• ই-পেপার

সময়ের আবর্তন মুমিনকে সচেতন করে তোলে

গৃহকর্মীদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে যেসব বিষয় লক্ষণীয়

মুফতি ওমর বিন নাছির
গৃহকর্মীদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে যেসব বিষয় লক্ষণীয়
সংগৃহীত ছবি

একটি পরিবারকে সুশৃঙ্খল ও স্বাচ্ছন্দ্যময় রাখতে গৃহকর্মীদের অবদান অনেক সময় নীরব হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা ঘরের নানা কাজে সহযোগিতা করে পরিবারের সদস্যদের জীবনকে সহজ করে তোলে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সমাজে অনেক সময় গৃহকর্মীদের অবহেলা, অপমান, শোষণ কিংবা নির্যাতনের শিকার হতে দেখা যায়। ইসলাম এ ধরনের আচরণকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছে এবং গৃহকর্মী, শ্রমিক ও অধীনস্থদের প্রতি দয়া, সম্মান ও ন্যায়বিচারের নির্দেশ দিয়েছে।

ইসলাম মানুষের মর্যাদাকে বংশ, জাতি, সম্পদ বা পেশার ভিত্তিতে নয়; বরং তাকওয়া ও মানবিকতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করে। তাই একজন গৃহকর্মীও একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ, যার সম্মান, অধিকার ও অনুভূতি রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর জীবন ও শিক্ষার মাধ্যমে গৃহকর্মীদের সঙ্গে সদাচরণের সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

১. গৃহকর্মীদের ভাই-বোনের মতো মনে করা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের অধীনস্থরা তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধীনে রেখেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘তোমরা যা খাও তাদেরকেও তা খেতে দাও এবং তোমরা যা পরিধান কর তাদেরকেও তা পরতে দাও।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩০)
এই হাদিসে রাসুল (সা.) গৃহকর্মীদের দাস বা চাকর হিসেবে নয়; বরং ভাই হিসেবে বিবেচনা করার শিক্ষা দিয়েছেন। তাই তাদের সঙ্গে অহংকারপূর্ণ নয়, বরং মানবিক আচরণ করা উচিত।

২. সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে কথা বলা
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বলো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৮৩)
গৃহকর্মীদের সঙ্গে রূঢ়, অপমানজনক বা তুচ্ছতাচ্ছিল্যপূর্ণ ভাষায় কথা বলা ইসলামের আদর্শ নয়। তাদের ভুল হলে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বলা উচিত। কারণ কোমল ভাষা মানুষের হৃদয় জয় করে, আর কঠোর ভাষা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে।

৩. কাজের ক্ষেত্রে সামর্থ্যের প্রতি খেয়াল রাখা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তাদের ওপর এমন কাজ চাপিয়ে দিও না যা তাদের সাধ্যের বাইরে। যদি চাপিয়েই দাও, তবে তাদেরকে সাহায্য করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩০)
অনেক সময় গৃহকর্মীদের ওপর অতিরিক্ত কাজের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়। ইসলাম এ ধরনের জুলুমকে সমর্থন করে না। কাজের সময়, বিশ্রাম ও শারীরিক সক্ষমতার প্রতি লক্ষ্য রাখা কর্তব্য।

৪. খাদ্য, পোশাক ও মৌলিক চাহিদার প্রতি যত্নবান হওয়া
ইসলাম শুধু কাজ নেওয়ার কথা বলেনি; বরং তাদের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের প্রতিও গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা যা খাও তাদেরও তা খেতে দাও এবং তোমরা যা পরিধান কর তাদেরও তা পরতে দাও।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৬৬১)
এ হাদিসের অর্থ হলো, গৃহকর্মীদের মানুষ হিসেবে মর্যাদা দিতে হবে এবং তাদের জীবনযাপনের ন্যূনতম প্রয়োজনগুলোর প্রতি উদাসীন হওয়া যাবে না।

৫. নির্যাতন ও অবিচার থেকে বিরত থাকা
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৫৭)
গৃহকর্মীদের শারীরিক, মানসিক বা আর্থিক নির্যাতন করা গুরুতর গুনাহ। তাদের বেতন আটকে রাখা, অন্যায়ভাবে গালমন্দ করা বা মারধর করা ইসলামে নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের বিরুদ্ধে স্বয়ং বাদী হবেন, যারা শ্রমিককে কাজ করিয়ে তার প্রাপ্য মজুরি দেয় না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২২২৭)

৬. ভুলত্রুটি হলে ক্ষমাশীল হওয়া
মানুষ মাত্রই ভুল করে। গৃহকর্মীরাও এর ব্যতিক্রম নয়। এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি আমার খাদেমকে দিনে কতবার ক্ষমা করব?’ তিনি বললেন, ‘প্রতিদিন সত্তর বার।’ (সুনান আবু দাউদ, হাদিস : ৫১৬৪) এর অর্থ হলো, গৃহকর্মীদের ছোটখাটো ভুলত্রুটির ক্ষেত্রে ক্ষমাশীল ও সহনশীল হওয়া একজন মুমিনের গুণ।

৭. তাদের হক ও পারিশ্রমিক যথাসময়ে প্রদান করা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি দিয়ে দাও।’ (সুনান ইবন মাজাহ, হাদিস : ২৪৪৩)
গৃহকর্মীদের বেতন বিলম্বিত করা বা অযথা কাটছাঁট করা ইসলামের দৃষ্টিতে অন্যায়।

৮. তাদের জন্য দোয়া করা ও কল্যাণ কামনা করা
একজন মুমিন শুধু নিজের জন্য নয়; বরং তার অধীনস্থদের জন্যও কল্যাণ কামনা করে। গৃহকর্মীদের সুখ-দুঃখের খোঁজ নেওয়া, অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং তাদের পরিবারের জন্য সহানুভূতি প্রদর্শন করা ইসলামী চরিত্রের অংশ।

৯. রাসুলুল্লাহ (সা.) এর অনুপম আদর্শ
আনাস ইবন মালিক (রা.) বলেন, ‘আমি দশ বছর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর খেদমত করেছি। তিনি কখনো আমাকে ‘উফ’ পর্যন্ত বলেননি এবং কোনো কাজের জন্য বলেননি, ‘এটা কেন করলে?’ বা ‘এটা কেন করলে না?’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৩০৯)
এটি মানব ইতিহাসে একজন নিয়োগকর্তার পক্ষ থেকে কর্মচারীর প্রতি সর্বোচ্চ সৌজন্য ও দয়ার দৃষ্টান্ত।

১০.তাদের সঙ্গে সদাচারকে ইবাদত মনে করা
ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা, যা সমাজের দুর্বল ও অধীনস্থ মানুষের অধিকার রক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। গৃহকর্মীরা আমাদের সেবক নয়; বরং আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী মানুষ। তাদের সঙ্গে সদাচরণ করা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি একটি মহান ইবাদতও বটে। যে ব্যক্তি তার গৃহকর্মীর প্রতি দয়া, ন্যায় ও মানবিকতা প্রদর্শন করে, সে প্রকৃতপক্ষে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করে।

আসুন, আমরা আমাদের ঘরে কর্মরত প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে এমন আচরণ করি, যাতে তারা আমাদের কাছ থেকে সম্মান, নিরাপত্তা ও ভালোবাসা অনুভব করতে পারে। কেননা মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শনই আল্লাহর দয়া লাভের অন্যতম মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে গৃহকর্মীসহ সকল মানুষের হক যথাযথভাবে আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

আমরা কেন ঈমান আনি

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ
আমরা কেন ঈমান আনি
সংগৃহীত ছবি

ঈমান শুধু কোনো সামাজিক উত্তরাধিকার নয়, কোনো পরিবেশের অন্ধ অনুসরণ নয়, কোনো বংশপরম্পরায় চলে আসা অভ্যাসও নয়; বরং ঈমান হলো এক মহান সত্য, যার ওপর আসমান ও জমিন প্রতিষ্ঠিত এবং যার ওপর নির্ভর করে দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতা।

মহান আল্লাহ আমাদের কাছে অন্ধ ঈমান চাননি কিংবা প্রমাণহীন কোনো বিশ্বাসও চাননি; বরং তিনি ঈমানকে দুটি মহান বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছেন—

