kalerkantho

মঙ্গলবার । ২২ অক্টোবর ২০১৯। ৬ কাতির্ক ১৪২৬। ২২ সফর ১৪৪১              

কক্সবাজারের এক উপজেলাতেই ভোটার হয়েছে ৫৯৭ রোহিঙ্গা

কক্সবাজারের এক শিক্ষকসহ ৬০০ অজ্ঞাত রোহিঙ্গার বিরুদ্ধে মামলা

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০৮:৫৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কক্সবাজারের এক উপজেলাতেই ভোটার হয়েছে ৫৯৭ রোহিঙ্গা

নগদ টাকার বিনিময়ে কক্সবাজারেও শত শত রোহিঙ্গাকে ভোটার তালিকাভুক্তির অভিযোগ উঠেছে। কেবল মাত্র কক্সবাজারের একটি উপজেলায় ইতিমধ্যে ৫৯৭ জন রোহিঙ্গাকে অবৈধ পন্থায় ভোটার তালিকাভুক্তির প্রমাণও মিলেছে। আশংকা করা হচ্ছে, পুরো জেলায় এভাবে শত শত রোহিঙ্গা ভোটার হয়ে যেতে পারে। কক্সবাজারের একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের নেতৃত্বে রোহিঙ্গাদের চট্টগ্রাম নিয়ে গিয়ে ভোটার তালিকাভুক্তির কাজটি চলে আসছিল। অভিযোগ রয়েছে, সংঘবদ্ধ দালালচক্র প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অসাধু জনপ্রতিনিধিদের যোগসাজসে রোহিঙ্গারা ভোটার তালিকাভুক্ত হচ্ছে।

সর্বনিম্ন ১৫/২০ হাজার টাকা থেকে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে পর্যন্ত ভোটার তালিকাভুক্তির তথ্য পাওয়া গেছে। এমনকি রোহিঙ্গারা লাখ টাকা দিয়ে হলেও যে কোনোপ্রকারে ভোটার হবার জন্য মরিয়া হয়ে পড়েছে। রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকাভুক্তিকরণ রোধের জন্য সরকার কক্সবাজার জেলার সকল ইউনিয়ন পরিষদে জন্মনিবন্ধন সনদ প্রদান বন্ধ করে দিয়েছে। তারপরেও এক শ্রেণীর দালাল ৫/১০ হাজার টাকার বিনিময়ে অনলাইন নিবন্ধনের নামে ইউনিয়ন পরিষদের কিছু অসাধু চেয়ারম্যান-মেম্বাররাই রোহিঙ্গাদের সনদ প্রদান করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকাভুক্তির চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার বিষয়ে ইতিমধ্যে ওই শিক্ষক এবং আরো চার রোহিঙ্গা সহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা রুজু হয়েছে। কক্সবাজার জেলা নির্বাচন অফিসের কর্মচারিদের সহযোগিতায় কক্সবাজার সদর মডেল থানা পুলিশ ৪ রোহিঙ্গাকে গ্রেফতার করেছে। পুলিশ এবং নির্বাচন অফিসের কর্মীদের ভাষ্যমতে, কক্সবাজার সদর উপজেলার পূর্ব গোমাতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শামসুর রহমান দীর্ঘদিন ধরেই এ কাজে জড়িত রয়েছেন।

কক্সবাজার সদর উপজেলার ইসলামাবাদ ইউনিয়নের খোদাইবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা এবং পূর্ব গোমাতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শামসুর রহমান বেশ কয়েক বছর আগে অনুপ্রবেশকারি রোহিঙ্গাদের দালাল বানিয়ে ভোটার তালিকাভুক্তির কাজ করছেন। ২০১৭ সালে হালনাগাদ ভোটার তালিকা করার সময় প্রতারণামূলক ভাবে সীল, স্বাক্ষর জালিয়াতির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ভোটার করায় কক্সবাজার সদর মডেল থানায় গেল বছরের ১৩ মার্চ উক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করা হয়।

মামলা দায়েরের পর উক্ত শিক্ষককে সাময়িক বহিষ্কার করার পরেও তিনি আরো বেপরোয়া হয়ে পড়েন। এমনকি বেশ কয়েক বছর আগে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের দালাল বানিয়ে উক্ত শিক্ষক শত শত রোহিঙ্গাকে ইতিমধ্যে ভোটার তালিকাভুক্ত করেন। সর্বশেষ গত ১৩ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার জেলা নির্বাচন অফিসের সহযোগিতায় পুলিশ কক্সবাজার শহরের পশ্চিম নতুন বাহারছড়া এলাকা থেকে চারজন রোহিঙ্গাকে আটক করে। আটক রোহিঙ্গারা যথাক্রমে নুরুল ইসলাম প্রকাশ নুরু (৪২), মোহাম্মদ ইয়াছিন (৩৭), আবদুল্লাহ (৫৩) এবং ওবাইদুল্লাহ (৩৭)।

