• ই-পেপার

‘ফিলিস্তিনি শিশুদের জীবন কি মূল্যহীন’

ঐতিহাসিক মসজিদে আদদাস

তায়েফের বুকে যে মসজিদ মুসলিমদের জন্য এক টুকরো সান্ত্বনা

ইসলামী জীবন ডেস্ক
তায়েফের বুকে যে মসজিদ মুসলিমদের জন্য এক টুকরো সান্ত্বনা
সংগৃহীত ছবি

ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু স্থান রয়েছে, যেগুলো শুধুমাত্র স্থাপত্যের কারণে নয়, বরং ঈমান, ধৈর্য ও আল্লাহর রহমতের অবিস্মরণীয় স্মৃতির কারণে যুগে যুগে মুসলমানদের হৃদয়ে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। সৌদি আরবের তাইফ শহরে অবস্থিত মসজিদ আদ্দাস তেমনই একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, এখানেই নবী মুহাম্মদ (সা.) তাইফবাসীর নির্মম নির্যাতন ও প্রত্যাখ্যানের পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়েছিলেন। আর এখানেই ঘটে যায় এক হৃদয়স্পর্শী ঘটনা—যা একজন খ্রিস্টান ক্রীতদাসের হৃদয়ে ইসলামের আলো জ্বালিয়ে দেয়।

নবুওয়তের দশম বছরে, মহানবী (সা.) প্রিয় স্ত্রী খাদিজা (রা.) এবং চাচা আবু তালিবের ইন্তেকালের পর ইসলামের দাওয়াত নিয়ে তাইফে যান। কিন্তু সেখানে তিনি প্রত্যাশিত সাড়া তো পানইনি, বরং শহরের প্রভাবশালীরা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে। উসকানি দিয়ে শিশু ও দুর্বৃত্তদের তাঁর পেছনে লেলিয়ে দেওয়া হয়। তারা পাথর নিক্ষেপ করতে করতে তাঁকে শহরের বাইরে বের করে দেয়। এতে তাঁর পবিত্র শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায় এবং জুতা পর্যন্ত রক্তে ভিজে যায়।

মহানবী (সা.) রক্তাক্ত আর ক্লান্ত-শ্রান্ত শরীর নিয়ে শহরের অদূরে অবস্থিহ একটি আঙুর বাগানে আশ্রয় নেন । দূর থেকে তাঁর অবস্থা দেখে বাগানের মালিকরা তাদের খ্রিস্টান ক্রীতদাস আদ্দাস-কে এক থোকা আঙুর দিয়ে তাঁর কাছে পাঠান। আদদাস যখন আঙুরের পাত্র নবীজির সামনে রাখল, তিনি খাওয়ার আগে বললেন, ‘বিসমিল্লাহ্’ (আল্লাহর নামে শুরু করছি)। শুনে আদদাসকে থমকে গেল। তায়েফ বা মক্কার পৌত্তলিকরা এভাবে কথা বলে না। সে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এই উপত্যকার মানুষ তো এমন কথা বলে না। আপনি কে? মহানবী (সা.) পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার আদি বাড়ি কোথায়, তোমার ধর্ম কী?’ আদদাস জবাব দিল, ‘আমি ইরাকের নিনেভা শহরের এক খ্রিষ্টান।’ নিনেভার নাম শুনে নবীজির রক্তাক্ত মুখেও এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তিনি বললেন, ‘তুমি তবে সেই পুণ্যবান নবী ইউনুস ইবনে মাত্তার শহরের লোক!’ আদদাস আরও অবাক, এই মরুভূমির মানুষ ইউনুসের নাম জানার কথা নয়। মহানবী (সা.) বললেন, ‘ইউনুস ছিলেন আমার ভাই। তিনি ছিলেন আল্লাহর নবী, আমিও আল্লাহর নবী।’

এই একটি বাক্য জাগিয়ে তুলল আদদাসের ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা বিশ্বাস। সে বুঝে গেল, সামনে বসা মানুষটি মক্কার কোনো সাধারণ নেতা নন। তিনি সেই শেষ নবী, যাঁর কথা তার নিজের কিতাবেও লেখা আছে। সে নবীজির হাতে, পায়ে, কপালে চুমু খেতে লাগল। দূর থেকে সেই দৃশ্য দেখে উতবা-শাইবা আফসোস করে বলল, ‘সর্বনাশ, লোকটা আমাদের দাসকেও নষ্ট করে দিল!’ ফিরে আসার পর তারা আদদাসকে জিজ্ঞেস করল, কেন সে ওভাবে চুমু খাচ্ছিল। আদদাস দৃঢ়ভাবে জবাব দিল, ‘এই পৃথিবীতে এই মানুষটির চেয়ে উত্তম আর কেউ নেই। তিনি আমাকে এমন এক সত্য বলেছেন, যা একজন নবী ছাড়া কেউ জানতে পারে না।’

