
তোমাদের আঁকা
ফেউ
লেখা : ইমদাদুল হক মিলন, আঁকা : তানভীর মালেক

গ্রামে ফিরতে চাই
আরহাম বিন আনোয়ার তৃতীয় শ্রেণি (প্রভাতি), রোল-৭ গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ঢাকা

এবার ঈদে মা-বাবা এবং আমার ছোট দুই ভাইসহ আমরা গ্রামের বাড়ি নীলফামারীতে যাই। বাড়িতে গিয়ে দেখি, প্রথমবারের মতো দাদাবাড়িতে লিচুগাছে লিচু ধরেছে। গাছটা অনেক বড়। আমি প্রথমবারের মতো হাত দিয়ে লিচু ছিঁড়লাম গাছ থেকে। বাবা প্রায়ই দুপুরে ঘুমাতে বলেন, কিন্তু আমার ভালো লাগে না। তবু কয়েক দিন ঘুমিয়েছি। ঈদের আগে প্রতি রাতেই বৃষ্টি হয়েছে। টিনের ঘরে বৃষ্টির ঝুমঝুম শব্দ আমার ভালো লাগে। দাদাবাড়ির একটু দূরেই ছোট একটা নদী। নদীর ধারে ঘুরতে গিয়েছিলাম। এক রাতে সবাই মিলে পিকনিক করেছি। পাড়ার অনেক ছেলের সঙ্গে ফুটবলও খেলেছি। দল বেঁধে অন্য দাদুদের বাসায় গেছি। গুড়ের সন্দেশ খেয়েছি। ঈদের দিন দাদিমার কাছ থেকে সালামি পেয়েছি। ঈদগাহে নামাজের সময় বৃষ্টিতে ভিজেছি। নামাজ শেষে দাদার কবরে দোয়া করেছি। ঈদের পরের দিন বাবা একটা পাকা কাঁঠাল নিয়ে আসেন। সবাই মিলে কাঁঠাল খাই। পাকা আম গাছ থেকে মাটিতে পড়লে প্রথমবারের মতো তুলে খাই। ঝড়ের সময় অনেক আম মাটিতে পড়ে। রাতের বেলা সব কাজিন মিলে বড় একটা জায়গায় পিলো পাসিং খেলি। আমি বারবার গ্রামের বাড়ি ফিরতে চাই।
তুমি চুরি করলে কেন?

ছোটবেলায় মা যখন অফিসে যেতেন, বাবাই আমাদের সামলাতেন। আমাকে হাঁটতে শিখিয়েছেন, পড়ে গেলে ওষুধ লাগিয়েছেন। প্রথম ‘অ আ ক খ’ শিখে যখন ‘বাবা’ বলেছিলাম, তাঁর মুখটা খুশিতে ভরে গিয়েছিল। অফিস থেকে ফিরে চা না পেলে, খবরের কাগজ বা টিভির রিমোট না পেলে বাবা রাগ করতেন। এখন বুঝি—রাগ না, ওটা ছিল আমাদের কাছে আবদার। বাবার সঙ্গে মেলায় গেছি, বৃন্দাবন, আগ্রা, দিল্লি বেড়াতে গেছি। পূজার সময় বাবা হাতে অল্প কিছু পকেট মানি দিতেন। তা দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ফুচকা খাওয়া, মেলায় খেলনা কেনার আনন্দই আলাদা। বাবার রাগ খুব বেশি। মায়ের সঙ্গে ঝগড়া হলে সেই রাগটা আমাদের ওপর এসে পড়ত। পড়া ভুল হলে বা কোনো ভুল কাজ করলে বাবা মারধরও করতেন। আমি একটু মোটা বলে বাবার কিছু মন্তব্যও আমাকে খুব কষ্ট দিত। একবার একটা অনুষ্ঠানে আমাদের সবাইকে ব্যাগ দেওয়া হচ্ছিল। অনুষ্ঠানের শেষের দিকে দেখলাম সবাই তিন-চারটি করে নিয়ে যাচ্ছে। লোভ সামলাতে না পেরে আমিও একটা অতিরিক্ত ব্যাগ নিয়েছিলাম। দেখে বাবা ভীষণ রেগে সবার সামনে খুব বকা দেন। বলেছিলেন, ‘তুমি চুরি করলে কেন?’ ভয় পেয়ে বলেছিলাম, ‘সবাই তো নিচ্ছে, তাই নিলাম।’ কিন্তু বাবা কোনো অজুহাত শোনেননি। পাশাপাশি তাঁর মনটা অসম্ভব নরম। বেশ কয়েক বছর আগে বলেছিলাম একটা ফোন কিনে দিতে। গত পূজায় আমাকে ফোন আর একটা স্মার্ট ওয়াচ কিনে দিয়েছিলেন। আজকাল বাবাকে খুব একটা কাছে পাই না। রাতেও কাজে ব্যস্ত থাকেন। বাবাকে খুব একটা চোখের সামনে পাই না বলে মাঝেমধ্যে তাঁকে দেখলে একটা আলাদা ভয় ও দূরত্ব কাজ করে। পিছুটান বা জেদ ছাড়ানোর জন্য বাবা আমাকে হোস্টেলে পাঠিয়ে দেওয়ার ভয় দেখাতেন, পরীক্ষার সময় পড়া না হলে ‘বাড়ি থেকে বের করে দেব’ বলেও ভয় দেখাতেন। রাত করে বাড়ি ফিরলে খেতে দিতেন না। শাস্তি দেওয়ার জন্য মাঝে মাঝে সারা দিন বিদ্যুৎ ও এসি বন্ধ করে রাখতেন। বাবা মানুষ হিসেবে বড্ড জটিল। কখনো খুব আপন, কখনো খুব কঠিন। জানি বাবা সব সময় আমাকে বোঝেন না। তবু বাবা, তোমায় ভালোবাসি।
আয়ুষ দাস
নবম শ্রেণি
আম কুড়োবার ধুম
শফিক ইমতিয়াজ

