• ই-পেপার

তুরস্কে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানদের প্রথম আন্তর্জাতিক বৈঠক

হাদিসের বাণী

যে তিন বিষয়ে মহানবী (সা.) শপথ করেছেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
যে তিন বিষয়ে মহানবী (সা.) শপথ করেছেন
সংগৃহীত ছবি

বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবু কাবশাহ আমর ইবনে সাদ আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি মহানবী (সা.)-কে বলতে শুনেছেন যে, আমি তিনটি বিষয়ে তোমাদের জন্য কসম করছি। ১. কোনো ব্যক্তি তার সম্পদ থেকে সাদাকাহ করলে তার সম্পদ কমে যায় না। ২. কোনো ব্যক্তির ওপর জুলুম করা হলে, সে তাতে সবর করলে, আল্লাহ তার সম্মান বৃদ্ধি করে দেন। ৩. যে ব্যক্তি ভিক্ষার দরজাকে খোলে, আল্লাহ তাআলা তার জন্যও দারিদ্র্যের দরজাকে খুলে দেন। (তিরমিজি, হাদিস নং : ২৩২৫, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং : ১৮০৩১)

শিক্ষা ও বিধান 
১. সাদাকাহ করলে সম্পদ কমে না। আল্লাহর পথে দান করলে বাহ্যিকভাবে টাকা কমতে দেখা গেলেও আল্লাহ তাতে বরকত দান করেন। কেননা দান মানুষের সম্পদকে নিরাপদ রাখে এবং আখিরাতে বিশাল প্রতিদান এনে দেয়।

২. জুলুমের মুখে ধৈর্য সম্মান বৃদ্ধি করে। কেউ অন্যায় করলে প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ধৈর্য ধারণ করলে আল্লাহ তার মর্যাদা মানুষের কাছে ও নিজের কাছে বৃদ্ধি করেন। এটি দুর্বলতার নয়; বরং শক্ত ঈমান ও উত্তম চরিত্রের পরিচয়।

৩. অপ্রয়োজনীয় ভিক্ষাবৃত্তি দারিদ্র্যের কারণ। যে ব্যক্তি অভ্যাসগতভাবে মানুষের কাছে হাত পাততে শুরু করে, আল্লাহ তাকে আরো অভাবের পরীক্ষায় ফেলতে পারেন। তাই যথাসম্ভব পরিশ্রম করে জীবিকা অর্জন করা এবং অযথা মানুষের কাছে না চাওয়া উচিত। তবে প্রকৃত অভাবগ্রস্ত ও অসহায় মানুষের জন্য শরিয়ত ভিক্ষা বা সাহায্য গ্রহণের অনুমতি দিয়েছে।

৪. আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা। দান, ধৈর্য ও আত্মসম্মান—এই তিনটি গুণ আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুলের প্রকাশ। যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর নির্ভর করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তম ব্যবস্থা করেন।

৫. মহানবী (সা.)-এর কথার গুরুত্ব। তিনি এই তিনটি বিষয়ে কসম করে বলেছেন, যা বোঝায় এগুলো নিশ্চিত সত্য। তাই এই হাদিসের শিক্ষাগুলো মনে রাখা, অন্যদের শেখানো এবং জীবনে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
 

প্রচলিত বীমা কোম্পানীতে চাকুরী করার বিধান

মুফতি ওমর বিন নাছির
প্রচলিত বীমা কোম্পানীতে চাকুরী করার বিধান
সংগৃহীত ছবি

একজন মুসলিমের জীবিকা যেমন ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত, তেমনি সেই জীবিকা অর্জনের মাধ্যমও হতে হবে হালাল ও শরীয়তসম্মত। বর্তমান যুগে বিভিন্ন পেশার মধ্যে বীমা কোম্পানীতে চাকুরী একটি বহুল প্রচলিত পেশা। অনেক মুসলিম জীবিকার প্রয়োজনে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করেন বা করতে আগ্রহী হন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—শরীয়তের দৃষ্টিতে বীমা কোম্পানীতে চাকুরী করা কি বৈধ?

প্রচলিত বীমার শরয়ি বিধান
বিশ্বের অধিকাংশ সমসাময়িক ইসলামী ফিকহ একাডেমি ও প্রখ্যাত আলেমগণের মতে প্রচলিত বাণিজ্যিক বীমা বৈধ নয়। কারণ এতে সাধারণত তিনটি বড় শরয়ী নিষিদ্ধ বিষয় বিদ্যমান থাকে— ১. সুদ (রিবা), ২.অতিরিক্ত অনিশ্চয়তা (গারার), ৩. জুয়া বা ভাগ্যের উপর নির্ভরতা (মাইসির)। এই তিনটি কারণেই আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিকহ একাডেমি, বিভিন্ন ফতোয়া বোর্ড এবং বহু সমসাময়িক আলেম প্রচলিত বীমাকে শরীয়তসম্মত মনে করেন না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৫)
প্রচলিত বীমার অর্থনৈতিক কাঠামো যেহেতো সুদভিত্তিক বিনিয়োগ তাই এটা নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে যায়।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সুদ গ্রহণকারী, সুদ প্রদানকারী, সুদের হিসাব লেখক এবং এর সাক্ষীদ্বয়—সবার ওপর লানত করেছেন এবং বলেছেন, তারা সবাই সমান।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ১৫৯৮)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সুদের কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতাও অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ।

বীমা কোম্পানীতে চাকুরীর বিধান
যদি কোনো ব্যক্তি এমন একটি প্রচলিত বীমা কোম্পানীতে চাকুরী করেন, যেখানে তার কাজ সরাসরি— বীমা বিক্রি করা, পলিসি তৈরি করা, কমিশনভিত্তিক গ্রাহক সংগ্রহ করা, সুদভিত্তিক আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনা করা, এবং দাবি নিষ্পত্তি বা বীমা চুক্তি সম্পাদন করা। আর এসবই ইসলামে শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে হয় না। তাই অধিকাংশ সমসাময়িক আলেমের মতে এ ধরনের চাকুরী বৈধ নয়। কারণ এতে হারাম কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করা হয়, যা শরিয়তের নির্দেশনার পরিপন্থী।

সহায়ক বিভাগের চাকুরী
কোনো কোনো আলেমের মতে, যদি একজন ব্যক্তি নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা এমন কোনো সাধারণ দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন, যার সঙ্গে বীমা চুক্তি বা সুদভিত্তিক কার্যক্রমের সরাসরি সম্পর্ক নেই, তাহলে বিষয়টি ভিন্নভাবে বিবেচিত হতে পারে। তবে অধিকাংশ ফকীহের মত হলো—যতদূর সম্ভব এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের চাকুরী থেকেও বিরত থাকা উত্তম; কারণ প্রতিষ্ঠানটির মূল কার্যক্রমই শরীয়তসম্মত নয়।

প্রচলিত বীমার বিকল্প পদ্ধতি হলো তাকাফুল
ইসলামী অর্থনীতিতে বীমার বিকল্প হিসেবে তাকাফুল ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এখানে অংশগ্রহণকারীরা পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে ঝুঁকি ভাগাভাগি করেন। এতে সুদ, জুয়া ও অতিরিক্ত অনিশ্চয়তা পরিহারের চেষ্টা করা হয় এবং শরীয়াহ তত্ত্বাবধায়ক বোর্ডের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সহাবি আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র; তিনি শুধুমাত্র পবিত্র (হালাল) জিনিসই গ্রহণ করেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং  : ১০১৫)

অতএব, একজন মুসলিমের জন্য এমন জীবিকা অর্জনের চেষ্টা করা উচিত, যা হালাল এবং সন্দেহমুক্ত। তবে যদি জীবিকার চরম প্রয়োজন দেখা দেয় এবং অন্য কোনো হালাল বিকল্প সাময়িকভাবে না থাকে, তবে দ্রুত হালাল কর্মসংস্থানের চেষ্টা করা এবং আল্লাহর নিকট তাওবা ও সাহায্য প্রার্থনা করা উচিত। কেননা বাস্তব জীবনে অনেক মানুষ কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। এক্ষেত্রে অবশ্যই হালাল জীবিকার দিকে অগ্রসর হওয়ার আন্তরিক চেষ্টা করা জরুরি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল ও বরকতময় জীবিকা দান করুন, হারাম ও সন্দেহযুক্ত উপার্জন থেকে হিফাজত করুন এবং তাঁর সন্তুষ্টির পথে অটল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন। 

সন্তান প্রতিপালনে ইয়াকুব (আ.)-এর দূরদর্শিতা

মুফতি ওমর বিন নাছির
সন্তান প্রতিপালনে ইয়াকুব (আ.)-এর দূরদর্শিতা
সংগৃহীত ছবি

একজন পিতা শুধু পরিবারের উপার্জনকারী নন; তিনি একজন অভিভাবক, শিক্ষক, পথপ্রদর্শক এবং সন্তানের প্রথম আদর্শ। একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ভর করে একজন পিতার চরিত্র, প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও ভালোবাসার ওপর। ইসলাম একজন পিতার দায়িত্বকে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে বিবেচনা করেছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।’ (সুরা : তাহরিম, আয়াত : ৬)

অন্যদিকে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল, তাই সে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮৯৩)

কোরআনে মহান আল্লাহ এমন একজন পিতার জীবনের চিত্র অঙ্কন করেছেন, যিনি যুগে যুগে সব বাবার জন্য অনুসরণীয় আদর্শ। তিনি হলেন মহান আল্লাহর নবী ইয়াকুব (আ.)। সন্তান প্রতিপালনে ইয়াকুব (আ.)-এর দূরদর্শিতার পাঁচটি দিক তুলে ধরা হলো,

১. হালাল উপার্জন ও দায়িত্বশীলতা : নবী ইয়াকুব (আ.) ছিলেন পরিশ্রমী ও দায়িত্ববান একজন পিতা। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী তিনি মেষপালন করতেন এবং নিজের পরিবারের জীবিকা হালাল উপার্জনের মাধ্যমে নির্বাহ করতেন। কঠিন দুর্ভিক্ষের সময়ও তিনি দায়িত্ব এড়িয়ে যাননি। বরং সন্তানদের মিসরে খাদ্য সংগ্রহের জন্য পাঠিয়েছিলেন। (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৫৮-৬৩)
তাই একজন আদর্শ পিতার উচিত, সন্তানকে শুধু অর্থ নয়, হালাল রিজিকের ব্যবস্থাও করে দেওয়া। 

২. সন্তানের কল্যাণে অবিরাম দোয়া ও উপদেশ : নবী ইয়াকুব (আ.)-এর সন্তানরা তাঁর সঙ্গে অন্যায় আচরণ করেছিল। তারা প্রিয় পুত্র ইউসুফ (আ.)-কে তাঁর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল। কিন্তু এত বড় কষ্ট পাওয়ার পরও তিনি কখনো তাদের জন্য দোয়া করা, উপদেশ দেওয়া কিংবা কল্যাণ কামনা করা বন্ধ করেননি। ইরশাদ হয়েছে, “তারা বলল, ‘হে আমাদের পিতা! আমাদের পাপের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয়ই আমরা অপরাধী ছিলাম।’ তিনি বললেন, ‘আমি শিগগিরই আমার প্রতিপালকের কাছে তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব। নিশ্চয়ই তিনিই পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৯৭-৯৮)

তাই এখানেই একজন আদর্শ পিতার পরিচয়—তিনি সন্তানের ভুলে ভেঙে পড়েন না; বরং তাদের সংশোধনের জন্য আল্লাহর দরবারে হাত তোলেন।

