• ই-পেপার

শিশুর নিরাপত্তায় ইসলামের শিক্ষা

ডিজিটাল যুগে গিবত : পরচর্চার নতুন চেহারা

মুফতি সায়্যিদ মুনিব মুর্শিদ
ডিজিটাল যুগে গিবত : পরচর্চার নতুন চেহারা
সংগৃহীত ছবি

একসময় গিবত হতো চায়ের দোকানের আড্ডায়, পাড়ার বৈঠকে কিংবা বন্ধুমহলের গল্পে। আজ প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে গিবতের রূপও বদলে গেছে। এখন একটি স্ক্রিনশট, একটি ফেসবুক পোস্ট, একটি মন্তব্য কিংবা একটি ইনবক্স বার্তাই পরিণত হতে পারে গিবত, অপবাদ ও চরিত্রহননের অস্ত্রে। ইসলাম মানুষের সম্মান ও মর্যাদাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা একে অপরের গিবত কোরো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তো তা ঘৃণা কর।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১২)

গিবতের প্রকৃত অর্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)  বলেন, ‘তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কিছু বলা, যা সে অপছন্দ করে।’ জিজ্ঞেস করা হলো, যদি তার মধ্যে সেই বিষয়টি সত্যিই থাকে? তিনি বললেন, ‘যদি তা তার মধ্যে থাকে, তবে তুমি তার গিবত করলে; আর যদি তা না থাকে, তবে তুমি তার ওপর অপবাদ আরোপ করলে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৯)

আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা প্রায়ই দেখি, কারও ব্যক্তিগত ভুল, পারিবারিক ঘটনা কিংবা পুরোনো কোনো বক্তব্যের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনেকেই মনে করেন, সরাসরি মুখোমুখি না বলে অনলাইনে আলোচনা করলে তা গিবতের অন্তর্ভুক্ত নয়। অথচ শরিয়তের দৃষ্টিতে মাধ্যম নয়, মূল বিষয় হলো অন্যের অপ্রিয় বিষয় তার অনুপস্থিতিতে প্রচার করা। সে কাজ মজলিসে হোক বা মুঠোফোনের পর্দায়—উভয় ক্ষেত্রেই এর বিধান একই। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন কল্যাণকর কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০১৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৪৭)

ডিজিটাল যুগে এই হাদিসের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। কারণ একটি অসতর্ক মন্তব্য, একটি ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট বা একটি যাচাইহীন শেয়ার মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ডিজিটাল গিবতের পরিসর অনেক বড়। একসময় একটি কথার শ্রোতা ছিল কয়েকজন; এখন একটি পোস্ট মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে গুনাহের বিস্তারও বহুগুণ বেড়ে যায়, আর ক্ষতিগ্রস্ত হয় একজন মানুষের সম্মান।

এই প্রযুক্তিনির্ভর যুগে একজন মুসলমানের জন্য আঙুলের ইবাদতও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পোস্ট শেয়ার করার আগে, কোনো মন্তব্য লেখার আগে কিংবা কোনো স্ক্রিনশট ফরোয়ার্ড করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত—এতে কি কারও সম্মান ক্ষুণ্ন হচ্ছে? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে নীরব থাকাই তাকওয়ার পরিচয়।

ডিজিটাল মাধ্যম আমাদের যোগাযোগ সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের নৈতিকতারও পরীক্ষা নিচ্ছে। একজন মুমিনের পরিচয় শুধু তার নামাজ বা রোজায় নয়; বরং তার জিহ্বা ও কীবোর্ড কতটা মানুষের ক্ষতি থেকে নিরাপদ, তার মধ্যেও নিহিত। আজকের অনলাইন পৃথিবীতে গিবত থেকে বেঁচে থাকাই নৈতিক ও ঈমানি দায়িত্ব।

হাদিসের বাণী

সদকা : বরকত লাভের নিশ্চিত উপায়

ইসলামী জীবন ডেস্ক
সদকা : বরকত লাভের নিশ্চিত উপায়
সংগৃহীত ছবি

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, একবার এক ব্যক্তি কোনো এক জঙ্গলে ভ্রমণ করছিলেন। এমতাবস্থায় হঠাৎ মেঘখণ্ড থেকে তিনি এই আওয়াজ শুনতে পেলেন যে অমুকের বাগানে পানি দাও। সঙ্গে সঙ্গে ওই মেঘখণ্ডটি একদিকে যেতে লাগল। অতঃপর এক প্রস্তরপূর্ণ ভূমিতে বর্ষণ করল। ওই স্থানের নালাসমূহের একটি নালা ওই পানিতে সম্পূর্ণরূপে ভরে গেল। তখন সেই লোকটি পানির অনুসরণ করে চলল। যেতে যেতে সে এক ব্যক্তিকে তার বাগানে দাঁড়ানো অবস্থায়  দেখতে পেল। লোকটি তখন কোদাল দিয়ে পানি ফেরাচ্ছিলেন।

এটা দেখে সে তাকে বলল, হে আল্লাহর বান্দা! তোমার নাম কী? সে বলল, আমার নাম অমুক, যা সে মেঘখণ্ডের মাঝে শুনতে পেয়েছে। তারপর বাগানের মালিক তাকে প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর বান্দা! তুমি আমার নাম জিজ্ঞেস করলে কেন? জবাবে সে বলল, যে মেঘের এই পানি, এর মাঝে আমি এ আওয়াজ শুনতে পেয়েছি, তোমার নাম নিয়ে বলছে যে, অমুকের বাগানে পানি দাও। তারপর সে জিজ্ঞাসা করে বললো, আচ্ছা, তুমি এই (বাগানের ব্যাপারে) কী আমল করো? মালিক বলল, যেহেতু তুমি জিজ্ঞেস করছ, (তাই বলছি) আমি এই বাগানের উৎপাদিত ফসলের প্রতি লক্ষ করি। তারপর এর এক-তৃতীয়াংশ সদকা করি দিই, এক-তৃতীয়াংশ আমি ও আমার পরিবার-পরিজন আহার করি এবং বাকি আরেক-তৃতীয়াংশ এতে ফিরিয়ে দিই (অর্থাৎ চাষাবাদ ও বাগানের উন্নয়নের কাজে ব্যয় করি)। (মুসলিম, হাদিস : ৭২০৩)


শিক্ষা ও বিধান
১. দান-সদকার বরকত অপরিসীম। বাগানের মালিক তার উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ আল্লাহর পথে দান করতেন। এই দানের বরকতেই আল্লাহ তাআলা তার বাগানের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করেছিলেন। এমনকি মেঘকেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল তার বাগানে পানি বর্ষণের জন্য। তাই আল্লাহর পথে ব্যয় করলে সম্পদ কমে না; বরং বরকত বৃদ্ধি পায়।

২. গোপনে নেক আমল করার মর্যাদা। লোকটি কোনো প্রচার-প্রচারণা বা মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য দান করতেন না। তার নেক আমল ছিল একান্তই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। তাই ইখলাসের সঙ্গে করা আমল আল্লাহর কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য।

৩. সম্পদের সুষম ব্যবহার। বাগানের মালিক তার আয়কে তিন ভাগে ভাগ করতেন—এক ভাগ সদকা করতেন, এক ভাগ পরিবারকে খাওয়াতেন, এক ভাগ পুনরায় বাগানের উন্নয়নে বিনিয়োগ করতেন। এভাবে ইসলাম অপচয় বা কৃপণতা নয়; বরং আয়-ব্যয়ের ভারসাম্যপূর্ণ নীতি শিক্ষা দেয়।

৪. হালাল উপার্জনের গুরুত্ব। লোকটি নিজে পরিশ্রম করে বাগান চাষ করতেন এবং তার আয় ছিল হালাল। তাই হালাল উপার্জন আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভের অন্যতম মাধ্যম।

৫. পরিশ্রমের সঙ্গে আল্লাহর ওপর ভরসা। লোকটি শুধু দোয়া করেই বসে থাকেননি; তিনি বাগানের পরিচর্যা করেছেন, আবার আল্লাহর ওপরও ভরসা রেখেছেন। তাই প্রকৃত তাওয়াক্কুল হলো চেষ্টা করা এবং ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করা।

৬. আল্লাহ তাঁর নেক বান্দাদের জন্য অদৃশ্যভাবে সাহায্য করেন। মেঘকে বিশেষভাবে ওই বাগানে পানি দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ সাহায্য। তাই যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করে, আল্লাহ তার জন্য এমন পথ খুলে দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।

৭. সম্পদের হক আদায় করা জরুরি। বাগানের মালিক জানতেন যে তার সম্পদে দরিদ্র ও অভাবীদেরও অধিকার রয়েছে। তাই তিনি নিয়মিত সদকা করতেন। তাই সম্পদের হক আদায় করলে সম্পদ পবিত্র ও বরকতময় হয়।

৮. পরিবার-পরিজনের ভরণপোষণও ইবাদত। তিনি আয়ের একটি অংশ নিজের পরিবারকে খাওয়ানোর জন্য ব্যয় করতেন। তাই হালাল উপার্জন থেকে পরিবারকে খাওয়ানোও সওয়াবের কাজ।

৯. ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করা সুন্নাহসম্মত। তিনি বাগানের উন্নয়নের জন্য আয়ের একটি অংশ পুনরায় বিনিয়োগ করতেন। তাই ইসলাম ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, সঞ্চয় এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগকে সমর্থন করে।

১০. দান-সদকা শুধু আখিরাত নয়, দুনিয়ার কল্যাণও বয়ে আনে। এই বাগান মালিকের দান তার বাগানের উৎপাদন ও সমৃদ্ধির কারণ হয়েছিল। এভাবে সদকা দুনিয়ার বিপদ-আপদ দূর করে এবং জীবিকায় বরকত বয়ে আনে।

পুরুষ ও মহিলার নামাজ : একই নাকি ভিন্ন?

মুফতি সায়্যিদ মুনিব মুর্শিদ
পুরুষ ও মহিলার নামাজ : একই নাকি ভিন্ন?
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনে নামাজ হলো আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম। এটি ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ এবং একজন মুসলমানের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তাই নামাজের বিধান, পদ্ধতি ও আদব সম্পর্কে জানার আগ্রহ স্বাভাবিক। দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রশ্ন মুসলিম সমাজে আলোচিত হয়ে আসছে—পুরুষ ও মহিলার নামাজ কি সম্পূর্ণ একই, নাকি কিছু ক্ষেত্রে ভিন্নতা রয়েছে?

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের কোরআন, হাদিস, সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্য, তাবেয়িদের আমল এবং ফুকাহায়ে কেরামের ব্যাখ্যার দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। কারণ ইসলামের বিধান শুধু একটি দলিলের উপর নির্ভরশীল নয়; বরং কোরআন, সুন্নাহ, সাহাবিদের ব্যাখ্যা ও উম্মাহর গ্রহণযোগ্য ইজতিহাদের সমন্বয়ে শরিয়তের পূর্ণাঙ্গ রূপ প্রকাশ পায়।

নামাজের মৌলিক কাঠামো সবার জন্য এক : রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন,‘তোমরা নামাজ আদায় কর, যেমন আমাকে নামাজ আদায় করতে দেখ।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৩১)

এই হাদিসের আলোকে সকল আলেম একমত যে নামাজের ফরজ, ওয়াজিব, রুকন এবং মৌলিক কাঠামো নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য একই। তাকবিরে তাহরিমা, কিয়াম, কিরাত, রুকু, সিজদা, দুই সিজদার মাঝখানে বসা  এবং সালাম—এসব মৌলিক বিষয়ের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য নেই। তবে নামাজের ভঙ্গি বা সিফাতের কিছু সূক্ষ্ম বিষয়ে নারী ও পুরুষের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। 

নারীর জন্য সংযম ও পর্দার নীতি : মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা তোমাদের ঘরে অবস্থান কর।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৩৩)
মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন যে এ আয়াত নারীর জন্য লজ্জাশীলতা, সংযম, পর্দা ও আত্মগোপনের একটি মৌলিক নীতি শিক্ষা দেয়। (তাফসিরে ইবনে কাসির)

ফুকাহায়ে কেরামের মতে, এই নীতির প্রভাব নামাজের ভঙ্গিতেও প্রতিফলিত হয়েছে। অর্থাৎ নারীর নামাজ এমনভাবে আদায় করা উত্তম, যাতে তার শরীর অধিক সঙ্কুচিত ও আচ্ছাদিত থাকে এবং সতর রক্ষার বিষয়টি আরও সুদৃঢ় হয়। নারীর নামাজে সঙ্কুচিত থাকার বিষয়ে সাহাবায়ে কেরাম থেকে একাধিক বর্ণনা পাওয়া যায়। হজরত আলী (রা.) বলেন, ‘মহিলা যখন সিজদা করবে, তখন নিজেকে গুটিয়ে রাখবে এবং উরু একত্রে মিলিয়ে রাখবে।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদিস : ২৭৯৪)

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘মহিলা যখন নামাজে বসবে, তখন এক উরুকে অপর উরুর সঙ্গে মিলিয়ে বসবে এবং সিজদায় নিজের পেট উরুর সঙ্গে মিলিয়ে রাখবে।’ (সুনানে বায়হাকি)
এসব বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে সাহাবায়ে কেরাম নারীদের জন্য নামাজে অধিক সংযত ও সঙ্কুচিত ভঙ্গিকে পছন্দ করতেন।

সাহাবীদের পরবর্তী প্রজন্ম তথা তাবেয়িরাও একই মত পোষণ করেছেন। প্রখ্যাত তাবেয়ি ইবরাহিম নাখাঈ (রহ.) বলেন, মহিলা রুকু ও সিজদায় নিজেকে গুটিয়ে রাখবে।’(মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা)
ইমাম হাসান বসরী (রহ.) বলেন, নারী নামাজে সঙ্কুচিত থাকবে।’ (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, হাদিস : ৫০৭৮) এ থেকে স্পষ্ট হয় যে তাবেয়িদের যুগেও নারীর নামাজে সংযম ও আত্মগোপনের নীতি সুপরিচিত ও প্রচলিত ছিল।

সাহাবি ও তাবেয়িদের এসব বর্ণনার আলোকে  হানাফি মাজহাবের ফুকাহায়ে কেরাম  নারীর নামাজের কিছু বিশেষ ভঙ্গি নির্ধারণ করেছেন। তা হলো- ‘নারীর সিজদা পুরুষের সিজদা থেকে ভিন্ন হবে।’ আরো আছে, ‘নারীর জন্য নামাজে সঙ্কুচিত হওয়া উত্তম; কারণ এতে অধিক সতর রক্ষা হয়।’ (বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৫০৪, হিদায়া, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা :  ৫৩, আল-মাবসুত,  খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ২৩)
অর্থাৎ হানাফী ফিকহে এ পার্থক্যের মূল ভিত্তি হলো সতর সংরক্ষণ, লজ্জাশীলতা এবং অধিক পর্দা নিশ্চিত করা।

হানাফি মাজহাব অনুযায়ী নারীর নামাজের প্রধান ভিন্নতাসমূহ
১. তাকবিরে তাহরিমার সময় মহিলা কাঁধ পর্যন্ত হাত তোলবে।
২. দাঁড়ানো অবস্থায় মহিলা বুকের উপর হাত বাঁধবে।
৩. রুকুর সময় পুরুষের মতো শরীর বেশি প্রসারিত না করে নিজেকে গুটিয়ে রেখে রুকু করবে।
৪. সিজদার সময় পেট উরুর সঙ্গে এবং বাহু শরীরের সঙ্গে মিলিয়ে রাখবে।
৫. বসা অবস্থায় দুই পা ডান দিকে বের করে (তাওয়াররুক সদৃশ ভঙ্গি) বসবে। (আল-ফাতাওয়াল হিন্দিয়া, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৭৩, রদ্দুল মুহতার, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৫০৪)

এখানে দু্ইটি বিষয় লক্ষ্যনীয় 
এক. ইসলামী ফিকহের বহু মাসআলা সরাসরি মারফু হাদিসে উল্লেখ না থাকলেও  সাহাবিদের ফতোয়া ও আমলের মাধ্যমে সেগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ প্রসজ্ঞে ইমাম তিরমিজি (রহ.) উল্লেখ করেন, ‘আহলে ইলম অনেক সময় সাহাবীদের আমল ও বক্তব্য গ্রহণ করেন।’ অতএব সাহাবায়ে কেরামের ব্যাখ্যা ও আমল ইসলামী ফিকহে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত।

দুই. রাসুলুল্লাহ (সা.) যে বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে যেভাবে নামাজ পড়তে দেখ, সেভাবেই নামাজ পড়ো’ এই হাদিসের ব্যাখ্যা হলো, এই হাদিস নামাজের মৌলিক পদ্ধতি ও কাঠামোর নির্দেশনা প্রদান করে। তবে শরিয়তে এমন বহু বিধান রয়েছে যেখানে মূল ইবাদত এক হলেও নারী-পুরুষের বাস্তব প্রয়োগে কিছু পার্থক্য রাখা হয়েছে। যেমন— সতরের বিধান, জামাতে দাঁড়ানোর স্থান, জুমার নামাজের হুকুম ও ঈদের জামাতে অংশগ্রহণের বিধান ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে মূল ইবাদত এক হলেও নারী-পুরুষের জন্য কিছু পৃথক নির্দেশনা রয়েছে। 

ইসলামের দৃষ্টিতে নামাজের মূল কাঠামো, ফরজ, রুকন ও মৌলিক বিধান নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য অভিন্ন। তবে হানাফি মাজহাবের বিশ্লেষণ অনুযায়ী নারীর জন্য অধিক পর্দা, লজ্জাশীলতা ও সতর সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে নামাজের কিছু ভঙ্গিতে বিশেষত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। এই মতামতের ভিত্তি শুধু পরবর্তী ফকিহদের ব্যক্তিগত অভিমত নয়; বরং সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্য, তাবেয়িদের আমল এবং যুগে যুগে স্বীকৃত ফুকাহায়ে কেরামের ইজতিহাদের উপর প্রতিষ্ঠিত। তাই এ বিষয়ে প্রাজ্ঞ উলামায়ে কেরামের গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাকে মানা জরুরি ।

লেখক : ফাযেল, জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা ঢাকা।

অসাধারণ মানুষের গুণাবলি ও জীবনাদর্শ

ড. আবু সালেহ মুহাম্মদ তোহা
অসাধারণ মানুষের গুণাবলি ও জীবনাদর্শ
সংগৃহীত ছবি

মানুষের সমাজে কেউ ধন-সম্পদ, ক্ষমতা বা খ্যাতির কারণে সম্মানিত হয়, আবার কেউ নীরবে ও অপ্রকাশ্যে জীবন যাপন করেও মহান আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী হন। আল্লাহর এমন কিছু বিশেষ বান্দা আছেন, যাঁরা ফরজ ও নফল ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য অর্জন করেন এবং নিজেদের জীবনকে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করেন।

বাহ্যিকভাবে তাঁরা সাধারণ মানুষ হলেও তাঁদের আন্তরিকতা, আত্মত্যাগ, দানশীলতা, বিনয় ও আল্লাহর প্রতি অগাধ নির্ভরতার কারণে তাঁরা আল্লাহর বিশেষ ভালোবাসা ও অনুগ্রহ লাভ করে অসাধারণ মানুষে পরিণত হয়ে থাকেন।

অসাধারণ মানুষের পরিচয় : আল্লাহর বিশেষ কিছু বান্দা এমন রয়েছেন, যাঁরা সমাজের সাধারণ মানুষ হলেও আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা, নির্ভরতা ও আনুগত্যের কারণে মহান আল্লাহ তাঁদের বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেন। ফলে তাঁরা কোনো বিষয়ে আল্লাহর নামে শপথ করলে আল্লাহ তা পূরণ করেন। এর অর্থ এই নয় যে তাঁরা স্বাধীনভাবে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী; বরং তাঁদের ঈমান, ইখলাস এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থার কারণে আল্লাহ তাঁদের দোয়া, আশা বা শপথ কবুল করেন।

এটি তাঁদের মর্যাদা এবং আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ। আসলে মানুষের প্রকৃত সম্মান ধন-সম্পদ, পদমর্যাদা বা সামাজিক প্রতিপত্তিতে নয়; বরং খাঁটি ঈমান, তাকওয়া, ইখলাস ও আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাসে। যাঁরা নিজেদের জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করেন, তাঁরাই প্রকৃত অর্থে অসাধারণ মানুষ এবং আল্লাহর বিশেষ বান্দা। হাদিসে এসেছে, আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে এমন বান্দাও রয়েছে, যে আল্লাহর নামে কোনো কসম করলে তা পূরণ করে। (বুখারি, হাদিস : ২৭০৩)

অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও ভালোবাসার কারণে এমন কিছু খাঁটি বান্দা রয়েছেন, যাঁরা কোনো বিষয়ে আল্লাহর নামে কসম বা শপথ করলে মহান আল্লাহ তাঁদের সম্মান রক্ষার্থে এবং তাঁদের বিশ্বাসের মর্যাদা দিতে সেই কসম কবুল করেন এবং পূর্ণ করে দেন। অন্য হাদিসে বলা হয়েছে, আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, মাথায় উষ্কখুষ্ক চুল এবং দেহে ধূলিমলিন দুইখানা পুরাতন কাপড় পরিহিত এরূপ অনেক ব্যক্তি রয়েছে, যার প্রতি লোকেরা দৃষ্টিপাত করে না। অথচ সে আল্লাহর নামে শপথ করে ওয়াদা করলে তিনি তা সত্যে পরিণত করেন। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৫৪)

একজন অসাধারণ মানুষের গল্প : একটি হাদিসে এক অসাধারণ মানুষের গল্প বর্ণিত হয়েছে। তাতে তাঁর মর্যাদা ও কর্মের বিবরণ প্রকাশ পেয়েছে।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, একবার এক ব্যক্তি কোনো এক জঙ্গলে ভ্রমণ করছিলেন। এমতাবস্থায় হঠাৎ মেঘখণ্ড থেকে তিনি এই আওয়াজ শুনতে পেলেন যে অমুকের বাগানে পানি দাও। সঙ্গে সঙ্গে ওই মেঘখণ্ডটি একদিকে যেতে লাগল। অতঃপর এক প্রস্তরপূর্ণ ভূমিতে বারিপাত করল। ওই স্থানের নালাসমূহের একটি নালা ওই পানিতে সম্পূর্ণরূপে ভরে গেল। তখন সেই লোকটি পানির অনুসরণ করে চলল। যেতে যেতে সে এক ব্যক্তিকে তার বাগানে দণ্ডায়মান অবস্থায় কোদাল দিয়ে পানি ফেরাচ্ছে দেখতে পেল।

এটা দেখে সে তাকে বলল, হে আল্লাহর বান্দা! তোমার নাম কী? সে বলল, আমার নাম অমুক, যা সে মেঘখণ্ডের মাঝে শুনতে পেয়েছে। অতঃপর বাগানের মালিক তাকে প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর বান্দা! তুমি আমার নাম জিজ্ঞেস করলে কেন? জবাবে সে বলল, যে মেঘের এই পানি, এর মাঝে আমি এ আওয়াজ শুনতে পেয়েছি, তোমার নাম নিয়ে বলছে যে অমুকের বাগানে পানি দাও। অতঃপর বলল, তুমি এই (বাগানের ব্যাপারে) কী আমল করো? মালিক বলল, যেহেতু তুমি জিজ্ঞেস করছ, (তাই বলছি) আমি এই বাগানের উৎপাদিত ফসলের প্রতি লক্ষ করি। অতঃপর এর এক-তৃতীয়াংশ সদকা করি, এক-তৃতীয়াংশ আমি ও আমার পরিবার-পরিজন আহার করি এবং এক-তৃতীয়াংশ এতে ফিরিয়ে দিই (চাষাবাদ ও বাগানের উন্নয়নের কাজে ব্যয় করি)।(মুসলিম, হাদিস : ৭২০৩)

