• ই-পেপার

আজকের নামাজের সময়সূচি, ২ জানুয়ারি ২০২৬

ইসলামী আইনের চোখে

হালালা সেন্টার ও হিল্লা বিয়ে

ড. মুহাম্মদ তাজাম্মুল হক
হালালা সেন্টার ও হিল্লা বিয়ে
সংগৃহীত ছবি

হালালা বলতে আরবি ‘তাহলিল’কে বোঝানো হয়। এটি ইসলামের একটি বিশেষ বিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা তিন তালাকের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর চূড়ান্ত বিচ্ছেদের পর তাদের পুনরায় একত্র হওয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

জাহেলি যুগে পুরুষরা স্ত্রীকে অসংখ্যবার তালাক দিত, তালাক দেওয়ার পর আবার ফিরিয়ে নিত, কিংবা দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে ঝুলিয়ে রাখত। এটি ছিল পুরুষের স্বেচ্ছাচারিতার বহিঃপ্রকাশ। ইসলাম এই অপব্যবহার রোধে তালাকের ক্ষেত্রে সীমারেখা নির্ধারণ করেছে। পবিত্র কোরআনে ন্যূনতম দুইবারে তালাক প্রদানের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

দ্বিতীয় তালাকের পর পারিবারিক পর্যায়ে ‘ইসলাহ’ (সংশোধন) ও ‘সুলহ’ (সমন্বয়) প্রচেষ্টার নীতি প্রদান করেছে। তিন তালাককে চূড়ান্ত বিচ্ছেদ হিসেবে গণ্য করেছে। এর মাধ্যমে বিয়ের দায়িত্বশীলতা ও পারিবারিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং পুরুষকে তালাক উচ্চারণে সতর্ক করা হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহর কাছে হালাল বিষয়সমূহের মধ্যে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হলো তালাক। (আবু দাউদ, আস-সুনান : ২১৭৮)

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তথাকথিত ‘হালালা সেন্টার’ প্রতিষ্ঠার প্রচারণা এবং হালালার জন্য প্রার্থীদের সিভি আহবান করার মতো ঘটনাগুলো শরিয়াহর এই বিধানকে ভয়াবহভাবে বিকৃত করেছে।

হালালা কী
কোনো স্বামী যদি তার স্ত্রীকে তিন তালাক প্রদান করে, তাহলে স্ত্রী তার জন্য হারাম হয়ে যায়। এ অবস্থায় তারা পুনরায় একত্র হতে চাইলে স্ত্রীকে অন্য একজন পুরুষের সঙ্গে স্বাভাবিক ও প্রকৃত বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে। যদি দ্বিতীয় বিবাহ স্বাভাবিক কারণে—যেমন তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর মাধ্যমে শেষ হয়ে যায়, তাহলে ইদ্দত অতিবাহিত হওয়ার পর প্রথম স্বামীর সঙ্গে নতুন মোহর ও নতুন আকেদর মাধ্যমে পুনর্বিবাহ করা বৈধ হবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতঃপর যদি সে তাকে (তৃতীয়বার) তালাক দেয়, তাহলে সে তার জন্য হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য স্বামীকে বিয়ে করে।

অতঃপর যদি দ্বিতীয় স্বামী তাকে তালাক দেয়, তাহলে তারা যদি মনে করে যে আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করতে পারবে, তাহলে তাদের পুনরায় একত্র হওয়ার মধ্যে কোনো গুনাহ নেই।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৩০)

কখন হালালার প্রসঙ্গ আসবে
১. তিন তালাকের পর : প্রথম বা দ্বিতীয় তালাকের ক্ষেত্রে ইদ্দতের মধ্যে স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারে। সেখানে হালালার কোনো প্রশ্নই আসে না। তিন তালাকের মাধ্যমে বায়িন বা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর পুনরায় সংসার করার প্রসঙ্গ এলে হালালার বিষয় আসবে।

২. স্বাভাবিক দ্বিতীয় বিবাহ : দ্বিতীয় বিবাহটি বাস্তব ও স্বাভাবিক হতে হবে। শুধু প্রথম স্বামীর কাছে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে নামমাত্র বিয়ে শরিয়াহসম্মত নয়।

৩. স্বাভাবিক দ্বিতীয়বার বিবাহবিচ্ছেদ : দ্বিতীয় বিবাহ স্বাভাবিকভাবে স্বামীর মৃত্যু কিংবা তালাকের মাধ্যমে শেষ হতে হবে। পূর্বপরিকল্পিত বিচ্ছেদ গ্রহণযোগ্য নয়।

৪. নতুন বিবাহ ও মোহর : প্রথম স্বামীর সঙ্গে পুনর্বিবাহের জন্য নতুন আক্দ ও মোহর আবশ্যক।

হালালা মেকানিজম : পরিকল্পিত হালালা কেন নিষিদ্ধ?
এখানেই সবচেয়ে বড় ভুল-বোঝাবুঝি দেখা যায়। ইসলামী শরিয়াহ হালালার জন্য কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়নি; বরং একটি স্বাভাবিক দ্বিতীয় বিবাহের পরিণতিতে যদি উপরোক্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখনই শুধু পুনর্বিবাহের অনুমতি দিয়েছে।

কিন্তু যদি শুরু থেকেই এই শর্ত আরোপ করা হয় যে দ্বিতীয় ব্যক্তি নারীকে বিয়ে করবে, মিলিত হবে এবং পরে তালাক দিয়ে দেবে, যাতে সে প্রথম স্বামীর জন্য হালাল হয়ে যায়, তাহলে এটি ‘নিকাহে তাহলিল’, যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি হালালা করে এবং যার জন্য হালালা করা হয়, উভয়ের ওপর আল্লাহর লানত। (আত-তিরমিজি, আস-সুনান : ১১১৯)

অন্য এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, আমি কি তোমাদের ধার করা ষাঁড় সম্পর্কে জানাব না? সাহাবিরা বললেন, অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসুল! তিনি বললেন, সে হলো হালালাকারী ব্যক্তি। আল্লাহ লানত করেছেন হালালা সম্পাদনকারী এবং যার জন্য তা করা হয়। (ইবনে মাজাহ, আস-সুনান : ১৯৩৬)

অতএব, নারীকে প্রথম স্বামীর জন্য হালাল করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে কোনো বন্ধু, আত্মীয় কিংবা অন্য কাউকে দিয়ে এক রাত কিংবা কিছুদিন বা মাসের জন্য বিয়ে দেওয়া এবং পরে তালাকের ব্যবস্থা করা শরিয়াহর দৃষ্টিতে জঘন্য প্রতারণা। এটি বিবাহের পবিত্রতাকে উপহাসে পরিণত করে। নবীজি (সা.)-এর ভাষায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দৃষ্টান্ত ‘ধার করা ষাঁড়’।

পরিকল্পিত হালালা সম্পর্কে ফিকহি অবস্থান
চার মাজহাবের ফকিহরা এ বিষয়ে একমত যে পূর্বপরিকল্পিত হালালা হারাম।
ক. হানাফি মাজহাব : এ ধরনের শর্তযুক্ত বিবাহ নিকৃষ্ট ও গুনাহর কাজ। (ইবন হুমাম, ফাতহুল কাদির : ৩/২১০)

খ. মালিকি মাজহাব : উদ্দেশ্য যদি তাহলিল হয়, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য নয়। (আশ-শাফিঈ, আল-উম্ম : ৫/১৫৫)

গ. শাফেয়ি মাজহাব : শর্তযুক্ত তাহলিল শরিয়াহর উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। (মালিক, মুয়াত্তা : ২/৫৮৫)

ঘ. হাম্বলি মাজহাব : পরিকল্পিত হালালা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। (ইবনে কুদামা, আল-মুগনি : ৭/৩৪৫)

ফলে উপরোক্ত উদ্দেশ্য পূরণে শরিয়াহ হালালা নামক কোনো প্রতিষ্ঠান, কেন্দ্র বা পেশাদার সেবা চালু করার অনুমতি প্রদান করে না। বরং এমন আয়োজন শরিয়াহর বিধানকে বিকৃত করে এবং বিবাহকে খেলায় পরিণত করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তথাকথিত ‘হালালা সেন্টার’, ‘হালালার জন্য পাত্র প্রয়োজন’, কিংবা ‘সিভি জমা দিন’ ধরনের প্রচারণা ইসলামী শিক্ষার চরম অপব্যাখ্যা।