৩. প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও ধৈর্য ধারণ : যখন ছেলেরা ইউসুফ (আ.)-এর জামায় মিথ্যা রক্ত লাগিয়ে এনে বলল যে নেকড়ে তাকে খেয়ে ফেলেছে, তখন ইয়াকুব (আ.) তাদের কথাকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করেননি। তিনি ঘটনাটির অসংগতি বুঝতে পেরেছিলেন এবং অসাধারণ ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছিলেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘বরং তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি বিষয়কে সহজ করে দিয়েছে। অতএব, আমার করণীয় হলো উত্তম ধৈর্য (সবরুন জামিল)।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ১৮)

এই ঘটনাগুলো আমাদের শেখায়, একজন আদর্শ পিতা আবেগের বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত নেন না; বরং ধৈর্য, বিচক্ষণতা ও আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেন।

৪. সহমর্মিতা প্রদর্শন করা : নবী ইয়াকুব (আ.) সন্তানদের সঙ্গে কঠোর শাসকের মতো নয়, বরং স্নেহময় অভিভাবকের মতো কথা বলতেন। তিনি তাদের কথা শুনতেন, মতামতের মূল্য দিতেন এবং ভালোবাসার ভাষায় সংবোধন করতেন। তাঁর পরিবারে সংলাপ ছিল, দূরত্ব নয়। কোরআনে বিভিন্ন স্থানে আমরা দেখি, তিনি সন্তানদের পরামর্শ দিচ্ছেন, সতর্ক করছেন এবং আন্তরিকভাবে তাদের সঙ্গে কথা বলছেন। (দেখুন : সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৫ ও ৬৭)।
কেননা সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তাদের আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল ও নৈতিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

৫. ক্ষমাশীল হওয়া : একজন পিতার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো ক্ষমা করার ক্ষমতা। নবী ইয়াকুব (আ.)-এর ছেলেরা বছরের পর বছর তাঁকে শোক ও কষ্টের মধ্যে রেখেছিল। কিন্তু যখন তারা নিজেদের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইল, তখন তিনি তাদের অপমান করেননি, প্রতিশোধ নেননি কিংবা প্রত্যাখ্যানও করেননি। বরং মমতাভরা হৃদয়ে বললেন, ‘আমি শিগগিরই আমার প্রতিপালকের কাছে তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব। নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৯৮)
এটাই একজন আদর্শ পিতার হৃদয়—যেখানে শাস্তির চেয়ে সংশোধনের আকাঙ্ক্ষা বড়, প্রতিশোধের চেয়ে ভালোবাসা গভীর।

আজকের পৃথিবীতে সন্তানের জন্য দামি পোশাক, উন্নত শিক্ষা কিংবা আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করাই একজন পিতার একমাত্র দায়িত্ব নয়। প্রকৃত দায়িত্ব হলো তাদের ঈমান, চরিত্র, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলা। অতএব, প্রতিটি মুসলিম পিতার উচিত এই মহান নবীর জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে নিজের পরিবারকে একটি শান্তিময়, ঈমানসমৃদ্ধ ও আদর্শ পরিবারে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করা। কারণ একজন সৎপিতা শুধু একটি সন্তান নয়, বরং একটি প্রজন্মকে গড়ে তোলেন। আর একজন আদর্শ পিতার সুশিক্ষা ও সচ্চরিত্রের প্রভাব সমাজ ও জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণেও অনন্য ভূমিকা রাখে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সব পিতাকে নবী ইয়াকুব (আ.)-এর উত্তম চরিত্র অনুসরণের তাওফিক দান করুন এবং আমাদের পরিবারগুলোকে ঈমান, ভালোবাসা ও কল্যাণে পরিপূর্ণ করে দিন। আমিন।

