পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবসহ শিল্পখাতসংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা।
তারা বলেছেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে সব ধরনের পণ্য উৎপাদন ব্যয় বেড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বাড়বে। একইসঙ্গে শিল্প খাত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে এবং দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বুধবার (২০ মে) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) আয়োজিত দুইদিনব্যাপী গণশুনানির প্রথম দিনে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে তীব্র বিরোধিতা করে এসব কথা বলেন বক্তারা।
শুনানিতে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে দেশের ছয়টি বিতরণ কম্পানি খুচরা পর্যায়ে বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকের জন্য ১৫ থেকে ২৯ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির আবেদন জমা দিয়ে রেখেছে বিইআরসিতে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্যহার নিয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
শুনানিতে বক্তব্যে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাংগঠনিক সম্পাদক ড. সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, ‘‘বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করা হলে বিইআরসি ‘গণশত্রুতে’ পরিণত হবে। মূল্যবৃদ্ধির পক্ষে বারবার বলা হচ্ছে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে। কিন্তু সরকার তো জনগণের টাকাতেই ভর্তুকি দেয়। সবাই সরকারের মুনাফার কথা ভাবছে, অথচ মানুষের কষ্টের কথা কেউ ভাবছে না।’’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘অতীতে আইনের দোহাই দিয়ে সবচেয়ে বেশি বেআইনি কাজ করা হয়েছে এবং এতে বিইআরসি সহায়তা করেছে।’ এখনো কমিশনের সতর্ক হওয়ার সময় আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিইআরসিকে দেশের স্বার্থে কাজ করতে হবে।’
ড. মিজানুর রহমান আরো বলেন, ৫ আগস্টের পর দেশে অনেক কিছু পরিবর্তন হলেও বিইআরসিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। কমিশন বলছে আইন অনুযায়ী তাদের ক্ষমতা নেই। কিন্তু যেখানে সংবিধান পরিবর্তনের আলোচনা হতে পারে, সেখানে বিইআরসি আইন পরিবর্তন অসম্ভব নয়। বিইআরসি জনগণের পক্ষ না নিয়ে অবৈধ প্রস্তাবদাতাদের পক্ষ নিচ্ছে বলেও তিনি জানান।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) পরিচালক মো. জামাল উদ্দিন মিয়া বলেন, ‘‘এই মুহূর্তে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি হবে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। বর্তমানে দেশের রপ্তানি খাত নিম্নমুখী অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে শিল্পখাত আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা হারাবে।’
তিনি বলেন, ‘একসময় তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ চীনের পরেই ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই অবস্থান দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। তাই কোনো অবস্থাতেই বিদ্যুতের মূল্যহার বাড়ানোর সুযোগ নেই।’
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে এবং ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। তাই মূল্যবৃদ্ধির কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বিপিডিবির মূল্যবৃদ্ধির সুপারিশে জনগণের স্বার্থ বিবেচনা করা হয়নি। এজন্য এই গণশুনানি বাতিলের দাবি জানান তিনি।’
রুহিন হোসেন প্রিন্স আরো বলেন, ‘বর্তমান আইনে বিইআরসি শুধু দাম বাড়ানোর সুপারিশ নিয়েই শুনানি করতে পারে, দাম কমানোর সুপারিশ নিয়ে নয়। তাই বিইআরসি আইন সংশোধন করে জনগণের স্বার্থ রক্ষার আইন করতে হবে এবং কোনো অজুহাতেই বিদ্যুতের দাম যাতে বাড়ানো না হয় সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেন, সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর গত দুই বছরের বেশি সময়ে বিদ্যুৎ উৎপানের মূল জ্বালানি গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্র চালু না থাকলেও এইচএফওভিত্তিক কেন্দ্র পরিচালনা করতে হচ্ছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী সরকারি ও বেসরকারি কম্পানিগুলোকে জ্বালানির মূল্য অনেক ক্ষেত্রে ডলারে পরিশোধ করতে হয়। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘অনেকে দাবি করছেন বাংলাদেশ ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ আমদানি করে, বাস্তবে তা সঠিক নয়। বর্তমানে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ বিদ্যুৎ ভারত থেকে আমদানি করা হয়, বাকি বিদ্যুৎ দেশীয়ভাবে উৎপাদিত। তবে দেশীয় উৎপাদনেও আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়। আমদানিকৃত বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান ট্যারিফ কাঠামোর তুলনায় বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে।’
বিপিডিবি চেয়ারম্যান বলেন, ‘প্রস্তাবিত মূল্যবৃদ্ধির লক্ষ্য কোনোভাবেই পুরো খাতকে ব্রেক-ইভেনে নেওয়া নয়। বরং বিপুল ভর্তুকির একটি অংশ সমন্বয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাদের হিসাবে বিদ্যুৎ খাতে ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা, আর বিইআরসির হিসাবে তা প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকা। প্রস্তাবিত সমন্বয়ের মাধ্যমে হয়তো মোট ভর্তুকির এক-পঞ্চমাংশ বা এক-চতুর্থাংশ কমানো সম্ভব হবে, কিন্তু বাকি অংশ সরকারকেই বহন করতে হবে।’
রেজাউল করিম আরো বলেন, ‘ট্রান্সমিশন লসের বিষয়টিও বিপিডিবিকে বহন করতে হচ্ছে। বিপিডিবি প্রকৃত সিস্টেম লস ৩ দশমিক ০৭ শতাংশ ধরে হিসাব করেছে, যেখানে বিইআরসি ২ দশমিক ৭ শতাংশ বিবেচনা করেছে। এ ছাড়া উৎস করসহ বিভিন্ন ব্যয়ও বিপিডিবির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বর্তমানে মানুষ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কোথাও কয়েক মিনিট বিদ্যুৎ না থাকলেও অভিযোগ আসে। তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে যথাযথ জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না করতে পারলে উৎপাদনে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটতে পারে। সরকারের পক্ষেও প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি বহন করা কঠিন। এ কারণে একটি ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ তৈরি করতেই মূল্য সমন্বয়ের প্রস্তাব আনা হয়েছে।’
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, বর্তমান বিদ্যুৎ নীতিমালায় কিছু পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে এবং সরকার এ বিষয়ে কাজ করছে। বিপিডিবির দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনা জরুরি। বিশেষ করে বিদ্যুৎ খাতে কর্মরত প্রকৌশলীদের প্রচলিত ধারণা বদলাতে হবে, কারণ বিশ্বব্যাপী বিদ্যুৎ উৎপাদনের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, ইউরোপের অনেক দেশ ইতিমধ্যে শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় চলে গেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে মোট বিদ্যুতের প্রায় ৫০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে। ভারতে শুধু সৌরবিদ্যুৎ ২০ শতাংশের বেশি এবং বায়ুবিদ্যুৎ ১০ শতাংশের বেশি। পাকিস্তানেও সৌরবিদ্যুতের অংশ ৩০ শতাংশের বেশি।
বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশ যদি সৌরবিদ্যুতের দিকে এগোতে পারে এবং বিপিডিবি এ খাতে সহযোগিতামূলক ভূমিকা পালন করে, তাহলে ভবিষ্যতে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় কমে আসবে। এতে জনগণের ওপর বিদ্যুতের মূল্যজনিত চাপও হ্রাস পাবে।








