• ই-পেপার

আজকের নামাজের সময়সূচি, ৬ জুন ২০২৬

পরিশ্রম যেভাবে সাফল্য বয়ে আনে

মাইমুনা আক্তার
পরিশ্রম যেভাবে সাফল্য বয়ে আনে
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনে সফলতা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং এটি দীর্ঘ সাধনা, অধ্যবসায় ও অবিরাম প্রচেষ্টার ফল। পৃথিবীর ইতিহাসে যাঁরা স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে আছেন, তাঁদের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কেউই এক দিনে সাফল্যের শিখরে পৌঁছাননি।  অসংখ্য ব্যর্থতা, প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে ধৈর্য ও পরিশ্রমের পথ অতিক্রম করেই তাঁরা গন্তব্যে পৌঁছেছেন। কারণ মহান আল্লাহ এই পৃথিবীকে কর্মের ক্ষেত্র হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। এখানে প্রাপ্তির সঙ্গে প্রচেষ্টা এবং সফলতার সঙ্গে সাধনার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

ইসলামও মানুষকে অলসতা বা ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে বসে থাকতে শেখায় না। বরং চেষ্টা, সংগ্রাম ও কর্মনিষ্ঠাকে সফলতার অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি হিসেবে উপস্থাপন করে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর এই যে মানুষ তাই পায়, যা সে চেষ্টা করে।’ (সুরা : আন নাজম, আয়াত : ৩৯)

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরবিদরা বলেন, মানুষ তার কর্ম ও প্রচেষ্টার ফলই লাভ করে। চেষ্টা ও সাধনা ছাড়া কোনো অর্জন সম্ভব নয়। প্রত্যেক ব্যক্তি তার কর্মফলেরই মুখোমুখি হবে। (তাফসিরে কুরতুবী)

পার্থিব জীবনের সাফল্যের মতো আখিরাতের সফলতাও চেষ্টা ও সাধনা ছাড়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর সন্তুষ্টি, জান্নাতের সৌভাগ্য কিংবা আত্মিক উৎকর্ষ—কোনোটিই অলসতার মাধ্যমে লাভ করা যায় না। যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে আল্লাহর পথে চলতে চায় এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সংগ্রাম করে, আল্লাহ নিজেই তার জন্য হেদায়েতের পথ খুলে দেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা আমার উদ্দেশ্যে চেষ্টা-সংগ্রাম করবে, তাদের আমি আমার পথ দেখাব। আর আল্লাহ অবশ্যই সৎকর্মশীল লোকদের সঙ্গে রয়েছেন।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৬৯)

এই আয়াতের তাফসিরে ফুদাইল ইবনে আয়াদ বলেন, ‘যারা বিদ্যার্জনে ব্রতী হয়, আমি তাদের জন্য আমলও সহজ করে দিই।’ (বাগভী)

আসলে মানুষের আন্তরিক প্রচেষ্টা কখনোই আল্লাহর কাছে মূল্যহীন নয়। কোনো ব্যক্তি যদি নিষ্ঠার সঙ্গে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য পরিশ্রম করে, আল্লাহ তাকে তার অবস্থার ওপর ছেড়ে দেন না; বরং ধীরে ধীরে তাকে সত্যের পথে পরিচালিত করেন, কল্যাণের দরজা উন্মুক্ত করে দেন এবং নেক কাজের সুযোগ সৃষ্টি করে দেন।

মুমিনের জীবনের লক্ষ্য শুধু দুনিয়াবি সফলতা নয়; বরং আখিরাতের স্থায়ী মুক্তি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। তাই একজন মুমিন ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে আদায়ের পাশাপাশি নফল আমল, দান-সদকা, কোরআন তিলাওয়াত, জ্ঞানার্জন ও মানবসেবার মাধ্যমে নিজের আমলের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করে। আল্লাহ তাআলা এমন প্রচেষ্টাকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। তিনি বলেন, আর যারা মুমিন হয়ে আখিরাত কামনা করে এবং তার জন্য যথাযথ চেষ্টা করে। তাদের প্রচেষ্টা পুরস্কারযোগ্য। (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ১৯)

অতএব, সফলতার স্বপ্ন দেখাই যথেষ্ট নয়; সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন নিরলস চেষ্টা, ধৈর্য ও আত্মনিবেদন। দুনিয়ার কোনো ক্ষেত্রেই হোক কিংবা আখিরাতের কল্যাণ লাভের উদ্দেশ্যেই হোক, মহান আল্লাহ চেষ্টা ও সাধনাকেই সফলতার সোপান বানিয়েছেন। তাই মুমিনের কর্তব্য হলো হতাশ না হয়ে অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং বিশ্বাস করা যে আন্তরিক প্রচেষ্টার কোনো প্রতিদান কখনোই আল্লাহর কাছে হারিয়ে যায় না। একদিন না একদিন তিনি তার শ্রম, ত্যাগ ও সাধনার উত্তম প্রতিদান অবশ্যই দান করবেন।

কোরআনের বর্ণনায় হজ কবুল হওয়ার ১০ আলামত

ইসলামী জীবন ডেস্ক
কোরআনের বর্ণনায় হজ কবুল হওয়ার ১০ আলামত
সংগৃহীত ছবি

হজ ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম একটি মহান ইবাদত। এটি শুধু কিছু আনুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডের সমষ্টি নয়; বরং জীবনের এক আমূল পরিবর্তনের নাম। একজন মুসলিম যখন আল্লাহর ঘরের মেহমান হয়ে লাখো মানুষের সঙ্গে একই পোশাকে, একই স্থানে, একই রবের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গুনাহের জন্য কান্নাকাটি করে, তখন তার অন্তরে এক নতুন জাগরণ সৃষ্টি হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন হাজি কিভাবে বুঝবেন যে তাঁর হজ আল্লাহর দরবারে কবুল হয়েছে?

হজ কবুল হওয়ার প্রকৃত সংবাদ একমাত্র আল্লাহ তাআলাই জানেন। পৃথিবীর কোনো মানুষ নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না যে তার বা অন্য কারো হজ কবুল হয়েছে কি না। তবে কোরআনে এমন কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়, যা একজন বান্দার হজ কবুল হওয়ার সুসংবাদ বহন করে।

আর হজের পর যদি মানুষের ঈমান, চরিত্র, আমল, চিন্তা-চেতনা ও জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসে, তবে তা কবুলিয়তের অন্যতম লক্ষণ হিসেবে গণ্য হয়। নিচে হজ কবুল হওয়ার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আলামত আলোচনা করা হলো—

১. ঈমান ও আমল বৃদ্ধি পাওয়া : হজ কবুল হওয়ার অন্যতম বড় আলামত হলো মানুষের ঈমান আরো শক্তিশালী হওয়া এবং ইবাদতের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়া। হজের আগে যে ব্যক্তি নামাজে অলসতা করত, কোরআন তিলাওয়াত থেকে দূরে থাকত কিংবা বিভিন্ন নেক আমলে অনাগ্রহী ছিল, হজের পর তার মধ্যে যদি ইবাদতের প্রতি গভীর ভালোবাসা সৃষ্টি হয়, তবে এটি কবুলিয়তের একটি মহা লক্ষণ। কেননা কবুল হজ মানুষকে আল্লাহর আরো নিকটবর্তী করে এবং তার হৃদয়ে তাকওয়ার আলো জ্বালিয়ে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যারা সৎপথ অবলম্বন করেছে, আল্লাহ তাদের হেদায়েত আরো বৃদ্ধি করে দেন এবং তাদের তাকওয়া দান করেন।’ (সুরা : মুহাম্মাদ, আয়াত : ১৭)

২. দুনিয়ার মোহ কমে যাওয়া এবং আখিরাতমুখী হওয়া : হজের প্রতিটি অনুষঙ্গ মানুষকে মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ইহরামের সাদা কাপড় যেন কাফনের কথা মনে করিয়ে দেয়, আর আরাফাতের ময়দান যেন হাশরের মাঠের প্রতিচ্ছবি। তাই হজ কবুল হলে মানুষের হৃদয়ে দুনিয়ার চাকচিক্যের প্রতি আকর্ষণ কমে যায় এবং আখিরাতের সফলতার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। তার চিন্তা-চেতনা, পরিকল্পনা ও জীবনের লক্ষ্য ধীরে ধীরে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের দিকে ধাবিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘দুনিয়ার জীবন তো প্রতারণার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৮৫)

৩. গুনাহ ও অন্যায় থেকে সম্পূর্ণরূপে ফিরে আসা : হজ কবুল হওয়ার সবচেয়ে স্পষ্ট আলামত হলো পাপমুক্ত জীবনযাপনের চেষ্টা করা। যে ব্যক্তি হজের আগে সুদ, ঘুষ, মিথ্যা, গিবত, অশ্লীলতা, হারাম উপার্জন বা অন্য কোনো গুনাহে জড়িত ছিল, হজের পর যদি সেসব থেকে আন্তরিকভাবে তাওবা করে দূরে সরে আসে, তবে এটি কবুলিয়তের শক্তিশালী নিদর্শন। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি হজ করল এবং অশ্লীলতা ও গুনাহ থেকে বিরত থাকল, সে এমন অবস্থায় ফিরে আসে যেমন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছিল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৫২১)

৪. নিজের আমলকে তুচ্ছ মনে করা : কবুল হজের একটি সূক্ষ্ম আলামত হলো মানুষ নিজের আমল নিয়ে অহংকার না করে বরং তা অপ্রতুল মনে করে। হজ থেকে ফিরে কেউ যদি বলতে শুরু করে, ‘আমি হজ করেছি’, তাহলে এটা হবে খুব জঘন্য বিষয়। কেননা আল্লাহ বলেন, ‘আর তারা যা কিছু দান করে (এবং নেক আমল করে), তা করে এমন অবস্থায় যে তাদের অন্তর ভীতসন্ত্রস্ত থাকে, কারণ তারা তাদের প্রতিপালকের নিকট ফিরে যাবে।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ৬০)

৫. আমল কবুল না হওয়ার ভয় হওয়া : সালাফে সালেহিনরা নেক আমল করার চেয়ে আমল কবুল হওয়ার ব্যাপারে বেশি উদ্বিগ্ন থাকতেন। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা শুধু মুত্তাকিদের আমল কবুল করেন।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২৭)

৬. কবুল হওয়ার আশা নিয়ে বেশি বেশি দোয়া করা : ভয়ের পাশাপাশি মুমিনের অন্তরে আশা থাকাও জরুরি। কারণ আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া মুমিনের কাজ নয়। কাবা শরিফ নির্মাণের মতো মহান কাজ সম্পন্ন করার পরও ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাঈল (আ.) দোয়া করেছিলেন, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদের পক্ষ থেকে (আমাদের আমলগুলো) কবুল করে নিন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১২৭)

৭. বেশি পরিমাণে ইস্তিগফার করা : ইবাদত শেষ হওয়ার পর ইস্তিগফার করা নবী-রাসুলদের সুন্নাহ। কেননা কবুল হজ মানুষকে আরো বেশি বিনয়ী করে এবং সে উপলব্ধি করে যে তার ইবাদতে নিশ্চয়ই বহু ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়ে গেছে। তাই সে বেশি বেশি তাওবা ও ইস্তিগফারে মনোযোগী হয়। আল্লাহ তাআলা হজের আমল বর্ণনার শেষে বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৯৯)

৮. নেক আমলের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা : একটি নেক আমল কবুল হওয়ার অন্যতম আলামত হলো তার মাধ্যমে আরেকটি নেক আমলের পথ খুলে যাওয়া। হজের পর যদি কেউ নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, দ্বিনি শিক্ষা অর্জন, দাওয়াত ও খিদমতের কাজে আগের চেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে যায়, তবে এটি তার হজের ইতিবাচক প্রভাব এবং কবুলিয়তের সুসংবাদ বহন করে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ যখন কোনো বান্দার কল্যাণ চান, তখন তাকে নেক আমলের তাওফিক দান করেন।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিভাবে?’ তিনি বললেন, ‘মৃত্যুর আগে তাকে একটি সৎ কাজ করার তাওফিক দেন, তারপর সেই অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটান।’ (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস : ১৭৭৭৮)

