নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অনিশ্চয়তা দূর হলেও এখনো বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি হয়নি। আগামী বাজেট প্রস্তাব ও সরকারের নীতিতে কী থাকবে, সেটিই দেখার বিষয় বলে মনে করে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
গতকাল রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ অর্থনীতি : উত্তরণকালীন সময়ে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সিপিডি। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। বক্তব্য দেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান, জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহকারী হেলেন মাশিয়েত প্রিয়তি, তামিম আহমেদ প্রমুখ।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। দেশীয় কাঠামোগত দুর্বলতা ও বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে দেশের অর্থনীতি এখনো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বর্তমান অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি। তিনি বলেন, মূলত জ্বালানি, পরিবহন এবং বিভিন্ন সেবার ব্যয় বৃদ্ধিই এই মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ। দেশে চলমান জ্বালানিসংকট ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় লাগামহীনভাবে বেড়ে চলেছে, যা পারিবারিক অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। বাজারে যেভাবে পণ্যের দাম ও সেবামূল্য বাড়ছে, সেই তুলনায় সাধারণ মানুষের মজুরি বৃদ্ধির হার সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত দেশের বাজারে জ্বালানির দামে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হয়েছে। এই সময়ে ডিজেলের দাম ১৫ শতাংশ এবং একই সঙ্গে পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দ্রুত পরিবহন খাতে পড়েছে। বাসভাড়া বৃদ্ধির পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের ব্যয়ও বেশ বেড়ে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে।
সিপিডি জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংকট বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে দেশের ঝুঁকি কতটা বাড়তে পারে, সেটিও স্পষ্ট হয়েছে।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক নিশ্চয়তা ফিরে এলেও বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তারা এখনো পুরোপুরি স্বস্তিবোধ করছেন না। তারা মূলত অপেক্ষা করছেন আসন্ন বাজেটে কী ধরনের প্রস্তাব আসে, কী ধরনের নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সংস্কার কতটা বাস্তবায়ন হয় সেগুলো দেখার জন্য। তিনি বলেন, বিনিয়োগের বর্তমান চিত্রেও এই আস্থাহীনতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রায় ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। পাশাপাশি মূলধনী যন্ত্রপাতি ও মধ্যবর্তী কাঁচামালের আমদানির ধীরগতিও ইঙ্গিত দেয় যে উদ্যোক্তারা এখনো বড় পরিসরে বিনিয়োগে এগিয়ে আসছেন না। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশে সরকারি বিনিয়োগের তুলনায় বেসরকারি খাতের ভূমিকা অনেক বড়। সাধারণভাবে সরকার এক টাকা বিনিয়োগ করলে বেসরকারি খাত প্রায় চার টাকা বিনিয়োগ করে থাকে। ফলে অর্থনীতিতে গতি আনতে হলে বেসরকারি খাতকেই সামনে এগিয়ে আসতে হবে। হেলেন মাশিয়েত প্রিয়তি বলেন, জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক দাম নিম্নমুখী থাকায় দ্বিতীয় দফায় জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল না। এতে মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়বে। তাই বারবার দাম বাড়ানোর বদলে জ্বালানি খাতে কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন




