মানুষের জীবনে চাওয়া-পাওয়া, আশা-নিরাশা, সফলতা-ব্যর্থতা—এসব যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। মানুষ যখন কাঙ্ক্ষিত কোনো কিছু অর্জন করে তখন সেটাকে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ মনে করে।
আবার যখন কোনো স্বপ্ন ভেঙে যায়, প্রার্থিত কোনো সুযোগ হাতছাড়া হয় কিংবা জীবনের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে পড়ে, তখন অনেকেই মনে করেন আল্লাহ হয়তো তার প্রতি অসন্তুষ্ট। অথচ একজন মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। সে বিশ্বাস করে, তার জীবনের প্রতিটি ঘটনা আল্লাহর জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও রহমতের অধীনেই সংঘটিত হয়। কারণ আল্লাহ তাআলা বান্দার বর্তমান নয়, তার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ—সবকিছু জানেন।
তাই অনেক সময় যে বিষয়টিকে আমরা ক্ষতি মনে করি, তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অমূল্য কল্যাণ; আর যেটিকে আমরা লাভ মনে করি, সেটিই কখনো কখনো হয়ে ওঠে বড় ক্ষতির কারণ। মুমিনের দায়িত্ব হলো আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর ভরসা রাখা এবং প্রতিটি অবস্থায় তাঁর হিকমতের প্রতি আস্থা রাখা।
সবকিছুর পেছনে রয়েছে আল্লাহর অসীম প্রজ্ঞা
আল্লাহ তাআলা মানুষের স্রষ্টা। তিনি মানুষের অন্তরের অবস্থা, প্রয়োজন, দুর্বলতা এবং ভবিষ্যৎ পরিণতি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান রাখেন। তাই তিনি যা ফয়সালা করেন, তা বান্দার প্রকৃত কল্যাণের জন্যই করেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হতে পারে তোমরা কোনো বিষয়কে অপছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হতে পারে তোমরা কোনো বিষয়কে ভালো মনে করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।’
(সুরা : বাকারা, আয়াত : ২১৬)
এই আয়াত আমাদের শেখায়, মানুষের বিচার সীমাবদ্ধ; কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান অসীম। আমরা শুধু বাহ্যিক অবস্থা দেখি, কিন্তু আল্লাহ দেখেন তার সুদূরপ্রসারী ফলাফল।
ব্যর্থতা সব সময় প্রত্যাখ্যান নয়
মানুষ সাধারণত ব্যর্থতাকে জীবনের সমাপ্তি মনে করে। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হলো, প্রতিটি ব্যর্থতার আড়ালেও আল্লাহর কোনো না কোনো হিকমত লুকিয়ে থাকে। কখনো আল্লাহ বান্দাকে এমন একটি পথ থেকে ফিরিয়ে দেন, যার শেষপ্রান্তে রয়েছে বিপদ, কষ্ট, গুনাহ কিংবা ধ্বংস। আমরা শুধু বন্ধ হয়ে যাওয়া দরজাটি দেখি, কিন্তু আল্লাহ জানেন সেই দরজার ওপারে কী অপেক্ষা করছে। হয়তো যে চাকরিটি আপনি পাননি, সেটি আপনার দ্বিন, পরিবার কিংবা মানসিক প্রশান্তির জন্য ক্ষতিকর ছিল। হয়তো যে সম্পর্কটি ভেঙে গেছে, সেটি ভবিষ্যতে আপনার জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার কারণ হতে পারত। হয়তো যে ব্যবসাটি সফল হয়নি, তার মধ্যে এমন ক্ষতি লুকিয়ে ছিল, যা থেকে আল্লাহ আপনাকে রক্ষা করতে চেয়েছেন। তাই একজন মুমিন ব্যর্থতার মধ্যেও আল্লাহর রহমত ও কল্যাণের সন্ধান করে।
মুমিনের জীবনে প্রতিটি অবস্থা কল্যাণকর
মহানবী (সা.) মুমিনের জীবন সম্পর্কে এক অসাধারণ সত্য তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘মুমিনের বিষয়টি সত্যিই আশ্চর্য! তার প্রতিটি অবস্থাই কল্যাণকর। যখন সে সুখ পায় তখন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে; এতে তার কল্যাণ হয়। আর যখন দুঃখ-কষ্টে আক্রান্ত হয় তখন ধৈর্য ধারণ করে; এতেও তার কল্যাণ হয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৯৯৯)