৯. মানুষের হক আদায়ে সচেতন হওয়া : হজ কবুল হওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলামত হলো মানুষের অধিকার আদায়ের ব্যাপারে যত্নবান হয়ে ওঠা। সে কারো টাকা-পয়সা, সম্পদ, সম্মান বা অধিকার নষ্ট করে না; বরং অতীতের অন্যায়ের জন্য ক্ষমা চায় এবং মানুষের হক ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। কারণ আল্লাহর হক তাওবার মাধ্যমে মাফ হতে পারে, কিন্তু বান্দার হক আদায় বা ক্ষমা না নেওয়া পর্যন্ত মুক্তি পাওয়া কঠিন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন যে তোমরা আমানতসমূহ তাদের প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দাও।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৮)

১০. উত্তম চরিত্র ও নম্রতা অবলম্বন করা : কবুল হজ মানুষের আচার-আচরণে সৌন্দর্য নিয়ে আসে। সে ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করে, মানুষের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করে, অহংকার ত্যাগ করে এবং নম্রতা ও বিনয়ের পরিচয় দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর রহমানের বান্দা তারা, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং যখন অজ্ঞ লোকেরা তাদের সম্বোধন করে, তখন তারা শান্তিপূর্ণ কথা বলে।’(সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৬৩)

অতএব, হজের প্রকৃত সফলতা ‘হাজি’ উপাধি লাভে নয়; বরং হজের মাধ্যমে অন্তরের পরিবর্তনে। যে হজ মানুষের জীবনকে আল্লাহমুখী করে, গুনাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, নেক আমলের প্রতি আগ্রহী করে, বিনয়ী ও আখিরাতমুখী বানায়—সেই হজই মাকবুল হজ হওয়ার আশা করা যায়। তাই হজ সম্পন্ন করার পর একজন মুমিনের সর্ববৃহৎ চিন্তা হওয়া উচিত ‘আমি হজ করেছি’ এ কথা প্রচার করা নয়; বরং ‘আমার হজ কি আল্লাহর কাছে কবুল হয়েছে?’ এই ভাবনায় নিজেকে সংশোধন করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবার হজ, ওমরাহ ও নেক আমল কবুল করুন। আমিন।

ইসলামে হাজিদের অভ্যর্থনা জানানোর বিধান

আতাউর রহমান খসরু
ইসলামে হাজিদের অভ্যর্থনা জানানোর বিধান

নিঃসন্দেহে হজ পরম সৌভাগ্যের বিষয়। প্রতিটি মুসলমান এই সৌভাগ্য অর্জন করতে চায়। মুসলিম সমাজের একটি ঐতিহ্য হলো হাজিরা যখন হজের সৌভাগ্য অর্জন করে মাতৃভূমিতে ফেরে তখন তাঁদেরকে অভ্যর্থনা জানান। এর মাধ্যমে তাঁর অর্জন ও ফিরে আসার আনন্দ প্রকাশ করা হয়।

হাজিদের অভ্যর্থনা জানানোর বিধান

ফকিহরা বলেন, হাজিদের অভ্যর্থনা জানানো মুসলিম রীতির অন্তর্ভুক্ত, এটা ইবাদতের অংশ নয়। এটা এমন একটি রীতি, যা সরাসরি কোরআন-হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়, তবে একাধিক হাদিস থেকে বোঝা যায়, নবীজি (সা.) এই বিষয়ে নিষেধ করেননি, যা বৈধতা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট।

আল্লামা ইবনুল মুনির (রহ.) বলেন, ফিকহের দৃষ্টিতের হজ থেকে আগত মানুষকে অভ্যর্থনা জানানো বৈধ। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) বিষয়টি অস্বীকার করেননি, বরং দুজন শিশুকে তাঁর অভ্যর্থনায় উপস্থিত করায় তিনি খুশি হয়েছেন এবং তাদের সামনে ও পেছনে বসিয়েছেন। (ইরশাদুস সারি : ৩/২৭৮)

ইমাম বুখারি (রহ.) সহিহ বুখারিতে একটি পরিচ্ছেদের শিরোনাম দিয়েছেন ‘হজ থেকে প্রত্যাবর্তনকারীদের স্বাগত জানান’, যা ইমাম বুখারি (রহ.)-এর কাছে বিষয়টি বৈধ হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। (সহিহ বুখারি, হজ অধ্যায়)

