দীর্ঘদিন ধরে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত মাটিকে তুলা চাষের জন্য অনুপযোগী বলে মনে করা হতো। তবে সেই ধারণা পাল্টে দিয়েছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) গবেষকরা। তারা সেখানে তুলার সফল উৎপাদন ও রোগ নিয়ন্ত্রণে পরিবেশবান্ধব জৈব প্রযুক্তি প্রয়োগে সফল হয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ড ল্যাবরেটরিতে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, উপকারী অণুজীব ট্রাইকোডার্মা হারজিয়ানাম, ট্রাইকোডার্মা অ্যাসপেরেলাম এবং ব্যাসিলাস সাবটিলিসের সমন্বিত প্রয়োগ তুলার অন্যতম ক্ষতিকর রোগ ফিউজারিয়াম উইল্ট দমনে অত্যন্ত কার্যকর। একই সঙ্গে এই প্রযুক্তি তুলা গাছের বেড়ে ওঠা, ফলন ও কৃষকের আয় বাড়াতেও ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
গবেষণায় বিভিন্ন তুলার জাতের ওপর এসব অণুজীব পৃথক ও সমন্বিতভাবে প্রয়োগ করে তাদের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হয়। পরীক্ষায় ব্যবহৃত তুলার জাতগুলোর মধ্যে ছিল সিবি-১২ থেকে সিবি-২০, রুপালি-১, হোয়াইট গোল্ড-১ এবং হোয়াইট গোল্ড-২। ফল হিসেবে দেখা যায়, তিনটি অণুজীবের সমন্বিত প্রয়োগে তুলা গাছ সবচেয়ে বেশি সুস্থ ও সবল হয়েছে। এ ক্ষেত্রে রোগের আক্রমণ ছিল সর্বনিম্ন এবং ফলন ছিল সর্বোচ্চ। এককভাবে অণুজীব প্রয়োগের তুলনায় সমন্বিত প্রয়োগ বেশি কার্যকর ফল দিয়েছে।
গবেষকদের মতে, এসব উপকারী অণুজীব মাটিতে রোগ-জীবাণুর বৃদ্ধি দমন করে, শিকড়ের বিকাশ বাড়ায়, গাছের পুষ্টিগ্রহণে সহায়তা করে এবং প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। ফলে প্রতিকূল পরিবেশেও তুলা গাছ ভালো ফলন দিতে সক্ষম হয়।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ বস্ত্রশিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলেও দেশের মোট তুলার চাহিদার প্রায় ৯৭ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ভারত, পাকিস্তান, উজবেকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ তুলা আমদানির ফলে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়।
গবেষকরা বলছেন, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ লবণাক্ত জমিকে তুলা চাষের আওতায় আনা গেলে জাতীয় পর্যায়ে তুলা উৎপাদন বাড়বে এবং আমদানিনির্ভরতা অনেকাংশে কমে আসবে।
গবেষণার আরেকটি দিক হলো, পরীক্ষামূলক ক্ষেতে তুলাগাছে উল্লেখযোগ্য কোনো পোকামাকড় বা রোগের আক্রমণ দেখা যায়নি। ফলে রাসায়নিক কীটনাশক ও ছত্রাকনাশকের ব্যবহার কমানো সম্ভব, যা কৃষিকে আরো পরিবেশবান্ধব ও টেকসই করতে সহায়তা করবে।
গবেষকরা অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখেছেন, এই প্রযুক্তি অনুসরণ করে তুলা চাষ করলে কৃষকরা প্রতিবিঘা জমি থেকে ৫০ হাজার থেকে ৬৬ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ করতে পারেন। ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকদের জন্য তুলা একটি লাভজনক অর্থকরী ফসল হিসেবে দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
গবেষণা প্রকল্পটির নেতৃত্ব দেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিপ্রযুক্তি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল ইসলাম। সহ-গবেষক হিসেবে ছিলেন অধ্যাপক ড. সিমুল দাস। মাঠপর্যায়ের গবেষণা কার্যক্রম, তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে ভূমিকা রাখেন এমএস শিক্ষার্থী ও রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট মো. আসাদুর রহমান।
গবেষকরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তুলা একটি সম্ভাবনাময় ফসল হতে পারে। পরিবেশবান্ধব জৈবপ্রযুক্তির মাধ্যমে রোগ নিয়ন্ত্রণ ও উচ্চ ফলন নিশ্চিত করা গেলে উপকূলের হাজারো কৃষকের আয় বাড়বে। একই সঙ্গে দেশের বস্ত্রশিল্পের জন্য স্থানীয়ভাবে তুলার জোগান বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।