শিশুর জেদ মা-বাবার বড় দুশ্চিন্তার কারণ। মা-বাবা ও অভিভাবক না সহ্য করতে পারেন শিশুর অযৌক্তিক জেদ, না পারেন তাকে কঠোরভাবে শাসন করতে। ফলে কখনো তারা হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেন। আবার কখনো তাদের অতি কঠোরতায় বখে যায় আদরের সন্তান। ইসলাম সর্বাবস্থায় শিশুর প্রতি কোমল আচরণের পরামর্শ দেয়। শিশু জেদি হলে তার প্রতিপালনে বাস্তবমুখী আচরণ ও মধ্যপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দেয়।
শিশু জেদি হয় কেন
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিশু জেদি হয়ে জন্মগ্রহণ করে না, বরং পারিপার্শ্বিক কারণে তারা জেদি হয়। জেদি শিশুর সঙ্গে যথোপযুক্ত আচরণ করতে চাইলে প্রথমেই এসব কারণ বুঝতে হবে। চিকিৎসক, গবেষক ও প্রাজ্ঞ লোকেরা শিশুর জেদের কিছু কারণ বর্ণনা করেন। তা হলো—
১. স্বভাবজাত কারণ : শিশুর কিছু কিছু জেদ স্বভাবজাত। শিশুদের ভাষা ও অভিব্যক্তি প্রকাশে সীমাবদ্ধতা থাকায় তারা কখনো কখনো জেদকে ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে। যেমন মা-বাবা বা অভিভাবকরা শিশুর প্রতি মনোযোগী না হলে, তাকে অবহেলা বা উপেক্ষা করলে শিশু জেদ দেখাতে পারে। কখনো ভয় পাচ্ছে এমন কাজ তার ওপর চাপিয়ে দিলেও শিশু জেদ দেখাতে পারে।
২. প্রতিপালনের ত্রুটি : মা-বাবা ও অভিভাবকদের ভুল প্রতিপালন, আচরণ ও শাসনের কারণেও শিশু জেদি হয়ে উঠতে পারে। যেমন—শিশুর প্রতি কথায় কথায় রাগ প্রকাশ করলে, বড়রা পরস্পরের প্রতি বেশি জেদ দেখালে, শিশুর যৌক্তিক দাবি প্রত্যাখ্যান করলে, পরিবারে সে বৈষম্য ও অবিচারের শিকার হলে শিশু জেদি হয়ে উঠতে পারে।
৩. পরিবেশগত কারণ : শিশু মন্দ সঙ্গ ও পরিবেশের কারণেও জেদি হয়ে উঠতে পারে। সে যদি তার কোনো বন্ধু বা খেলার সাথিকে জেদ দেখাতে এবং তা দেখিয়ে দাবি আদায় করতে দেখে তাতে তার ভেতরও জেদ প্রকাশের প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
৪. স্বাস্থ্যগত কারণ : চিকিৎসকরা বলেন, জেনেটিক বা পরিবেশগত কারণের বাইরেও স্বাস্থ্যগত ত্রুটির কারণেও শিশুর অতিরিক্ত জেদ হতে পারে। যেমন—শিশুর এপিলেপসি (খিঁচুনির) বা এডিএইচডির সমস্যা থাকলে শিশুরা অতিরিক্ত জেদ দেখাতে পারে।
জেদি শিশুর প্রতি আচরণ
ইসলামের দৃষ্টিতে শিশুর বোধ-বুদ্ধি পরিপক্ব হওয়া পর্যন্ত তার সব কথা, কাজ ও আচরণ ক্ষমার যোগ্য। তাই যে শিশু ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝে না তার প্রতি ধৈর্য ও সহনশীলতা প্রদর্শন এবং কোমল আচরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর যে শিশু বুঝমান তার প্রতি স্নেহ ও অকঠোর শাসনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিম্নে ইসলামের নির্দেশনা তুলে ধরা হলো—
১. স্নেহ ও মমতা প্রদর্শন : শিশু জেদি হলেও ইসলাম তার প্রতি কোমল ও স্নেহের আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়, যে ছোটকে স্নেহ ও বড়কে সম্মান করে না।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৪৩)
২. ধৈর্য ও সহনশীলতা : ইসলাম শিশুর প্রতি সর্বোচ্চ সহনশীল আচরণের নির্দেশ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে এর অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে। আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বীয় কন্যা জয়নব (রা.)-এর মেয়ে উমামাকে কোলে নিয়ে নামাজ আদায় করতেন। তিনি যখন সিজদা করতেন তাকে নামিয়ে রাখতেন এবং যখন দাঁড়াতেন কোলে তুলে নিতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫১৬)
৩. উত্তম আচরণ ও পরিবেশ : শিশুরা অনুকরণপ্রিয়, তারা চারপাশের মানুষগুলো থেকে আচরণ শেখে। তাই শিশুর সঙ্গে এবং তার উপস্থিতিতে তেমন আচরণ করা উচিত যেমন তার কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হয়। এটা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কর্মকৌশল ছিল। পবিত্র কোআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘রাসুলের জীবনে তোমাদের জন্য আছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ২১)
৪. সন্তানদের ভেতর ইনসাফ : পারিবারিক জুলুম, অবিচার ও অবহেলা শিশুকে জেদি ও এক রোখা করে তুলতে পারে। তাই ইসলাম সন্তানদের ভেতর ইনসাফ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের ভেতর ইনসাফ করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৫৮৭)
৫. ভালো কাজের প্রশংসা : শিশুরা প্রশংসা শুনতে পছন্দ করে। তাই সে কোনো ভালো করলে তার প্রশংসা করা এবং উৎসাহ দেওয়া উচিত। এতে তার ভেতর ইতিবাচক মানসিকতা গড়ে উঠবে। পবিত্র কোরআনে মুমিনদের ভালো কাজের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার পথ করে দেবেন এবং তাকে ধারণাতীত উৎস থেকে দান করবেন জীবিকা।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ২-৩)
৬. জেদের বিপরীতে জেদ নয় : অনেক সময় মা-বাবা ও অভিভাবক সন্তানের সঙ্গে জেদাজেদিতে লিপ্ত হন। এটা অনুচিত ও অগ্রহণযোগ্য। কেননা অবুঝ শিশু ও অভিভাবক কখনো সমান নয়। ইসলামের শিক্ষা হলো মন্দের পরিবর্তে ভালো। অর্থাৎ শিশু জেদ দেখালে অভিভাবক তাকে যুক্তি ও উপদেশের মাধ্যমে বোঝাবেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘ভালো ও মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দ প্রতিহত করো উত্কৃষ্ট দ্বারা, ফলে তোমার সঙ্গে যার শত্রুতা আছে, সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো।’ (সুরা : হা-মিম-সাজদা, আয়াত : ৩৪)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই কোমলতা যেকোনো বিষয়কে সুন্দর করে এবং তা ত্যাগ করলে যেকোনো বিষয় কদর্য হয়।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২৪৭৮)
৭. ন্যায়সংগত শাসন : ইসলাম শিশুর সঙ্গে প্রথমে কোমল আচরণের নির্দেশ দেয়। কিন্তু শিশুর সংশোধন না হলে ন্যায়সংগত শাসনের অনুমতি দেয়। তা হলো শিশুর বয়স, পরিপক্বতা ও অবাধ্যতার মাত্রা বিবেচনা করে অকঠোর শাসন ও শাস্তি প্রদান করা। শাস্তি শুধু শারীরিক আঘাত নয়, বরং ভর্ৎসনা ও তিরস্কারও শাসন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছর হলে তাদেরকে নামাজের আদেশ দাও এবং ১০ বছর হলে তাদেরকে নামাজের জন্য প্রহার কোরো। আর বিছানায় তাদের মধ্যে দূরত্ব রাখো।’(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৫)
৮. প্রয়োজনে চিকিৎসা : শিশুর জেদকে সব সময় স্বভাবজাত ও বংশগত বিষয় ভাবা উচিত নয়। শিশু অতিরিক্ত জেদ দেখালে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং তার নিয়মিত চিকিৎসা করতে হবে। ইসলাম প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণে উৎসাহিত করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক রোগের প্রতিষেধক আছে। রোগী যখন সঠিক প্রতিষেধক লাভ করে তখন আল্লাহর নির্দেশে সে আরোগ্য লাভ করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২২০৪)
শিশুর জেদ সামলানোর উপায়
অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রাজ্ঞ আলেমরা জেদি শিশুকে সামলাতে নিম্নের পরামর্শগুলো দেন—
১. শিশুর প্রয়োজন ও আবেগ বুঝতে চেষ্টা করুন। তার কথা ও মতামতকে গুরুত্ব দিন।
২. শিশুর ভাষা ও অভিব্যক্তিগুলো পর্যালোচনা করুন। যেন জেদ দেখানোর আগেই তার সমস্যার সমাধান করা যায়।
৩. শিশুর প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করুন। তার প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করুন। অহেতুক সমালোচনা পরিহার করুন।
৪. শিশুর প্রতি কার্পণ্যহীন ভালোবাসা প্রকাশ করুন। সাধারণত শিশুরা স্নেহ ও ভালোবাসা লাভে আগ্রহী হয়ে থাকে।
৫. শিশুর কাজের সীমা নির্ধারণ করে দিন। নির্ধারিত সীমা পর্যন্ত তাকে স্বাধীনতা দিন। প্রয়োজনে ধীরে ধীরে তা সংকুচিত করুন।
৬. জেদের সময় শিশুকে অবকাশ দিন। জেদ কমে এলে তাকে স্নেহ, মমতা ও যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে বলুন।
৭. যথাসম্ভব শারীরিক শাস্তি পরিহার করুন।
সর্বোপরি আল্লাহর কাছে অধিক পরিমাণে দোয়া করুন। কেননা যেকোনো বিষয়ে আল্লাহর ইচ্ছাই চূড়ান্ত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ দোয়া শিখিয়েছেন, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য এমন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দান করো, যারা হবে আমাদের জন্য নয়নপ্রীতিকর এবং আমাদেরকে করো মুত্তাকিদের জন্য অনুসরণযোগ্য।’ (সুরা : ফোরকান, আয়াত : ৭৪)
আল্লাহ সন্তানের ব্যাপারে সব মা-বাবার দুশ্চিন্তা দূর করে দিন। আমিন।




