kalerkantho

শুক্রবার । ৭ অক্টোবর ২০২২ । ২২ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

আরাফার দিন সম্পর্কে মহানবী (সা.) যা বলেছেন

মাওলানা মুহাম্মদ মুনিরুল হাছান   

৮ জুলাই, ২০২২ ১০:৪৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আরাফার দিন সম্পর্কে মহানবী (সা.) যা বলেছেন

মক্কা থেকে ১৫ মাইল পূর্বে তায়েফের পথে অবস্থিত এক মরু ময়দানের নাম আরাফাত। ময়দানের উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত জাবালে রহমত। আরাফাহ শব্দের অর্থ হলো পরিচিতি। আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) আল্লাহর নির্দেশে বেহেশত থেকে বের হওয়ার পর পৃথিবীতে পরস্পর পরস্পরকে খুঁজতে খুঁজতে আরাফাতের ময়দানে এসে মিলিত হয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

 এ কারণে ওই স্থানের নাম হলো আরাফাত।

মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের গুনাহমুক্ত হওয়ার জন্য যেসব দিবস দান করেছেন সেসব দিনের মধ্যে আরাফার দিন অন্যতম। জিলহজ মাসের ৯ তারিখকে বলা হয় ইয়াউমে আরাফাহ বা আরাফাতের দিন। আরাফাত দিবস অত্যন্ত মহিমান্বিত ও মর্যাদাপূর্ণ একটি দিন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর কসম সাক্ষ্যদাতার এবং যার ব্যাপারে সাক্ষ্য দেওয়া হবে তার। ’ (সুরা : বুরুজ, আয়াত : ৩)

kalerkanthoউক্ত আয়াতে এই দিনকে ‘মাশহুদ’ বলা হয়েছে এবং এর কসম খাওয়া হয়েছে। রাসুল (সা.) ‘মাশহুদ’কে আরাফাতের দিন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। (তিরমিজি)

আরাফার ময়দান ক্ষমা পাওয়ার ময়দান হিসেবেও পরিচিত। শূন্য মস্তকে সেলাইবিহীন বস্ত্র পরিহিত লাখো আল্লাহপ্রেমীর কান্নার আওয়াজ এদিন আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ওঠে।

আল্লাহপ্রেমিকরা লাব্বাইকা, লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক—‘হে আল্লাহ! বান্দা হাজির, বান্দা হাজির’ বলে আল্লাহর ঘরে হাজিরা দানকারী বান্দারা এদিন আরাফাতের ময়দানে সমবেত হয়ে চোখের পানিতে বুক ভাসিয়ে রাব্বুল আলামিনের দরবারে কাতর হয়ে ফরিয়াদ জানায়। দশম হিজরি সনে এই ময়দানে প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) পবিত্র হজ উপলক্ষে তাঁর শেষ ভাষণ দিয়েছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে যা বিদায় হজের ভাষণ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

ইসলামের মূল স্তম্ভসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো হজ। আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করাই হলো হজ। আর আরাফাতের দিনটি মূলত হজের দিন। উরওয়া ইবন মুদারিস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মুজদালিফায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমি তাঈ গোত্রের দুই পাহাড় থেকে এসেছি। আর আমি কোনো পাহাড়ে অবস্থান বাদ দিইনি; এমতাবস্থায় আমার কি হজ আদায় হয়েছে? রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে এই সালাত আদায় করেছে আর এর আগে আরাফায় অবস্থান করেছে—দিনে বা রাতে, তার হজ পূর্ণ হয়েছে এবং সে তার ইহরাম শেষ করেছে। (নাসাঈ, হাদিস : ৩০৪৪)

আরাফার দিন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ : আরাফার দিনটি ইসলামে এত মর্যাদাপূর্ণ যে রাসুলুল্লাহ (সা.) এটাকে ঈদের দিন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। উকবাহ বিন আমের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আরাফাতের দিন, কোরবানির দিন এবং তাশরিকের দিনগুলো হচ্ছে ইসলামে আমাদের ঈদের দিন। এই দিনগুলো হচ্ছে পানাহারের দিন। (আবু দাউদ, হাদিস : ২৪২১)

ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণার দিন : আল্লাহ তাআলা এ দিনকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেছেন। দ্বিন-ইসলাম পূর্ণতার ঘোষণা দিয়েছেন এ দিনেই। এ দিনেই অবতীর্ণ হয়েছে কোরআনে কারিমের সর্বশেষ আয়াত, ‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বিন পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত পরিপূর্ণ করলাম এবং ইসলাম তোমাদের দ্বিন মনোনীত করলাম। ’ (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ৩)

ক্ষমা লাভের দিন : আরাফাত দিবসে বান্দার দিকে আল্লাহর রহমতের জোয়ার প্রবলবেগে উৎসারিত হয়। অসংখ্য বান্দাকে তিনি ক্ষমা করে থাকেন এই দিনে। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আরাফার দিনের মতো আর কোনো দিন এত বেশি পরিমাণে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয় না। এই দিন আল্লাহ দুনিয়ার নিকটবর্তী হন এবং বান্দাদের নিয়ে ফেরেশতাদের কাছে গর্ব করেন। আল্লাহ বলেন, কী চায় তারা? (মুসলিম, হাদিস : ১৩৪৮)

জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত আরেক বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহ তাআলা নিকটতম আসমানে আসেন এবং পৃথিবীবাসীকে নিয়ে আসমানের অধিবাসী অর্থাৎ ফেরেশতাদের সঙ্গে গর্ব করেন। বলেন, দেখো তোমরা— আমার বান্দারা উষ্কখুষ্ক চুলে, ধুলোয় মলিন বদনে, রোদে পুড়ে দূর-দূরান্ত থেকে এখানে সমবেত হয়েছে। তারা আমার রহমতের প্রত্যাশী। অথচ তারা আমার আজাব দেখেনি। ফলে আরাফার দিনের মতো আর কোনো দিন এত বেশি পরিমাণে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয় না। (ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৩৮৫৩)

এক রোজায় দুই বছরের গুনাহ মাফ : এ দিবসের একটি রোজায় বান্দার দুই বছরের গুনাহ মাফ হয়। রাসুল (সা.) বলেন, আরাফার দিনের (৯ জিলহজের) রোজার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা রাখি যে তিনি আগের এক বছরের এবং পরের এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। (মুসলিম, হাদিস : ১১৬২)

আরাফাতের দিনের শ্রেষ্ঠ দোয়া : হাদিস শরিফে আরাফাতের দিনের দোয়াকে শ্রেষ্ঠ দোয়া বলা হয়েছে। নবীজি (সা.) বলেন, শ্রেষ্ঠ দোয়া আরাফাতের দোয়া। দোয়া হিসেবে সর্বোত্তম হলো ওই দোয়া, যা আমি এবং আমার পূর্ববর্তী নবীরা করেছেন। তা হলো—‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলক ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শায়ইন কাদির। ’

অর্থ : আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই, রাজত্ব একমাত্র তাঁরই, সমস্ত প্রশংসাও একমাত্র তাঁর  জন্য, আর তিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫৮৫)



সাতদিনের সেরা