প্রথমত, সত্যকে চেনার জন্য বিবেক ও বুদ্ধির আলো।
দ্বিতীয়ত, অন্তরকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য ওহির আলো। এ কারণেই আজকের আলোচনার বিষয়—‘আমরা কেন ঈমান আনি।’ গোটা বিশ্ব আল্লাহর অস্তিত্বের সাক্ষ্য দেয়।

প্রথমত, একটু চিন্তা করুন এই মহাবিশ্ব নিয়ে, যেখানে আমরা বসবাস করছি। একটি উঁচু আকাশ, বিস্তৃত পৃথিবী, সূর্য ও চন্দ্র, আর দিগন্তজুড়ে অসংখ্য নিদর্শন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আসমান ও জমিনের সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৯০)

এসব শুধু সৌন্দর্যের দৃশ্য নয়; বরং এগুলো হলো নিদর্শন, প্রমাণ ও ইঙ্গিত, যা আমাদের সেই স্রষ্টার দিকে নিয়ে যায়, যিনি সৃষ্টি করেছেন এবং নিখুঁত করেছেন।

সুস্থ বিবেক যখন এই মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা ও নিখুঁত ব্যবস্থাপনা দেখে, তখন সে বুঝতে পারে—এর পেছনে অবশ্যই একজন প্রজ্ঞাময় স্রষ্টা রয়েছেন।
কোরআন এমন এক স্পষ্ট প্রশ্ন করেছে, যার পর অস্বীকারের কোনো সুযোগ থাকে না—‘তারা কি কোনো কিছু ছাড়াই সৃষ্টি হয়েছে, নাকি তারা নিজেরাই নিজেদের স্রষ্টা?’ (সুরা : আত-তুর, আয়াত : ৩৫)

মানুষ নিজেই আল্লাহর নিদর্শন 
মহান আল্লাহ বলেন, ‘এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যেও (নিদর্শন আছে), তবে কি তোমরা দেখতে পাও না?’ (সুরা : আজ-জারিয়াত, আয়াত : ২১)

নিজের দিকে তাকাও—একটি হৃদয়, যা তোমার অনুমতি ছাড়াই অবিরাম স্পন্দিত হচ্ছে। একটি শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা, যা নিজে থেকেই চলছে। চোখ, যা দেখে। কান, যা শোনে। বুদ্ধি, যা চিন্তা করে, বিশ্লেষণ করে, তুলনা করে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

তুমি দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে থাকলেও তোমার ভেতরে একটি ব্যবস্থা অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে—হৃৎস্পন্দনের নিয়মিততা, কোষের পুনর্গঠন, শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

এসব কে তোমার মধ্যে স্থাপন করেছেন? আল্লাহ বলেন, ‘যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাকে সুবিন্যস্ত করেছেন এবং সুষম করেছেন। তিনি যেভাবে চেয়েছেন, সেভাবেই তোমাকে গঠন করেছেন।’ (সুরা : আল-ইনফিতার. আয়াত : ৭-৮)

মানুষের স্বভাব আল্লাহকে চিনতে প্রস্তুত
ঈমান কোনো আকস্মিক ধারণা নয়; বরং এটি অন্তরের একটি মূল স্বভাব। মানুষ আল্লাহকে চেনার স্বাভাবিক প্রবণতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। আল্লাহ বলেন, ‘এটাই আল্লাহর সেই স্বভাব, যার ওপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা : আর-রুম, আয়াত : ৩০)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক শিশু ফিতরাতের ওপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদি, খ্রিস্টান অথবা অগ্নিপূজক বানায়।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

তাই যখন ভয় তীব্র হয়, যখন বিপদ-সংকট নেমে আসে, যখন কঠিন পরীক্ষা আসে—তখন মানুষের অন্তরের পর্দাগুলো সরে যায় এবং তার প্রকৃত স্বভাব প্রকাশ পায়। তখন সে কী বলে? সে বলে—‘হে আমার রব! হে আল্লাহ!’ এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যখন তারা নৌযানে আরোহণ করে, তখন তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে ডাকে। অতঃপর তিনি যখন তাদের স্থলে পৌঁছে দেন, তখন তারা আবার শিরক করে।’ (সুরা : আল-আনকাবুত, আয়াত : ৬৫)

আল্লাহ আমাদের উদ্দেশ্যহীনভাবে ছেড়ে দেননি
যদি মানুষ কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া সৃষ্টি হতো, তাহলে তার জীবন হতো এক বিভ্রান্তি। তখন সত্য ও মিথ্যার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকত না। কিন্তু আল্লাহর রহমত ও প্রজ্ঞা এ কথা অনুমোদন করে না যে তিনি আমাদের সৃষ্টি করবেন এবং কোনো পথনির্দেশ ছাড়াই ছেড়ে দেবেন। আল্লাহ বলেন, ‘আমি রাসুলদের সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে পাঠিয়েছি, যাতে রাসুলদের পরে মানুষের জন্য আল্লাহর বিরুদ্ধে কোনো অজুহাত না থাকে।’ (সুরা : আন-নিসা, আয়াত : ১৬৫)

তিনি রাসুল পাঠিয়েছেন, কিতাব নাজিল করেছেন এবং সর্বশেষে মুহাম্মদ (সা.)-কে পাঠিয়েছেন। তাঁর                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                      মাধ্যমে দিয়েছেন মহান কোরআন—যা হলো আলো, হেদায়েত ও শেফা। আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ! তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে প্রমাণ এসেছে এবং আমি তোমাদের প্রতি সুস্পষ্ট আলো নাজিল করেছি।’ (সুরা : আন-নিসা, আয়াত : ১৭৪)

কোরআন হলো আল্লাহকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার গ্রন্থ। জীবনের উদ্দেশ্য বুঝিয়ে দেওয়ার গ্রন্থ। ভুল ধারণা সংশোধনের গ্রন্থ; ন্যায় প্রতিষ্ঠার গ্রন্থ এবং আত্মাকে পবিত্র করার গ্রন্থ। এটিই মানুষকে ঈমানের পথে নিয়ে যায়।

ইবাদত মানুষকে তার প্রকৃত অবস্থানে ফিরিয়ে দেয়
আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ! তোমরা তোমাদের সেই রবের ইবাদত কর, যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা : আল-বাকারাহ, আয়াত : ২১)

আল্লাহ ইবাদতের সঙ্গে সৃষ্টির সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই তোমার আনুগত্যের সর্বাধিক অধিকারী। যিনি তোমাকে রিজিক দিয়েছেন, তিনিই তোমার আশা করার সর্বাধিক যোগ্য। যিনি তোমার সব বিষয় পরিচালনা করেন, তাঁর ওপরই তোমার ভরসা করা উচিত।

ইবাদত মানে হলো অন্তরকে তার সঠিক স্থানে ফিরিয়ে আনা। তোমার হৃদয় আল্লাহর সঙ্গে থাকবে, প্রবৃত্তির সঙ্গে নয়। তোমার আশা আল্লাহর কাছে থাকবে; মানুষের কাছে নয়। তোমার নির্ভরতা আল্লাহর ওপর থাকবে; শুধু উপকরণের ওপর নয়। তাই আল্লাহ বলেন, ‘জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা : আর-রাদ, আয়াত : ২৮)

ঈমান অন্তরকে সংশোধন করে, ফলে বাহ্যিক আচরণ সুন্দর হয়। ঈমান বিবেককে পবিত্র করে, ফলে চরিত্র সঠিক হয়। ঈমান মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে মানুষের রবের দাসত্বে নিয়ে যায়।

হে আল্লাহ! দুনিয়া ও তার সবকিছুর চেয়ে ঈমানকে আমাদের কাছে বেশি প্রিয় করে দিন।

আজকের নামাজের সময়সূচি, ২৪ জুন ২০২৬

অনলাইন ডেস্ক
আজকের নামাজের সময়সূচি, ২৪ জুন ২০২৬

আজ বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ১০ আষাঢ় ১৪৩৩, ৮ মহররম, ১৪৪৮।

ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি নিম্নরূপ—

জোহরের সময় শুরু ১২টা ০৪ মিনিটে।

আসরের সময় শুরু ৪টা ৪০ মিনিটে।

মাগরিব ৬টা ৫৩ মিনিটে।

এশার সময় শুরু ৮টা ১৯ মিনিটে।

আগামীকাল ফজর শুরু ৩টা ৪৭ মিনিটে 

আজ ঢাকায় সূর্যাস্ত ৬টা ৪৯ মিনিটে এবং আগামীকাল সূর্যোদয় ৫টা ১২ মিনিটে।

সূত্র : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা।

মৃত্যুর পরও সদকায়ে জারিয়ার মাধ্যমে সওয়াব লাভের ১০ উপায়

মুফতি ওমর বিন নাছির
মৃত্যুর পরও সদকায়ে জারিয়ার মাধ্যমে সওয়াব লাভের ১০ উপায়
সংগৃহীত ছবি

দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আখিরাত চিরস্থায়ী। একজন বুদ্ধিমান মুমিন সেই ব্যক্তি, যিনি মৃত্যুর আগেই নিজের জন্য এমন কিছু আমল রেখে যান যা কবরের অন্ধকারেও তার জন্য নূর হয়ে থাকবে। একটি মসজিদ, একটি নলকূপ, একটি কোরআন, একটি গাছ কিংবা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—এসব ছোট উদ্যোগও হতে পারে অনন্ত সওয়াবের উৎস। আর মানুষের জীবনের সবচেয়ে নিশ্চিত সত্য হলো মৃত্যু। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৮৫)

মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষের আমলের খাতা বন্ধ হয়ে যায়। তবে ইসলামের সৌন্দর্য হলো, কিছু নেক আমল এমন আছে যার সওয়াব মৃত্যুর পরও অব্যাহতভাবে পৌঁছাতে থাকে। এগুলোকে বলা হয় সদকায়ে জারিয়া বা চলমান সদকা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়; তবে তিনটি আমল বন্ধ হয় না— সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৬৩১)
তাই একজন দূরদর্শী মুমিনের উচিত এমন কিছু নেক কাজ করে যাওয়া, যা মৃত্যুর পরও তার আমলনামায় সওয়াবের ধারা অব্যাহত রাখবে।


১. মসজিদ নির্মাণে সহযোগিতা
মসজিদ আল্লাহর ঘর। যারা মসজিদ নির্মাণে অংশগ্রহণ করে, তাদের জন্য জান্নাতে বিশেষ পুরস্কারের ঘোষণা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একটি মসজিদ নির্মাণ করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৫০)
একটি মসজিদে যতদিন নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত ও ইবাদত চলবে, ততদিন নির্মাণকারীর সওয়াবও চলতে থাকবে।

২. বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা
পানি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। তৃষ্ণার্ত মানুষ বা প্রাণীর জন্য পানির ব্যবস্থা করা অন্যতম শ্রেষ্ঠ সদকা। রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কোন সদকা সবচেয়ে উত্তম? তিনি বলেন, ‘পানি পান করানো।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৬৮১)
নলকূপ, গভীর নলকূপ, পানির ট্যাংক বা কূপ খনন করে অসংখ্য মানুষের উপকার করা যায়। যতদিন মানুষ সেই পানি ব্যবহার করবে, ততদিন সওয়াব চলতে থাকবে।

৩. কোরআন ও দ্বীনি জ্ঞান প্রচার
জ্ঞান এমন এক সম্পদ যা মৃত্যুর পরও মানুষের উপকার করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে?’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৯)
কোরআন মাজিদ, হাদিসের বই, ইসলামী সাহিত্য কিংবা দ্বীনি শিক্ষা প্রসারের জন্য অর্থ ব্যয় করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ কাজ। কেউ সেই জ্ঞান থেকে উপকৃত হলে তার সওয়াব দানকারীর কাছেও পৌঁছায়।

৪. বৃক্ষরোপণ করা
গাছ মানুষের খাদ্য, অক্সিজেন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। ইসলামে বৃক্ষরোপণকে সদকা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলিম যদি একটি গাছ লাগায়, অতঃপর মানুষ, পাখি বা প্রাণী তা থেকে খায়, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩২০)
ফলদ, ঔষধি কিংবা বনজ গাছ রোপণ দীর্ঘমেয়াদি সওয়াবের মাধ্যম হতে পারে।

