ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) পাঁচটি ছাত্রী হলের শিক্ষার্থীরা হল প্রশাসনের বিভিন্ন বৈষম্যমূলক ও অমানবিক নিয়মের অবসান এবং নারী শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবিতে উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন। সোমবার (২৭ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৪টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে উপাচার্যের কাছে তিন দফা দাবি-সংবলিত স্মারকলিপি জমা দেন তারা।
স্মারকলিপি দেওয়ার আগে প্রশাসনিক ভবনের সামনে রোকেয়া হল, শামসুন নাহার হল, কবি সুফিয়া কামাল হল, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল এবং বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলের শিক্ষার্থীরা সংবাদ সম্মেলন করেন।
শিক্ষার্থীদের তিন দফা দাবির মধ্যে রয়েছে— বৈধ পরিচয়পত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে সব নারী শিক্ষার্থীর সব ছাত্রী হলে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, হলের মূল ফটকে সময়সীমা ও বের হওয়ার জটিল নিয়ম শিথিল করা এবং আবাসিক শিক্ষার্থীদের মা, বোন বা অন্য নারী অভিভাবকদের সহজ প্রক্রিয়ায় হলে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া।
সংবাদ সম্মেলনে রোকেয়া হলের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান জেরিন বলেন, বছরের পর বছর ধরে নারী শিক্ষার্থীদের ওপর অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক নিয়ম চাপিয়ে রাখা হয়েছে। রাতে সামান্য দেরি হলেও অনেককে হলে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। আবার জরুরি অসুস্থতা বা পরিবারের সদস্যের মৃত্যু হলেও দীর্ঘ অনুমতি প্রক্রিয়ার কারণে দ্রুত হল থেকে বের হওয়া সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, ‘আমাদের মা-বাবা মারা গেলেও নিজের হাতে আবেদন লিখে অনুমতি নিয়ে বের হতে হয়। গুরুতর অসুস্থ হলেও দুই-তিন ঘণ্টা লেগে যায়। এই অমানবিক নিয়মগুলোর পরিবর্তন চাই।’
২৪ ঘণ্টা হলের গেট খোলা রাখার দাবির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে জেরিন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটি তাদের প্রধান দাবি নয়। আগে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ক্যাম্পাস ও হলসংলগ্ন এলাকায় ভবঘুরে, নেশাগ্রস্ত ও বখাটেদের উৎপাত বন্ধের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের মতামতের ভিত্তিতে ২৪ ঘণ্টা হল খোলা রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।’
সংবাদ সম্মেলনে অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের সমস্যার বিষয়ও তুলে ধরা হয়। কবি সুফিয়া কামাল হলের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী জাকিয়া আক্তার বলেন, অনাবাসিক হওয়ায় নিজের হলে সীমিত সুযোগ পেলেও অন্য কোনো ছাত্রী হলে প্রবেশ করতে পারেন না। ফলে অনেক সময় কাছের হলের ক্যান্টিন ব্যবহার করাও সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, ‘আমি একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, আমার বৈধ হল কার্ড আছে। তাহলে কেন শুধু অন্য হলের শিক্ষার্থী হওয়ার কারণে আমাকে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না? অনাবাসিক হলেই কি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি আমাদের অধিকার কমে যায়?’
বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলের সংযুক্ত অনাবাসিক শিক্ষার্থী সামিয়া অভিযোগ করেন, দেড় বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেও তিনি নিজের সংযুক্ত হলে কার্যত প্রবেশের সুযোগ পাননি। অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের সন্দেহের চোখে দেখা হয় এবং হলের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সহশিক্ষা ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ থেকেও তারা বঞ্চিত হন।
কবি সুফিয়া কামাল হল সংসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) শিমু আক্তার বলেন, আবাসিক ও অনাবাসিক—উভয় ধরনের নারী শিক্ষার্থীদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে গিয়ে যে হয়রানিমূলক আচরণের অভিযোগ উঠেছে, তা দূর করার দাবিতেই পাঁচটি নারী হলের প্রতিনিধিরা একত্রিত হয়েছেন।
শিক্ষার্থীরা তাদের যৌক্তিক দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেন। তবে দাবি বাস্তবায়নে দ্রুত দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে আরো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণারও হুঁশিয়ারি দেন তারা।