• ই-পেপার

সাত শ্রেণির মানুষের জন্য ধ্বংসের সতর্কবার্তা

হাদিসের বাণী

যে তিন বিষয়ে মহানবী (সা.) শপথ করেছেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
যে তিন বিষয়ে মহানবী (সা.) শপথ করেছেন
সংগৃহীত ছবি

বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবু কাবশাহ আমর ইবনে সাদ আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি মহানবী (সা.)-কে বলতে শুনেছেন যে, আমি তিনটি বিষয়ে তোমাদের জন্য কসম করছি। ১. কোনো ব্যক্তি তার সম্পদ থেকে সাদাকাহ করলে তার সম্পদ কমে যায় না। ২. কোনো ব্যক্তির ওপর জুলুম করা হলে, সে তাতে সবর করলে, আল্লাহ তার সম্মান বৃদ্ধি করে দেন। ৩. যে ব্যক্তি ভিক্ষার দরজাকে খোলে, আল্লাহ তাআলা তার জন্যও দারিদ্র্যের দরজাকে খুলে দেন। (তিরমিজি, হাদিস নং : ২৩২৫, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং : ১৮০৩১)

শিক্ষা ও বিধান 
১. সাদাকাহ করলে সম্পদ কমে না। আল্লাহর পথে দান করলে বাহ্যিকভাবে টাকা কমতে দেখা গেলেও আল্লাহ তাতে বরকত দান করেন। কেননা দান মানুষের সম্পদকে নিরাপদ রাখে এবং আখিরাতে বিশাল প্রতিদান এনে দেয়।

২. জুলুমের মুখে ধৈর্য সম্মান বৃদ্ধি করে। কেউ অন্যায় করলে প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ধৈর্য ধারণ করলে আল্লাহ তার মর্যাদা মানুষের কাছে ও নিজের কাছে বৃদ্ধি করেন। এটি দুর্বলতার নয়; বরং শক্ত ঈমান ও উত্তম চরিত্রের পরিচয়।

৩. অপ্রয়োজনীয় ভিক্ষাবৃত্তি দারিদ্র্যের কারণ। যে ব্যক্তি অভ্যাসগতভাবে মানুষের কাছে হাত পাততে শুরু করে, আল্লাহ তাকে আরো অভাবের পরীক্ষায় ফেলতে পারেন। তাই যথাসম্ভব পরিশ্রম করে জীবিকা অর্জন করা এবং অযথা মানুষের কাছে না চাওয়া উচিত। তবে প্রকৃত অভাবগ্রস্ত ও অসহায় মানুষের জন্য শরিয়ত ভিক্ষা বা সাহায্য গ্রহণের অনুমতি দিয়েছে।

৪. আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা। দান, ধৈর্য ও আত্মসম্মান—এই তিনটি গুণ আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুলের প্রকাশ। যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর নির্ভর করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তম ব্যবস্থা করেন।

৫. মহানবী (সা.)-এর কথার গুরুত্ব। তিনি এই তিনটি বিষয়ে কসম করে বলেছেন, যা বোঝায় এগুলো নিশ্চিত সত্য। তাই এই হাদিসের শিক্ষাগুলো মনে রাখা, অন্যদের শেখানো এবং জীবনে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
 

প্রচলিত বীমা কম্পানিতে চাকরি করার বিধান

মুফতি ওমর বিন নাছির
প্রচলিত বীমা কম্পানিতে চাকরি করার বিধান
সংগৃহীত ছবি

একজন মুসলিমের জীবিকা যেমন ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত, তেমনি সেই জীবিকা অর্জনের মাধ্যমও হতে হবে হালাল ও শরীয়তসম্মত। বর্তমান যুগে বিভিন্ন পেশার মধ্যে বীমা কম্পানিতে চাকুরী একটি বহুল প্রচলিত পেশা। অনেক মুসলিম জীবিকার প্রয়োজনে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করেন বা করতে আগ্রহী হন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—শরীয়তের দৃষ্টিতে বীমা কম্পানিতে চাকুরী করা কি বৈধ?

প্রচলিত বীমার শরয়ি বিধান
বিশ্বের অধিকাংশ সমসাময়িক ইসলামী ফিকহ একাডেমি ও প্রখ্যাত আলেমগণের মতে প্রচলিত বাণিজ্যিক বীমা বৈধ নয়। কারণ এতে সাধারণত তিনটি বড় শরয়ী নিষিদ্ধ বিষয় বিদ্যমান থাকে— ১. সুদ (রিবা), ২.অতিরিক্ত অনিশ্চয়তা (গারার), ৩. জুয়া বা ভাগ্যের উপর নির্ভরতা (মাইসির)। এই তিনটি কারণেই আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিকহ একাডেমি, বিভিন্ন ফতোয়া বোর্ড এবং বহু সমসাময়িক আলেম প্রচলিত বীমাকে শরীয়তসম্মত মনে করেন না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৫)
প্রচলিত বীমার অর্থনৈতিক কাঠামো যেহেতো সুদভিত্তিক বিনিয়োগ তাই এটা নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে যায়।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সুদ গ্রহণকারী, সুদ প্রদানকারী, সুদের হিসাব লেখক এবং এর সাক্ষীদ্বয়—সবার ওপর লানত করেছেন এবং বলেছেন, তারা সবাই সমান।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ১৫৯৮)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সুদের কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতাও অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ।

বীমা কম্পানিতে চাকুরীর বিধান
যদি কোনো ব্যক্তি এমন একটি প্রচলিত বীমা কম্পানিতে চাকুরী করেন, যেখানে তার কাজ সরাসরি— বীমা বিক্রি করা, পলিসি তৈরি করা, কমিশনভিত্তিক গ্রাহক সংগ্রহ করা, সুদভিত্তিক আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনা করা, এবং দাবি নিষ্পত্তি বা বীমা চুক্তি সম্পাদন করা। আর এসবই ইসলামে শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে হয় না। তাই অধিকাংশ সমসাময়িক আলেমের মতে এ ধরনের চাকুরী বৈধ নয়। কারণ এতে হারাম কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করা হয়, যা শরিয়তের নির্দেশনার পরিপন্থী।

সহায়ক বিভাগের চাকুরী
কোনো কোনো আলেমের মতে, যদি একজন ব্যক্তি নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা এমন কোনো সাধারণ দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন, যার সঙ্গে বীমা চুক্তি বা সুদভিত্তিক কার্যক্রমের সরাসরি সম্পর্ক নেই, তাহলে বিষয়টি ভিন্নভাবে বিবেচিত হতে পারে। তবে অধিকাংশ ফকীহের মত হলো—যতদূর সম্ভব এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের চাকুরী থেকেও বিরত থাকা উত্তম; কারণ প্রতিষ্ঠানটির মূল কার্যক্রমই শরীয়তসম্মত নয়।

প্রচলিত বীমার বিকল্প পদ্ধতি হলো তাকাফুল
ইসলামী অর্থনীতিতে বীমার বিকল্প হিসেবে তাকাফুল ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এখানে অংশগ্রহণকারীরা পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে ঝুঁকি ভাগাভাগি করেন। এতে সুদ, জুয়া ও অতিরিক্ত অনিশ্চয়তা পরিহারের চেষ্টা করা হয় এবং শরীয়াহ তত্ত্বাবধায়ক বোর্ডের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সহাবি আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র; তিনি শুধুমাত্র পবিত্র (হালাল) জিনিসই গ্রহণ করেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং  : ১০১৫)

অতএব, একজন মুসলিমের জন্য এমন জীবিকা অর্জনের চেষ্টা করা উচিত, যা হালাল এবং সন্দেহমুক্ত। তবে যদি জীবিকার চরম প্রয়োজন দেখা দেয় এবং অন্য কোনো হালাল বিকল্প সাময়িকভাবে না থাকে, তবে দ্রুত হালাল কর্মসংস্থানের চেষ্টা করা এবং আল্লাহর নিকট তাওবা ও সাহায্য প্রার্থনা করা উচিত। কেননা বাস্তব জীবনে অনেক মানুষ কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। এক্ষেত্রে অবশ্যই হালাল জীবিকার দিকে অগ্রসর হওয়ার আন্তরিক চেষ্টা করা জরুরি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল ও বরকতময় জীবিকা দান করুন, হারাম ও সন্দেহযুক্ত উপার্জন থেকে হিফাজত করুন এবং তাঁর সন্তুষ্টির পথে অটল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন। 

তুরস্কে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানদের প্রথম আন্তর্জাতিক বৈঠক

ইসলামী জীবন ডেস্ক
তুরস্কে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানদের প্রথম আন্তর্জাতিক বৈঠক
সংগৃহীত ছবি

