• ই-পেপার

রোনালদোর মতো উদযাপন করব

  • বর্ণমালা আজিজ, তৃতীয় শ্রেণি, যশোর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, যশোর

[ সেই কবিতা এই ছবি ]

ফুটবল খেলোয়াড়

জসীম উদ্‌দীন

ফুটবল খেলোয়াড়
অলংকরণ : মাসুম

আমাদের মেসে ইমদাদ হক ফুটবল খেলোয়াড়,

হাতে পায়ে মুখে শত আঘাতের ক্ষতে খ্যাতি লেখা তার।

সন্ধ্যাবেলায় দেখিবে তাহারে পটি বাঁধি পায়ে হাতে,

মালিশ মাখিছে প্রতি গিঁটে গিঁটে কাত হয়ে বিছানাতে।

 

মেসের চাকর হয় লবেজান ছেঁক দিতে ভাঙা হাড়ে,

সারা রাত শুধু ছটফট করে কেঁদে কেঁদে ডাক ছাড়ে।

আমরা তো ভাবি ছ’মাসের তরে পঙ্গু সে হলো হায়,

ফুটবল টিমে বল লয়ে কভু দেখিতে পাব না তায়।

 

প্রভাতবেলায় খবর লইতে ছুটে যাই তার ঘরে,

বিছানা তাহার শূন্য পড়িয়া ভাঙা খাটিয়ার পরে।

টেবিলের পরে ছোট-বড় যত মালিশের শিশিগুলি,

উপহাস যেন করিতেছে মোরে ছিপি পরা দাঁত তুলি।

 

সন্ধ্যাবেলায় খেলার মাঠেতে চেয়ে দেখি বিস্ময়ে,

মোদের মেসের ইমদাদ হক আগে ছোটে বল লয়ে!

বাম পায়ে বল ড্রিবলিং করে ডান পায়ে মারে ঠেলা,

ভাঙা কয়খানা হাতে-পায়ে তার বজ্র করিছে খেলা।

চালাও চালাও আরো আগে যাও বাতাসের মতো ধাও,

মারো জোরে মারো—গোলের ভেতরে বলেরে ছুড়িয়া দাও।

 

গোল-গোল-গোল, চারদিক হতে ওঠে কোলাহলকল,

জীবনের পণ, মরণের পণ, সব বাধা, পায়ে দল।

গোল-গোল-গোল মোদের মেসের ইমদাদ হক কাজি,

ভাঙা দুটি পায়ে জয়ের ভাগ্য লুটিয়া আনিল আজি।

দর্শকদল ফিরিয়া চলেছে মহা-কলবর করে,

ইমদাদ হক খোঁড়াতে খোঁড়াতে আসে যে মেসের ঘরে।

মেসের চাকর হয়রান হয় পায়েতে মালিশ মাখি,

বে-ঘুম রাত্র কেটে যায় তার চিৎকার করি ডাকি।

সকালে সকালে দৈনিক খুলি মহা-আনন্দে পড়ে,

ইমদাদ হক কাল যা খেলেছে কমই তা নজরে পড়ে।

[ কত অজানারে ]

সময় যখন গোলকধাঁধা

আল সানি

সময় যখন গোলকধাঁধা

ভাবো তো, একবার মেক্সিকো সিটির এক স্টেডিয়ামে তুমি দুপুরের একটা ম্যাচ উপভোগ করলে। খেলা শেষ হতেই দ্রুত ছুটলে বিমানবন্দরের দিকে। কারণ রাতে কানাডার ভ্যাংকুভারে আরেকটি ম্যাচ দেখতে হবে। দুই শহরের মধ্যে প্লেনে যেতে সময় লাগে চার ঘণ্টা। সাধারণ হিসাবে মেক্সিকোতে দুপুর ২টায় প্লেনে উঠলে কানাডায় যখন নামবে তখন সন্ধ্যা ৬টা বাজার কথা। কিন্তু ভ্যাংকুভার বিমানবন্দরে নেমে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চমকে উঠবে, ওমা সেখানে তখন মাত্র বিকেল ৪টা! চার ঘণ্টা প্লেনে ওড়ার পরও ঘড়ির কাঁটা উল্টো দুই ঘণ্টা পিছিয়ে গেছে!

