• ই-পেপার

সিয়াম সাধনা থেকে জীবন সাধনা

নবীযুগে যিনি পবিত্র কাবার চাবি সংরক্ষণ করতেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
নবীযুগে যিনি পবিত্র কাবার চাবি সংরক্ষণ করতেন
সংগৃহীত ছবি

মক্কার সম্ভ্রান্ত বংশের সন্তান উসমান ইবনে তালহা (রা.)। মক্কার সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশের বনু আবদিদ দার গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বংশপরম্পরায় তাদের পরিবারের ওপর ন্যস্ত ছিল কাবা শরীফের চাবি সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব। আরব সমাজে এটি ছিল অত্যন্ত সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব।

মহানবী (সা.)-এর মক্কীজীবনে কাবার চাবিকে ঘিরে একটি ঘটনার জন্য তিনি ইসলামের ইতিহাসে বিখ্যাত। তৎকালীন সময়ে কেউ কাবায় প্রবেশ করতে চাইলে অপেক্ষা করতে হতো উসমান ইবনে তালহার (রা.) গোত্রের লোকদের জন্য। কারণ, কাবার চাবি থাকতো তাদের কাছে। একবারের ঘটনা—

একদিন হারাম শরীফের চত্বরে সাহাবিদের নিয়ে বসেছিলেন নবীজি (সা.)। হঠাৎ ভাবলেন, কাবা শরীফের ভেতরে ঢুকবেন। উসমান ইবনে তালহা তখনো মুসলিম হননি। তার কাছে কাবা ঘর খুলে দেওয়ার আবেদন করলেন নবীজি। উসমান ইবনে তালহা নবীজিকে চাবি দিলেন না। তখন নবীজি (সা.) শান্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘একদিন তুমি এই চাবি আমার হাতে দেখতে পাবে।’ উসমান বিস্মিত হয়ে জানতে চেয়েছিলেন, ‘তাহলে কি সেদিন কুরাইশরা অপমানিত হবে?’ উত্তরে রাসুল (সা.) বলেছিলেন, ‘না, বরং সেদিন কুরাইশরা সম্মানিত হবে।’

এরপর দিন গড়ায়। যুগ পার হয়। এক সময় মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন মহানবী (সা.)। হিজরতেরও প্রায় আট বছর পর ঘটে এক ঐতিহাসিক ঘটনা।

৮ম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের পর মহানবী (সা.)-এর সেই ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবে রূপ নেয়। পুরো মক্কার অধিপতি তখন নবীজি (সা.)। কাবার চাবি ওসমান ইবনে তালহার কাছ থেকে চেয়ে নিলেন নবীজি (সা.)। হজরত আব্বাস (রা.) এবং হজরত আলী (রা.) নবীজির পেছনে পেছন ছুটছেন। মনের ভেতর তীব্র প্রতীক্ষা কাবার চাবির দায়িত্ব যদি দিয়ে দেন নবীজি। দু’একজন বলেও ফেলেছেন মুখ ফুটে। সবার ভেতর প্রচণ্ড কৌতূহল কাকে দেওয়া হবে চাবি?

উসমান ইবনে তালহা অসহায় ভাবে নবীজির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। সবাইকে অবাক করে দিয়ে নবীজি (সা.) কাবার চাবি আবার উসমান ইবনে তালহার (রা.) হাতেই ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। ঘটনা এখানে শেষ হয়নি। এরপর নবীজি ঘোষণা করলেন, ‘হে বনু তালহা! কিয়ামত পর্যন্ত এই চাবি তোমাদের কাছেই থাকবে।’

নবীজির এই মহানুভবতায় তিনি আপ্লুত হলেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত কাবার চাবি তার বংশধররাই বহন করছেন। এখনো সৌদি বাদশা এসে কাবার দুয়ারে অপেক্ষা করেন। ওসমান ইবনে তালহার (রা.) বংশের বর্তমান দায়িত্বশীল এসে দরজা খুলে দিলে ভেতরে প্রবেশ করেন।

ইসলাম গ্রহণের আগে জাহেলি যুগেও উসমান ইবনে তালহার (রা.) চরিত্রে ছিল সততা, আত্মমর্যাদা ও মানবিকতার উজ্জ্বল ছাপ। এর অন্যতম প্রমাণ হজরত উম্মে সালামা (রা.)-এর হিজরতের ঘটনা। তখনো তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি। তবে একা ও অসহায় উম্মে সালামা (রা.) ও তার শিশুপুত্রকে দীর্ঘ পথ নিরাপদে মদিনার উপকণ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছে দেন। কোনো স্বার্থ ছাড়াই একজন নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন তিনি।

ইসলাম গ্রহণের পর তিনি রাসুলুল্লাহর (সা.) একনিষ্ঠ সাহাবিতে পরিণত হন। জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে মদিনায় নবীজির সান্নিধ্যে হিজরত করেন। মক্কা বিজয়ের আগেই হজরত খালিদ বিন ওয়ালিদ এবং আমর ইবনে আসের সাথে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তিনি। জীবনভর তিনি কাবা শরিফের খিদমত, আমানত রক্ষা এবং ইসলামের সেবায় নিজেকে নিবেদিত করেন। তার বর্ণিত বেশ কয়েকটি হাদিস হাদিসের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থগুলোতে সংরক্ষিত হয়েছে। তিনি প্রমাণ করে গেছেন—সম্মান বংশে নয়, সত্যকে গ্রহণ করার মধ্যেই মানুষের প্রকৃত মর্যাদা। ৪২ হিজরীতে মক্কায় ইন্তেকাল করেন তিনি।

হাদিসের বাণী

কেয়ামতের ভয়াবহতা

ইসলামী জীবন ডেস্ক
কেয়ামতের ভয়াবহতা
সংগৃহীত ছবি

বিশিষ্ট সাহাবি হজরত মিকদাদ (রা.)- থেকে বর্ণিত, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, কিয়ামতের ময়দানে সূর্যকে সৃষ্টজীবের অনেক কাছাকাছি করা হবে, ফলে সূর্য ও সৃষ্টজীবের মধ্যে দূরত্ব হবে মাত্র এক মাইল। মিকদাদ (রা.)- থেকে রাবি সুলাইম ইবনে আমির বলেন, ওয়াল্লাহি! আমি জানি না, রাসুলুল্লাহ (সা.) এখানে মাইল দ্বারা কোন মাইল উদ্দেশ্য নিয়েছেন! জমিনের দূরত্ব সমপরিমাণ মাইল, নাকি (সুরমাদানির) শলাকা, যার দ্বারা চোখে সুরমা লাগানো হয়, সেটা উদ্দেশ্য নিয়েছেন! (কেননা সেটাকেও মাইল বলা হয়)।

তিনি বলেন, প্রত্যেক মানুষ নিজ-নিজ আমল অনুযায়ী ঘামের মধ্যে ডুবে থাকবে। সেদিন কারো ঘাম হবে পায়ের টাখনু পর্যন্ত। আবার কারো-কারো হাঁটু পর্যন্ত ঘাম হবে। আবার কারো ঘাম হবে নাক পর্যন্ত। এ কথা বলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর মুখের দিকে ইশারা করলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭২০৬, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৩৮১৩)

শিক্ষা ও বিধান 
১. কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী : একদিন অবশ্যই কিয়ামত সংঘটিত হবে এবং প্রত্যেক মানুষকে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হবে।
২. কিয়ামতের ভয়াবহতা : সেদিন সূর্য মানুষের খুব কাছে আনা হবে, যা কিয়ামতের কঠিন ও ভয়ংকর অবস্থার পরিচয় বহন করে।
৩. আমলের গুরুত্ব : মানুষের ঘাম তার আমল অনুযায়ী হবে। যার আমল যত খারাপ, তার কষ্টও তত বেশি হবে।
৪. ন্যায়বিচারের প্রমাণ : আল্লাহ তাআলা কারও প্রতি অবিচার করবেন না; প্রত্যেককে তার কর্ম অনুযায়ী প্রতিদান দেওয়া হবে।
৫. নেক আমলের প্রতি উৎসাহ : সালাত, সিয়াম, জাকাত, সদকা, সৎকাজ ও আল্লাহভীতি মানুষের কিয়ামতের কষ্ট লাঘবের কারণ হতে পারে।
৬. গুনাহ থেকে সতর্কতা : পাপ ও অবাধ্যতা কিয়ামতের দিন মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেবে।
৭. আখিরাতমুখী জীবন গড়ার শিক্ষা : দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ভোগে মগ্ন না হয়ে আখিরাতের সফলতার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।
৮. তাওবার গুরুত্ব : কিয়ামতের কঠিন দিনের আগে আন্তরিক তাওবা করে আল্লাহর কাছে ফিরে আসা জরুরি।
৯. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সতর্কবাণী : তিনি উম্মতকে ভবিষ্যতের ভয়াবহ পরিস্থিতি জানিয়ে সতর্ক করেছেন, যাতে তারা নিজেদের সংশোধন করতে পারে।
১০. আল্লাহর রহমতের আশা : ভয়াবহ দিনের বর্ণনা মুমিনকে ভীত করার পাশাপাশি নেক আমল ও আল্লাহর রহমতের আশায় জীবন পরিচালনার শিক্ষা দেয়।
 

কোরআনের যে আয়াত মানবজীবনের পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান

মুফতি ওমর বিন নাছির
কোরআনের যে আয়াত মানবজীবনের পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান
সংগৃহীত ছবি

মানবজীবনের প্রকৃত সফলতা হলো আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন করে তাঁর বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা। কারণ মহান আল্লাহ মানুষকে উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেননি; বরং তাঁর ইবাদতের মাধ্যমে পৃথিবীতে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য সৃষ্টি করেছেন।

আল্লাহ তাআলা মানুষের স্বভাব, প্রয়োজন, দুর্বলতা ও শক্তি সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত। তাই তিনিই জানেন কোন কাজ মানুষের জন্য কল্যাণকর এবং কোনটি ধ্বংসের কারণ। কোরআনে এমন কিছু মৌলিক নির্দেশনা রয়েছে, যা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ—সকল ক্ষেত্রেই শান্তি, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে। সেগুলো হলো-

১. আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক না করা : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বলুন, এসো, আমি তোমাদেরকে পাঠ করে শোনাই যা তোমাদের রব তোমাদের জন্য হারাম করেছেন—তোমরা তাঁর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করবে না।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৫১)
এটাই ইসলামের প্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষা। আল্লাহই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, জীবন-মৃত্যুর মালিক এবং ইবাদতের একমাত্র হকদার। তাই তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করা সবচেয়ে বড় জুলুম।

আবু জর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জিবরাইল (আ.) আমাকে সুসংবাদ দিয়েছেন, আমার উম্মতের যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক না করে মৃত্যুবরণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে...।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১২৩৭)

২. মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার : তাওহিদের পরপরই আল্লাহ তাআলা পিতা-মাতার অধিকার উল্লেখ করেছেন। মাতা-পিতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৫১)

ইসলামে পিতা-মাতার সম্মান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে তাঁদের সন্তুষ্টিকে আল্লাহর সন্তুষ্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টির মধ্যে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টির মধ্যে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৮৯৯)

৩. সন্তানদের জীবন ও অধিকার রক্ষা : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘দারিদ্র্যের ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা কোরো না। আমিই তোমাদের এবং তাদের রিজিক দান করি।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৫১)

জাহেলি যুগে আরবরা দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তান হত্যা করত। ইসলাম এই বর্বর প্রথাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৯৩)
অতএব সন্তান শুধু পারিবারিক সদস্য নয়; তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত একটি আমানত।

৪. অশ্লীলতা ও ব্যভিচারের কাছেও না যাওয়া : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীলতা এবং অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ।’ (সুরা : আনআম, ৬:১৫১)

আল্লাহ শুধু ব্যভিচার নয়, বরং ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যায় এমন সব পথ—অশ্লীলতা, কুদৃষ্টি, অনৈতিক সম্পর্ক ও লজ্জাহীনতাও নিষিদ্ধ করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর চেয়ে অধিক গাইরতসম্পন্ন আর কেউ নেই। এজন্যই তিনি প্রকাশ্য ও গোপন সব অশ্লীল কাজ হারাম করেছেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৯৯)

৫. নিরপরাধ প্রাণ হত্যা থেকে বিরত থাকা : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে প্রাণকে আল্লাহ সম্মানিত করেছেন, ন্যায়সঙ্গত কারণ ছাড়া তাকে হত্যা কোরো না।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৫১)

অন্যায়ভাবে হত্যা ইসলামে সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধগুলোর একটি।

৬. মানুষের সম্মান, অঙ্গীকার ও ন্যায়বিচার রক্ষা : ইসলাম শুধু ইবাদতের ধর্ম নয়; এটি চরিত্র গঠনেরও ধর্ম। একজন মুসলিমের কথা, প্রতিশ্রুতি ও আচরণ বিশ্বস্ত হওয়া আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মানুষ কোনো কথা উচ্চারণ করে না, কিন্তু তার নিকট একজন পর্যবেক্ষক প্রস্তুত থাকে।’ (সুরা : কাফ, আয়াত : ১৮)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যার মধ্যে আমানতদারি নেই, তার ঈমান পূর্ণ নয়; আর যে অঙ্গীকার রক্ষা করে না, তার দ্বীন পূর্ণ নয়।’ (মুসনাদ আহমদ, হাদিস: ১২৫৬৭)

৭. ইসলামের নির্দেশনাগুলো পরিপূর্ণভাবে মেনে চলা : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এটাই আমার সরল পথ; অতএব তোমরা এ পথই অনুসরণ করো এবং অন্যান্য পথ অনুসরণ কোরো না; তাহলে সেগুলো তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৫৩)

সুরা আনআমের এই মহান নির্দেশনাগুলো মানবজীবনের জন্য আল্লাহপ্রদত্ত এক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এখানে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র—সব ক্ষেত্রের মৌলিক নীতিমালা একত্রে তুলে ধরা হয়েছে। যে ব্যক্তি এই বিধানগুলো আন্তরিকতার সঙ্গে অনুসরণ করবে, তার জীবন হবে ঈমান, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ; সমাজ হবে নিরাপদ, পরিবার হবে সুখী এবং রাষ্ট্র হবে ন্যায়ভিত্তিক। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কোরআনের এই মহান নির্দেশনাগুলো বুঝে আন্তরিকতার সঙ্গে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
 

জ্ঞান ও প্রজ্ঞা লাভে পঠিতব্য মহামূল্যবান তিনটি দোয়া

ইসলামী জীবন ডেস্ক
জ্ঞান ও প্রজ্ঞা লাভে পঠিতব্য মহামূল্যবান তিনটি দোয়া
সংগৃহীত ছবি

জ্ঞান মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ। সম্পদ, ক্ষমতা কিংবা খ্যাতি মানুষকে সাময়িক মর্যাদা দিতে পারে, কিন্তু প্রকৃত জ্ঞান ও আল্লাহভীতি মানুষকে দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় জগতেই সম্মানিত করে। ইসলামে ইলম অর্জনকে ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা প্রথম যে ওহি নাজিল করেছেন, তার সূচনাই ছিল—‘পড়ো’। এটি প্রমাণ করে যে ইসলাম জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও চিন্তাশীলতার ধর্ম।

তবে জ্ঞান অর্জনের জন্য শুধু প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আল্লাহর বিশেষ সাহায্য, তাওফিক ও বরকত। তাই কোরআন ও হাদিসে এমন কিছু দোয়া শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, যেগুলো নিয়মিত পাঠ করলে উপকারী জ্ঞান, সঠিক বুঝ এবং প্রজ্ঞা লাভ হয়। দোয়াগুলো হলো—

১. ইবরাহিম (আ.)-এর প্রজ্ঞা লাভের দোয়া

رَبِّ هَبۡ لِي حُكۡمًا وَأَلۡحِقۡنِي بِالصَّالِحِينَ

উচ্চারণ : রাব্বি হাবলি হুকমান ওয়া আলহিকনি বিস সালিহিন।
অর্থ : ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে প্রজ্ঞা দান করুন এবং আমাকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করুন।’ (সুরা : শুআরা, আয়াত : ৮৩)

এই দোয়ায় হজরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর কাছে শুধু জ্ঞান নয়, বরং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রজ্ঞা এবং নেককারদের সঙ্গ লাভের আবেদন করেছেন। কারণ প্রকৃত জ্ঞান তখনই মূল্যবান হয়, যখন তা মানুষকে সৎপথে পরিচালিত করে।

২. উপকারী জ্ঞান বৃদ্ধির দোয়া

اللَّهُمَّ انْفَعْنِي بِمَا عَلَّمْتَنِي، وَعَلِّمْنِي مَا يَنْفَعُنِي، وَزِدْنِي عِلْمًا، وَأَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ حَالِ أَهْلِ النَّارِ

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মানফাতানি বিমা আল্লামতানি, ওয়া আল্লিমনি মা ইয়ানফাউনি, ওয়া জিদনি ইলমা, ওয়া আউজু বিল্লাহি মিন হালি আহলিন নার।
অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আপনি আমাকে যা শিখিয়েছেন, তা দ্বারা আমাকে উপকৃত করুন। আমার জন্য যা উপকারী, তা আমাকে শিক্ষা দিন। আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন এবং আমি জাহান্নামিদের অবস্থা থেকে আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ৩৫৯৯)

এটি এমন একটি পরিপূর্ণ দোয়া, যেখানে উপকারী জ্ঞান, নতুন জ্ঞান অর্জন, জ্ঞান বৃদ্ধি এবং আখিরাতের মুক্তি—সবকিছুরই আবেদন রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও এই দোয়া নিয়মিত করতেন।

৩. দ্বীনের গভীর জ্ঞান লাভের দোয়া

اللَّهُمَّ فَقِّهْنِي فِي الدِّينِ

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ফাক্কিহনি ফিদ দ্বীন।
অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমাকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করুন।’

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) ছোটবেলায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর খেদমত করতেন। একদিন তিনি নবীজি (সা.)-এর অজুর জন্য পানি প্রস্তুত করে রাখলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর জন্য এই দোয়া করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৪৩)
এই দোয়ার বরকতেই ইবনে আব্বাস (রা.) পরবর্তীকালে ‘হিবরুল উম্মাহ’ (উম্মতের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত) ও ‘তারজুমানুল কোরআন নামে খ্যাত হন।

আমাদের করণীয়
শিক্ষার্থী, শিক্ষক, গবেষক, আলেম কিংবা সাধারণ মুসলিম—সবারই উচিত প্রতিদিন এই দোয়াগুলো পাঠ করা। বিশেষ করে পড়াশোনা শুরু করার আগে, পরীক্ষার পূর্বে, কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কিংবা নতুন কিছু শেখার সূচনায় এসব দোয়া নিয়মিত পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা। মনে রাখতে হবে, জ্ঞান তখনই কল্যাণকর হয়, যখন তা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, সত্যকে জানা এবং মানুষের উপকারে ব্যবহৃত হয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে উপকারী জ্ঞান, বিশুদ্ধ প্রজ্ঞা এবং সেই অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

সিয়াম সাধনা থেকে জীবন সাধনা | কালের কণ্ঠ