ইসলামী শরিয়াহর উদ্দেশ্য হচ্ছে, তিন তালাককে ভয়াবহ পরিণতি উল্লেখ করে তালাকের বিষয়ে নিরুৎসাহ করা; এটিকে পাশ কাটিয়ে ‘হালালা মেকানিজম’ তৈরি করা নয়। তাই তালাকের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা অবলম্বন করা এবং ইসলামী শরিয়াহকে কৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা থেকে বিরত থাকাই একজন মুসলিমের কর্তব্য।

লেখক : অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

 

আজকের নামাজের সময়সূচি, ১১ জুন ২০২৬

অনলাইন ডেস্ক
আজকের নামাজের সময়সূচি, ১১ জুন ২০২৬

আজ বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, ২৪ জিলহজ ১৪৪৭।

ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি নিম্নরূপ—

জোহরের সময় শুরু ১২টা ০২ মিনিটে।

আসরের সময় শুরু ৪টা ৩৮ মিনিটে।

মাগরিব ৬টা ৫০ মিনিটে।

এশার সময় শুরু ৮টা ১৬ মিনিটে।

আগামীকাল ফজর শুরু ৩টা ৪৬ মিনিটে 

আজ ঢাকায় সূর্যাস্ত ৬টা ৪২ মিনিটে এবং আগামীকাল সূর্যোদয় ৫টা ১১ মিনিটে।

সূত্র : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা।

দাঁতের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে দাঁত সোজা করা কি বৈধ

মুফতি ওমর বিন নাছির
দাঁতের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে দাঁত সোজা করা কি বৈধ
সংগৃহীত ছবি

মানুষ স্বভাবগতভাবেই সৌন্দর্যপ্রিয়। সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি জীবনযাপন মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। ইসলামও মানুষের এই স্বাভাবিক চাহিদাকে অস্বীকার করেনি; বরং সৌন্দর্য, পরিচ্ছন্নতা ও শোভনতার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছে। তবে ইসলামে সৌন্দর্যচর্চার ক্ষেত্রেও কিছু নীতিমালা রয়েছে, যাতে মানুষ সৌন্দর্যের নামে আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা অতিক্রম না করে। আধুনিক যুগে দাঁতের বিভিন্ন সমস্যা দূর করতে এবং দাঁতের স্বাভাবিক গঠন ঠিক রাখতে ব্রেস বা অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতির ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—দাঁতের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য দাঁত সোজা করা কি শরিয়তসম্মত?

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সর্বোত্তম অবয়বে সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা : তিন, আয়াত : ৪)

অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে আদমসন্তান! তোমরা প্রত্যেক ইবাদতের সময় তোমাদের সৌন্দর্য ও শোভা গ্রহণ করো।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৩১)


এসব আয়াত থেকে বোঝা যায় যে ইসলাম মানুষের পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। তবে এই সৌন্দর্যচর্চা হতে হবে বৈধ ও শরিয়তসম্মত সীমার মধ্যে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৯১)

এই হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয় যে বৈধ উপায়ে সৌন্দর্য অর্জন ও পরিচ্ছন্ন থাকা ইসলামের দৃষ্টিতে প্রশংসনীয় কাজ। তবে একই সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন কিছু কৃত্রিম সৌন্দর্যচর্চার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন, যা আল্লাহর সৃষ্টিকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে পরিবর্তন করার শামিল। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ওইসব নারীর ওপর লানত করেছেন যারা সৌন্দর্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে দাঁতের মাঝে কৃত্রিম ফাঁক সৃষ্টি করে এবং এভাবে আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন আনে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৩১; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২১২৫)

কিন্তু এই হাদিসের অর্থ বুঝতে হলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ করতে হবে। হাদিসে নিষিদ্ধ করা হয়েছে স্বাভাবিক দাঁতকে কৃত্রিমভাবে পরিবর্তন করে নতুন ধরনের সৌন্দর্য সৃষ্টি করাকে। এখানে চিকিৎসা, রোগ নিরাময় বা জন্মগত ত্রুটি সংশোধনের কথা বলা হয়নি। তাই ইসলামী আইনবিদগণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, কোনো শারীরিক ত্রুটি দূর করা, বিকৃতি সংশোধন করা কিংবা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য চিকিৎসা গ্রহণ করা নিষিদ্ধ নয়।

প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী (রহ.) লিখেছেন, ‘যেসব চিকিৎসা বা ওষুধ মুখমণ্ডলের দাগ দূর করে এবং চেহারাকে সুন্দর করে, সেগুলোতে কোনো বাধা নেই।’ (উমদাতুল কারি, ১৪/১৭৯)

একইভাবে ইমাম নববি (রহ.) ব্যাখ্যা করেছেন যে, যদি কোনো পরিবর্তন চিকিৎসা বা ত্রুটি দূর করার উদ্দেশ্যে হয়, তাহলে তা নিষিদ্ধ নয়; বরং বৈধ।

এসব মূলনীতির আলোকে দাঁত অত্যধিক বাঁকা হলে, উঁচু-নিচু হলে, চোয়ালের গঠনগত সমস্যার কারণে দাঁত বিক্ষিপ্ত হয়ে গেলে, খাওয়া-দাওয়া বা কথা বলায় অসুবিধা সৃষ্টি হলে কিংবা মুখমণ্ডলের স্বাভাবিক সৌন্দর্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হলে ব্রেস বা অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে দাঁত সোজা করা সম্পূর্ণ জায়েজ। কারণ এটি আল্লাহর সৃষ্টিকে বিকৃত করার উদ্দেশ্যে নয়; বরং বিদ্যমান ত্রুটি সংশোধন এবং স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা।

অতএব বলা যায়, কোনো দাঁত যদি অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং তা সংশোধনের জন্য ব্রেস বা আধুনিক দন্তচিকিৎসার আশ্রয় নেওয়া হয়, তাহলে শরিয়তের দৃষ্টিতে এতে কোনো বাধা নেই। বরং এটি চিকিৎসার অন্তর্ভুক্ত একটি বৈধ ব্যবস্থা। কারণ ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক সৌন্দর্য সমর্থন করে এবং মানুষের কষ্ট ও ত্রুটি দূর করার পথকে সহজ করে দেয়। এটাই ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবমুখী সৌন্দর্যবোধের এক অনন্য উদাহরণ।

ইসলামে একাধিক বিয়ের ক্ষেত্রে যেসব বিষয় লক্ষণীয়

মুফতি ওমর বিন নাছির
ইসলামে একাধিক বিয়ের ক্ষেত্রে যেসব বিষয় লক্ষণীয়
সংগৃহীত ছবি

বর্তমান যুগে ‘একাধিক বিবাহ’ বা ‘বহুবিবাহ’ শব্দটি অনেকের কাছে যেন একটি রোমান্টিক কল্পনা, ব্যক্তিগত ভোগবিলাস কিংবা সীমাহীন চাহিদা পূরণের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ কেউ ইসলামের মহান বিধানকে নিজেদের প্রবৃত্তির হাতিয়ার বানিয়ে এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন একাধিক বিয়ে করা মানেই পুরুষত্বের গৌরব বা বিশেষ সফলতা! অথচ ইসলাম কখনোই বহুবিবাহকে ফ্যান্টাসি, খেল-তামাশা বা কামনার স্বাধীন লাইসেন্স হিসেবে দেয়নি। বরং এটি একটি দায়িত্বপূর্ণ সামাজিক বিধান, যা নির্দিষ্ট পরিস্থিতি, ইনসাফ, তাকওয়া ও জবাবদিহির ভিত্তিতে অনুমোদিত হয়েছে। আর ইসলাম বহুবিবাহকে ‘অনুমতি’ দিয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে কঠোর শর্তও আরোপ করেছে। এমনকি ন্যায়বিচার করতে না পারার আশঙ্কা থাকলে একজন স্ত্রীতে সীমাবদ্ধ থাকার নির্দেশ দিয়েছে। সমাজে বিধবা, এতিম, অসহায় নারী, যুদ্ধ-পরবর্তী সংকট কিংবা পারিবারিক বিশেষ সমস্যার সমাধানে এটি কল্যাণকর হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা নারীদের মধ্য থেকে যাদের ভালো লাগে তাদের বিয়ে করো—দুই, তিন বা চার পর্যন্ত। তবে যদি আশঙ্কা করো যে ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তাহলে একটিই।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৩)