রূপকথার মতো শোনালেও চলতি ফুটবল বিশ্বকাপে খেলোয়াড় এবং দর্শকদের ঠিক এই বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই যেতে হচ্ছে। এবারের বিশ্বকাপ শুধু দল বা স্টেডিয়ামের দিক থেকেই বড় নয়, মাঠগুলোর দূরত্বের দিক থেকেও এটি যেন এক বিশাল গোলকধাঁধা। আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোর তিনটি দেশজুড়ে ছড়ানো এই ফুটবল উৎসবের অদৃশ্য প্রতিপক্ষের নাম ‘টাইম জোন’ বা সময়ের ব্যবধান। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম দলগুলো এবং কোটি কোটি সমর্থককে একই টুর্নামেন্টে চারটি ভিন্ন সময়ের অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। এক মাঠ থেকে অন্য মাঠে যাওয়ার এই যাত্রায় ঘড়ির কাঁটা কখনো এগিয়ে যাবে, কখনো পিছিয়ে যাবে। ফুটবলারদের শরীর আর তোমার মতো দর্শকদের চোখের ঘুম নিয়ে সময়ের এই কানামাছি খেলা এবার বিশ্বকাপের অন্যতম বড় রোমাঞ্চ ও চ্যালেঞ্জ।

ফুটবলারদের জন্য সময়ের এই ব্যবধান শুধু একটা সংখ্যার খেলা নয়, এটি সরাসরি তাদের খেলার ওপর প্রভাব ফেলে। আমাদের সবার শরীরের ভেতরই ঘুমানো আর জেগে থাকার একটা চেনা নিয়ম থাকে। যখন কোনো দল লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে নিউইয়র্কে ম্যাচ খেলতে যাবে, তখন তাদের শরীর তিন ঘণ্টার একটি বড় ধাক্কা খাবে।

এই তিন ঘণ্টার ব্যবধান ফুটবলারদের ঘুমানোর সময়, খাওয়াদাওয়া এবং শরীরের শক্তির ওপর ওলটপালট করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। দেখা যাবে মাঠে যখন ম্যাচ শুরু হবে ফুটবলারদের শরীর তখন হয়তো বলছে, এটা তাদের ঘুমানোর সময়! এ কারণেই এবার দলগুলোর তাঁবুতে কোচের চেয়েও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছেন ঘুম বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীরা। কোন দেশ কোন মাঠে কয় দিন আগে গিয়ে পৌঁছবে, তা নিয়ে চলছে সূক্ষ্ম হিসাব-নিকাশ।

সময়ের এই গোলকধাঁধার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী কিন্তু আমাদের দেশের মতো এশিয়ার কোটি কোটি দর্শক। আমেরিকায় যখন স্থানীয় সময় বিকেল ৫টায় হাই ভোল্টেজ ম্যাচ শুরু হবে তোমার-আমার ঘড়িতে তখন থাকবে ভোর ৪টা কিংবা ৫টা। আবার ওখানকার দুপুরের ম্যাচ আমাদের দেখতে হবে মাঝরাতে। ফলে পছন্দের দলের খেলা দেখতে হলে তোমাকে নিজের হোম ওয়ার্কের সূচি কিংবা ঘুমের সময়কে ছাড় দিতেই হবে। 

 

 

 

[ আবার পড়ো ]

ফুটবল

তারাপদ রায়

ফুটবল
অলংকরণ : তানভীর মালেক

ফুটবল খেলার অ আ ক খ জানে না এ রকম লোক বা স্ত্রীলোক এ দেশে আজকাল বিরল। এমনকি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি বাড়ির কাজের মেয়ে সে হয়তো গহন পাড়াগাঁ থেকে এসেছে, সেও জানে গোল হওয়া কাকে বলে, গোল খেলে হারতে হয় এবং গোল দিলে জেতা যায়। ফুটবলের এই মূল সূত্রটি সে ভালোভাবেই জানে।

অথচ ফুটবল খেলার বয়স এ দেশে, শুধু এ দেশে কেন, প্রায় সারা পৃথিবীতেই এক শতাব্দীর সামান্য কিছু বেশিকাল এবং ধীরে ধীরে ফুটবল জনপ্রিয় হয়েছে এই শতকেরই গোড়ায়।

ফুটবলের সবচেয়ে বড় কথা এ খেলার মোটামুটি নিয়ম-কানুন একেবারেই কঠিন নয়, নিতান্ত শিশুও বুঝতে পারে। এক অফসাইড এবং কিঞ্চিৎ পেনাল্টি ব্যাপারটা ছাড়া হ্যান্ডবল, ফাউল, কর্নার, থ্রো সবারই বোধগম্য। গোল তো বটেই।

আর তা ছাড়া সবচেয়ে বড় কথা বিশ্বকাপের কল্যাণে এবং রেডিও, ভিডিও এবং দূরদর্শনের দৌলতে এখন ফুটবল সর্বজনের ঘরের মধ্যে এসে গেছে।

আমাদের মতো গরিব দেশের পক্ষে হাডুডু বা কবাডির মতোই ফুটবল খুবই গ্রহণযোগ্য ক্রীড়া। একটা চামড়ার বল আর একটু ঠাণ্ডা জায়গা, ঘাসে-ঢাকা মাঠ হোক কিংবা গলির মোড় হোক পেলেই হলো। একটা বলে একটা সিজন চলে যায়, একসঙ্গে ২২ জন খেলতে পারে। মাথাপ্রতি দৈনিক খরচ পড়ে পাঁচ থেকে দশ পয়সা।

একটা বল নিয়ে ২২ জন খেলে, একটা পুরনো রসরচনায় বিষয়টাকে একটু অন্যদিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।

এ হলো অনেক দিন আগের গল্প। তখনো কিন্তু ফুটবল খেলার রীতিনীতি, আইন-কানুন সবাই জানে না।

সেই আদ্যিযুগে এক নটবর জমিদারবাবু তাঁর মহালে গেছেন তদারকি করতে। বিকেলে ভ্রমণে বেরিয়েছেন তিনি, দেখলেন রাস্তার পাশে মাঠে তাঁর প্রজানন্দনেরা একটা গোলমতো চামড়ার জিনিসে লাথি মেরে কী যেন খেলছে পরম উৎসাহে।

জমিদারবাবু এর আগে ফুটবল খেলা কখনো দেখেননি, এ সম্পর্কে জানেনও না কিছু।

তিনি বয়স্যদের মারফত গ্রামবাসী এবং ফুটবল খেলোয়াড়দের কাছ থেকে জেনে নিলেন এই মজাদার ব্যাপারটা কী এবং তারপর মাঠের ছেলেদের ডেকে বললেন, তোমরা আমার প্রজাদের ছেলে, আমি খুব দুঃখ পেলাম তোমরা ২২ জনে মাত্র একটা বলে খেলছ। আমি নায়েবমশায়কে বলছি তোমাদের প্রত্যেকের জন্য একটা করে আলাদা বল কিনে দেবেন।

জায়গাটা ছিল নিম্ন পূর্ববঙ্গের নাবা অঞ্চল। সেখানকার গ্রাম্য কথ্য ভাষা একটু অন্য রকম, জমিদারবাবুর বক্তব্য না বুঝতে পেরে ছেলেরা হাঁ করে ফ্যালফ্যাল দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রইল। পরে যখন হৃদয়ঙ্গম হলো ব্যাপারটা, ২২টা বল পাওয়ার আনন্দে অবশ্য ‘হিপ হিপ হুররে’ করে উঠেছিল ছেলেরা।

জমিদারবাবু ‘হিপ হিপ হুররে’—কথাটাও আগে শোনেননি, তবে সে অন্য গল্প।

ঠিক এই জাতীয় আরেকটি গল্প আছে পরবর্তীকালের, বলা যায় এই আধুনিক সময়ের। এ গল্প এক কাল্পনিক মন্ত্রীকে নিয়ে, সেই তিনি যার নামে অনেক মাথামোটা হাসিঠাট্টার গল্প একদা প্রচলিত ছিল বাজারে।

মাননীয় মন্ত্রী একটি ফুটবল খেলার ফাইনাল ম্যাচে গেছেন সভাপতি হিসেবে পুরস্কার দিতে।

খেলা শেষে পুরস্কার প্রদানান্তে তাঁর ভাষণে তিনি বললেন, আমার খুব দুঃখ হচ্ছে এই দেখে যে এ বছর মাত্র দুটি টিম ফাইনালে উঠতে পেরেছে। আমাদের দেশে হাজার হাজার ফুটবল ক্লাব রয়েছে। এর পর থেকে আমাদের সচেতন হতে হবে, নজর রাখতে হবে, চেষ্টা করতে হবে, যাতে আগামী মরসুম থেকে যতগুলো সম্ভব টিম ফাইনালে উঠতে পারে, ফাইনালে উঠে খেলতে পারে।

অবশ্য এটি একটি অত্যন্ত হাস্যকর গল্প। শুধু মাননীয় মন্ত্রীর বিচারবুদ্ধির ওপর কটাক্ষপাত করা ছাড়া, তাঁকে হেয় করা ছাড়া এই গল্পের, এই জাতীয় সমস্ত গল্পেরই অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই।

অনেক দিন আগে এই জাতীয় হাস্যকর ইন্টারভিউ দেখেছিলাম একটি ইংরেজি হালকা ম্যাগাজিনে। শুনেছি পরবর্তীকালে সেটা ব্রিটিশ দূরদর্শনেও চিত্রান্তরিত হয়।

পরে জেনেছি ওই মজার সাক্ষাৎকার এবং দূরদর্শনে রূপান্তর যাদের করা, তারা ব্রিটিশ দূরদর্শনের অনতি সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে জনপ্রিয় কৌতুকজুটি। এই কৌতুকজুটি, যাদের নাম এরিক মোরকাম্বে এবং আরনি ওয়াইজ, তারা পূর্বকালের চলচ্চিত্রের লরেল হার্ডি কিংবা মার্কস ব্রাদার্সের মতোই সর্বজনপ্রিয়।

 

এরিক মোরকাম্বের ফুটবলের ওপরে সাক্ষাৎকার থেকে কিছু কিছু প্রক্ষিপ্ত অংশ উপহার দিচ্ছি—

প্রশ্ন : আচ্ছা,আপনি কখনো নিজে ফুটবল খেলেছেন?

উত্তর : না। নিজে একা কখনো খেলিনি। অন্যদের নিয়ে একসঙ্গে খেলেছি।

প্রশ্ন : কোথায় খেলতেন?

উত্তর : কেন? ফুটবল খেলার মাঠে।

প্রশ্ন : কী পজিশনে খেলতেন?

উত্তর: বেশির ভাগ সময়ই দাঁড়িয়ে খেলতাম, তবে কখনো কখনো পড়ে গেলে শুয়ে বা বসে।

পুনশ্চ :

গল্পটা কার ঘাড়ে চাপাব—পি কে নাকি অমল দত্ত নাকি সুভাষ ভৌমিক নাকি হাবিব সাহেব? অথবা মিস্টার এক্স ওয়াই জেড?

এদের কেউ কেউ আমার আবার বাল্যবন্ধু, কিংবা কিঞ্চিৎ ঘনিষ্ঠ।

তবু গল্পটা বলি।

কোচ সাহেব খেলার আগে তাঁবুতে খেলোয়াড়দের বললেন, তোমরা খুব মনের জোরে, সাহসের সঙ্গে খেলে যাও। এখন পর্যন্ত আমরা কোনো খেলায় হারিনি, ড্র করিনি, গোল খাইনি। একটি নতুন ছেলে, সে এবারই স্ট্যান্ড বাই হিসেবে সুযোগ পেয়েছে। সে হঠাৎ কিছু না বুঝে বলে ফেলল, কিন্তু স্যার, এ তো আমাদের প্রথম খেলা এই মরসুমের।

 

 

ফেউ

ফেউ