আটক রোহিঙ্গা ওবাইদুল্লাহ এবং আবদুল্লাহ আপন সহোদর। তারা দুইজনই টেকনাফের মুচনি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা। আটক দুই ভাই রোহিঙ্গাদের ভোটার করার জন্য দালাল হিসাবে কাজ করে থাকেন। তারা ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের যোগাড় করে টাকা পয়সা নিয়ে উক্ত শিক্ষকের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে থাকেন। আটক অপর দুই রোহিঙ্গা নুরুল ইসলাম প্রকাশ নুরু ও মোহাম্মদ ইয়াছিন কেও দালাল দুই ভ্রাতা শিক্ষকের কাছে নিয়ে আসেন।

আটক রোহিঙ্গা নুরুল ইসলাম প্রকাশ নুরু ও মোহাম্মদ ইয়াছিন পুলিশকে জানিয়েছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শামসুর রহমান গত ১২ মে দুই দালাল রোহিঙ্গা ভ্রাতাদের সহ চট্টগ্রাম নিয়ে যান। সেখানে কিছু অজ্ঞাতনামা লোক এসে রোহিঙ্গাদের কম্পিউটার ডিজিটাল ডিভাইস সহ ইলেকট্রনিক্স বিভিন্ন ডিজিটাল সিস্টেমে তাদের (রোহিঙ্গা) নাম ঠিকানা এন্ট্রি করে। উক্ত শিক্ষক এদিন দুই রোহিঙ্গার নিকট থেকে প্রথম দফায় ১৫ হাজার টাকা গ্রহণ করে চট্টগ্রাম নিযে যান।

আটক হওয়া চার রোহিঙ্গা ও প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক শামসুর রহমানের নাম উল্লেখ পূর্বক অবৈধ পন্থায় ভোটার তালিকাভুক্ত হওয়া ৫০০ থেকে ৬০০ অজ্ঞাতনামা রোহিঙ্গার বিরুদ্ধে গত ১৩ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার সদর মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের হয়েছে। মামলাটি দায়ের করেন কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা শিমুল বিশ্বাস। এটি সহ প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষকের বিরুদ্ধে দুটি জালিয়াতির মামলা নিয়ে তিনি পলাতক রয়েছেন। পলাতক শিক্ষক ইতিমধ্যে সাময়িক বহিষ্কারাদেশ নিয়ে সপ্তাহে কয়েক দিন বিদ্যালয়ে গিয়ে উপস্থিত দেখাতে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষরও করেন বলে সহকর্মী একজন শিক্ষক জানিয়েছেন।

কক্সবাজার সদর মডেল থানার উপ পরিদর্শক এবং মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা কাঞ্চন দাশ কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন ‘ আটক হওয়া রোহিঙ্গা এবং নির্বাচন অফিসের তথ্য মতে কেবল কক্সবাজার সদর উপজেলায় ৫০০ থেকে ৬০০ রোহিঙ্গা অবৈধ পন্থায় ভোটার হয়েছেন। এমনকি প্রাথমিক অনুসন্ধানে ৫৯৭ জন রোহিঙ্গা ভোটার হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই উক্ত সংখ্যক রোহিঙ্গাকে অজ্ঞাত দেখিয়ে মামলা করা হয়েছে।’ তিনি জানান, তদন্তে সব তথ্যই বেরিয়ে আসবে। এসব রোহিঙ্গাকে আইনের আওতায়ও আনা হবে।

এদিকে অনুসন্ধানে জানা গেছে, কক্সবাজারের রামু উপজেলার ঈদগড় ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাটাজঙ্গল গ্রামের বাসিন্দা নবী হোসেনের পুত্র আবুল কাসেম প্রকাশ কাসেম ডাকাতকেও ভোটার করার জন্য হালনাগাদ ভোটার কর্মসুচিতে নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এলাকার লোকজন জানান, নবী হোসেন মিয়ানমারের রাখাইন থেকে এসে উক্ত এলাকায় বসবাস শুরু করেন। কাসেমের বিরুদ্ধে ডাকাতি, হত্যা ও ইয়াবা পাচারের মোট পাঁচটি মামলা রয়েছে।

এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহকারি বড়বিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষিকা রেহেনা আকতার গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন- ‘আমার কাছে উক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কেউ আপত্তি তুলেনি। তাই তার জন্ম সনদসহ যাবতীয় কাগজপত্র দেয়ায় তা আমি সুপারভাইজারকে দিয়েছি।’ তিনি স্বীকার করেন যে, রোহিঙ্গা কাসেমের দেয়া কাগজপত্র সঠিক কিনা তা তিনি যাচাই করেননি। জানা গেছে, কক্সবাজার জেলাব্যাপী এরকম অবৈধ পন্থায় শত শত রোহিঙ্গা ভোটার তালিকাভুক্ত হয়ে যাচ্ছে গোপনে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা