মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো সময়। হারিয়ে যাওয়া অর্থ ফিরে পাওয়া সম্ভব, কিন্তু চলে যাওয়া একটি মুহূর্তও আর ফিরে আসে না। তাই একজন মুমিনের প্রতিটি দিন হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক নতুন সুযোগ। যেদিন আল্লাহর স্মরণে শুরু হয়, হালাল উপার্জনে অতিবাহিত হয় এবং ইবাদত ও সৎকর্মের মাধ্যমে শেষ হয়—সেই দিনই প্রকৃত অর্থে বরকতময় দিন।
আজকের ব্যস্ত জীবনে আমরা প্রায়ই বরকতের অভাব অনুভব করি। সময় আছে, কিন্তু কাজ শেষ হয় না; উপার্জন আছে, কিন্তু তৃপ্তি নেই; সুযোগ আছে, কিন্তু প্রশান্তি নেই। এর মূল কারণ অনেক সময় আল্লাহর দেওয়া বরকত থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেওয়া। অথচ কোরআন ও সহিহ হাদিস আমাদের এমন কিছু আমল শিখিয়েছে, যেগুলো নিয়মিত পালন করলে একটি দিন বরকত, প্রশান্তি ও কল্যাণে পরিপূর্ণ হতে পারে।
১. ফজরের আগে জেগে তাহাজ্জুদ ও দোয়ার মাধ্যমে দিন শুরু করা
দিনের সর্বোত্তম সূচনা হলো শেষ রাতে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো। এই সময় আল্লাহ তাআলা বান্দার দোয়া কবুল করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় করুন। এটি আপনার জন্য অতিরিক্ত ইবাদত। আশা করা যায়, আপনার প্রতিপালক আপনাকে প্রশংসিত স্থানে প্রতিষ্ঠিত করবেন।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৭৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমাদের রব প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করেন এবং বলেন, কে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দান করব? কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১৪৫)
২. সময়মতো ফজরের সালাত আদায় করা
ফজরের সালাত দিনের সবচেয়ে বরকতময় সূচনা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ফজরের সালাত আদায় করল, সে আল্লাহর নিরাপত্তার মধ্যে রইল।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৬৫৭)
আরও বলেছেন, ‘হে আল্লাহ! আমার উম্মতের জন্য দিনের প্রথম ভাগে বরকত দান করুন।’ (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ২৬০৬)
এ কারণে সকালকে অলসতা বা ঘুমে নষ্ট না করে উৎপাদনশীল কাজে ব্যয় করা সুন্নত।
৩. সকাল-সন্ধ্যার নিয়মিত জিকির করা
সকাল ও সন্ধ্যার মাসনুন জিকির মানুষকে শয়তানের কুমন্ত্রণা, বিপদ-আপদ ও অকল্যাণ থেকে রক্ষা করে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৫২)
রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় বিভিন্ন দোয়া ও যিকির পাঠ করতেন এবং সাহাবিদেরও তা শিক্ষা দিতেন। (হিসনুল মুসলিম)
৪. কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অন্তরকে আলোকিত করা
যে দিন কোরআনের তিলাওয়াত দিয়ে শুরু হয়, সে দিন আল্লাহর রহমত দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই এই কোরআন এমন পথ প্রদর্শন করে যা সর্বাধিক সরল।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যে কোরআন শিক্ষা করে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০২৭)
৫. পাঁচ ওয়াক্ত সালাত যথাসময়ে আদায় করা
সালাত মুমিনের জীবনের মূল ভিত্তি। এটি দিনের প্রতিটি অংশকে বরকতময় করে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই সালাত অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৪৫)
৬. হালাল উপার্জন ও সততার সঙ্গে কাজ করা
বরকতের অন্যতম প্রধান উৎস হলো হালাল রিজিক। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা পৃথিবীর হালাল ও পবিত্র বস্তু থেকে আহার করো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৬৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দীক ও শহিদদের সঙ্গে থাকবে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১২০৯)
৭. মানুষের উপকার করা
একটি বরকতময় দিন সেই দিন, যেদিন অন্তত একজন মানুষের উপকার করা যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় সেই ব্যক্তি, যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে।’ (তাবারানি, হাদিস : ৫৭৮৭)
৮. দান-সদকা করা
সদকা কখনো সম্পদ কমায় না; বরং বরকত বৃদ্ধি করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দান-সদকা সম্পদ কমায় না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৮)
৯. গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা ও বেশি বেশি ইস্তিগফার করা
পাপ বরকতকে নষ্ট করে, আর ইস্তিগফার বরকতের দরজা খুলে দেয়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো... তিনি তোমাদের জন্য আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, সম্পদ ও সন্তান বৃদ্ধি করবেন এবং তোমাদের জন্য উদ্যান ও নদী সৃষ্টি করবেন।’ (সুরা : নুহ, আয়াত : ১০–১২)
১০. দিন শেষে আত্মসমালোচনা ও আল্লাহর কাছে তাওবা করা
একজন সফল মুমিন প্রতিদিন নিজের হিসাব নেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সকল আদম সন্তানই ভুলকারী, আর ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম তারা, যারা বেশি বেশি তাওবা করে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৪৯৯)
দিনের শেষে তাওবা, ইস্তিগফার এবং ঘুমানোর পূর্বের মাসনুন আমলগুলো পালন করলে পরবর্তী দিনের জন্যও বরকতের ভিত্তি তৈরি হয়।
শেষকথা, বরকত শুধু সম্পদের প্রাচুর্যের নাম নয়; বরং অল্প সময়ে অধিক কল্যাণ, অল্প সম্পদে তৃপ্তি, অল্প আমলে অধিক সওয়াব এবং জীবনে আল্লাহর রহমত লাভের নামই বরকত। একজন মুসলিম যদি প্রতিটি দিন আল্লাহর নামে শুরু করে, সালাত, কোরআন, জিকির, হালাল উপার্জন, মানুষের সেবা ও আন্তরিক তাওবার মাধ্যমে দিন অতিবাহিত করে, তবে তার জীবনে আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দান করবেন। আসুন, আমরা প্রত্যেকে আজ থেকেই প্রতিটি দিনকে বরকতময় করার এই কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক আমলগুলো নিজেদের জীবনে বাস্তবায়নের দৃঢ় সংকল্প করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রতিটি দিনকে ঈমান, আমল, শান্তি, রহমত ও বরকতে পরিপূর্ণ করে দিন। আমিন।