তুরস্কের গাজিয়ানতেপ শহরে ইসলামী বিশ্বের উচ্চশিক্ষা খাতে সহযোগিতা ও সমন্বয়ের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রধানদের আন্তর্জাতিক পরামর্শমূলক সভায় বিশ্বের ৪৩টি দেশের ৭০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্বকারী ১০০ জনেরও বেশি উপাচার্য, বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অংশ নিয়েছেন।

এই ঐতিহাসিক সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইসলামী বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করা, উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ এবং অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কার্যকর কৌশল নির্ধারণ করা। পাশাপাশি যৌথ গবেষণা সম্প্রসারণ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময়, প্রাতিষ্ঠানিক গতিশীলতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই একাডেমিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়।

সম্মেলনের ফাঁকে সৌদি আরব, ফিলিস্তিন, মিসর, লিবিয়া, লেবানন, ভারত, থাইল্যান্ড, সার্বিয়া, গাম্বিয়াসহ বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানদের মধ্যে একাধিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকে একাডেমিক সহযোগিতার পরিধি আরো বিস্তৃত করা, গবেষণাভিত্তিক অংশীদারি গড়ে তোলা এবং ইসলামী বিশ্বের উন্নয়নে যৌথ বৈজ্ঞানিক প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সভার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল গাজা উপত্যকার শিক্ষাব্যবস্থা রক্ষা। অংশগ্রহণকারী শিক্ষাবিদরা যুদ্ধ ও মানবিক সংকটের মধ্যেও গাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তুরস্কের উচ্চশিক্ষা পরিষদের প্রধান গাজার বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাশে দাঁড়াতে ইসলামী বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতি সম্মিলিত দায়িত্ব পালনের আহবান জানান। তিনি বলেন, কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও যেন গাজার শিক্ষার্থীরা শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, সে জন্য বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ ও কার্যকর সহযোগিতা জরুরি।

সন্তান প্রতিপালনে ইয়াকুব (আ.)-এর দূরদর্শিতা

মুফতি ওমর বিন নাছির
সন্তান প্রতিপালনে ইয়াকুব (আ.)-এর দূরদর্শিতা
সংগৃহীত ছবি

একজন পিতা শুধু পরিবারের উপার্জনকারী নন; তিনি একজন অভিভাবক, শিক্ষক, পথপ্রদর্শক এবং সন্তানের প্রথম আদর্শ। একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ভর করে একজন পিতার চরিত্র, প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও ভালোবাসার ওপর। ইসলাম একজন পিতার দায়িত্বকে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে বিবেচনা করেছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।’ (সুরা : তাহরিম, আয়াত : ৬)

অন্যদিকে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল, তাই সে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮৯৩)

কোরআনে মহান আল্লাহ এমন একজন পিতার জীবনের চিত্র অঙ্কন করেছেন, যিনি যুগে যুগে সব বাবার জন্য অনুসরণীয় আদর্শ। তিনি হলেন মহান আল্লাহর নবী ইয়াকুব (আ.)। সন্তান প্রতিপালনে ইয়াকুব (আ.)-এর দূরদর্শিতার পাঁচটি দিক তুলে ধরা হলো,

১. হালাল উপার্জন ও দায়িত্বশীলতা : নবী ইয়াকুব (আ.) ছিলেন পরিশ্রমী ও দায়িত্ববান একজন পিতা। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী তিনি মেষপালন করতেন এবং নিজের পরিবারের জীবিকা হালাল উপার্জনের মাধ্যমে নির্বাহ করতেন। কঠিন দুর্ভিক্ষের সময়ও তিনি দায়িত্ব এড়িয়ে যাননি। বরং সন্তানদের মিসরে খাদ্য সংগ্রহের জন্য পাঠিয়েছিলেন। (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৫৮-৬৩)
তাই একজন আদর্শ পিতার উচিত, সন্তানকে শুধু অর্থ নয়, হালাল রিজিকের ব্যবস্থাও করে দেওয়া। 

২. সন্তানের কল্যাণে অবিরাম দোয়া ও উপদেশ : নবী ইয়াকুব (আ.)-এর সন্তানরা তাঁর সঙ্গে অন্যায় আচরণ করেছিল। তারা প্রিয় পুত্র ইউসুফ (আ.)-কে তাঁর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল। কিন্তু এত বড় কষ্ট পাওয়ার পরও তিনি কখনো তাদের জন্য দোয়া করা, উপদেশ দেওয়া কিংবা কল্যাণ কামনা করা বন্ধ করেননি। ইরশাদ হয়েছে, “তারা বলল, ‘হে আমাদের পিতা! আমাদের পাপের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয়ই আমরা অপরাধী ছিলাম।’ তিনি বললেন, ‘আমি শিগগিরই আমার প্রতিপালকের কাছে তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব। নিশ্চয়ই তিনিই পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৯৭-৯৮)