এই হাদিস প্রমাণ করে যে মুমিনের জীবনে কোনো ঘটনাই অর্থহীন নয়। সুখ হোক কিংবা দুঃখ—সবকিছু তার জন্য কল্যাণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কষ্টের আড়ালে থাকে স্বস্তির বার্তা
জীবনের কঠিন সময়গুলো মানুষকে ভেঙে দেয় না; বরং অনেক সময় তাকে আরো শক্তিশালী, পরিণত ও আল্লাহমুখী করে তোলে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৮৬)
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই রয়েছে স্বস্ত্তি।’ (সুরা : ইনশিরাহ, আয়াত : ৫-৬)
এই আয়াতগুলো মুমিনকে আশা ও সাহস জোগায়। কারণ আল্লাহ যখন পরীক্ষা দেন, তখন সেই পরীক্ষার মধ্যেই মুক্তির পথও নির্ধারণ করে রাখেন।
তাকদিরের প্রতি বিশ্বাস মুমিনকে প্রশান্তি দেয়
একজন মুমিন বিশ্বাস করে যে পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে সবই আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত ফয়সালার অংশ। তাই সে হারিয়ে যাওয়া বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত আফসোস করে না এবং প্রাপ্ত বিষয় নিয়ে অহংকারও করে না। মহানবী (সা.) ইবনে আব্বাস (রা.)-কে উপদেশ দিয়ে বলেছেন, ‘জেনে রাখো, যা তোমাকে এড়িয়ে গেছে তা কখনো তোমার জন্য নির্ধারিত ছিল না; আর যা তোমার কাছে এসেছে, তা কখনো তোমাকে এড়িয়ে যেতে পারত না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৫১৬)
এই বিশ্বাস মানুষের হৃদয়ে গভীর প্রশান্তি সৃষ্টি করে এবং তাকে হতাশা থেকে রক্ষা করে।
ব্যর্থতার পর মুমিনের করণীয়
ব্যর্থতার মুখোমুখি হলে একজন মুমিনের উচিত- আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করা। ধৈর্য ও সবরের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা। নিজের ভুলত্রুটি ও দুর্বলতাগুলো পর্যালোচনা করা। নতুনভাবে পরিকল্পনা করে আবার চেষ্টা করা। বেশি বেশি দোয়া, ইস্তিগফার ও নফল ইবাদতে মনোযোগ দেওয়া। আল্লাহর রহমত থেকে কখনো নিরাশ না হওয়া। অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে এই বিশ্বাস রাখা যে আল্লাহর পরিকল্পনা মানুষের পরিকল্পনার চেয়ে অনেক উত্তম।
সুতরাং জীবনের প্রতিটি ব্যর্থতা হারিয়ে যাওয়ার গল্প নয়; অনেক ব্যর্থতা আসলে রক্ষা পাওয়ার গল্প। যে সুযোগটি আপনি হারিয়েছেন, হয়তো সেটিই আপনার জন্য ক্ষতিকর ছিল। যে স্বপ্নটি পূরণ হয়নি, হয়তো তার চেয়ে উত্তম কিছু আল্লাহ আপনার জন্য সংরক্ষণ করে রেখেছেন। একজন মুমিন জানে, আল্লাহর কোনো ফয়সালাই উদ্দেশ্যহীন নয়। তিনি যখন কিছু দেন, তাতে কল্যাণ থাকে; আবার যখন কিছু থেকে বঞ্চিত করেন তাতেও কল্যাণ লুকিয়ে থাকে। তাই সুখে শুকরিয়া এবং দুঃখে সবর—এই দুই ডানায় ভর করেই মুমিন তার জীবনযাত্রা পরিচালনা করে।
মনে রাখতে হবে, আল্লাহ বান্দার শত্রু নন; তিনি পরম দয়ালু ও সর্বজ্ঞ রব। তাই কোনো দরজা বন্ধ হয়ে গেলে হতাশ না হয়ে তাঁর ওপর ভরসা রাখতে হবে। কারণ অনেক সময় যে ব্যর্থতাকে আমরা দুর্ভাগ্য মনে করি, সেটিই আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার সবচেয়ে নিখুঁত ব্যবস্থা। আর এটাই হলো আল্লাহ যেভাবে তাঁর বান্দার জন্য কল্যাণের ফয়সালা করেন তার এক অনন্য ও হৃদয়স্পর্শী বাস্তবতা।