• ই-পেপার

রমাদানের শেষ দশক ইবাদতের শ্রেষ্ঠ সময়

আমরা কেন ঈমান আনি

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ
আমরা কেন ঈমান আনি
সংগৃহীত ছবি

ঈমান শুধু কোনো সামাজিক উত্তরাধিকার নয়, কোনো পরিবেশের অন্ধ অনুসরণ নয়, কোনো বংশপরম্পরায় চলে আসা অভ্যাসও নয়; বরং ঈমান হলো এক মহান সত্য, যার ওপর আসমান ও জমিন প্রতিষ্ঠিত এবং যার ওপর নির্ভর করে দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতা।

মহান আল্লাহ আমাদের কাছে অন্ধ ঈমান চাননি কিংবা প্রমাণহীন কোনো বিশ্বাসও চাননি; বরং তিনি ঈমানকে দুটি মহান বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছেন—

প্রথমত, সত্যকে চেনার জন্য বিবেক ও বুদ্ধির আলো।
দ্বিতীয়ত, অন্তরকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য ওহির আলো। এ কারণেই আজকের আলোচনার বিষয়—‘আমরা কেন ঈমান আনি।’ গোটা বিশ্ব আল্লাহর অস্তিত্বের সাক্ষ্য দেয়।

প্রথমত, একটু চিন্তা করুন এই মহাবিশ্ব নিয়ে, যেখানে আমরা বসবাস করছি। একটি উঁচু আকাশ, বিস্তৃত পৃথিবী, সূর্য ও চন্দ্র, আর দিগন্তজুড়ে অসংখ্য নিদর্শন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আসমান ও জমিনের সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৯০)

এসব শুধু সৌন্দর্যের দৃশ্য নয়; বরং এগুলো হলো নিদর্শন, প্রমাণ ও ইঙ্গিত, যা আমাদের সেই স্রষ্টার দিকে নিয়ে যায়, যিনি সৃষ্টি করেছেন এবং নিখুঁত করেছেন।

সুস্থ বিবেক যখন এই মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা ও নিখুঁত ব্যবস্থাপনা দেখে, তখন সে বুঝতে পারে—এর পেছনে অবশ্যই একজন প্রজ্ঞাময় স্রষ্টা রয়েছেন।
কোরআন এমন এক স্পষ্ট প্রশ্ন করেছে, যার পর অস্বীকারের কোনো সুযোগ থাকে না—‘তারা কি কোনো কিছু ছাড়াই সৃষ্টি হয়েছে, নাকি তারা নিজেরাই নিজেদের স্রষ্টা?’ (সুরা : আত-তুর, আয়াত : ৩৫)

মানুষ নিজেই আল্লাহর নিদর্শন 
মহান আল্লাহ বলেন, ‘এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যেও (নিদর্শন আছে), তবে কি তোমরা দেখতে পাও না?’ (সুরা : আজ-জারিয়াত, আয়াত : ২১)

নিজের দিকে তাকাও—একটি হৃদয়, যা তোমার অনুমতি ছাড়াই অবিরাম স্পন্দিত হচ্ছে। একটি শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা, যা নিজে থেকেই চলছে। চোখ, যা দেখে। কান, যা শোনে। বুদ্ধি, যা চিন্তা করে, বিশ্লেষণ করে, তুলনা করে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

তুমি দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে থাকলেও তোমার ভেতরে একটি ব্যবস্থা অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে—হৃৎস্পন্দনের নিয়মিততা, কোষের পুনর্গঠন, শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

এসব কে তোমার মধ্যে স্থাপন করেছেন? আল্লাহ বলেন, ‘যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাকে সুবিন্যস্ত করেছেন এবং সুষম করেছেন। তিনি যেভাবে চেয়েছেন, সেভাবেই তোমাকে গঠন করেছেন।’ (সুরা : আল-ইনফিতার. আয়াত : ৭-৮)

মানুষের স্বভাব আল্লাহকে চিনতে প্রস্তুত
ঈমান কোনো আকস্মিক ধারণা নয়; বরং এটি অন্তরের একটি মূল স্বভাব। মানুষ আল্লাহকে চেনার স্বাভাবিক প্রবণতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। আল্লাহ বলেন, ‘এটাই আল্লাহর সেই স্বভাব, যার ওপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা : আর-রুম, আয়াত : ৩০)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক শিশু ফিতরাতের ওপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদি, খ্রিস্টান অথবা অগ্নিপূজক বানায়।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

তাই যখন ভয় তীব্র হয়, যখন বিপদ-সংকট নেমে আসে, যখন কঠিন পরীক্ষা আসে—তখন মানুষের অন্তরের পর্দাগুলো সরে যায় এবং তার প্রকৃত স্বভাব প্রকাশ পায়। তখন সে কী বলে? সে বলে—‘হে আমার রব! হে আল্লাহ!’ এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যখন তারা নৌযানে আরোহণ করে, তখন তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে ডাকে। অতঃপর তিনি যখন তাদের স্থলে পৌঁছে দেন, তখন তারা আবার শিরক করে।’ (সুরা : আল-আনকাবুত, আয়াত : ৬৫)

আল্লাহ আমাদের উদ্দেশ্যহীনভাবে ছেড়ে দেননি
যদি মানুষ কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া সৃষ্টি হতো, তাহলে তার জীবন হতো এক বিভ্রান্তি। তখন সত্য ও মিথ্যার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকত না। কিন্তু আল্লাহর রহমত ও প্রজ্ঞা এ কথা অনুমোদন করে না যে তিনি আমাদের সৃষ্টি করবেন এবং কোনো পথনির্দেশ ছাড়াই ছেড়ে দেবেন। আল্লাহ বলেন, ‘আমি রাসুলদের সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে পাঠিয়েছি, যাতে রাসুলদের পরে মানুষের জন্য আল্লাহর বিরুদ্ধে কোনো অজুহাত না থাকে।’ (সুরা : আন-নিসা, আয়াত : ১৬৫)

তিনি রাসুল পাঠিয়েছেন, কিতাব নাজিল করেছেন এবং সর্বশেষে মুহাম্মদ (সা.)-কে পাঠিয়েছেন। তাঁর                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                      মাধ্যমে দিয়েছেন মহান কোরআন—যা হলো আলো, হেদায়েত ও শেফা। আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ! তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে প্রমাণ এসেছে এবং আমি তোমাদের প্রতি সুস্পষ্ট আলো নাজিল করেছি।’ (সুরা : আন-নিসা, আয়াত : ১৭৪)

কোরআন হলো আল্লাহকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার গ্রন্থ। জীবনের উদ্দেশ্য বুঝিয়ে দেওয়ার গ্রন্থ। ভুল ধারণা সংশোধনের গ্রন্থ; ন্যায় প্রতিষ্ঠার গ্রন্থ এবং আত্মাকে পবিত্র করার গ্রন্থ। এটিই মানুষকে ঈমানের পথে নিয়ে যায়।

ইবাদত মানুষকে তার প্রকৃত অবস্থানে ফিরিয়ে দেয়
আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ! তোমরা তোমাদের সেই রবের ইবাদত কর, যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা : আল-বাকারাহ, আয়াত : ২১)

আল্লাহ ইবাদতের সঙ্গে সৃষ্টির সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই তোমার আনুগত্যের সর্বাধিক অধিকারী। যিনি তোমাকে রিজিক দিয়েছেন, তিনিই তোমার আশা করার সর্বাধিক যোগ্য। যিনি তোমার সব বিষয় পরিচালনা করেন, তাঁর ওপরই তোমার ভরসা করা উচিত।