তাই এখানেই একজন আদর্শ পিতার পরিচয়—তিনি সন্তানের ভুলে ভেঙে পড়েন না; বরং তাদের সংশোধনের জন্য আল্লাহর দরবারে হাত তোলেন।

৩. প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও ধৈর্য ধারণ : যখন ছেলেরা ইউসুফ (আ.)-এর জামায় মিথ্যা রক্ত লাগিয়ে এনে বলল যে নেকড়ে তাকে খেয়ে ফেলেছে, তখন ইয়াকুব (আ.) তাদের কথাকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করেননি। তিনি ঘটনাটির অসংগতি বুঝতে পেরেছিলেন এবং অসাধারণ ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছিলেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘বরং তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি বিষয়কে সহজ করে দিয়েছে। অতএব, আমার করণীয় হলো উত্তম ধৈর্য (সবরুন জামিল)।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ১৮)

এই ঘটনাগুলো আমাদের শেখায়, একজন আদর্শ পিতা আবেগের বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত নেন না; বরং ধৈর্য, বিচক্ষণতা ও আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেন।

৪. সহমর্মিতা প্রদর্শন করা : নবী ইয়াকুব (আ.) সন্তানদের সঙ্গে কঠোর শাসকের মতো নয়, বরং স্নেহময় অভিভাবকের মতো কথা বলতেন। তিনি তাদের কথা শুনতেন, মতামতের মূল্য দিতেন এবং ভালোবাসার ভাষায় সংবোধন করতেন। তাঁর পরিবারে সংলাপ ছিল, দূরত্ব নয়। কোরআনে বিভিন্ন স্থানে আমরা দেখি, তিনি সন্তানদের পরামর্শ দিচ্ছেন, সতর্ক করছেন এবং আন্তরিকভাবে তাদের সঙ্গে কথা বলছেন। (দেখুন : সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৫ ও ৬৭)।
কেননা সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তাদের আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল ও নৈতিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

৫. ক্ষমাশীল হওয়া : একজন পিতার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো ক্ষমা করার ক্ষমতা। নবী ইয়াকুব (আ.)-এর ছেলেরা বছরের পর বছর তাঁকে শোক ও কষ্টের মধ্যে রেখেছিল। কিন্তু যখন তারা নিজেদের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইল, তখন তিনি তাদের অপমান করেননি, প্রতিশোধ নেননি কিংবা প্রত্যাখ্যানও করেননি। বরং মমতাভরা হৃদয়ে বললেন, ‘আমি শিগগিরই আমার প্রতিপালকের কাছে তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব। নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৯৮)
এটাই একজন আদর্শ পিতার হৃদয়—যেখানে শাস্তির চেয়ে সংশোধনের আকাঙ্ক্ষা বড়, প্রতিশোধের চেয়ে ভালোবাসা গভীর।

আজকের পৃথিবীতে সন্তানের জন্য দামি পোশাক, উন্নত শিক্ষা কিংবা আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করাই একজন পিতার একমাত্র দায়িত্ব নয়। প্রকৃত দায়িত্ব হলো তাদের ঈমান, চরিত্র, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলা। অতএব, প্রতিটি মুসলিম পিতার উচিত এই মহান নবীর জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে নিজের পরিবারকে একটি শান্তিময়, ঈমানসমৃদ্ধ ও আদর্শ পরিবারে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করা। কারণ একজন সৎপিতা শুধু একটি সন্তান নয়, বরং একটি প্রজন্মকে গড়ে তোলেন। আর একজন আদর্শ পিতার সুশিক্ষা ও সচ্চরিত্রের প্রভাব সমাজ ও জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণেও অনন্য ভূমিকা রাখে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সব পিতাকে নবী ইয়াকুব (আ.)-এর উত্তম চরিত্র অনুসরণের তাওফিক দান করুন এবং আমাদের পরিবারগুলোকে ঈমান, ভালোবাসা ও কল্যাণে পরিপূর্ণ করে দিন। আমিন।