
মেঘলা আঁধার
- জাহাঙ্গীর আলম জাহান
ফেউ
লেখা : ইমদাদুল হক মিলন, আঁকা : তানভীর মালেক

টুবাইয়ের রথ
পৃথ্বীজিৎ চৌধুরী, আগরপাড়া স্বামী বিবেকানন্দ একাডেমি, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

ছোট্ট টুবাই বাবার কাছে খুব বায়না করে তিনতলা রথের জন্য। বাবা একতলা রথ কিনে দিয়ে বলেছিল পরেরবার কিনে দেবে। তাই একতলা রথ নিয়েই টুবাই বেরোয়, মন খারাপ। পাড়ার বন্ধু রনি আর জোজো খুব খেপায়। বলে, ‘কিরে টুবাই, একতলা রথ তোর? আমার দেখ তিনতলা। একতলায় বলরাম, দোতলায় সুভদ্রা আর একদম ওপরের তলায় জগন্নাথ ঠাকুর।
তোর বাবা তোকে একতলা রথ কিনে দিয়েছে? তুই আমাদের বন্ধু না।’ টুবাই বারবার বলে, ‘ঠাকুর তো রথে থাকবে, ঘুরবে। একতলা তিনতলায় কী হবে রে? আমরা সবাই তো বন্ধু, এমন করিস না আমার সঙ্গে।’ ওরা তাও কথা বলছিল না। হাসছিল টুবাইকে নিয়ে। শুধু তোতলা বলে রবিকে ওরা দলে নেয় না। আর রবির রথও নেই। ওর বাবা দূরে কাজে গেছে, ফিরতে পারেনি। রবি তাই দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। টুবাই ওকে ডেকে বলল, ‘চল, আমরা আজ দুজনে রথ নিয়ে ঘুরব।’ রবি তো খুব খুশি। জড়িয়ে ধরে বলল, ‘টুবাই, তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড।’ ‘জয় জগন্নাথ’ বলে ওরা রথের দড়িতে টান দিল। রথ এগিয়ে চলল।
[ কত অজানারে ]
কিটম্যানের কাজ কী
আল সানি

২০১৬ সালের ইউরো কাপে ফ্রান্স বনাম সুইজারল্যান্ডের খেলা। সেই ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের চারজন খেলোয়াড়ের জার্সি প্রতিপক্ষের টানে ছিঁড়ে গিয়েছিল। ম্যাচ শেষে সুইস উইঙ্গার জাদরান শাকিরি গণমাধ্যমের সামনে তাদের জার্সি প্রস্তুতকারক ব্র্যান্ডের কাপড়ের কোয়ালিটি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। স্পোর্টসওয়্যার জায়ান্ট পুমার তৈরি সেই জার্সির ফ্যাব্রিক নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছিল। নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল কম্পানিটির বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ভ্যালু ও শেয়ারবাজারে। জানলে অবাক হবে, একটা আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচে জার্সি বা বুটের মতো সরঞ্জাম শুধু খেলোয়াড়দের পোশাক নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিলিয়ন ডলারের করপোরেট স্পন্সরশিপ এবং ফিফার কঠোর নিয়ম। আমরা যখন মাঠে ১১ জন খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স বা কোচের ট্যাকটিকস নিয়ে পত্রিকা বা টিভিতে চুলচেরা বিশ্লেষণ করি, তখন স্পোর্টসের এই বিশাল ব্যাকস্টেজ বা লজিস্টিকস ম্যানেজমেন্ট আড়ালে থেকে যায়। প্রতিটি দলের ড্রেসিংরুমের এই লজিস্টিকস ফ্রন্ট সামলানোর দায়িত্বে থাকেন কিটম্যান এবং তাঁদের সহযোগীরা, যাঁদের কাজের ভিত্তি মূলত ‘জিরো-এরর’ বা শূন্য ভুলের এক গাণিতিক হিসাব।
পেশাদার ফুটবলের লজিস্টিকস কতটা কঠোর ও নিখুঁত, তা বোঝা যায় ম্যাচের জন্য বরাদ্দ জার্সির সংখ্যা দেখলে। একটা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে প্রতি ম্যাচের জন্য একেকজন খেলোয়াড়ের নামে অন্তত তিন থেকে চার সেট কাস্টমাইজড জার্সি প্রস্তুত রাখতে হয়। প্রথম সেটটি ব্যবহার করা হয় প্রথমার্ধের জন্য। বিরতির পর খেলোয়াড়রা সম্পূর্ণ নতুন ও ফ্রেশ দ্বিতীয় সেট জার্সি পরে মাঠে নামেন। তৃতীয় সেটটি রাখা হয় ম্যাচ শেষে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়ের সঙ্গে জার্সি বদল করার ঐতিহ্যগত প্রথার জন্য কিংবা খেলা চলাকালীন জরুরি ব্যাকআপ হিসেবে। নক আউট পর্বের ম্যাচগুলো অতিরিক্ত সময়ে গড়ালে খেলোয়াড়দের জন্য চতুর্থ আরেকটি সেটও মজুদ রাখতে হয় ড্রেসিংরুমে। ২৬ জনের একটি স্কোয়াডের জন্য শুধু একটি ম্যাচের দিনই কিটম্যানকে ১০০টির বেশি জার্সি নিখুঁতভাবে সাজাতে হয়। এর বাইরে থাকে গোলরক্ষকদের আলাদা রঙের কিট, ট্র্যাকিং জিপিএস সায়েন্স ভেস্ট, শিন-গার্ড, মোজা এবং প্রতি ফুটবলারের পায়ের গঠন ও মাঠের কন্ডিশন অনুযায়ী দু-তিন জোড়া কাস্টমাইজড বুট।
ম্যাচ শুরুর অন্তত চার-পাঁচ ঘণ্টা আগে স্টেডিয়ামের ড্রেসিংরুমে কিটম্যানদের মূল কাজ শুরু হয়। একেকজন খেলোয়াড়ের জার্সি হ্যাঙ্গারে ঝোলানোর আগে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পরীক্ষা করা হয় ‘ম্যাচ ডে স্ট্যাম্পিং’। আধুনিক নিয়মে জার্সির বুকে প্রতিপক্ষের নাম, তারিখ ও ভেন্যুর নাম স্থায়ীভাবে ছাপা থাকে। ভুলবশত পূর্ববর্তী বা পরবর্তী কোনো ম্যাচের তথ্য ছাপা হলে তা ফিফার আইনের সরাসরি লঙ্ঘন এবং ফুটবল ফেডারেশনের জন্য বড় ধরনের জরিমানা বা নিষেধাজ্ঞার কারণ হতে পারে। খেলা চলাকালীন কিটম্যানদের ডাগ আউটের পেছনে হাই-অ্যালার্টে থাকতে হয়, কারণ ফুটবলে জার্সি ইমার্জেন্সি যেকোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, মাঠে কোনো খেলোয়াড়ের জার্সিতে রক্ত লাগলে বা তা সামান্য ছিঁড়ে গেলেও ওই জার্সি পরে খেলা চালিয়ে যাওয়া নিষেধ। রেফারি তাৎক্ষণিকভাবে খেলোয়াড়কে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দেন। লজিস্টিকস টিমকে মাত্র ১০ থেকে ১৫ সেকেন্ডের মধ্যে সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়ের নামের হুবহু আরেকটি ফ্রেশ জার্সি সরবরাহ করতে হয়। কিটম্যানের এই ব্যাকআপ প্রক্রিয়া সচল করতে সামান্য দেরি হলে দলটিকে সমপরিমাণ সময় ১০ জন নিয়ে খেলতে হয়, যা কৌশলগতভাবে বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
খেলা শেষের বাঁশি বাজার পর যখন দলগুলো মাঠ ছাড়ে, তখন কিটম্যানদের কাজের দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে ক্লান্তিকর ধাপ শুরু হয়। ড্রেসিংরুম থেকে ঘাম ও কাদা লাগা জার্সিগুলো সংগ্রহ করে গভীর রাতেই বেইস ক্যাম্পের নিজস্ব লন্ড্রি ইউনিটে পাঠানো হয়। কড়া নজরদারিতে এগুলো ধোয়া, শুকানো এবং ড্রাই-ক্লিন করার প্রক্রিয়া শেষ করতে ভোর হয়ে যায়, কারণ পরদিন সকালেই খেলোয়াড়দের রিকভারি সেশন ও অনুশীলনের জন্য ট্রেনিং কিট প্রস্তুত রাখার বাধ্যবাধকতা থাকে।