যেসব অভ্যাস মুসলিমদের মেধা শাণিত করে

মুফতি ওমর বিন নাছির
যেসব অভ্যাস মুসলিমদের মেধা শাণিত করে
সংগৃহীত ছবি

আল্লাহ তাআলা মানুষকে শুধু জ্ঞান অর্জনের জন্য সৃষ্টি করেননি। বরং সেই জ্ঞানকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর জন্য চিন্তা, বিবেচনা ও প্রজ্ঞার শক্তিও দান করেছেন। পবিত্র কোরআনে বারবার মানুষকে প্রশ্ন করা হয়েছে—‘তোমরা কি চিন্তা কোরো না?’ আরো আছে ‘তোমরা কি উপলব্ধি করবে না?’। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ইসলাম অন্ধ অনুসরণের ধর্ম নয়; বরং গভীর চিন্তা, সঠিক বিচার ও আল্লাহর নির্দেশনার আলোকে জীবন পরিচালনার শিক্ষা দেয়।

আজকের যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট ও আধুনিক প্রযুক্তি মুহূর্তের মধ্যে অসংখ্য তথ্য আমাদের সামনে হাজির করে। কিন্তু তথ্যের প্রাচুর্য সব সময় প্রজ্ঞার জন্ম দেয় না। বরং একজন মুসলিমের প্রকৃত শক্তি হলো—সে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি চিন্তা করে, পরামর্শ নেয়, আল্লাহর ওপর ভরসা করে এবং ধীরস্থিরতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এসব অভ্যাসই মানুষের মেধাকে শানিত করে, চরিত্রকে পরিপক্ব করে এবং তাকে আল্লাহর নৈকট্যের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। যেসব অভ্যাস মুসলিমদের মেধা শানিত করে সেগুলো হলো-

১. নিয়ত বিশুদ্ধ রাখা : যেকোনো কাজ শুরুর আগে একজন মুসলিম নিজেকে প্রশ্ন করে—আমি এই কাজটি কেন করছি? এর উদ্দেশ্য কী? রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সমস্ত কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পাবে, যার নিয়ত সে করেছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১)
নিয়ত শুধু আমলের সওয়াব নির্ধারণ করে না; এটি মানুষের চিন্তার দিকও ঠিক করে দেয়। যার উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি, তার সিদ্ধান্তেও ভারসাম্য আসে, অহংকার কমে এবং আত্মসমালোচনার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।

২. একান্তে বসে চিন্তা করা : ইসলামে গভীর চিন্তাকে বলা হয় তাফাক্কুর। এটি শুধু একটি মানসিক ব্যায়াম নয়; বরং একটি ইবাদতস্বরূপ অভ্যাস। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনের মধ্যে জ্ঞানবানদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করে...।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৯০–১৯১)
আজ আমরা কঠিন কোনো প্রশ্ন এলেই প্রযুক্তির কাছে উত্তর খুঁজি। অথচ মানুষের সবচেয়ে গভীর উপলব্ধিগুলো জন্ম নেয় নীরব মুহূর্তে—যখন সে নিজেকে, জীবনকে এবং সৃষ্টিজগতকে নিয়ে চিন্তা করে। প্রযুক্তি তথ্য দিতে পারে, কিন্তু চিন্তা করার দায়িত্ব মানুষের নিজের।

৩. পরামর্শ গ্রহণ করা : মেধাবী মানুষ কখনো নিজেকে সর্বজ্ঞ মনে করে না। বরং সে অন্যদের অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা থেকে শিক্ষা নেয়। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেন, ‘তাদের কাজকর্ম পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।’ (সুরা : শুরা, আয়াত : ৩৮)

রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও বদর, উহুদ ও খন্দকের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করেছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের তথ্য, বিশ্লেষণ ও পরিসংখ্যান দিতে পারে; কিন্তু একজন অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ মানুষ আমাদের বাস্তব অবস্থা, পারিবারিক প্রেক্ষাপট, মানসিক অবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ বিবেচনা করে পরামর্শ দিতে পারেন। তাই একজন মুসলিম তথ্যের পাশাপাশি মানুষের প্রজ্ঞাকেও মূল্য দেয়।

