১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করলে ১৩ ফেব্রুয়ারি দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারত বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘গৃহযুদ্ধ শুরু হলে এটা এ জাতিকে কোথায় নিয়ে যেত আল্লাহতালাই ভালো জানেন। এটা আমাদের আশঙ্কা, এটা না-ও হতে পারত। দেশপ্রেমিক মানুষের দায়িত্ব হচ্ছে যেখানেই সন্দেহ সেখানে এড়িয়ে চলা। সন্দেহের জায়গা খুব তীব্র ছিল।’
রবিবার (১৪ জুন) রাতে সিলেট সার্কিট হাউসে জামায়াতে ইসলামী সিলেট মহানগর আয়োজিত ১১ দলীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময়সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান এসব কথা বলেন।
নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুলে জামায়াত আমির বলেন, “হিসাবনিকাশ স্পষ্ট। আমাদের অবস্থান ছিল গণভোটের ‘হ্যা’-এর পক্ষে। ৬৮ দশমিক ৬ ভাগ ভোট দিয়েছে ‘হ্যাঁ’-তে। এটা পরিষ্কার আপনারা দেখেছেন। নির্বাচনের সপ্তাহ দিন আগে গাছে, বাসে, লঞ্চে, ট্রেনে সব জায়গায় আওয়াজ একটাই আওয়াজ ছিল, দ্বিতীয় কোনো আওয়াজ ছিল না। তাহলে এত মানুষের ভোট গেল কোথায়?”
তিনি বলেন, ‘এই নির্বাচনের পর সাধারণ মানুষ বলেছে, ভোট দিলাম আপনাদের আর সরকার গঠন করল আরেক দল। এটা কিভাবে হলো? আপনারা এটা মেনে নিলেন কেন? মানুষের একটু ক্ষোভ আমাদের ওপর ছিল। এরপর আর মানুষের বুঝতে আর দেরি হয়নি। অল্প দিনের মাঝেই মানুষ বুঝে গেছে যে আমরা কেন মেনে নিয়েছি।’
সীমান্তে উত্তেজনা প্রসঙ্গ তুলে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আপনারা দেখছেন, সীমান্তে অব্যাহত উত্তেজনা চলছে। সীমান্তের ওপার থেকে এমনসব উসকানিমূলক কথাবার্তা বলা হচ্ছে, আমরা যদি দেশ ও জাতীয় হিসেবে প্রত্যেকটি কথার উত্তর দিতে যাই তাহলে প্রতিদিন একবার যুদ্ধ বেধে যাবে।’
এ সময় তিনি বলেন, ‘দুই-দুইবার স্বাধীন হলাম। কিন্তু প্রকৃত স্বাধীনতা পেলাম কি। সবাই বলছে স্বাধীনতার সুফল এখনো ঘরে ওঠেনি।’ এর জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়ি করে তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার সুফল ঘরে উঠাবেটা কে? উঠাবে এ দেশের রাজনৈতিক দলগুলো। যারা আমরা কথা বলি কোনো না পর্যায়ে দেশ শাসন আমরাই করেছি, দেশ পরিচালনা আমরাই করেছি। তাহলে আমরা কাকে দোষ দিতে চাচ্ছি। আমরা আমাদের দোষ দেখি না কেন? নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করে নিজের দুর্বলতার দূর করার চেষ্টা করছি না। এটাই বিশাল প্রশ্ন।’
সংসদে জনগণকে দেওয়া ওয়াদা রক্ষা করে যাবেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সংসদের ভেতরে চরমপন্থা অবলম্বন করবো না এবং অধমপন্থা অবলম্বন করব না। আমাদের অবস্থা মধ্যমপন্থা, যৌক্তিক। দেশ এবং জাতির স্বার্থে যা প্রয়োজন। আমরা বিরোধী দল হিসেবে জাতিকে দেওয়া কথা মেনে চলার চেষ্টা করছি। আমরা এর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করব না।’
বিএনপি জনগণের সঙ্গে ওয়াদা লঙ্ঘন করেছে দাবি করে জামায়াত আমির বলেন, ‘ইতোমধ্যে সরকারি দল জনগণকে দেওয়া ওয়াদা সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করেছে। নির্বাচনের আগে তারাই বলেছিল, গণভোটের রায় যেদিকে যাবে সেটাই তারা মানবে। তারা এখন মানে না কেনো? তারা এখন শপথ নেয় না কেনো? তারা এখন বলছে, সাংবিধানিক ভিত্তি নাই। জিজ্ঞেস করেছিলাম, এটা প্রথম গণভোট নয়, স্বাধীনার আগের আরো তিনটি গণভোট হয়েছে। সেগুলারও সাংবিধানিক ভিত্তি ছিল না। তখনও সংবিধানে গণভোটের কোনে ট্রেডিশন ছিলো না । তখন যদি গণভোট হালাল হয়ে থাকে, এখন হারাম হয় কেনো।’
একই অর্ডারে দুইটা ভোট জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচন, সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচন। একটার গোশত হালাল কিন্তু আরেকটা হারাম। এটা কোন ধরনের কথা। এখন তারা বলছেন, নির্বাচন যেকোনোভাবে করার জন্য এটা আমরা জাতিকে বলেছিলাম। এটা আমাদের মনের কথা নয়। রাজনৈতিক দলগুলো যদি জাতির সাথে এভাবে স্ট্যান্ড বাজি করে তাহলে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের উপর মানুষের আস্থা থাকবে কেনো? আর মানুষ যদি আস্থা হারিয়ে তাহলে এদেশ হবে একটা জঙ্গলি দেশ।’
বিএনপির আচরণে বিস্মিত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘হঠাৎ করে বিএনপির জন্ম হয় নাই। সেই ৭৮ সালে জন্ম নেয়া দল তিলে তিলে আজকে এসে দাঁড়িয়ে এই পর্যায়ে। তারা কেনো যে এ আচরণ করছে আমরা বুঝতে পারছি না। আমরা আশা ছেড়ে দেইনি। আমরা আমাদের লড়াই চালিয়ে যাবো। জনগণের এই রায় একবার ব্যর্থ হয়ে যায় এদেশে গণরায় কোনোদিন টেকসই হবে না। আমরা টেকসই একটা নিয়মতান্ত্রিক সমাজ চাচ্ছি। আমরা কোনো বিশৃঙ্খলা পছন্দ করি না। আমরা সংসদের ভিতরে সবকিছু সমাধান হউক এটা টাই। কিন্তু সংসদের সে জায়গাটা সংকুচিত হয়ে যায় তাহলে আমাদের ময়দানে আসা ছাড়া উপায় থাকে না। অতএব আমাদের অবস্থান দুই জায়গায়। আমাদের অবস্থান সংসদের. আমাদের অবস্থান ময়দানে। সংসদে যদি সমাধান না হয়, রাজপথে আমরা সমাধান করবো ইনশাআল্লাহ। এবং আমরা গভীরভাবে আস্থাশীল জনগণের এ রায় ব্যর্থ হবে না। এ রায় আমরা আদায় করে ছাড়বো। কোনো ছাড়া দেব না।’