মাঝরাত; বৃষ্টির হানা—ঝিম কিড়কিড়
বয় ঝড়, কাঁপে ঘর, পাল্লাটা খিড়কির
জ্যৈষ্ঠের এই ঝড়, বাপ রে কী রূপ-দাপ
ডালপালা কড়মড়, আম পড়ে ধুপধাপ!
এ সময় কাঁথা মুড়ে বিছানায় কাত রই?
নই আমি সেই বোকা, ঘুমোবার পাত্রই
খাপছাড়া কাজ ছাড়া এ জীবন ঝুট বৈ
প্রয়োজনে সারা রাত ভিজে আম খুঁটবই।
ভূত-প্রেত, সাপ-খোপ, নেই ভয় দৈবের
কৌশলে খিল এঁটে ছাতা নিয়ে হই বের
ভয় তবে একটাই, বাপ যদি টের পায়
রক্ষেটা হতে পারে দয়ালের কেরপায়!
আমবাগ নিকটেই, হাঁটা পথ, ওই দূর
যোগ দেয় সহপাঠী ডানপিটে মঈদুর
গিয়ে দেখি, হীরকের সবগুলো টুকরোই
এসে গেছে; চিন্তা কি? কাল বার শুক্রই।
খাঁ বাড়ির বেটা-বেটি, জমায়েত সব্বাই
বুলা পিসি, দিলু খালা, বাতরোগী রব ভাই
ঢুলি রাম, কুলি শের, পালাকার দিলদার
সাড়া পাই জিতু খালু, দীপ, স্বপ্নিলদার।
আম পড়ে ধুপধাপ; কে কুড়োয়! হুল্লোড়!
এর সাথে নেই যোগ বাজারের মূল্যর
ঠেলাঠেলি, ধাক্কা বা বড়জোর খামচাই
ভিজে ভিজে একাকার, কবজায় আম চাই!
জল কমে আকাশের ওল্টানো কাপটায়
আম তবে পড়ছেই বাতাসের ঝাপটায়।
টর্চের আলো ফেলে কে যে গলা খাঁকরায়!
আসছে কে? আব্বা কি? এসে যদি পাকড়ায়!
সাথে কে গো? আঁচ পাই আম্মার কণ্ঠের
ছেলে নেই ঘরে, বুঝি পেল এতক্ষণ টের!
খোঁজে বের হয়েছেন গুণধর পুত্রের
পালাই, পাশেই ঝোপ নাটা আর ধুতরের
কিশোরের বুকে কত শাসনের বিষ সয়?
চোখ মেলে চাই—লাগে ঘোরতর বিস্ময়!
এই বুঝি এই দেশে জ্যৈষ্ঠের ভাব-বাও
আম্মাকে সাথে নিয়ে আম খোঁটে আব্বাও!