৫. মাদ্রাসা, স্কুল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা
শিক্ষা একটি জাতির উন্নতির ভিত্তি। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা বা পরিচালনায় সহায়তা করা অত্যন্ত মূল্যবান সদকায়ে জারিয়া। যেখানে কোরআন শিক্ষা, দ্বীনি জ্ঞান বা উপকারী শিক্ষা অর্জিত হবে, সেখানে প্রতিটি উপকারের অংশ প্রতিষ্ঠাতার আমলনামায় যুক্ত হতে থাকবে।

৬. হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবায় সহযোগিতা
অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা ও সেবায় অংশ নেওয়া ইসলামে মহৎ কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের একটি কষ্ট দূর করে দেয়, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার একটি কষ্ট দূর করে দেবেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৯৯)
হাসপাতাল নির্মাণ, অ্যাম্বুলেন্স দান, চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রদান কিংবা দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা সহায়তা—সবই সদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

৭. কবরস্থানের জন্য জমি দান
মুসলমানদের দাফনের জন্য জমি ওয়াকফ বা দান করা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যাণমূলক কাজ। যতদিন সেই জমি মুসলমানদের দাফনের কাজে ব্যবহৃত হবে, ততদিন দানকারীর জন্য সওয়াব অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ।

৮. রাস্তা, সেতু বা মুসাফিরখানা নির্মাণ
মানুষের চলাচল সহজ করার জন্য রাস্তা, সেতু, বিশ্রামাগার বা মুসাফিরখানা নির্মাণ করা সমাজের জন্য বড় উপকার। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা কল্যাণকর কাজ করো, যাতে সফল হতে পারো।’ (সুরা : হাজ্জ, আয়াত : ৭৭)
প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এসব সুবিধা ব্যবহার করে উপকৃত হয়, আর দানকারীর আমলনামায় সওয়াব জমা হতে থাকে।

৯. খাল, পুকুর বা নদী খনন
কৃষিকাজ, পানীয় জল ও পরিবেশ রক্ষার জন্য খাল, পুকুর বা জলাধার খনন অত্যন্ত উপকারী কাজ। এটি বহু মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করে এবং দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ বয়ে আনে। তাই এটিও সদকায়ে জারিয়ার অন্যতম মাধ্যম।

১০. জীবন রক্ষাকারী সহায়তা ও রক্তদান
রক্তদানের মাধ্যমে একজন মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব। ইসলামে মানুষের জীবন রক্ষা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে একজন মানুষের জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল।’ (সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ৩২)
যদিও রক্তদান ক্লাসিক অর্থে সবসময় সদকায়ে জারিয়ার উদাহরণ নয়, তবে এটি মহান সদকা ও মানবসেবামূলক কাজ। আর যদি কেউ স্থায়ীভাবে রক্তব্যাংক, চিকিৎসা প্রকল্প বা জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলেন, তাহলে তা সদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

এছাড়া আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ সদকায়ে জারিয়া হলো- এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করা, হিফজখানা বা কোরআন শিক্ষা কেন্দ্র চালু করা, ইসলামী দাওয়াহ কার্যক্রমে সহায়তা করা, ওয়াকফ সম্পত্তি দান করা, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান করা এবং উপকারী ইসলামী বই রচনা ও প্রকাশ করা ইত্যাদি। 

তাই আসুন, আমরা নিজেদের জন্য এবং আমাদের মৃত বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন ও প্রিয়জনদের নামে সদকায়ে জারিয়ার ব্যবস্থা করি। কারণ মৃত্যুর পর মানুষ যখন একা হয়ে যায়, তখন তার নেক আমলই হয় সবচেয়ে বড় সঙ্গী। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এমন আমল করার তাওফিক দান করুন, যার সওয়াব মৃত্যুর পরও অব্যাহতভাবে আমাদের আমলনামায় পৌঁছাতে থাকবে। আমিন।

লেখক : আলেম ও সাংবাদিক