লক্ষণীয় বিষয় হলো, আল্লাহ তায়ালা বহুবিবাহের অনুমতির সঙ্গে সঙ্গে ‘ন্যায়বিচার’কে প্রধান শর্ত বানিয়েছেন। অর্থাৎ এখানে প্রবৃত্তির স্বাধীনতা নয়; বরং দায়িত্বশীলতা ও ইনসাফই মুখ্য। আর ইনসাফহীন বহুবিবাহ ভয়ংকর গুনাহ। অনেক মানুষ বহুবিবাহের স্বপ্ন দেখে, কিন্তু স্ত্রীদের হক, মানসিক নিরাপত্তা, ভরণপোষণ ও সময় বণ্টনের কথা ভাবে না। অথচ ইসলাম এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর। মহানবী (সা.)  বলেছেন, ‘যার দুই স্ত্রী আছে, অতঃপর সে একজনের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে (অন্যজনের প্রতি অবিচার করে), সে কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় আসবে যে তার শরীরের এক পাশ বাঁকা থাকবে।’ (নাসায়ি, হাদিস নং : ৩৯৫২, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২১৩৩)

আজকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই বহুবিবাহকে হাস্যরস, ট্রেন্ড কিংবা পুরুষের ‘ফ্যান্টাসি’ হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু একজন মুমিনের জীবন প্রবৃত্তি দ্বারা পরিচালিত হয় না; বরং তাকওয়া দ্বারা পরিচালিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি তার রবের সামনে দাঁড়ানোর ভয় করেছে এবং প্রবৃত্তিকে দমন করেছে, জান্নাতই হবে তার আবাসস্থল।’ (সুরা : নাজিয়াত, আয়াত : ৪০-৪১)

সুতরাং ইসলাম মানুষকে কামনার পেছনে ছুটতে শেখায় না; বরং নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়। অনেক সময় দেখা যায়, একজন ব্যক্তি দ্বিতীয় বিয়ের স্বপ্নে বিভোর; অথচ প্রথম স্ত্রীর হক আদায়েই সে ব্যর্থ। সংসারের খরচ, মানসিক যত্ন, সন্তানের দায়িত্ব—সব কিছু অবহেলিত হয়। তাইতো মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।’ (তিরমিজি, হাদিস নম্বর : ৩৮৯৫)
অতএব, সত্যিকারের দ্বিনদার পুরুষ সে-ই, যে নিজের পরিবারের হক আদায়ে সচেতন।

যদি কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টি, সামাজিক কল্যাণ ও শরিয়তের সীমারেখা রক্ষা করে বহুবিবাহ করে—তবে তা বৈধ ও কখনো কখনো কল্যাণকরও হতে পারে। কিন্তু যদি এটি শুধু সৌন্দর্যপ্রীতি, রোমাঞ্চ, অহংকার বা অস্থির কামনার বহিঃপ্রকাশ হয়, তবে সেই নিয়ত মারাত্মক বিপজ্জনক। কারণ ইসলাম নিয়তের ওপর গুরুত্ব দেয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘সমস্ত আমলের ভিত্তি হলো নিয়ত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর : ১)

ইসলামের বিধানগুলো মানুষের কল্যাণ, পবিত্রতা ও ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রণীত। কিন্তু যখন কোনো বৈধ বিষয়কে মানুষ প্রবৃত্তি, অহংকার কিংবা দুনিয়াবি মোহের উপকরণ বানিয়ে ফেলে, তখন সেই বৈধ বিষয়ও ফিতনা ও অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বহুবিবাহের ক্ষেত্রেও আজ এমনটি ঘটছে। অনেকেই শরিয়তের গভীর উদ্দেশ্য না বুঝে এটিকে ‘পুরুষের স্বাধীনতা’ বা ‘রোমান্টিক কল্পনা’ হিসেবে উপস্থাপন করছেন। ফলে পরিবারে অশান্তি, নারীর প্রতি জুলুম, সন্তানদের মানসিক বিপর্যয় এবং দ্বীনের সৌন্দর্য বিকৃত হচ্ছে। অনেক পুরুষ দ্বিতীয় বিয়ের কথা চিন্তা করলেও প্রথম স্ত্রীর আবেগ, ত্যাগ ও অনুভূতির মূল্যায়ন করে না। অথচ একজন স্ত্রী তার যৌবন, শ্রম, ভালোবাসা ও জীবন একটি সংসারের জন্য ব্যয় করে। ইসলাম তার অনুভূতিকেও গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তাদের সাথে সদাচরণের সাথে জীবনযাপন কর।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৯)

সুতরাং স্ত্রীর মনে অকারণে কষ্ট দেওয়া, তাকে অনিরাপত্তায় ফেলা বা অবমূল্যায়ন করা ইসলাম কখনো সমর্থন করেনা। আর একজন ব্যক্তি যখন ইনসাফ ছাড়া একাধিক বিয়ে করে, তখন তার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীদের মধ্যে থাকে সন্তানরা। পরিবারে ঝগড়া, অবহেলা, আর্থিক সংকট ও মানসিক অস্থিরতা সন্তানদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দেয়। অথচ মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, এবং প্রত্যেককে তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর : ৮৯৩)

অতএব, একজন পিতা যদি নিজের প্রবৃত্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সন্তানদের হক নষ্ট করে, তবে তাকে আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে হবে। বহুবিবাহ শুধু আবেগের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক সামর্থ্যের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। একাধিক পরিবার পরিচালনা করা, সমান ভরণপোষণ নিশ্চিত করা এবং সবার মৌলিক অধিকার পূরণ করা অত্যন্ত কঠিন দায়িত্ব। কেননা অনেকেই দ্বিতীয় বিয়ে করে প্রথম পরিবারের খরচই ঠিকভাবে বহন করতে পারে না। ফলে স্ত্রী ও সন্তানরা কষ্টে জীবনযাপন করে। এটি শরিয়তের উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সচ্ছল ব্যক্তি যেন তার সচ্ছলতা অনুযায়ী ব্যয় করে।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ৭)

আজ অনেকেই মনে করে একাধিক বিয়ের আকাঙ্ক্ষাই যেন ‘পুরুষত্বের’ প্রমাণ। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত শক্তিশালী মানুষ সে নয়, যে নিজের কামনাকে প্রশ্রয় দেয়; বরং সে-ই শক্তিশালী, যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে জয়ী হয়; বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর : ৬১১৪)

ইসলাম বহুবিবাহকে কখনোই ফ্যান্টাসি বা প্রবৃত্তির খেলায় পরিণত করেনি। এটি কোনো পুরুষতান্ত্রিক সীমাহীন ভোগবিলাসের লাইসেন্সও নয়। বরং এটি একটি ভারী আমানত, যার সঙ্গে জড়িত ইনসাফ, তাকওয়া, দায়িত্ববোধ ও কঠিন জবাবদিহি। অতএব, যে ব্যক্তি বহুবিবাহের কথা ভাববে, তাকে আগে নিজের ঈমান, চরিত্র, আর্থিক সামর্থ্য, ন্যায়বিচার ও পারিবারিক দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে ভাবতে হবে। কারণ ইসলাম শুধু ‘বিয়ে করার অনুমতি’ দেয়নি; বরং ‘হক’ আদায়ের বাধ্যবাধকতাও আরোপ করেছে। তাই প্রয়োজন—বহুবিবাহকে ফ্যান্টাসির চশমায় নয়, বরং কোরআন-সুন্নাহর ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিতে দেখা। তাহলেই মানুষ বুঝতে পারবে—ইসলাম কামনার ধর্ম নয়; বরং ন্যায়, সংযম, দায়িত্ব ও পবিত্রতার ধর্ম।

আজকের নামাজের সময়সূচি, ২ জানুয়ারি ২০২৬ | কালের কণ্ঠ