• ই-পেপার

অসাধারণ মানুষের গুণাবলি ও জীবনাদর্শ

পুরুষ ও মহিলার নামাজ : একই নাকি ভিন্ন?

মুফতি সায়্যিদ মুনিব মুর্শিদ
পুরুষ ও মহিলার নামাজ : একই নাকি ভিন্ন?
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনে নামাজ হলো আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম। এটি ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ এবং একজন মুসলমানের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তাই নামাজের বিধান, পদ্ধতি ও আদব সম্পর্কে জানার আগ্রহ স্বাভাবিক। দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রশ্ন মুসলিম সমাজে আলোচিত হয়ে আসছে—পুরুষ ও মহিলার নামাজ কি সম্পূর্ণ একই, নাকি কিছু ক্ষেত্রে ভিন্নতা রয়েছে?

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের কোরআন, হাদিস, সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্য, তাবেয়িদের আমল এবং ফুকাহায়ে কেরামের ব্যাখ্যার দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। কারণ ইসলামের বিধান শুধু একটি দলিলের উপর নির্ভরশীল নয়; বরং কোরআন, সুন্নাহ, সাহাবিদের ব্যাখ্যা ও উম্মাহর গ্রহণযোগ্য ইজতিহাদের সমন্বয়ে শরিয়তের পূর্ণাঙ্গ রূপ প্রকাশ পায়।

নামাজের মৌলিক কাঠামো সবার জন্য এক : রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন,‘তোমরা নামাজ আদায় কর, যেমন আমাকে নামাজ আদায় করতে দেখ।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৩১)

এই হাদিসের আলোকে সকল আলেম একমত যে নামাজের ফরজ, ওয়াজিব, রুকন এবং মৌলিক কাঠামো নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য একই। তাকবিরে তাহরিমা, কিয়াম, কিরাত, রুকু, সিজদা, দুই সিজদার মাঝখানে বসা  এবং সালাম—এসব মৌলিক বিষয়ের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য নেই। তবে নামাজের ভঙ্গি বা সিফাতের কিছু সূক্ষ্ম বিষয়ে নারী ও পুরুষের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। 

নারীর জন্য সংযম ও পর্দার নীতি : মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা তোমাদের ঘরে অবস্থান কর।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৩৩)
মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন যে এ আয়াত নারীর জন্য লজ্জাশীলতা, সংযম, পর্দা ও আত্মগোপনের একটি মৌলিক নীতি শিক্ষা দেয়। (তাফসিরে ইবনে কাসির)

ফুকাহায়ে কেরামের মতে, এই নীতির প্রভাব নামাজের ভঙ্গিতেও প্রতিফলিত হয়েছে। অর্থাৎ নারীর নামাজ এমনভাবে আদায় করা উত্তম, যাতে তার শরীর অধিক সঙ্কুচিত ও আচ্ছাদিত থাকে এবং সতর রক্ষার বিষয়টি আরও সুদৃঢ় হয়। নারীর নামাজে সঙ্কুচিত থাকার বিষয়ে সাহাবায়ে কেরাম থেকে একাধিক বর্ণনা পাওয়া যায়। হজরত আলী (রা.) বলেন, ‘মহিলা যখন সিজদা করবে, তখন নিজেকে গুটিয়ে রাখবে এবং উরু একত্রে মিলিয়ে রাখবে।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদিস : ২৭৯৪)

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘মহিলা যখন নামাজে বসবে, তখন এক উরুকে অপর উরুর সঙ্গে মিলিয়ে বসবে এবং সিজদায় নিজের পেট উরুর সঙ্গে মিলিয়ে রাখবে।’ (সুনানে বায়হাকি)
এসব বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে সাহাবায়ে কেরাম নারীদের জন্য নামাজে অধিক সংযত ও সঙ্কুচিত ভঙ্গিকে পছন্দ করতেন।

সাহাবীদের পরবর্তী প্রজন্ম তথা তাবেয়িরাও একই মত পোষণ করেছেন। প্রখ্যাত তাবেয়ি ইবরাহিম নাখাঈ (রহ.) বলেন, মহিলা রুকু ও সিজদায় নিজেকে গুটিয়ে রাখবে।’(মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা)
ইমাম হাসান বসরী (রহ.) বলেন, নারী নামাজে সঙ্কুচিত থাকবে।’ (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, হাদিস : ৫০৭৮) এ থেকে স্পষ্ট হয় যে তাবেয়িদের যুগেও নারীর নামাজে সংযম ও আত্মগোপনের নীতি সুপরিচিত ও প্রচলিত ছিল।

সাহাবি ও তাবেয়িদের এসব বর্ণনার আলোকে  হানাফি মাজহাবের ফুকাহায়ে কেরাম  নারীর নামাজের কিছু বিশেষ ভঙ্গি নির্ধারণ করেছেন। তা হলো- ‘নারীর সিজদা পুরুষের সিজদা থেকে ভিন্ন হবে।’ আরো আছে, ‘নারীর জন্য নামাজে সঙ্কুচিত হওয়া উত্তম; কারণ এতে অধিক সতর রক্ষা হয়।’ (বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৫০৪, হিদায়া, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা :  ৫৩, আল-মাবসুত,  খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ২৩)
অর্থাৎ হানাফী ফিকহে এ পার্থক্যের মূল ভিত্তি হলো সতর সংরক্ষণ, লজ্জাশীলতা এবং অধিক পর্দা নিশ্চিত করা।

হানাফি মাজহাব অনুযায়ী নারীর নামাজের প্রধান ভিন্নতাসমূহ
১. তাকবিরে তাহরিমার সময় মহিলা কাঁধ পর্যন্ত হাত তোলবে।
২. দাঁড়ানো অবস্থায় মহিলা বুকের উপর হাত বাঁধবে।
৩. রুকুর সময় পুরুষের মতো শরীর বেশি প্রসারিত না করে নিজেকে গুটিয়ে রেখে রুকু করবে।
৪. সিজদার সময় পেট উরুর সঙ্গে এবং বাহু শরীরের সঙ্গে মিলিয়ে রাখবে।
৫. বসা অবস্থায় দুই পা ডান দিকে বের করে (তাওয়াররুক সদৃশ ভঙ্গি) বসবে। (আল-ফাতাওয়াল হিন্দিয়া, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৭৩, রদ্দুল মুহতার, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৫০৪)

এখানে দু্ইটি বিষয় লক্ষ্যনীয় 
এক. ইসলামী ফিকহের বহু মাসআলা সরাসরি মারফু হাদিসে উল্লেখ না থাকলেও  সাহাবিদের ফতোয়া ও আমলের মাধ্যমে সেগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ প্রসজ্ঞে ইমাম তিরমিজি (রহ.) উল্লেখ করেন, ‘আহলে ইলম অনেক সময় সাহাবীদের আমল ও বক্তব্য গ্রহণ করেন।’ অতএব সাহাবায়ে কেরামের ব্যাখ্যা ও আমল ইসলামী ফিকহে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত।

দুই. রাসুলুল্লাহ (সা.) যে বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে যেভাবে নামাজ পড়তে দেখ, সেভাবেই নামাজ পড়ো’ এই হাদিসের ব্যাখ্যা হলো, এই হাদিস নামাজের মৌলিক পদ্ধতি ও কাঠামোর নির্দেশনা প্রদান করে। তবে শরিয়তে এমন বহু বিধান রয়েছে যেখানে মূল ইবাদত এক হলেও নারী-পুরুষের বাস্তব প্রয়োগে কিছু পার্থক্য রাখা হয়েছে। যেমন— সতরের বিধান, জামাতে দাঁড়ানোর স্থান, জুমার নামাজের হুকুম ও ঈদের জামাতে অংশগ্রহণের বিধান ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে মূল ইবাদত এক হলেও নারী-পুরুষের জন্য কিছু পৃথক নির্দেশনা রয়েছে। 

ইসলামের দৃষ্টিতে নামাজের মূল কাঠামো, ফরজ, রুকন ও মৌলিক বিধান নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য অভিন্ন। তবে হানাফি মাজহাবের বিশ্লেষণ অনুযায়ী নারীর জন্য অধিক পর্দা, লজ্জাশীলতা ও সতর সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে নামাজের কিছু ভঙ্গিতে বিশেষত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। এই মতামতের ভিত্তি শুধু পরবর্তী ফকিহদের ব্যক্তিগত অভিমত নয়; বরং সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্য, তাবেয়িদের আমল এবং যুগে যুগে স্বীকৃত ফুকাহায়ে কেরামের ইজতিহাদের উপর প্রতিষ্ঠিত। তাই এ বিষয়ে প্রাজ্ঞ উলামায়ে কেরামের গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাকে মানা জরুরি ।

লেখক : ফাযেল, জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা ঢাকা।

শিশুর নিরাপত্তায় ইসলামের শিক্ষা

আলেমা হাবিবা আক্তার
শিশুর নিরাপত্তায় ইসলামের শিক্ষা
সংগৃহীত ছবি

শিশুরা পেলব ফুলের মতো। তারা সমাজের সবচেয়ে কোমল ও স্পর্শকাতর অংশ। মা-বাবা, অভিভাবক, পরিবার ও সমাজের ভুল সিদ্ধান্ত ও অসচেতনতার কারণে শিশুর জীবন বিপন্ন হয়। বর্তমান বিশ্বে, বিশেষ করে আমাদের সমাজে শিশুরা হত্যা, অপহরণ, নির্যাতন ও বিভিন্ন ধরনের সহিংস অপরাধের শিকার হচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ইসলামের শিক্ষা হলো, শিশুর জীবন ও ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।

সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, দিন দিন শিশুর প্রতি মানুষের সহানুভূতি, মমতা ও স্নেহ যেন কমে যাচ্ছে। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ছোটদের স্নেহ করে না, বড়কে সম্মান করে না, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৯১৯)

ইসলামের দৃষ্টিতে মানবজীবনের মূল্য অপরিসীম। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ একজন মানুষের জীবনকে সমগ্র পৃথিবীর মানুষের জীবনের সমান ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘যে মানুষ হত্যা বা দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজ করার কারণে ছাড়া কাউকে হত্যা করল, সে যেন দুনিয়ার সব মানুষকে হত্যা করল, আর যে কারো প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন সব মানুষের প্রাণ রক্ষা করল।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৩২)

শিশুর জীবনের নিরাপত্তা যেন আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই ইসলাম জন্মের আগেই তার জীবনের নিরাপত্তা ঘোষণা করেছে। আল্লাহর নির্দেশ হলো, ‘তোমরা নিজেদের সন্তানদের দারিদ্র্যের ভয়ে হত্যা কোরো না; আমিই তাদের রিজিক দিই এবং তোমাদেরও।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৩১)

এই নির্দেশ জাহেলি যুগের কন্যাশিশু হত্যার বিরুদ্ধে অবতীর্ণ হলেও এর শিক্ষা সর্বজনীন। কোনো অবস্থায়ই সন্তানের জীবন ধ্বংস করা যাবে না।

আজকের যুগে শিশু হত্যা, অপহরণ বা নির্যাতন কোরআনের এই শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আরেকটি ভয়াবহ বিষয় হলো শিশুর ওপর যৌন নিপীড়ন। শিশুরা ঘরে ও বাইরে, আপনজন, প্রতিবেশী, শিক্ষক, পরিচিত-অপরিচিত, এমনকি ধর্মালয়ে নানা শ্রেণির মানুষের দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। তাদের অনেকের প্রাণহানিও ঘটছে। অথচ ইসলামী আইনে ধর্ষণ একটি বহুমাত্রিক অপরাধ, যার মধ্যে কমপক্ষে তিনটি অপরাধ সংঘটিত হয়—ক. ব্যভিচার, খ. বল প্রয়োগ ও ভীতি প্রদর্শন, গ. সম্ভ্রম লুণ্ঠন। ইসলামী আইনে এই তিনটি বিষয়ই পৃথকভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আর ধর্ষণে যেহেতু এই তিনটি অপরাধের সমন্বয় ঘটে, তাই ধর্ষণ একটি গুরুতর অপরাধ। আর যখন কোনো কোমলমতি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়, তা আরো বেশি গুরুতর হয়ে ওঠে।

ইসলামী আইনজ্ঞরা বলেন, ধর্ষক যদি কোনো শিশুকে ধর্ষণ করে এবং এতে শিশুর মৃত্যু হয়, তাহলে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। একইভাবে কোনো নারীকে ধর্ষণের আগে বা পরে যদি তাকে হত্যা করা হয়, তাহলে হত্যাকারী ধর্ষককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। বেশির ভাগ ফকিহর মতে, এমন ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড তরবারির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘কেউ তোমাদের সঙ্গে সীমা লঙ্ঘন করলে তোমরাও তার সঙ্গে অনুরূপ আচরণ করো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৯৪; তাফসিরে কুরতুবি : ২/৩৫৮)

শিশুর প্রতি যে সহিংস আচরণ ও নিপীড়ন হচ্ছে এ জন্য অনেক সময় পারিবারিক অবহেলা ও সামাজিক দায়বোধের অভাব দায়ী বলে প্রমাণ হয়। ইসলাম সন্তান ও শিশুর প্রতি যত্নশীল হওয়ার শিক্ষা দেয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সম্পদ ও সন্তান পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য।’ (সুরা : কাহফ, আয়াত : ৪৬)

আর প্রতিটি সৌন্দর্যের দাবি হলো তা সংরক্ষণ করা হবে এবং তা সংরক্ষণে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সুতরাং শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব।

শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি উপায় হলো তাকে ঝুঁকি ও বিপদ সম্পর্কে অবহিত করা। অনেক সময় মা-বাবা ও অভিভাবক অসৎ বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশী, আত্মীয়দের সম্পর্কে শিশুদের সচেতন করে না। তাদের মন্দ স্পর্শ ও আচরণ সম্পর্কে জানান দেয় না। এতে শিশুরা বিপদে পড়ে। কোরআন শিশুদের সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সচেতন করার শিক্ষা দিয়েছে। পিতা ইয়াকুব (আ.) পুত্র ইউসুফকে বলছেন, ‘হে আমার পুত্র! তোমার স্বপ্নের কথা তোমার ভাইদের কাছে বর্ণনা কোরো না। যদি করো তাহলে তারা তোমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করবে। শয়তান তো মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৫)

ইসলামী শিক্ষা অনুযায়ী, রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ের দায়িত্ব হলো দুর্বলদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। শিশুদের সুরক্ষার জন্য কার্যকর আইন, দ্রুত বিচার ব্যবস্থা এবং সামাজিক সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান সমাজে শিশুদের বিরুদ্ধে যে সহিংসতা ও অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা রোধে একই সঙ্গে কোরআন ও সুন্নাহভিত্তিক নৈতিকতা শিক্ষা, পারিবারিক সচেতনতা এবং রাষ্ট্রীয় কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

সব শেষে মহানবী (সা.)-এর বাণী স্মরণ করতে চাই, যেখানে তিনি আদর্শ মুসলমানের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার হাত ও মুখ থেকে মানুষ নিরাপদ থাকে। আর মুমিন সেই ব্যক্তি, যার থেকে মানুষ তাদের জীবন ও সম্পদকে নিরাপদ মনে করে।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৪৯৯৫)

আল্লাহ সব শিশুকে নিরাপদ জীবন দান করুন। আমিন।

আজকের নামাজের সময়সূচি, ১০ জুন ২০২৬

অনলাইন ডেস্ক
আজকের নামাজের সময়সূচি, ১০ জুন ২০২৬

আজ বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, ২৩ জিলহজ ১৪৪৭।

ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি নিম্নরূপ—

জোহরের সময় শুরু ১২টা ০১ মিনিটে।

আসরের সময় শুরু ৪টা ৩৭ মিনিটে।

মাগরিব ৬টা ৪৯ মিনিটে।

এশার সময় শুরু ৮টা ১৫ মিনিটে।

আগামীকাল ফজর শুরু ৩টা ৪৬ মিনিটে 

আজ ঢাকায় সূর্যাস্ত ৬টা ৪২ মিনিটে এবং আগামীকাল সূর্যোদয় ৫টা ১১ মিনিটে।

সূত্র : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা।

পরিকল্পিত ‘হালালা’ বিবাহ সম্পর্কে ইসলাম কী বলে

ড. মুহাম্মদ তাজাম্মুল হক
পরিকল্পিত ‘হালালা’ বিবাহ সম্পর্কে ইসলাম কী বলে

হালালা বলতে আরবি ‘তাহলিল’-কে বোঝানো হয়। ইসলামের তা একটি বিশেষ বিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা তিন তালাকের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর চূড়ান্ত বিচ্ছেদের পর তাদের পুনরায় একত্র হওয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

জাহিলি যুগে পুরুষেরা স্ত্রীকে অগণিত তালাক দিত। তালাক দেওয়ার পর আবার ফিরিয়ে নিত। কিংবা দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে ঝুলিয়ে রাখত। তা ছিল পুরুষের স্বেচ্ছাচারিতার বহিঃপ্রকাশ। ইসলাম এই অপব্যবহার রোধে তালাকের ক্ষেত্রে সীমারেখা নির্ধারণ করেছে। 

পবিত্র কুরআনে ন্যূনতম দুই বারে তালাক দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় তালাকের পর পারিবারিক পর্যায়ে ‘ইসলাহ’ (সংশোধন) ও ‘সুলহ’ (সমন্বয়) প্রচেষ্টার নীতি করেছে। তিন তালাককে চূড়ান্ত বিচ্ছেদ হিসেবে গণ্য করেছে। এর মাধ্যমে বিবাহের দায়িত্বশীলতা ও পারিবারিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং পুরুষকে তালাক উচ্চারণে সতর্ক করা হয়েছে।

রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে হালাল বিষয়সমূহের মধ্যে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হলো তালাক।’ (আবু দাউদ, আস-সুনান, হাদিস নং : ২১৭৮)

হালালা কী?

কোনো স্বামী যদি তার স্ত্রীকে তিন তালাক প্রদান করে, তাহলে স্ত্রী তার জন্য হারাম হয়ে যায়। এ অবস্থায় তারা পুনরায় একত্র হতে চাইলে স্ত্রীকে অন্য একজন পুরুষের সঙ্গে স্বাভাবিক ও প্রকৃত বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে। যদি দ্বিতীয় বিবাহ স্বাভাবিক কারণে—যেমন তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর মাধ্যমে—শেষ হয়ে যায়, তাহলে ইদ্দত অতিবাহিত হওয়ার পর প্রথম স্বামীর সঙ্গে নতুন মোহর ও নতুন আকদের মাধ্যমে পুনর্বিবাহ করা বৈধ হবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতঃপর যদি সে তাকে (তৃতীয়বার) তালাক দেয়, তবে সে তার জন্য হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য স্বামীকে বিয়ে করে। অতঃপর যদি দ্বিতীয় স্বামী তাকে তালাক দেয়, তবে তারা যদি মনে করে যে আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করতে পারবে, তাহলে তাদের পুনরায় একত্র হওয়ার মধ্যে কোনো গুনাহ নেই।’ [সুরা বাকারা, আয়াত :২৩০)

কখন হালালার প্রসঙ্গ আসবে?

১. তিন তালাকের পর : প্রথম বা দ্বিতীয় তালাকের ক্ষেত্রে ইদ্দতের মধ্যে স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারেন। সেখানে হালালার কোনো প্রশ্নই আসে না। তিন তালাকের মাধ্যমে বায়িন বা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর পুণরায় সংসার করার প্রসঙ্গ আসলে হালালার বিষয় আসবে।

২. স্বাভাবিক দ্বিতীয় বিবাহ : দ্বিতীয় বিবাহটি বাস্তব ও স্বাভাবিক হতে হবে। কেবল প্রথম স্বামীর কাছে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে নামমাত্র বিবাহ শরিয়াহসম্মত নয়।

৩. স্বাভাবিক দ্বিতীয়বার বিবাহবিচ্ছেদ : দ্বিতীয় বিবাহ স্বাভাবিকভাবে স্বামীর মৃত্যু কিংবা তালাকের মাধ্যমে শেষ হতে হবে। পূর্বপরিকল্পিত বিচ্ছেদ গ্রহণযোগ্য নয়।

৪. নতুন বিবাহ ও মোহর : প্রথম স্বামীর সঙ্গে পুনর্বিবাহের জন্য নতুন আকদ ও মোহর আবশ্যক।

পরিকল্পিত হালালা কেন নিষিদ্ধ?

এখানেই সবচেয়ে বড় ভুল-বোঝাবুঝি দেখা যায়। শরিয়া হালালার জন্য কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়নি; বরং একটি স্বাভাবিক দ্বিতীয় বিবাহের পরিণতিতে যদি উপরোক্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন কেবল পুনর্বিবাহের অনুমতি দিয়েছে।

কিন্তু যদি শুরু থেকেই এই শর্ত আরোপ করা হয় যে, দ্বিতীয় ব্যক্তি নারীকে বিয়ে করবে, মিলিত হবে এবং পরে তালাক দিয়ে দেবে যাতে সে প্রথম স্বামীর জন্য হালাল হয়ে যায়—তাহলে এটি ‘নিকাহে তাহলিল’, যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেছেন, 

«لَعَنَ اللَّهُ الْمُحَلِّلَ وَالْمُحَلَّلَ لَهُ»

অর্থাৎ, ‘যে ব্যক্তি হালালা করে এবং যার জন্য হালালা করা হয়, উভয়ের ওপর আল্লাহর লানত।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১১১৯)

অন্য এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, 

«أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِالتَّيْسِ الْمُسْتَعَارِ؟» قَالُوا: بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ، قَالَ: «هُوَ الْمُحَلِّلُ، لَعَنَ اللَّهُ الْمُحَلِّلَ وَالْمُحَلَّلَ لَهُ»

‘আমি কি তোমাদের ধার করা ষাঁড় সম্পর্কে জানাব না?’ সাহাবিগণ বললেন, অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসুল! তিনি বললেন, ‘সে হলো হালালাকারী ব্যক্তি। আল্লাহ লানত করেছেন হালালা সম্পাদনকারী এবং যার জন্য তা করা হয়।’ ‘ইবনে মাজাহ, হাদিস নং : ১৯৩৬)

অতএব, নারীকে প্রথম স্বামীর জন্য হালাল করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে কোনো বন্ধু, আত্মীয় কিংবা অন্য কাউকে দিয়ে এক রাত কিংবা কিছু দিন বা মাসের জন্য বিয়ে দেওয়া এবং পরে তালাকের ব্যবস্থা করা শরিয়ার দৃষ্টিতে জঘন্য প্রতারণা। এটি বিবাহের পবিত্রতাকে উপহাসে পরিণত করে। নবীজির (সা.) ভাষায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দৃষ্টান্ত ‘ধার করা ষাঁড়’।

পরিকল্পিত হালালা সম্পর্কে ফিকহি অবস্থান

চার মাজহাবের ফকিহরা এ বিষয়ে একমত যে, পূর্বপরিকল্পিত ‘হালালা’ হারাম।

ক. হানাফি মাজহাব: এ ধরনের শর্তযুক্ত বিবাহ নিকৃষ্ট ও গুনাহের কাজ। (ফাতহুল কাদির, ৩/২১০)

খ. মালিকি মাজহাব: উদ্দেশ্য যদি তাহলীল হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য নয়। (আল-উম্ম, ৫/১৫৫)

গ. শাফিয়ী মাজহাব: শর্তযুক্ত তাহলিল শরিয়ার উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। (মালিক, মুয়াত্তা, ২/৫৮৫)

ঘ. হাম্বলি মাজহাব: পরিকল্পিত হালালা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। (আল-মুগনি, ৭/৩৪৫)

ফলে উপর্যুক্ত উদ্দেশ্য পূরণে ইসলামী শরিয়াহ ‘হালালা’ নামক কোনো প্রতিষ্ঠান, কেন্দ্র বা পেশাদার সেবা চালু করার অনুমতি প্রদান করে না। বরং এমন আয়োজন শরিয়ার বিধানকে বিকৃত করে এবং বিবাহকে খেলায় পরিণত করে। শরিয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে, তিন তালাককে ভয়াবহ পরিণতি উল্লেখ করে তালাকের বিষয়ে নিরুৎসাহিত করা; এটিকে পাশ কাটিয়ে ‘হালালা মেকানিজম’ তৈরি করা নয়। তাই তালাকের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা অবলম্বন করা এবং শরিয়াকে কৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা থেকে বিরত থাকাই একজন মুসলিমের কর্তব্য।

* অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা