় বড় গাছ আছে এমন কৃষি জমিতে এদের দেখা মিলত। 

গত কয়েক দিন গ্রামের বিভিন্ন পরিবেশ ঘুরে দেখা গেল, আগের মতো চিরপরিচিত এ পাখিটি তেমন দেখা যায় না। দুই একটা গ্রামে দেখা গেলেও তার সংখ্যা খুবই কম।

বেতাগী পৌর শহরের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা এরশাদুল ইসলাম জানান, 'আমার পাখি পালনের প্রিয় শখ। তাই খাঁচায় করে ঘুঘু ও কবুতর পালন করি। তবে ঘুঘু পাখি এখন আর তেমনটা পাওয়া যায় না।'

এ উপজেলার গ্রামাঞ্চলের বনগুলোতে প্রায় সর্বত্রই লাল, সবুজ, নীল ও খয়েরি বর্নের ঘুঘুর বিচরণ ছিল। সাধারণত জোড়ায় বা ছোট দলে বিচরণ করে। কৃষিজমি, খামার, ঘাসপূর্ণ মাঠ, ঝোপ, বনের প্রান্ত বা গ্রামে হেঁটে হেঁটে খাবার সংগ্রহ করে এরা। ঘাস ও আগাছার বিচি, শস্যদানা, গাছের কুঁড়ি ও কচি পাতা খায়। মূলত ধানই ছিল ঘুঘুর প্রধান খাদ্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফশলি জমিতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে যেমন ঘুঘুর প্রজনন কমে গেছে। তেমনি খাদ্যে বিষক্রিয়ার কারণে এখন প্রতিদিনই মারা যাচ্ছে ঘুঘু পাখি। বেতাগী উপজেলার গ্রামাঞ্চলে সর্বত্র একসময় মেঠে ঘুঘু, তিলি ঘুঘু, রাম ঘুঘুর দেখা মিলত। এখন সেই ঘুঘু দেখা তো দূরের কথা ঘুঘু পাখির ঘু.. ঘু.. শব্দের পরিচিত ডাকও তেমনটা শোনা যায় না। তবে এখনো দু'একটা গ্রামে মাঝে মধ্যে কিছু ঘুঘু পাখির ডাক শোনা যায়।

বেতাগী সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর শক্তিপদ বিশ্বাস বলেন, 'ঘুঘু পাখির সুনির্দিষ্ট আবাসস্থল ও প্রজননের উপযুক্ত পরিবেশ না থাকার কারণে এ প্রজাতির পাখি হ্রাস পাচ্ছে।'

পাখি বিশেষজ্ঞদের মতে, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক যুক্ত খাবার খাওয়ার ফলে পাখির পরিমাণ হ্রাস পাওয়া ও ডিম পাড়ার হার কমে যাওয়াসহ নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির পাখি বলে পরিচিত ঘুঘু পাখি। তাছাড়া পাখি শিকার ও বিক্রির কারণেও প্রতিদিন নিধন হচ্ছে এই পাখি।

উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা শেখ আব্দুল্লাহ বলেন, 'এ প্রজাতির পাখি বসবাসের ঝোপঝাড় কমে যাওয়া এবং যথোপযুক্ত অনুকূল পরিবেশ না থাকায় ধীরে ধীরে ঘুঘু পাখি কমে যাচ্ছে।'

ঘুঘু অত্যন্ত ভিতু ও লাজুক প্রকৃতির পাখি। সাধারণত বছরে এক জোড়া ডিম পাড়ে। সেই ডিমে তা দিয়ে নিজেই বাচ্চার জন্ম দেয়। বিস্তীর্ণ জমির গাছের ডালে, আড়ালে আবডালে এরা বাসা করে ডিম থেকে বাচ্চা দিত। এখন এই পাখিটি বিলুপ্তপ্রায়। বাসা থাকলেও পাখি নেই। একসময় প্রচুর সংখ্যায় দেখা গেলেও শিকারিদের কবলে পড়ে ও ঝোপ-জঙ্গল কমে যাওয়ায় বর্তমানে এদের সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। বিপন্ন হয়ে পড়েছে এই সুন্দর পাখিটি।

তবে গোলাপি-মেরুন ডানার পুরুষটি দেখতে অত্যন্ত সুন্দর। লাল ঘুঘু ছোট আকারের পাখি। লম্বায় ২৩ সেন্টিমিটার, যার মধ্যে লেজই নয় সেন্টিমিটার। স্ত্রী পাখিটি পুরুষটির চেয়ে কিছুটা ছোট। পুরুষটির মাথা নীলচে-ধূসর। পিঠ ও ডানার পালক গোলাপি-মেরুন। ডানার পেছনের অংশ কালচে। লেজের পালক ধূসর। লেজের নিচটা সাদা। বুক ও পেট হালকা গোলাপি। স্ত্রীটির রং পুরোপুরি আলাদা। দেহের ওপরের অংশ গাঢ় হলদে বাদামি ও নিচের অংশ হালকা হলদে-ধূসর। উভয়েরই গলার পেছনে একটি কালো চিকন কলার আছে। উভয়ের চোখ বাদামি, ঠোঁট কালো, পা বেগুনি-লাল বা বেগুনি-কালো। এদের সুমিষ্ট শুনতে খুবই ভালো লাগে।’

লাল ঘুঘু সারা বছর প্রজনন করতে পারে। সাধারণত গাছের পাতাওয়ালা শাখায় ঘাস ও কাঠিকুঠি দিয়ে বাসা বানায় এবং তাতে স্ত্রী পাখিটি দুটি সাদা রঙের ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয় মাত্র ১২ দিনে। বাসা বানানো থেকে শুরু করে ডিমে তা দেওয়া ও বাচ্চাদের খাওয়ানো সবকিছুই স্ত্রী-পুরুষ একত্রে মিলেমিশে করে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা