বর্তমান যুগে ‘একাধিক বিবাহ’ বা ‘বহুবিবাহ’ শব্দটি অনেকের কাছে যেন একটি রোমান্টিক কল্পনা, ব্যক্তিগত ভোগবিলাস কিংবা সীমাহীন চাহিদা পূরণের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ কেউ ইসলামের মহান বিধানকে নিজেদের প্রবৃত্তির হাতিয়ার বানিয়ে এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন একাধিক বিয়ে করা মানেই পুরুষত্বের গৌরব বা বিশেষ সফলতা! অথচ ইসলাম কখনোই বহুবিবাহকে ফ্যান্টাসি, খেল-তামাশা বা কামনার স্বাধীন লাইসেন্স হিসেবে দেয়নি। বরং এটি একটি দায়িত্বপূর্ণ সামাজিক বিধান, যা নির্দিষ্ট পরিস্থিতি, ইনসাফ, তাকওয়া ও জবাবদিহির ভিত্তিতে অনুমোদিত হয়েছে। আর ইসলাম বহুবিবাহকে ‘অনুমতি’ দিয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে কঠোর শর্তও আরোপ করেছে। এমনকি ন্যায়বিচার করতে না পারার আশঙ্কা থাকলে একজন স্ত্রীতে সীমাবদ্ধ থাকার নির্দেশ দিয়েছে। সমাজে বিধবা, এতিম, অসহায় নারী, যুদ্ধ-পরবর্তী সংকট কিংবা পারিবারিক বিশেষ সমস্যার সমাধানে এটি কল্যাণকর হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা নারীদের মধ্য থেকে যাদের ভালো লাগে তাদের বিয়ে করো—দুই, তিন বা চার পর্যন্ত। তবে যদি আশঙ্কা করো যে ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তাহলে একটিই।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৩)
লক্ষণীয় বিষয় হলো, আল্লাহ তায়ালা বহুবিবাহের অনুমতির সঙ্গে সঙ্গে ‘ন্যায়বিচার’কে প্রধান শর্ত বানিয়েছেন। অর্থাৎ এখানে প্রবৃত্তির স্বাধীনতা নয়; বরং দায়িত্বশীলতা ও ইনসাফই মুখ্য। আর ইনসাফহীন বহুবিবাহ ভয়ংকর গুনাহ। অনেক মানুষ বহুবিবাহের স্বপ্ন দেখে, কিন্তু স্ত্রীদের হক, মানসিক নিরাপত্তা, ভরণপোষণ ও সময় বণ্টনের কথা ভাবে না। অথচ ইসলাম এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যার দুই স্ত্রী আছে, অতঃপর সে একজনের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে (অন্যজনের প্রতি অবিচার করে), সে কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় আসবে যে তার শরীরের এক পাশ বাঁকা থাকবে।’ (নাসায়ি, হাদিস নং : ৩৯৫২, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২১৩৩)
আজকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই বহুবিবাহকে হাস্যরস, ট্রেন্ড কিংবা পুরুষের ‘ফ্যান্টাসি’ হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু একজন মুমিনের জীবন প্রবৃত্তি দ্বারা পরিচালিত হয় না; বরং তাকওয়া দ্বারা পরিচালিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি তার রবের সামনে দাঁড়ানোর ভয় করেছে এবং প্রবৃত্তিকে দমন করেছে, জান্নাতই হবে তার আবাসস্থল।’ (সুরা : নাজিয়াত, আয়াত : ৪০-৪১)
সুতরাং ইসলাম মানুষকে কামনার পেছনে ছুটতে শেখায় না; বরং নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়। অনেক সময় দেখা যায়, একজন ব্যক্তি দ্বিতীয় বিয়ের স্বপ্নে বিভোর; অথচ প্রথম স্ত্রীর হক আদায়েই সে ব্যর্থ। সংসারের খরচ, মানসিক যত্ন, সন্তানের দায়িত্ব—সব কিছু অবহেলিত হয়। তাইতো মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।’ (তিরমিজি, হাদিস নম্বর : ৩৮৯৫)
অতএব, সত্যিকারের দ্বিনদার পুরুষ সে-ই, যে নিজের পরিবারের হক আদায়ে সচেতন।
যদি কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টি, সামাজিক কল্যাণ ও শরিয়তের সীমারেখা রক্ষা করে বহুবিবাহ করে—তবে তা বৈধ ও কখনো কখনো কল্যাণকরও হতে পারে। কিন্তু যদি এটি শুধু সৌন্দর্যপ্রীতি, রোমাঞ্চ, অহংকার বা অস্থির কামনার বহিঃপ্রকাশ হয়, তবে সেই নিয়ত মারাত্মক বিপজ্জনক। কারণ ইসলাম নিয়তের ওপর গুরুত্ব দেয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘সমস্ত আমলের ভিত্তি হলো নিয়ত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর : ১)
ইসলামের বিধানগুলো মানুষের কল্যাণ, পবিত্রতা ও ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রণীত। কিন্তু যখন কোনো বৈধ বিষয়কে মানুষ প্রবৃত্তি, অহংকার কিংবা দুনিয়াবি মোহের উপকরণ বানিয়ে ফেলে, তখন সেই বৈধ বিষয়ও ফিতনা ও অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বহুবিবাহের ক্ষেত্রেও আজ এমনটি ঘটছে। অনেকেই শরিয়তের গভীর উদ্দেশ্য না বুঝে এটিকে ‘পুরুষের স্বাধীনতা’ বা ‘রোমান্টিক কল্পনা’ হিসেবে উপস্থাপন করছেন। ফলে পরিবারে অশান্তি, নারীর প্রতি জুলুম, সন্তানদের মানসিক বিপর্যয় এবং দ্বীনের সৌন্দর্য বিকৃত হচ্ছে। অনেক পুরুষ দ্বিতীয় বিয়ের কথা চিন্তা করলেও প্রথম স্ত্রীর আবেগ, ত্যাগ ও অনুভূতির মূল্যায়ন করে না। অথচ একজন স্ত্রী তার যৌবন, শ্রম, ভালোবাসা ও জীবন একটি সংসারের জন্য ব্যয় করে। ইসলাম তার অনুভূতিকেও গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তাদের সাথে সদাচরণের সাথে জীবনযাপন কর।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৯)
সুতরাং স্ত্রীর মনে অকারণে কষ্ট দেওয়া, তাকে অনিরাপত্তায় ফেলা বা অবমূল্যায়ন করা ইসলাম কখনো সমর্থন করেনা। আর একজন ব্যক্তি যখন ইনসাফ ছাড়া একাধিক বিয়ে করে, তখন তার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীদের মধ্যে থাকে সন্তানরা। পরিবারে ঝগড়া, অবহেলা, আর্থিক সংকট ও মানসিক অস্থিরতা সন্তানদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দেয়। অথচ মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, এবং প্রত্যেককে তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর : ৮৯৩)
অতএব, একজন পিতা যদি নিজের প্রবৃত্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সন্তানদের হক নষ্ট করে, তবে তাকে আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে হবে। বহুবিবাহ শুধু আবেগের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক সামর্থ্যের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। একাধিক পরিবার পরিচালনা করা, সমান ভরণপোষণ নিশ্চিত করা এবং সবার মৌলিক অধিকার পূরণ করা অত্যন্ত কঠিন দায়িত্ব। কেননা অনেকেই দ্বিতীয় বিয়ে করে প্রথম পরিবারের খরচই ঠিকভাবে বহন করতে পারে না। ফলে স্ত্রী ও সন্তানরা কষ্টে জীবনযাপন করে। এটি শরিয়তের উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সচ্ছল ব্যক্তি যেন তার সচ্ছলতা অনুযায়ী ব্যয় করে।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ৭)
আজ অনেকেই মনে করে একাধিক বিয়ের আকাঙ্ক্ষাই যেন ‘পুরুষত্বের’ প্রমাণ। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত শক্তিশালী মানুষ সে নয়, যে নিজের কামনাকে প্রশ্রয় দেয়; বরং সে-ই শক্তিশালী, যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে জয়ী হয়; বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর : ৬১১৪)
ইসলাম বহুবিবাহকে কখনোই ফ্যান্টাসি বা প্রবৃত্তির খেলায় পরিণত করেনি। এটি কোনো পুরুষতান্ত্রিক সীমাহীন ভোগবিলাসের লাইসেন্সও নয়। বরং এটি একটি ভারী আমানত, যার সঙ্গে জড়িত ইনসাফ, তাকওয়া, দায়িত্ববোধ ও কঠিন জবাবদিহি। অতএব, যে ব্যক্তি বহুবিবাহের কথা ভাববে, তাকে আগে নিজের ঈমান, চরিত্র, আর্থিক সামর্থ্য, ন্যায়বিচার ও পারিবারিক দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে ভাবতে হবে। কারণ ইসলাম শুধু ‘বিয়ে করার অনুমতি’ দেয়নি; বরং ‘হক’ আদায়ের বাধ্যবাধকতাও আরোপ করেছে। তাই প্রয়োজন—বহুবিবাহকে ফ্যান্টাসির চশমায় নয়, বরং কোরআন-সুন্নাহর ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিতে দেখা। তাহলেই মানুষ বুঝতে পারবে—ইসলাম কামনার ধর্ম নয়; বরং ন্যায়, সংযম, দায়িত্ব ও পবিত্রতার ধর্ম।