এই তাৎক্ষণিক ইসলাম গ্রহণ ছিল তায়েফের সেই অন্ধকার দিনে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এক টুকরো সান্ত্বনা। সেই আঙুর বাগানের জায়গাতেই পরে গড়ে ওঠে একটি মসজিদ—মসজিদে আদদাস। বাহ্যিক ব্যর্থতার আড়ালে আসলে সফলতা লুকিয়ে থাকে। পুরো তায়েফ শহর নবীজিকে তাড়িয়ে দেয়, অথচ আল্লাহ ঠিক তখনই একজন সাধারণ দাসের অন্তর খুলে দেন। তাই আজও তায়েফে যারা বেড়াতে যান, তারা মসজিদ আদদাসের শান্ত পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হন, অস্থির হৃদয়ে সান্ত্বনা লাভ করেন। বুঝতে পারেন, যখন দুনিয়ার সব মানুষ বিপক্ষে চলে যায়, চারপাশ তাড়িয়ে দেয়, তখনও আল্লাহর রহমতের একটা আঙুরের থোকা আর একজন বিশ্বস্ত আদদাস কোথাও না কোথাও অপেক্ষা করে থাকে।

তথ্যসূত্র :  (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খণ্ড ৩, পৃ. ১৩২, সীরাতে ইবনে হিশাম, সিরাতুন নবাবিয়্যাহ, ২/৭১, ইবনুল আসির, আল-কামিল ফিত-তারিখ, খণ্ড ১, পৃ. ৬৬০)

হাদিসের বাণী

ইসলামে আর্থিক স্বচ্ছতা রক্ষায় জবাবদিহিতার নির্দেশ

ইসলামী জীবন ডেস্ক
ইসলামে আর্থিক স্বচ্ছতা রক্ষায় জবাবদিহিতার নির্দেশ
সংগৃহীত ছবি

বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আদি ইবনে উমাইরাহ (রা.)-থেকে বর্ণিত, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমরা কাউকে আমাদের বিভিন্ন কাজে নিয়োগ করি, আর সে যদি সেখান থেকে সুঁই বা তার চেয়ে ছোট জিনিস গোপন করে, তাহলে সেটা খিয়ানত ও চুরি হিসেবে ধর্তব্য হবে। কিয়ামতের দিন সে এই খিয়ানত নিয়ে উপস্থিত হবে। এ কথা শুনে আনসারিদের থেকে একজন কালো ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললেন, (বর্ণনাকারী সাহাবি বলেন) আমি তাকে (এখন) দেখতে পাচ্ছি।

ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনি আমার দায়িত্ব ফিরিয়ে নিন। তিনি বললেন, কেন? কী হয়েছে? সে বলল, আমি আপনাকে এমন-এমন কথা বলতে শুনলাম। তিনি বললেন, আমি এখনো বলছি, যাকে আমরা কোনো কাজে নিয়োগ দিই, সে কম-বেশি যে সম্পদই হোক, তা আমার কাছে উপস্থিত করবে। এরপর সেখান থেকে যা দেওয়া হবে, সে তা-ই গ্রহণ করবে এবং যা দেওয়া হয় না, সেটা থেকে সে বিরত থাকবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস, ৪৭৪৩, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১৭৭২৩)

শিক্ষ ও বিধান
১. আমানত রক্ষা করা ঈমানের দাবি। আর যে ব্যক্তি কোনো দায়িত্ব বা চাকরিতে নিয়োজিত হয়, তার কাছে অর্পিত ছোট-বড় সব সম্পদই আমানত। এতে সামান্য পরিমাণও আত্মসাৎ করা হারাম।

২. সরকারি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ আত্মসাৎ করা বড় গুনাহ। এমনকি সুঁইয়ের মতো তুচ্ছ জিনিসও গোপন করে নেওয়া খিয়ানত ও চুরির অন্তর্ভুক্ত।

৩. কিয়ামতের দিন আত্মসাৎ করা সম্পদসহ হাজির হতে হবে। অন্যায়ভাবে নেওয়া সম্পদ মানুষের জন্য পরকালে লাঞ্ছনা ও শাস্তির কারণ হবে।

৪. দায়িত্বশীল ব্যক্তির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকা আবশ্যক। তাই কর্মচারী বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির জন্য কাজ শেষে কর্তৃপক্ষের কাছে অবশিষ্ট অর্থ-সম্পদ ফেরত দেয়া আবশ্যক।

৫. অনুমতি ছাড়া কোনো উপহার বা অতিরিক্ত সুবিধা গ্রহণ বৈধ নয়। দায়িত্ব পালনের সময় প্রাপ্ত সব সম্পদের পূর্ণ হিসাব দিতে হবে। কর্তৃপক্ষ যা বৈধভাবে প্রদান করবে, শুধু তাই গ্রহণ করা যাবে।

৬. এক্ষেত্রে সাহাবিদের তাকওয়া ও আল্লাহভীতি অনুকরণীয়। হাদিস শুনে ওই সাহাবি সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। এটি তাদের জবাবদিহিতার ভয় ও সততার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

৭. নেতৃত্ব ও প্রশাসনে সততা অপরিহার্য। রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের সকল পর্যায়ে আর্থিক স্বচ্ছতা বজায় রাখা ইসলামের নির্দেশ।

সর্বপরি এই হাদিস আমাদের শেখায় যে, সরকারি, প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগত—যেকোনো আমানতের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সততা বজায় রাখতে হবে। সামান্য পরিমাণ সম্পদ আত্মসাৎ করাও বড় গুনাহ। একজন মুমিনের পরিচয় হলো আমানত রক্ষা করা, দুর্নীতি ও খিয়ানত থেকে বেঁচে থাকা এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার অনুভূতি নিয়ে দায়িত্ব পালন করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের হাদিসের উপর পূর্ণ আমল করার তাওফিক দান করুক। আমিন। 

তাফসির চর্চায় সাহাবিদের নীতি ও পদ্ধতি

আতাউর রহমান খসরু
তাফসির চর্চায় সাহাবিদের নীতি ও পদ্ধতি
সংগৃহীত ছবি

মহান আল্লাহ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর কোরআন নাজিল করেন এবং তাঁকে কোরআনের মর্ম প্রচার ও ব্যাখ্যার দায়িত্ব দেন। ফলে নবীজি (সা.)-এর যুগেই শুরু হয়েছিল তাফসিরশাস্ত্রের চর্চা। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমার প্রতি কোরআন অবতীর্ণ করেছি, মানুষকে সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য, যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছিল, যাতে তারা চিন্তা করে।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৪৪)

উল্লিখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরবিদরা বলেন, এই আয়াত দ্বারা প্রমাণ হয়, মানুষকে কোরআনের ব্যাখ্যা শেখানো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নববী দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-ও তাঁর শিক্ষা ও সান্নিধ্যে কোরআনের শ্রেষ্ঠতম ধারক, বাহক ও ব্যাখ্যাকারে পরিণত হন। প্রকৃতপক্ষে তাঁরাই কোরআন সবচেয়ে উত্তমরূপে অনুধাবন করেছিলেন এবং তার ওপর যথাযথভাবে আমল করেছিলেন।

তাফসির চর্চায় সাহাবিদের পদ্ধতি
পবিত্র কোরআন ও তাফসির শাস্ত্রের পঠন-পাঠনে সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর পদ্ধতি ছিল নিম্নরূপ :

১. শেখা ও আমল করা : সাহাবিদের তাফসির চর্চার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁরা যখন কোনো আয়াত পাঠ করতেন, তখন তার মর্ম ও ব্যাখ্যা জানতেন এবং তাঁর ওপর আমল করতেন। অর্থাৎ উপলব্ধ অর্থ ও বিধান আমলের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘আমাদের ভেতর যখন কেউ কোরআনের ১০টি আয়াত শিখত, তখন সে তাঁর অর্থ জানা এবং তার ওপর আমল করার আগে সামনে অগ্রসর হতো না।’ (শুআবুল ঈমান, হাদিস : ১৮০১)

২. পড়ে পড়ে ব্যাখ্যা করা : রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিরা কোরআন পড়ে পড়ে তার ব্যাখ্যা করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে, যখন তাঁর কাছে তাঁর ভাইয়েরা একত্র হতেন। তাঁরা কোরআন খুলে তা পাঠ করতেন এবং তিনি তার ব্যাখ্যা করতেন। (ফাদায়িলুল কোরআন, পৃষ্ঠা-১০২)

৩. প্রশ্ন করে শিক্ষা দেওয়া : সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর ভেতর যাঁরা তাফসির শাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন, তাঁরা অন্যদের প্রশ্ন করতেন। যদি তারা সঠিক উত্তর দিতেন, তবে তিনি তাদের সমর্থন করতেন এবং জ্ঞানের প্রশংসা করতেন। আর ভুল করলে তিনি তাদের সংশোধন করে দিতেন। যেমন আবু বকর (রা.) জিজ্ঞাসা করেন, তোমরা আল্লাহর বাণী ‘নিশ্চয়ই যারা বলে, আল্লাহ আমাদের প্রভু, অতঃপর তাতে অবিচল থাকে’-এর ব্যাপারে কী বলো? তারা বলেন, এর ব্যাখ্যা হলো ‘আল্লাহ আমাদের প্রভু, অতঃপর তারা পাপ থেকে বেঁচে থাকে।’ আবু বকর (রা.) বললেন, তোমরা আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা গ্রহণ করেছ। এর ব্যাখ্যা হলো, ‘তারা বলে, আল্লাহ আমাদের প্রভু। অতঃপর তারা অবিচল থাকে। ফলে তারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো প্রতি ভ্রুক্ষেপ করে না।’
(তাফসির ইবনে কাসির : ৬/১৭৩)

৪. পারস্পরিক আলোচনা : সাহাবায়ে কেরাম (রা.) যখন একত্র হতেন পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে কোরআন ও তার ব্যাখ্যা শিখতেন। ঠিক যেমনটি রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো সম্প্রদায় আল্লাহর ঘরগুলোর কোনো একটি ঘরে একত্র হয়ে আল্লাহর কিতাব পাঠ করে এবং একে অপরের সঙ্গে মিলে (কোরআন) অধ্যয়নে লিপ্ত থাকে, তখন তাদের ওপর শান্তিধারা অবতীর্ণ হয়। রহমত তাদের আচ্ছন্ন করে ফেলে এবং ফেরেশতারা তাদের পরিবেষ্টন করে রাখেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৯৯)

আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিরা যখন একত্রে বসে ফিকহ নিয়ে আলোচনা করতেন, তখন তাঁরা একজন কোরআনের সুরা পাঠ করার আদেশ করতেন। (তাবাকাতে ইবনে সাআদ : ২/২৮৫)

৫. প্রচলিত ভুল ব্যাখ্যা সংশোধন করে : রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিরা প্রচলিত ভুল ব্যাখ্যা সংশোধন করেও মানুষকে কোরআনের ব্যাখ্যা শেখাতেন। আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ভাষণ দেন। তিনি বলেন, হে মানুষ তোমরা এই (সুরা মায়িদার ১০৫ নম্বর)  আয়াত পাঠ করো এবং এর ভুল অর্থ গ্রহণ করে থাকো। আয়াতটি হলো : ‘হে মুমিনরা! তোমাদের দায়িত্ব তোমাদেরই ওপর। তোমরা যদি সৎপথে পরিচালিত হও তবে যে পথভ্রষ্ট হয়েছে সে তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।’ আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, নিশ্চয়ই মানুষ যখন নিজেদের ভেতর মন্দ কাজ হতে দেখে অথচ সে তা প্রতিহত করে না। আশঙ্কা আছে, আল্লাহ তাদের সবাইকে এই পাপের শাস্তি দেবেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৩৩৮)

৬. জনসমাগমের আলোচনার মাধ্যমে : সাহাবিদের অনেকে জনসমাগমের স্থানে উপস্থিত হয়ে কোরআনের তাফসির করতেন। আবু ওয়ায়েল (রহ.) বলেন, ‘আমি ও আমার এক সঙ্গী হজ করি। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-ও হজে ছিলেন। তিনি সুরা নুর পাঠ করে তা ব্যাখ্যা করেন। আমার সঙ্গী বলেন, সুবহানাল্লাহ! এই ব্যক্তির মাথা থেকে কি বের হচ্ছে? যদি তুর্কিরা এটা শুনত তবে তারা ইসলাম গ্রহণ করত।’ (ফাদায়িলুস সাহাবা, ইমাম আহমদ, হাদিস : ১৯৩৪)

৭. প্রশ্নের উত্তরে ব্যাখ্যা : সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর কাছে সাধারণ মানুষ কোরআনের আয়াত বা অর্থ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি তার উত্তর দিতেন। যেমন আতা ইবনে রাবাহ (রহ.) বলেন, ‘আমি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মজলিসের চেয়ে উত্তম কোনো মজলিস দেখিনি। তাঁর কাছে কোরআনের শিক্ষার্থীরা এসে প্রশ্ন করতেন, ইলমের অধিকারীরা এসে প্রশ্ন করতেন, কবিতার শিক্ষার্থীরা এসে প্রশ্ন করতেন।’ (ফাদায়িলুস সাহাবা, ইমাম আহমদ, হাদিস : ১৯২৯)

সাহাবিদের তাফসিরের বৈশিষ্ট্য
ড. মুহসিন আবদুল হামিদ সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর তাফসিরের পাঁচটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। তা হলো—
১. বিরোধশূন্য : সাহাবিদের তাফসিরে বৈপরীত্য ও মৌলিক বিষয়ে বিরোধ পাওয়া যায় না, তবে আনুষঙ্গিক বিষয়ে তাদের অনেক মতভিন্নতা পাওয়া যায়।

২. স্বল্প বাক্য, বিস্তৃত মর্ম : সাহাবায়ে কেরাম (রা.) কোরআনের ব্যাখ্যায় দীর্ঘ আলোচনা পরিহার করতেন। এ বিষয়ে তাঁদের শব্দ-বাক্য হতো সীমিত এবং মর্ম হতো অত্যন্ত বিস্তৃত।

৩. নসনির্ভর : সাহাবিরা নস তথা কোরআন ও সুন্নাহ নির্ভর তাফসির করতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগের সঙ্গে তাঁদের যুগের বৈশিষ্ট্যগত মিল থাকায় তাঁদের ইজতিহাদের খুব বেশি প্রয়োজন হতো না। কোনো বিষয়ে কোরআন ও সুন্নাহের বক্তব্য পাওয়া না গেলে তাঁরা ইজতিহাদ করতেন।

৪. অপূর্ণাঙ্গ তাফসির : সাহাবায়ে কেরাম (রা.) প্রয়োজন ও মানুষের প্রশ্নের আলোকেই বেশি তাফসির করতেন। তাই তাঁদের যুগে পূর্ণাঙ্গ ও ধারাবাহিক তাফসির পাওয়া যায় না।

৫. ত্রুটিমুক্ত : সাহাবিরা স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে কোরআন শিখেছেন, তাঁরা ছিলেন নবীজি (সা.)-এর হাতে গড়া সোনার মানুষ। তাই তাঁদের তাফসির ছিল ভুলত্রুটি, বিকৃতি ও বিদআতমুক্ত। (তাতাওউরুল তাফসিরিল কোরআনিল কারিম কিরাআতান জাদিদাতান, পৃষ্ঠা-৩৮)

সাহাবিদের তাফসিরের বিধান
সাহাবায়ে কেরাম (রা.) কর্তৃক বর্ণিত তাফসিরের ব্যাপারে ফকিহ আলেমদের বক্তব্য নিম্নরূপ :

১. ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিমসহ বেশির ভাগ আলেমের মত হলো, সাহাবিদের বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত ও তাদের থেকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত তাফসিরের বিধান হলো তা মুসনাদ ও মারফু হাদিসের অনুরূপ। অর্থাৎ তা গ্রহণযোগ্য ও আমলকে আবশ্যক করে।

২. যে তাফসির সাহাবিরা মুসনাদ পদ্ধতি তথা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সূত্রে অথবা তাঁর থেকে মারফু পদ্ধতিতে বর্ণনা করেছেন সর্বসম্মতিক্রমে তার ওপর আমল করা ওয়াজিব এবং তা প্রত্যাখ্যান করা নাজায়েজ।

৩. তাদের থেকে যে তাফসির মাওকুফ পদ্ধতিতে বর্ণিত হয়েছে, তাতে যদি কিয়াসের (বুদ্ধিবৃত্তির) অবকাশ না থাকে তবে তা মারফু হাদিসের বিধানভুক্ত, অর্থাৎ তার ওপর আমল আবশ্যক। আর যদি তাতে কিয়াসের অবকাশ থাকে তবে তা মাওকুফ হাদিসের অন্তর্ভুক্ত, তা অনুসন্ধানের দাবি রাখে, এমন তাফসিরের ক্ষেত্রে মুজতাহিদ আলেমদের চিন্তা-ভাবনার অবকাশ আছে।

৪. সাহাবায়ে কেরাম (রা.) যে তাফসিরের ব্যাপারে একমত হয়েছেন তা অকাট্য এবং তার ওপর আমল করা আবশ্যক।

৫. কোনো আয়াতের ব্যাপারে সাহাবিদের থেকে একাধিক ভিন্ন ভিন্ন মত থাকলে, মুজতাহিদ আলেমরা যেকোনো একটির ওপর আমল করতে পারবেন। কিন্তু তারা নতুন কোনো মত উদ্ভাবন করতে পারবেন না। (আল মুসতাদরাক আলাস সহিহাইন : ২/২৮৩; মাবাহিসুন ফি উলুমিল কোরআন, পৃষ্ঠা-৩৪৫; আল বোরহান ফি উলুমিল কোরআন : ২/১৮৩)

শ্রেষ্ঠত্বের কারণ
সাহাবায়ে কেরাম পবিত্র কোরআনের যে তাফসির করেছেন, তা পৃথিবীর যেকোনো তাফসিরের ওপর শ্রেষ্ঠত্বের দাবি রাখে। কেননা—

১. তাঁরা ওহি নাজিল হতে দেখেছেন এবং ওহি নাজিলের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অবগত।

২. তাঁরা সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে কোরআনের অর্থ ও মর্ম শিখেছেন।

৩. তাকওয়া, দ্বিনদারি ও বিশ্বস্ততার বিচারে তাঁরাই সবচেয়ে অগ্রগামী ছিলেন।

৪. কোরআনের একাধিক আয়াতে তাঁদের প্রশংসা করা হয়েছে এবং তাঁদেরকে আল্লাহ ক্ষমা ও সন্তুষ্টি দানের ঘোষণা দিয়েছেন।

৫. রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁদের খাইরিয়্যাত (উত্তম হওয়ার) সাক্ষ্য দিয়েছেন। (প্রবন্ধ : আত-তাফসির ফি আসরিস সাহাবাতি)

আল্লাহ সবাইকে সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দ্বারা উপকৃত হওয়ার তাওফিক দিন। আমিন।

যেকোনো বিপদ থেকে নিশ্চিত মুক্তি লাভের দোয়া

ইসলামী জীবন ডেস্ক
যেকোনো বিপদ থেকে নিশ্চিত মুক্তি লাভের দোয়া
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবন কখনোই বিপদ-আপদমুক্ত নয়। কখনো রোগ-ব্যাধি, কখনো দুর্ঘটনা, কখনো শত্রুর অনিষ্ট, আবার কখনো অজানা কোনো দুর্যোগ—প্রতিনিয়ত নানা ধরনের ঝুঁকির মধ্য দিয়েই আমাদের চলতে হয়। মানুষ যতই শক্তিশালী বা সতর্ক হোক না কেন, আল্লাহ তাআলার হেফাজত ছাড়া প্রকৃত নিরাপত্তা লাভ করা সম্ভব নয়। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) হাদিসে এমন এক বরকতময় দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন, যা সকাল ও সন্ধ্যায় তিনবার পাঠ করলে আল্লাহর ইচ্ছায় সারাদিন বা সারারাত কোনো আকস্মিক বিপদ-আপদ ক্ষতি করতে পারে না। দোয়াটি হলো-

بِسْمِ اللّٰهِ الَّذِيْ لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْمُ

উচ্চারণ : বিসমিল্লাহিল্লাজি লা ইয়া দুররু মাআস মিহি শাইয়ুন ফিল আরদি ওয়ালা ফিস সামায়ি ওয়াহুয়াস সামিউল আলিম। 

অর্থ : ‘আল্লাহর নামে, যাঁর নামে পৃথিবীতে বা আকাশে কোনো কিছুই ক্ষতি করতে পারে না এবং তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’

হাদিস : ওসমান ইবনে আফফান (রা.)-থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি সকালে তিনবার এই দোয়া পাঠ করবে,  সন্ধ্যা পর্যন্ত তার উপর কোনো আকস্মিক বিপদ আসবে না। আর যে ব্যক্তি সন্ধ্যায় এটি বলবে সকাল পর্যন্ত তার উপর কোনো আকস্মিক বিপদ আসবে না। ইনশাআল্লাহ। (আবু দাউদ, হাদিস : ৫০৮৮, তিরমিজি, হাদিস : ৩৩৮৮)

‘ফিলিস্তিনি শিশুদের জীবন কি মূল্যহীন’ | কালের কণ্ঠ