যেভাবে অসাধারণ মানুষ হওয়া যায় : আল্লাহর অসাধারণ বান্দারা সর্বপ্রথম ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে পালন করেন। নামাজ, রোজা, জাকাত, হজ, পিতা-মাতার হক, মানুষের অধিকার—এসব বিষয়ে তাঁরা অত্যন্ত সচেতন থাকেন। ফরজ অবহেলা করে শুধু নফল ইবাদতের মাধ্যমে কেউ আল্লাহর প্রিয়পাত্র হতে পারে না। ফরজ পালনের পর তাঁরা নফল আদায়ে সচেষ্ট হয়ে থাকেন। প্রতিটি ইবাদতের নফল আছে; যেমন—নফল নামাজ, নফল রোজা, নফল দান-সদকা, নফল হজ, নফল কোরবানি ইত্যাদিতে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। এভাবেই তাঁদের হৃদয় আল্লাহর ভালোবাসায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং তাঁরা আল্লাহর ভালোবাসার পাত্রে পরিণত হন। এটি একজন মুমিনের সর্বোচ্চ মর্যাদা।

আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন তাঁর জীবন, চিন্তা ও কর্ম আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত হয়। এমন বান্দার ইন্দ্রিয় ও কর্ম আল্লাহর নির্দেশনায় পরিচালিত হয়। ফলে তিনি হারাম শোনা, দেখা, ধরা ও চলাফেরা থেকে বিরত থাকেন। তাঁর সব কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী পরিচালিত হয়। অর্থাৎ তিনি সত্য কথা শোনেন এবং গ্রহণ করেন। তিনি কল্যাণকর বিষয় দেখেন। তাঁর হাত অন্যায় ও জুলুম থেকে বিরত থাকে। তাঁর পদক্ষেপ সৎকর্মের পথে পরিচালিত হয়। তাঁদের দোয়া কবুল হয়। কারণ তাঁদের অন্তর পবিত্র, উপার্জন হালাল এবং জীবন আল্লাহমুখী। তাঁরা আল্লাহর বিশেষ নিরাপত্তা ও তত্ত্বাবধানে থাকেন। বিপদ-আপদে আল্লাহ তাঁদের সাহায্য করেন এবং ঈমানের ওপর অটল রাখেন। তাঁরা মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত আল্লাহর স্নেহ ও অনুগ্রহ লাভ করতে থাকেন। এটি আল্লাহর প্রিয় বান্দার প্রতি তাঁর বিশেষ দয়া ও ভালোবাসার পরিচায়ক। যেমন হাদিসে সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলির সঙ্গে দুশমনি রাখবে, আমি তার সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করব। আমার বান্দা যেসব ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য হাসিল করে থাকে, তার মধ্যে ওই ইবাদতের চেয়ে আমার কাছে অধিক প্রিয় আর কোনো ইবাদত নেই, যা আমি তার ওপর ফরজ করেছি। আর বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে। এমনকি অবশেষে আমি তাকে আমার এমন প্রিয়পাত্র বানিয়ে নিই যে আমিই তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শোনে। আমিই তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। আমিই তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। আমিই তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে চলে। সে যদি আমার কাছে কোনো কিছু চায়, আমি নিশ্চয়ই তাকে তা দান করি। আর যদি সে আমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, অবশ্যই আমি তাকে আশ্রয় দিই। আমি কোনো কাজ করতে চাইলে তা করতে কোনো দ্বিধা করি না, যতটা দ্বিধা করি মুমিন বান্দার প্রাণ নিতে। সে মৃত্যুকে অপছন্দ করে আর আমি তাকে কষ্ট দেওয়াকে অপছন্দ করি।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৫০২)

পরিশেষে বলা যায়, আল্লাহর অসাধারণ বান্দারা কোনো অলৌকিক ক্ষমতা বা পার্থিব প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে মহান নন; বরং তাঁদের শ্রেষ্ঠত্বের মূল ভিত্তি হলো খাঁটি ঈমান, তাকওয়া, ফরজ ইবাদতের প্রতি নিষ্ঠা, নফল আমলে অগ্রগামিতা, দানশীলতা, বিনয় এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ নির্ভরতা। তাঁরা মানুষের কল্যাণে নিজেদের সম্পদ ও সামর্থ্য ব্যয় করেন, হারাম থেকে দূরে থাকেন এবং সর্বদা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সচেষ্ট থাকেন। ফলে আল্লাহ তাঁদের ভালোবাসেন, তাঁদের দোয়া কবুল করেন, বিপদে সাহায্য করেন এবং তাঁদের মর্যাদা রক্ষা করেন।

লেখক : অধ্যাপক, আরবি বিভাগ
 রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়