রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) চারটি শাখা বন্ধের পথে। মূলধন সংকটের কারণে ব্যাংকটির এসব শাখা বন্ধ হতে পারে বলে জানা গেছে। ব্যাংকটির এসব শাখার বিদ্যমান ব্যবসা ধাপে ধাপে গুটিয়ে ফেলার প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ইউএই কেন্দ্রীয় ব্যাংক (সিবিইউএই)।
বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সিবিইউএই তাদের কাছে থাকা জনতা ব্যাংকের এই শাখাগুলোর অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তোলার ওপর (ডেবিট লেনদেন) নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। একইসঙ্গে নতুন গ্রাহক হিসাব খোলা বন্ধ রাখতে বলেছে।
এসব নির্দেশনার কারণ হিসেবে সিবিইউএই উল্লেখ করেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরিশোধিত মূলধন রাখতে না পারা এবং জনতা ব্যাংকের বাংলাদেশের সামগ্রিক কার্যক্রমের সংকটাপন্ন পরিস্থিতি।
এসব নির্দেশনা জানিয়ে সিবিইউএইর সহকারী গভর্নর আহমেদ সাঈদ আল কামজি গত ৮ জুলাই জনতা ব্যাংকের সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুজ্জামানকে চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে কামরুজ্জামানকে বিষয়টি জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদকে অবহিত করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে পর্যদের সিদ্ধান্ত দ্রুত জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সিবিইউএই এর নিয়ম অনুযায়ী, বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতস্থ জনতা ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন হওয়ার কথা ৪০০ মিলিয়ন দিরহাম। বর্তমানে পরিশোধিত মূলধন রয়েছে ১০০ মিলিয়ন দিরহাম। ঘাটতি ৩০০ মিলিয়ন দিরহাম বা প্রায় ১০০০ কোটি টাকা (প্রতি দিরহাম ৩৩.৫০ টাকা ধরে)। এই ঘাটতি পূরণ না করলে ব্যাংকটির কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশনা দিয়েছে আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কারণ পর্যাপ্ত পরিশোধিত মূলধন না থাকলে গ্রাহকদের আমানতের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এর আগে ২০২২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে জনতা ব্যাংক ইউএই শাখার পরিশোধিত মূলধন ৭৫ মিলিয়ন থেকে ১০০ মিলিয়ন দিরহামে উন্নীত করেছিল। তবে সেটিও বর্তমান নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণের জন্য যথেষ্ট হয়নি।
গত ৯ জুলাই ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে এসংক্রান্ত তথ্য জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন জনতা ব্যাংকের ইউএই শাখার প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ কামরুজ্জামান। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, ইউএই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শাখাগুলোকে নতুন গ্রাহক সম্পর্ক স্থাপন থেকে বিরত থাকতে হবে এবং বিদ্যমান কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে। তিনি এ বিষয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে পরিচালনা পর্ষদের নির্দেশনা চেয়েছেন।
গত ১৪ জুলাই অনুষ্ঠিত জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৮৮৪তম সভায় এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে, পরিস্থিতি মোকাবেলায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সমন্বয়ে জরুরি বৈঠক প্রয়োজন।
জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মাদ মজিবুর রহমান বলেন, ‘সংযুক্ত আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের নিয়ম অনুযায়ী পরিশোধিত মূলধন বাড়ানোর কথা জানিয়েছে। এখন ব্যাংকের পক্ষ থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে পর্যায়ক্রমে পরিশোধিত মূলধন বাড়িয়ে ৪০০ মিলিয়ন দিরহামে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। জনতা ব্যাংক তিন বছর ধরে পর্যায়ক্রমে এই পরিশোধিত মূলধন সৃষ্টি করার পরিকল্পনা জানিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ প্রস্তাবে রাজি না হলে সরকারের সহায়তা নিয়ে পরিশোধিত মূলধন বাড়ানো হবে।’
সংযুক্ত আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশে জনতা ব্যাংকের সংকটময় পরিস্থিতির কারণে যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সে বিষয়ে জানতে চাইলে মজিবুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাত নিয়েই বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের উদ্বেগ রয়েছে। কারণ জাতীয়ভাবে ব্যাংক খাতে ২০%-এর বেশি খেলাপি ঋণ উদ্বেগেরই। সেক্ষেত্রে জনতা ব্যাংকের ৭০% ঋণ খেলাপি হয়ে পড়েছে। এটা অবশ্যই উদ্বেগের। তবে এরমধ্যেও ব্যাংকটি টিকে আছে। ব্যাংকের এসএলআর ঠিক আছে। কৃষি ও ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করা হচ্ছে। সরকারের এলসি খোলা হচ্ছে এবং তার সেটেলমেন্ট করা হচ্ছে। সাধারণ এলসিও খোলা হচ্ছে। নতুন নতুন কার্ড ইস্যু করা হচ্ছে। ইনোভেশনে এগিয়ে রয়েছে জনতা ব্যাংক। মাসে ১২৫ কোটি টাকা বেতন দেওয়া হচ্ছে কোনো ধরনের ধারদেনা ছাড়াই।’
শিগগিরই ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশাব্যক্ত করেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মাদ মজিবুর রহমান।