৪. আল্লাহর ওপর ভরসা—ইস্তিখারা করা : সব তথ্য সংগ্রহ, চিন্তা ও পরামর্শের পরও মানুষের জ্ঞান সীমিত। ভবিষ্যতের প্রকৃত কল্যাণ শুধু আল্লাহই জানেন। তাই ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয় সালাতুল ইস্তিখারা আদায় করতে এবং আল্লাহর কাছে উত্তম সিদ্ধান্তের তাওফিক কামনা করতে। জাবির (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের কোরআনের সুরা শেখানোর মতো গুরুত্ব দিয়ে ইস্তিখারা করার শিক্ষা দিতেন।’ (সহিহ বুখারি)
আর ইস্তিখারা মানে অলৌকিক স্বপ্নের অপেক্ষা করা নয়; বরং যথাসাধ্য চেষ্টা করার পর আল্লাহর কাছে নিজের বিষয়টি সোপর্দ করা এবং তাঁর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা।

৫. ধীরস্থিরতা—তাড়াহুড়া না করা : তাড়াহুড়া অনেক সময় ভুল সিদ্ধান্তের কারণ হয়। ইসলাম ধৈর্য, স্থিরতা ও বিবেচনাপূর্ণ আচরণকে উৎসাহিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এক সাহাবিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘তোমার মধ্যে এমন দুটি গুণ রয়েছে, যা আল্লাহ ভালোবাসেন—সহনশীলতা ও ধীরস্থিরতা।’ (সহিহ মুসলিম)

তাই আজকের দ্রুতগতির পৃথিবীতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, ই-মেইল বা বক্তব্য প্রকাশের আগে কিছু সময় বিরতি নেওয়া, পুনরায় যাচাই করা এবং ভালোভাবে চিন্তা-ভাবনা করে দেখা—এগুলোও এই ইসলামী শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগ।

বিশেষভাবে লক্ষনীয় হলো-
মানুষ যখনই নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে সময় বাঁচিয়েছে, তখন সেই সময় আবার নতুন কাজ দিয়ে পূর্ণ করে ফেলেছে। কিন্তু একজন মুসলিমের দৃষ্টিতে এই অতিরিক্ত সময় একটি মূল্যবান আমানত। এই সময়ের কিছু অংশ যদি আমরা পিতা-মাতার সেবায়, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে, প্রতিবেশী ও সমাজের কল্যাণে, কোরআন তিলাওয়াত ও জ্ঞানচর্চায়, অথবা মসজিদে গিয়ে প্রশান্ত মনে ইবাদতে ব্যয় করি তবে সেই সময় সত্যিকার অর্থেই বরকতময় হয়ে ওঠে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যার আমলের পাল্লা ভারী হবে, সে থাকবে সন্তোষজনক জীবনে। আর যার আমলের পাল্লা হালকা হবে...।’ (সুরা : কারিয়াহ, আয়াত ৬–৯)

মেধা শুধুমাত্র জন্মগত প্রতিভার নাম নয়; এটি সঠিক অভ্যাসের ফল। প্রযুক্তি আমাদের অনেক কাজ সহজ করে দিতে পারে, কিন্তু বিবেক, প্রজ্ঞা, ঈমান এবং আল্লাহভীতি কখনো প্রযুক্তি দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায় না। একজন মুসলিমের শ্রেষ্ঠত্ব তথ্যের আধিক্যে নয়; বরং তথ্যকে হিকমতের সঙ্গে ব্যবহার করার মধ্যে। তাই আসুন, আমরা এমন অভ্যাস গড়ে তুলি, যা শুধু আমাদের বুদ্ধিমত্তাকেই শানিত করবে না; বরং আমাদেরকে আল্লাহর আরও নিকটবর্তী করবে। কারণ একজন প্রকৃত মুমিনের মেধা শুধু পৃথিবীতে সাফল্য আনে না—তা আখিরাতের মুক্তির পথও সুগম করে। আল্লাহ তাআলা আমাদের বুঝার তাওফিক দান করুক। আমিন। 

লেখক : আলেম ও সাংবাদিক