ইবাদত মানে হলো অন্তরকে তার সঠিক স্থানে ফিরিয়ে আনা। তোমার হৃদয় আল্লাহর সঙ্গে থাকবে, প্রবৃত্তির সঙ্গে নয়। তোমার আশা আল্লাহর কাছে থাকবে; মানুষের কাছে নয়। তোমার নির্ভরতা আল্লাহর ওপর থাকবে; শুধু উপকরণের ওপর নয়। তাই আল্লাহ বলেন, ‘জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা : আর-রাদ, আয়াত : ২৮)

ঈমান অন্তরকে সংশোধন করে, ফলে বাহ্যিক আচরণ সুন্দর হয়। ঈমান বিবেককে পবিত্র করে, ফলে চরিত্র সঠিক হয়। ঈমান মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে মানুষের রবের দাসত্বে নিয়ে যায়।

হে আল্লাহ! দুনিয়া ও তার সবকিছুর চেয়ে ঈমানকে আমাদের কাছে বেশি প্রিয় করে দিন।

সময়ের আবর্তন মুমিনকে সচেতন করে তোলে

ইসলামী জীবন ডেস্ক
সময়ের আবর্তন মুমিনকে সচেতন করে তোলে
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস ধন-সম্পদ, ক্ষমতা, সৌন্দর্য কিংবা খ্যাতি নয়; বরং মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো সময়। কারণ হারিয়ে যাওয়া সম্পদ ফিরে পাওয়া যায়, কিন্তু চলে যাওয়া একটি মুহূর্তও কখনো ফিরে আসে না। দিন ও রাতের অবিরাম আবর্তন, মাস ও বছরের পরিবর্তন, শৈশব থেকে যৌবন এবং যৌবন থেকে বার্ধক্যের দিকে ধাবিত হওয়া—এসব আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে আমরা এই পৃথিবীতে স্থায়ী নই; বরং একটি নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে দ্রুত এগিয়ে চলেছি।

প্রতিটি সূর্যোদয় যেন আমাদের জীবনের একটি নতুন পৃষ্ঠা খুলে দেয় এবং প্রতিটি সূর্যাস্ত সেই পৃষ্ঠার হিসাব বন্ধ করে দেয়। তাই একজন সচেতন মুমিনের জন্য সময়ের প্রবাহ শুধু ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন নয়; বরং এটি আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এক গুরুত্বপূর্ণ আহবান। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, আর প্রত্যেক ব্যক্তি যেন লক্ষ করে যে আগামীকালের জন্য সে কী প্রেরণ করেছে।’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ১৮)

সময়ের আবর্তনে মানুষের জন্য শিক্ষা
আল্লাহ তাআলা এই পৃথিবীকে পরিবর্তনের ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সুখের পর দুঃখ, দুঃখের পর সুখ, শক্তির পর দুর্বলতা, যৌবনের পর বার্ধক্য এবং জীবনের পর মৃত্যু—এসবই আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা অবশ্যই এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় উত্তীর্ণ হবে।’ (সুরা : ইনশিকাক, আয়াত : ১৯)

একটি ঋতু আসে, মানুষ তার জন্য প্রস্তুতি নেয়; একটি ঈদ আসে, মানুষ আনন্দে মেতে ওঠে; কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সবকিছু অতীত হয়ে যায়। যারা একদিন একত্র ছিল, তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যে ঘর একদিন মানুষের কোলাহলে মুখর ছিল, তা একদিন নীরব হয়ে যায়। এভাবেই জীবন আমাদের শিক্ষা দেয় যে এই পৃথিবী চিরস্থায়ী আবাস নয়; বরং এটি পরীক্ষার ক্ষেত্র।

দিন-রাতের পরিবর্তনে আল্লাহর নিদর্শন
যারা চিন্তাশীল, তারা দিন ও রাতের পরিবর্তনের মধ্যে আল্লাহর অসংখ্য নিদর্শন দেখতে পায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে এবং দিন ও রাতের পরিবর্তনে বোধসম্পন্ন লোকদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৯০)

এরপর আল্লাহ তাঁদের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন, ‘যারা দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৯১)
সুতরাং প্রকৃত মুমিন সময়ের পরিবর্তন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং নিজের আমল পর্যালোচনা করে।

নতুন হিজরি বছর আত্মসমালোচনার সময়
একটি বছর চলে গেছে, আরেকটি বছর শুরু হয়েছে। এ সময়টি শুধু নতুন ক্যালেন্ডারের সূচনা নয়; বরং নতুন জীবন গড়ার একটি সুবর্ণ সুযোগ। এই সময়ে একজন মুমিন নিজেকে প্রশ্ন করতে পারে—গত বছরে আমি কী অর্জন করেছি? আমার সালাত, তিলাওয়াত ও ইবাদতের অবস্থা কেমন ছিল? আমি কত মানুষের উপকার করেছি? কত পাপ থেকে তাওবা করেছি? যদি আজ আমার মৃত্যু হয়, আমি কি প্রস্তুত? আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যেদিন প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃত ভালো ও মন্দ কাজ সামনে উপস্থিত পাবে।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৩০)

তাই নতুন বছরের সূচনা হওয়া উচিত আন্তরিক তাওবা, ইস্তিগফার এবং নেক আমলের দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমে।

ডিজিটাল যুগে সময় অপচয়ের ভয়াবহতা
বর্তমান যুগে মানুষের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো সময়ের অপচয়। হাতে থাকা স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষের অজান্তেই তার জীবনের অমূল্য মুহূর্তগুলো গ্রাস করছে। দিন-রাত স্ক্রিনের সামনে কাটতে কাটতে অনেকেই ভুলে যাচ্ছে—কোরআন তিলাওয়াত, জ্ঞানার্জন, পরিবারকে সময় দেওয়া, আত্মউন্নয়ন, সমাজ ও উম্মাহর জন্য কাজ করা ইত্যাদি। একটি নোটিফিকেশন থেকে আরেকটি ভিডিও, একটি সংবাদ থেকে আরেকটি বিতর্ক—এভাবেই মূল্যবান জীবন ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে বেশির ভাগ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত্ত—সুস্বাস্থ্য ও অবসর সময়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪১২)

অতএব, আসুন আমরা আমাদের অতীত ভুলত্রুটির জন্য আন্তরিকভাবে তাওবা করি, মহররম ও আশুরার ফজিলতপূর্ণ আমলগুলো পালন করি, সময়ের সঠিক ব্যবহার করি এবং ডিজিটাল বিভ্রান্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আমরা যেন প্রতিটি দিনকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি নতুন সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সময়ের মূল্য উপলব্ধি করার, নেক আমলে জীবনকে সমৃদ্ধ করার এবং উত্তম পরিণতি লাভের তাওফিক দান করুন। আমিন।

আজকের নামাজের সময়সূচি, ২৪ জুন ২০২৬

অনলাইন ডেস্ক
আজকের নামাজের সময়সূচি, ২৪ জুন ২০২৬

আজ বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ১০ আষাঢ় ১৪৩৩, ৮ মহররম, ১৪৪৮।

ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি নিম্নরূপ—

জোহরের সময় শুরু ১২টা ০৪ মিনিটে।

আসরের সময় শুরু ৪টা ৪০ মিনিটে।

মাগরিব ৬টা ৫৩ মিনিটে।

এশার সময় শুরু ৮টা ১৯ মিনিটে।

আগামীকাল ফজর শুরু ৩টা ৪৭ মিনিটে 

আজ ঢাকায় সূর্যাস্ত ৬টা ৪৯ মিনিটে এবং আগামীকাল সূর্যোদয় ৫টা ১২ মিনিটে।

সূত্র : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা।

মৃত্যুর পরও সদকায়ে জারিয়ার মাধ্যমে সওয়াব লাভের ১০ উপায়

মুফতি ওমর বিন নাছির
মৃত্যুর পরও সদকায়ে জারিয়ার মাধ্যমে সওয়াব লাভের ১০ উপায়
সংগৃহীত ছবি

দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আখিরাত চিরস্থায়ী। একজন বুদ্ধিমান মুমিন সেই ব্যক্তি, যিনি মৃত্যুর আগেই নিজের জন্য এমন কিছু আমল রেখে যান যা কবরের অন্ধকারেও তার জন্য নূর হয়ে থাকবে। একটি মসজিদ, একটি নলকূপ, একটি কোরআন, একটি গাছ কিংবা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—এসব ছোট উদ্যোগও হতে পারে অনন্ত সওয়াবের উৎস। আর মানুষের জীবনের সবচেয়ে নিশ্চিত সত্য হলো মৃত্যু। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৮৫)

মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষের আমলের খাতা বন্ধ হয়ে যায়। তবে ইসলামের সৌন্দর্য হলো, কিছু নেক আমল এমন আছে যার সওয়াব মৃত্যুর পরও অব্যাহতভাবে পৌঁছাতে থাকে। এগুলোকে বলা হয় সদকায়ে জারিয়া বা চলমান সদকা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়; তবে তিনটি আমল বন্ধ হয় না— সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৬৩১)
তাই একজন দূরদর্শী মুমিনের উচিত এমন কিছু নেক কাজ করে যাওয়া, যা মৃত্যুর পরও তার আমলনামায় সওয়াবের ধারা অব্যাহত রাখবে।


১. মসজিদ নির্মাণে সহযোগিতা
মসজিদ আল্লাহর ঘর। যারা মসজিদ নির্মাণে অংশগ্রহণ করে, তাদের জন্য জান্নাতে বিশেষ পুরস্কারের ঘোষণা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একটি মসজিদ নির্মাণ করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৫০)
একটি মসজিদে যতদিন নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত ও ইবাদত চলবে, ততদিন নির্মাণকারীর সওয়াবও চলতে থাকবে।

২. বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা
পানি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। তৃষ্ণার্ত মানুষ বা প্রাণীর জন্য পানির ব্যবস্থা করা অন্যতম শ্রেষ্ঠ সদকা। রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কোন সদকা সবচেয়ে উত্তম? তিনি বলেন, ‘পানি পান করানো।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৬৮১)
নলকূপ, গভীর নলকূপ, পানির ট্যাংক বা কূপ খনন করে অসংখ্য মানুষের উপকার করা যায়। যতদিন মানুষ সেই পানি ব্যবহার করবে, ততদিন সওয়াব চলতে থাকবে।

৩. কোরআন ও দ্বীনি জ্ঞান প্রচার
জ্ঞান এমন এক সম্পদ যা মৃত্যুর পরও মানুষের উপকার করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে?’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৯)
কোরআন মাজিদ, হাদিসের বই, ইসলামী সাহিত্য কিংবা দ্বীনি শিক্ষা প্রসারের জন্য অর্থ ব্যয় করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ কাজ। কেউ সেই জ্ঞান থেকে উপকৃত হলে তার সওয়াব দানকারীর কাছেও পৌঁছায়।

৪. বৃক্ষরোপণ করা
গাছ মানুষের খাদ্য, অক্সিজেন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। ইসলামে বৃক্ষরোপণকে সদকা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলিম যদি একটি গাছ লাগায়, অতঃপর মানুষ, পাখি বা প্রাণী তা থেকে খায়, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩২০)
ফলদ, ঔষধি কিংবা বনজ গাছ রোপণ দীর্ঘমেয়াদি সওয়াবের মাধ্যম হতে পারে।

৫. মাদ্রাসা, স্কুল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা
শিক্ষা একটি জাতির উন্নতির ভিত্তি। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা বা পরিচালনায় সহায়তা করা অত্যন্ত মূল্যবান সদকায়ে জারিয়া। যেখানে কোরআন শিক্ষা, দ্বীনি জ্ঞান বা উপকারী শিক্ষা অর্জিত হবে, সেখানে প্রতিটি উপকারের অংশ প্রতিষ্ঠাতার আমলনামায় যুক্ত হতে থাকবে।

৬. হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবায় সহযোগিতা
অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা ও সেবায় অংশ নেওয়া ইসলামে মহৎ কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের একটি কষ্ট দূর করে দেয়, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার একটি কষ্ট দূর করে দেবেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৯৯)
হাসপাতাল নির্মাণ, অ্যাম্বুলেন্স দান, চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রদান কিংবা দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা সহায়তা—সবই সদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

৭. কবরস্থানের জন্য জমি দান
মুসলমানদের দাফনের জন্য জমি ওয়াকফ বা দান করা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যাণমূলক কাজ। যতদিন সেই জমি মুসলমানদের দাফনের কাজে ব্যবহৃত হবে, ততদিন দানকারীর জন্য সওয়াব অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ।

৮. রাস্তা, সেতু বা মুসাফিরখানা নির্মাণ
মানুষের চলাচল সহজ করার জন্য রাস্তা, সেতু, বিশ্রামাগার বা মুসাফিরখানা নির্মাণ করা সমাজের জন্য বড় উপকার। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা কল্যাণকর কাজ করো, যাতে সফল হতে পারো।’ (সুরা : হাজ্জ, আয়াত : ৭৭)
প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এসব সুবিধা ব্যবহার করে উপকৃত হয়, আর দানকারীর আমলনামায় সওয়াব জমা হতে থাকে।

৯. খাল, পুকুর বা নদী খনন
কৃষিকাজ, পানীয় জল ও পরিবেশ রক্ষার জন্য খাল, পুকুর বা জলাধার খনন অত্যন্ত উপকারী কাজ। এটি বহু মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করে এবং দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ বয়ে আনে। তাই এটিও সদকায়ে জারিয়ার অন্যতম মাধ্যম।

১০. জীবন রক্ষাকারী সহায়তা ও রক্তদান
রক্তদানের মাধ্যমে একজন মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব। ইসলামে মানুষের জীবন রক্ষা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে একজন মানুষের জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল।’ (সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ৩২)
যদিও রক্তদান ক্লাসিক অর্থে সবসময় সদকায়ে জারিয়ার উদাহরণ নয়, তবে এটি মহান সদকা ও মানবসেবামূলক কাজ। আর যদি কেউ স্থায়ীভাবে রক্তব্যাংক, চিকিৎসা প্রকল্প বা জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলেন, তাহলে তা সদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

এছাড়া আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ সদকায়ে জারিয়া হলো- এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করা, হিফজখানা বা কোরআন শিক্ষা কেন্দ্র চালু করা, ইসলামী দাওয়াহ কার্যক্রমে সহায়তা করা, ওয়াকফ সম্পত্তি দান করা, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান করা এবং উপকারী ইসলামী বই রচনা ও প্রকাশ করা ইত্যাদি। 

তাই আসুন, আমরা নিজেদের জন্য এবং আমাদের মৃত বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন ও প্রিয়জনদের নামে সদকায়ে জারিয়ার ব্যবস্থা করি। কারণ মৃত্যুর পর মানুষ যখন একা হয়ে যায়, তখন তার নেক আমলই হয় সবচেয়ে বড় সঙ্গী। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এমন আমল করার তাওফিক দান করুন, যার সওয়াব মৃত্যুর পরও অব্যাহতভাবে আমাদের আমলনামায় পৌঁছাতে থাকবে। আমিন।

লেখক : আলেম ও সাংবাদিক


 

রমাদানের শেষ দশক ইবাদতের শ্রেষ্ঠ সময় | কালের কণ্ঠ