নবীযুগে হাজিদের অভ্যর্থনা

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে হজ, ওমরাহ, যুদ্ধ বা অন্য কোনো সফর থেকে কোনো কাফেলা ফিরলে তাদের অভ্যর্থনা বা স্বাগত জানানো হতো। আয়েশা (রা.) বলেন, আমরা মক্কা থেকে হজ বা ওমরাহ করে ফিরলাম। আমাদেরকে দুজন আনসার বালক স্বাগত জানাল, তারা নিজ পরিবারের সদস্যরা সফর থেকে ফিরলে তাদের স্বাগত জানাত। (মুস্তাদরিকে হাকিম, হাদিস : ১৭৯৬)

আবদুল্লাহ বিন জাফর (রা.) বলেন, নবী (সা.) যখন সফর থেকে ফিরতেন, তখন তাঁর পরিবারের শিশুদের মাধ্যমে তাঁকে স্বাগত জানানো হতো। তিনি এক সফর থেকে ফিরলে আমাকে সামনে এগিয়ে দেওয়া হলো। তিনি আমাকে (বাহনে) তাঁর সামনে বসিয়ে নিলেন। অতঃপর ফাতেমা (রা.)-এর দুই ছেলের কোনো এক ছেলেকে নিয়ে আসা হলো। নবী (সা.) তাঁকে নিজের পেছনে বসিয়ে দিলেন। অতঃপর আমরা তিনজন একটি বাহনে আরোহণ করে মদিনায় প্রবেশ করলাম। (মুসলিম, হাদিস : ২৪২৮)

কেন স্বাগত জানাব

হাজিরা আল্লাহর ঘর ও নিদর্শনগুলো প্রত্যক্ষকারী এবং পবিত্র রওজা জিয়ারতকারী, তাই তারা বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার দাবিদার। অভ্যর্থনা এই সম্মান প্রকাশের একটি মাধ্যম। এ ছাড়া হাজিরা দীর্ঘদিন পরিবার, কর্মস্থল ও মাতৃভূমি থেকে দূরে ছিল, তারা ফিরে আসায় আপনজনরা স্বভাবতই আনন্দিত হয়, তাদের অভ্যর্থনা ও আপ্যায়নের মাধ্যমে এই আনন্দ প্রকাশ পায়। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ঘরে অবস্থানকারীরা যদি জানত তাদের ওপর হাজিদের কী অধিকার আছে, তবে হাজিরা আগমন করলে তারা তাদের বাহনগুলোকে চুম্বন করত। কেননা হাজিরা সমগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহর প্রতিনিধিদল। (শুআবুল ঈমান, হাদিস : ১৮১৫)

যেভাবে অভ্যর্থনা জানানো উচিত

হজ থেকে আসা হাজিদের অভ্যর্থনা ও স্বাগত জানাতে নিম্নোক্ত কাজগুলো করা উচিত।

১. এগিয়ে যাওয়া : হাজিদের অভ্যর্থনা জানাতে নিজ বাড়ি ও মহল্লা থেকে এগিয়ে যাওয়া বা জনপদের প্রবেশপথে অবস্থান করা উত্তম। কেননা নবীজি (সা.) জায়েদ বিন হারিসা (রা.)-কে স্বাগত জানাতে সামনে এগিয়ে গিয়েছিলেন।

২. সালাম দেওয়া : ইমাম শাবি (রহ.) বলেন, যখন কোনো ব্যক্তি সফর থেকে ফেরে তখন সুন্নত হলো তাঁর আপনজনরা তাঁর দিকে এগিয়ে যাবে এবং তাকে সালাম জানাবে। আর যখন কেউ সফরে বের হবে, তখন ব্যক্তি তাঁর আত্মীয়দের কাছে যাবে. তাদের কাছে দোয়া চাইবে। (বাহজাতুন নাজরি ফি আদাবিস সাফরি, পৃষ্ঠা-১০)

৩. মুসাফা ও মুআনাকা করা : যারা হাজিদের অভ্যর্থনা জানাবে, তারা হাজিদের সঙ্গে মুসাফা ও মুআনাকা করবে। আনাস বিন মালিক (রা.) বলেন, নবীজি (সা.)-এর সাহাবিরা যখন পরস্পরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন তাঁরা মুসাফা করতেন আর যখন সফর থেকে ফিরতেন তখন মুআনাকা করতেন। (আল আউসাত লিত-তাবরানি, হাদিস : ৯৭)

৪. দোয়া করা : যখন কোনো ব্যক্তি হজ থেকে ফেরেন তার জন্য দোয়া করা উচিত। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রহ.) হজ থেকে ফেরা হাজিদের জন্য দোয়া করতেন, ‘আল্লাহ তোমার ইবাদত কবুল করুন, তোমার প্রতিদান বাড়িয়ে দিন এবং তোমার ব্যয়ের প্রতিবিধান দিন।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস : ১৫৮১৪)

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) একজন হাজির জন্য এভাবে দোয়া করেছিলেন, ‘আল্লাহ তোমার হজ কবুল করুন, তোমার আমলগুলো পবিত্র করুন এবং আমাদেরকে ও তোমাকে পুনরায় তার পবিত্র ঘরে যাওয়ার তাওফিক দিন।’ (শরহু গায়াতিল মুনতাহা : ২/৪৪৪)

৫. দোয়া চাওয়া : পূর্বসূরি আলেমরা হাজিদের কাছে দোয়া চাওয়ার ব্যাপারে বিশেষ তাগিদ দিতেন। বিশেষ করে তারা পার্থিব কাজকর্মে লিপ্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘তুমি কোনো হাজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে তাঁকে সালাম দেবে, তাঁর সঙ্গে মুসাফা করবে এবং সে ঘরে প্রবেশের আগে তোমার পাপমুক্তির জন্য দোয়া চাইবে। কেননা তাঁকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৬১১২)

হাজিদের করণীয়

হজ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর হাজিদের কয়েকটি করণীয় হলো—

১. আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় : হজ থেকে ফেরার পর হাজিদের করণীয় হলো আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করা। কেননা আল্লাহ তাকে হজ করার এবং নিরাপদে ঘরে ফেরার তাওফিক দিয়েছেন। আবদুল্লাহ ইবনু ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখনই কোনো যুদ্ধ, হজ অথবা ওমরাহ থেকে প্রত্যাবর্তন করতেন তখন তিনি প্রত্যেক উঁচু ভূমিতে তিনবার আল্লাহু আকবার বলতেন এবং পরে বলতেন, ‘আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই। সর্বময় ক্ষমতা এবং সব প্রশংসা কেবল তাঁরই। তিনি সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান। আমরা প্রত্যাবর্তনকারী ও তাওবাকারী, ইবাদতকারী, আমাদের প্রভুর উদ্দেশে সিজদাকারী ও প্রশংসাকারী। আল্লাহ তাঁর ওয়াদা পূর্ণ করেছেন, স্বীয় বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং তিনি একাই সব শত্রুদলকে পরাজিত করেছেন।’ (বুখারি, হাদিস : ১৭৯৭)

২. মসজিদে নামাজ আদায় : মহানবী (সা.)-এর অভ্যাস ছিল তিনি কোনো সফর থেকে ফিরলে প্রথমে মসজিদে যেতেন এবং দুই রাকাত নামাজ আদায় করতেন। অতঃপর সমবেত মানুষকে নিয়ে বসতেন। সুতরাং হজ থেকে আগত ব্যক্তির বাড়ির কাছে মসজিদ থাকলে তারও উচিত প্রথমে মসজিদে যাওয়া এবং দুই রাকাত নামাজ আদায় করে ঘরে ফেরা।

৩. আপ্যায়ন করা : আরব ও মুসলিম সমাজের একটি পুরনো রীতি হলো হাজিদের বাড়িতে সমবেত মানুষের জন্য সাধ্যানুযায়ী আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা। আরবি ভাষায় এই খাবারকে নাকিআ বলা হয়। নাকিআ শব্দ নাকউন থেকে এসেছে, তার অর্থ ধুলাবালি। কেননা মুসাফিরের শরীরে ধুলাবালি লেগে থাকে। বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মদিনায় ফিরতেন একটি উট বা গরু জবাই করতেন। (বুখারি, হাদিস : ৩০৮৯)

সুতরাং হাজিরাও সাক্ষাৎ করতে আসা মানুষের জন্য আপ্যায়ন করতে পারে। বিশেষত হজ থেকে আনা খেজুর ও জমজমের পানি দ্বারা।

আল্লাহ সবাইকে সঠিক জ্ঞান দান করুন। আমিন।

মসজিদে নববীর হাজার বছরের স্থাপত্য-প্রদর্শনী

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মসজিদে নববীর হাজার বছরের স্থাপত্য-প্রদর্শনী
সংগৃহীত ছবি

ইসলামের দ্বিতীয় পবিত্রতম স্থান মদিনা মুনাওয়ারার গৌরবময় ইতিহাস, স্থাপত্যিক বিবর্তন এবং যুগে যুগে এর সম্প্রসারণের অসাধারণ কাহিনি এখন জীবন্ত হয়ে উঠেছে এক অনন্য প্রদর্শনীতে। মসজিদে নববীর স্থাপত্য প্রদর্শনী দর্শনার্থীদের জন্য উপহার দিচ্ছে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক ব্যতিক্রমধর্মী ইন্টারেক্টিভ অভিজ্ঞতা।

মসজিদে নববীর দক্ষিণ প্রাঙ্গণে অবস্থিত এই প্রদর্শনীতে প্রবেশ করলেই দর্শনার্থীরা যেন ফিরে যান ইসলামের স্বর্ণালি অতীতে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ইন্টারেক্টিভ স্ক্রিনের মাধ্যমে তারা জানতে পারেন মসজিদে নববীর প্রতিষ্ঠাকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত এর দীর্ঘ ইতিহাস, বিভিন্ন খিলাফত ও ইসলামী যুগে সংঘটিত সম্প্রসারণ এবং স্থাপত্যিক উন্নয়নের ধারাবাহিক বিবরণ।

প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ হলো, এর উন্নতমানের ডিজিটাল উপস্থাপনা। এখানে দর্শনার্থীরা স্পর্শনির্ভর পর্দার মাধ্যমে মসজিদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য, নকশাগত পরিবর্তন এবং বিভিন্ন যুগে সংযোজিত অংশগুলোর বিস্তারিত তথ্য সহজেই অন্বেষণ করতে পারেন। ফলে ইতিহাস জানার পাশাপাশি তারা এক বাস্তবধর্মী ও প্রাণবন্ত অভিজ্ঞতার স্বাদ পান।

এ ছাড়া প্রদর্শনীতে সংরক্ষিত রয়েছে বহু মূল্যবান ঐতিহাসিক নিদর্শন, যা মসজিদে নববীর স্থাপত্যিক যাত্রার বিভিন্ন অধ্যায়কে সাক্ষ্য দেয়। বিশেষ প্রদর্শনী হলে রাখা এসব নিদর্শন যুগে যুগে সংঘটিত সংস্কার ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে কাজ করছে। দর্শনার্থীদের জন্য আরো আকর্ষণীয় করে তুলতে এখানে স্থাপন করা হয়েছে বিভিন্ন ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) মডেল, যেসব মডেলের মাধ্যমে মসজিদের ক্রমবিকাশের চিত্র স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যায়।

মসজিদে নববীর ৩০৮ ও ৩০৯ নম্বর গেটের নিকটবর্তী দক্ষিণ প্রবেশপথে অবস্থিত এই প্রদর্শনী প্রতিদিন দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। দেশ-বিদেশের হাজারো মুসল্লি ও পর্যটক এখানে এসে ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং স্থাপত্যিক সৌন্দর্য সম্পর্কে সমৃদ্ধ জ্ঞানার্জন করছেন। ইতিহাস, স্থাপত্য ও প্রযুক্তির অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই প্রদর্শনী শুধু একটি প্রদর্শনী নয়; বরং এটি মসজিদে নববীর গৌরবময় অতীতকে নতুন প্রজন্মের সামনে জীবন্ত করে তোলার এক অনন্য প্রয়াস।